HeaderDesktopLD
HeaderMobile

অজানা গ্রাম পটাশপুরে কাটাতে পারেন এবারের পুজো

0

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

পটাশপুর (patashpur) থানা এলাকায় কাঁথি থেকে আসতে হলে বাজকুল হয়ে এগরা সড়ক ধরে আসা যায়। দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। এগরা থেকে পটাশপুর আসা যায়, দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। আবার বালিচক স্টেশন হয়ে বাসে পটাশপুর আসা যায়। এই এলাকায় বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান আছে।
অমর্ষি কসবা : কাঁথি থেকে বাজকুল হয়ে এগরা যাওয়ার রাস্তায় পড়ে অমর্ষি কসবা গ্রাম। কাঁথি থেকে ৫০ কিলোমিটার আর এগরা থেকে পঁচেটগড় দেখে এখানে এলে দূরত্ব এগরা থেকে ২১ কিলোমিটার। অমর্ষি বিখ্যাত পীর খাজা মখদুম শিহাবুদ্দিন চিসতি সাহেবের মাজারের জন্য। এই স্থানে খ্রিস্টীয় সতেরো শতকে নির্মিত একটি তিন গম্বুজ মসজিদও গুরুত্বপূর্ণ। এই মখদুম সাহেব ছিলেন মসনদ-ই-আলার তাজ খাঁয়ের গুরু।
বহু কিংবদন্তী আছে এই পীরসাহেবকে ঘিরে। কথিত আছে, তখন এই এলাকার রাজা ছিলেন দাম্ভিক অমর সিংহ। একদিন পীরসাহেব রাজদরবারে প্রবেশের সময় রাজার চটিজুতাকে সেলাম না করায় নিয়মভঙ্গের দায়ে মখদুম সাহেবের শিরশ্ছেদের আদেশ দেন রাজা। কিন্তু পীরসাহেব রাজাকে সন্মুখসমরে পরাজিত করে রাজার সমস্ত রাজ্য অধিকার করে নেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই রাজা অমর সিংহের নাম থেকেই জায়গার নাম, অপভ্রংশে অমর্ষি হয়েছে। বর্তমানে এই পীরের স্থান হিন্দু-মুসলমান সমস্ত মানুষের কাছে অতি পবিত্র। এখন উভয়ে আসেন, মানত করেন, ফুল-সিন্নি-ধূপ-বাতি নিবেদন করেন। প্রতিবছর বৈশাখ মাসের ১লা থেকে ৪ঠা পর্যন্ত পীরের উরস পালিত হয় ও এই উপলক্ষে মেলা বসে। এখানে মহরম খুব আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়।
গোকুলানন্দ মন্দির : আনুমানিক সতেরো খ্রিস্টাব্দে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী সাধক গোকুলানন্দের জন্ম হয়েছিল সবং থানার কোলন্দা গ্রামে। এটি কেলেঘাই নদীর ধারে। আর তিনি যেখানে বসে শেষজীবনে সাধন-ভজন করেছিলেন সেটি এখন নদীর ওপারে, পটাশপুর থানা এলাকায়। তিনি বাকসিদ্ধ সাধক হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন। বিভিন্ন অঞ্চলের লোকেরা তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কুঁড়েঘরের সামনে একটি তুলসীগাছ ছিল তাঁর যোগমঞ্চ। গোকুলানন্দ পৌষসংক্রান্তির দিন বারোটার সময় যোগমঞ্চে উপস্থিত হয়ে সমাধিমগ্ন হন। সেখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। গোকুলানন্দের যোগমঞ্চই তাঁর সমাধি ক্ষেত্র।

তাঁর প্রিয় শিষ্য বিপ্রসাদকে গোকুলানন্দ কিছু নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রতিবছর পৌষসংক্রান্তির দিন রাত্রি দুটোর পর থেকে পয়লা মাঘ পর্যন্ত যে নদীগর্ভ থেকে তিন মুঠো মাটি নিয়ে তাঁর যোগমঞ্চে দেবে সে নিজ আকাঙ্ক্ষিত ফললাভে সমর্থ হবে। আর ভক্তবৃন্দের আশ্রয়, আহার ও বিশ্রামের জন্য কেলেঘাই নদীর উত্তর তীরে ১লা মাঘ একটি মেলার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন। সেইমতো মাটি দেওয়া ও মনস্কামনা পূরণের ব্যাপারটি চলে আসছে।

আদিতে এক দিনের জন্য হলেও এখন চার দিন ধরে চলে মেলা। বহুদূর থেকে নৌকায়, গাড়িতে, গরুর গাড়িতে, হেঁটে আসা প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ ঘটে। এটি গোকুলানন্দের মেলা বা তুলসীচারার মেলা নামে পরিচিত।
বর্তমান যোগমঞ্চটি ইটের তৈরি, বেশ খাড়াই, মাটি দেওয়ার ফলে এক বিরাট মাটির স্তূপে পরিণত হয়েছে। উৎসাহী পর্যটকরা এটি দর্শন করলে ভাল লাগবে আর মেলার সময় এলে অভিজ্ঞতাটি সারাজীবনের সঞ্চয় হয়ে থাকবে।
গোনারার মনসাতলা : মেদিনীপুর জেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় মনসা পূজার কেন্দ্র হল গোনারা। সাপের অধিষ্ঠাত্রী দেবী অপেক্ষা সর্বপ্রকার বিপদ মুক্তির দেবী হিসাবে তিনি সারাবছরই পূজা পান। দেবীর এই থান ও মনসা গাছ ১৫০ বছরের প্রাচীন। মানুষ এবং গোরুর অসুখে বহু লোক মানত করেন। ভক্তদের মনোবাসনা পূর্ণ হলে ক্ষীরভোগ অর্থাৎ পায়েস দেবীর নিকট উৎসর্গ করার রীতি আছে। এগরা থেকে পটাশপুর হয়ে মঙ্গলামাড়ো ২৭ কিলোমিটার। কাঁথি, বাজকুল, মেচেদা প্রভৃতি জায়গার সঙ্গে মঙ্গলামাড়োর যোগ রয়েছে। মঙ্গলামাড়োর কাছে গোনারা গ্রাম।

এছাড়া, পটাশপুর থানা অঞ্চলে উৎসাহীরা দেখে নিতে পারেন নৈপুরের মদনমোহন মন্দির, তাপড়পাড়ায় লক্ষ্মীজনার্দন মন্দির, গোপালপুরে কালী মন্দির, শ্রীরামপুরে বাসুলী মন্দির, চন্দনপুরে চন্দনেশ্বর শিব মন্দির প্রভৃতি।

ভগবানপুর

এগরা মহকুমার একটি অন্যতম অঞ্চল হল ভগবানপুর থানা অঞ্চল। কাঁথি, এগরা, মেচেদা, বাজকুল প্রভৃতির সঙ্গে বাস যোগাযোগ রয়েছে। কাঁথি থেকে বাজকুল ৩০ কিলোমিটার, বাজকুল থেকে ভগবানপুর ১৩ কিলোমিটার। এই অঞ্চলে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েছে যা নীচে বিবৃত হল।
কাজলাগড় : বাজকুল থেকে কাজলাগড় ৪ কিলোমিটার আর কাঁথি থেকে ৩৪ কিলোমিটার। কাজলাগড়ে সুজামুঠা জমিদারির রাজধানী ছিল। গোবর্ধন রণঝাঁপ ছিলেন এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। রাজা নরেন্দ্র নারায়ণের সময় থেকে এঁরা চৌধুরী উপাধি গ্রহণ করেন।
এই বংশের প্রতিষ্ঠিত গোপালের নবরত্ন মন্দিরটি হল এক উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তি। উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট। মন্দিরের সামনে যে সুন্দর টেরাকোটা অলংকরণ ছিল তা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। রাজপরিবারের বংশলতিকা থেকে জানা যায়, রাজা মহেন্দ্র নারায়ণ এখানে রাজবাড়ি, ঠাকুরবাড়ি ও এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। সেই হিসাবে মন্দিরটি আঠারো শতকে নির্মিত বলে মনে করা হয়। বর্তমানে সবই পরিত্যক্ত। এখানে অন্যতম দ্রষ্টব্য হল জল ও পাড় নিয়ে সাত একরের বিশাল কাজলা দীঘি। জলকষ্ট নিবারণের জন্য রাজা গোপালচন্দ্র নারায়ণ খনন করেছিলেন। কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই পরগনার সেটেলমেন্ট অফিসার হয়ে তিন বছর এখানে ছিলেন। কাজলা দিঘির উত্তর পাড়ে তাঁর স্মরণে ‘দ্বিজেন্দ্র স্মৃতি স্তম্ভ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

পাইকভেড়ি : শ্যামসুন্দর ঠাকুরের ‘শীতাবাস’ ও পাশে ‘গ্রীষ্মাবাস’ বলে দুটি মন্দির রয়েছে এই গ্রামে। গ্রামের মুরলীধর বেরা ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে বেরা পরিবারের গৃহদেবতা শ্যামসুন্দরের জন্য চারচালা জগমোহন-সহ শিখর দেউল তৈরি করেছিলেন। মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ৫০ ফুট, এটি ‘শীতাবাস’ নামে খ্যাত। এর পূর্ব দিকে দক্ষিণমুখী এক দালানের ওপর পঞ্চরত্ন রীতির মন্দিরটি শ্যামসুন্দরের গ্রীষ্মাবাস বলে পরিচিত। এটি ১৭৩৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ও উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। বাড়ভগবানপুর থেকে ২ কিলোমিটার ও বাজকুল থেকে পাইকভেড়ি ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

ভগবানপুর : বাজকুল থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে এই ভগবানপুর থানা। এখানে সৈয়দ বাজার এলাকায় রুদ্রেশ্বর শিবের ৩৫ ফুট উচ্চতার সপ্তরশিখর মন্দির। এখান থেকে সামান্য পুবে চক্রবর্তী পরিবারের দক্ষিণাকালীর ৪০ ফুটের আটচালা মন্দির ও মন্দিরের দু’পাশে দুটি আটচালা শিব মন্দির এখানকার দর্শনীয় স্থান।
ভীমেশ্বরী দেবীর মন্দির : ভীমেশ্বরী আসলে দুর্গা। এই মন্দিরে পুত্র ও কন্যা-সহ দুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তি আছে। দেবীর বিশাল আটচালা ৪০ ফুটের মন্দিরটি জরাজীর্ণ অবস্থা। মন্দিরটি আঠেরো শতকের শেষের দিকে নির্মিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মন্দিরটি সিমুলিয়া গ্রামের মধ্যে অবস্থিত হলেও দেবীর নামে জায়গার নামও ভীমেশ্বরী হয়ে গেছে। বাজকুল থেকে ভীমেশ্বরীর দূরত্ব ১৭ কিলোমিটার। এখান থেকে ২ কিলোমিটার দূরে শিমুলেশ্বর শিব মন্দিরটিও বেশ প্রাচীন ও জাগ্রত বলে পরিচিত।
এছাড়া, এই থানা এলাকায় কলাবেড়িয়া গ্রামের শীতলা মন্দির, মাসুড়িয়ার কাঁচা খড়ের ছাওয়া শিব মন্দির, বিভীষণপুরের কালী মন্দির, তাঙ্গুরিয়ার কিশোর জীউ মন্দির, ভগবানপুর সৈয়দ বাজারের প্রাচীন দুই পীর সৈয়দ জাফর ও সৈয়দ মজঃফরের মাজার প্রভৃতিও দর্শনীয় স্থান।

Leave A Reply

Your email address will not be published.