HeaderDesktopLD
HeaderMobile

মুখেমুখে ফেরা পুজোর গান কই, ইউটিউব-ফেসবুক দিয়ে জনপ্রিয়তা হয় না: হৈমন্তী শুক্লা

0 961

তাঁর ফোনের কলার টিউনে বেজে উঠল, ওই বুঝি বাঁশি বাজে, রাধা রাধা বলে ডাকে, কী গুণ জানে বাঁশি আমি, রইতে নারি ঘরে।’ কিন্তু করোনা আবহে বেশিরভাগ সময়েই তাঁকে ঘরে থাকছে হচ্ছে। যদিও সম্প্রতি একটি রিয়্যালিটি শোয়ের বিচারক হয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু বেশি সময়টাই বাড়িতে কাটাচ্ছেন। তিনি হৈমন্তী শুক্লা। পুজোর গান নিয়ে অকপট আড্ডায় মন খুললেন দ্য ওয়ালের প্রতিনিধি শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

চিরকালের গান বলব আমি।

আমাদের ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল ঐ কালো চাকাটা ঘুরবে আর আমার গান বেরিয়ে আসবে। তখন রেকর্ড ছিল, তার পর ক্যাসেট, সিডি হয়ে এখন শুধুই ইউটিউবে একটা করে গান। আগে তো পুজোয় একজন শিল্পীর অনেকগুলো গান হত ক্যাসেটে। এখন ছোটরা নিজেরাই সুর করছে, কথা লিখছে, নিজেরাই গাইছেএর ভাল আর খারাপ দুটো দিকই আছে। আমি ছোটদের আশাহত করব না। কিন্তু বলব আর একটু ভাল করে শিখে গান বানাও।

মান্নাদা বা হেমন্তদা যে গানগুলো গেয়েছেন আবার সুর করেছেন, সেগুলোয় একটা শিক্ষার প্রতিফলন রয়েছে। সেই পুজোর গানগুলোই আজও বাজছে। এখনকার পুজোর গান কে কী বানাচ্ছে, শ্রোতারা কিন্তু জানে না। আর আগে আমাদের বাংলায় সব শিল্পীর মধ্যে একটা নিজস্বতা ছিল।

সেদিন আর একটা কথা অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়দা আমায় বলছিলেন, শুধু মেয়েদের কথা বলছি, বম্বেতে লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে পরে যে মহিলা শিল্পীরা এলেন তাঁরা সবাই ওই লতা মঙ্গেশকরকে সামনে রেখেই গান করেছেন করছেন। সে সুমন কল্যানপুর হোন বা শ্রেয়া ঘোষাল। শ্রেয়ার গলা খুব ভাল, কিন্তু নিজস্বতা নেই কোথাও। সেই লতাকে অনুসরণ করা গায়কী। কিন্তু বাংলা গানে সবার নিজস্বতা ছিল। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, এমনকি বনশ্রী সেনগুপ্ত, আরতি মুখোপাধ্যায় কিংবা আমার কথাই বলছি। গলার টেক্সচার সবার আলাদা। গানটা শুনলেই শ্রোতারা বুঝতে পারেন এইটা আরতি গাইছে বা এইটা হৈমন্তী গাইছে। এই জিনিসটা কিন্তু আর কোন জায়গায় পাওয়া যায়নি। এখন সব ঢালাও গান গাইছে, জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে কিন্তু যে গানগুলো শুনে গাইছে সেগুলো অরিজিনাল গানগুলোকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।

এই যে বলে না স্বর্ণযুগের গান, আসলে স্বর্ণযুগের গান বলে আলাদা কিছু নেই। আমি কাল ধরে বলতে চাই অতীত কাল, বর্তমান কাল। যে গানগুলো আমি উল্লেখ করছি সেগুলো কিন্তু চিরকালের গান বলব আমি। হেমন্তদা বা মান্নাদার গানগুলোই তো এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা গাইছে। এখনও যদি একটা পার্টি হয়, সেখানেও জীবনে কী পাব নাগেয়েই নাচছে। সেই ধরনের নতুন বাংলা গান কিন্তু আসছে না। একটা অবক্ষয় তো হয়েছে সাহিত্যে বলো, সিনেমায় বলো। পুজো মানে তো পুজোর ছবিও। অভিনয়ে তবু নতুন প্রতিভারা দেখছি সাঙ্ঘাতিক অভিনয় করছে কিন্তু গানে সেভাবে পেয়েছি বলে মনে হয় না। পুরনো গানই ভেঙে ভেঙে চলছে। এই যেমন জাতিস্মর‘-এর গান গুলো যখন অন্য গলায় শুনছি, একই গানে আমাদের কানে কিন্তু মান্নাদার গলাটা বাজছে।

 ‘অনুরোধের আসরএর শেষ গান মানেই হিট গান

এবছর পুজোর গান আমি করলেও সে মাত্র একটা গান। আগে তো পুজোর গানে প্রতিযোগিতা ছিল। চার পাঁচটা গানের মধ্যে একটা হিট হবেই। এখন একটাই গান ভাল লাগলে ভাল, ফেলে দিলে দিল। আমাদের সময় যেমন রেডিওতে অনুরোধের আসরছিল। প্রথম যখন আমার গান বেরেল আমরা তাকিয়ে আছি কবে ‘অনুরোধের আসর‘-এ বাজবে। তখন মিডিয়া এখনকার মতো শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু আমি একজন নতুন শিল্পী, আমার নতুন পুজোর গান ‘এ তো কান্না নয় আমার’ যেই  ‘অনুরোধের আসর‘-এ বাজল, একেবারে সাড়া পড়ে গেল। আর একটা ব্যাপার ছিল, শেষে কার গান বাজল? সেই গানটাই সবথেকে হিট হবে। আমরা ভাইবোনেরা বলতাম, আজ হেমন্তদার শেষ গান হবে, আজ শ্যামলদার হবে, সন্ধ্যাদির হবে। 

এই ধারাটা এফএম, বিশেষত ‘আমার এফএম’ ধরে রেখেছিল। কিন্তু এখন কী হয়েছে এফএমে শুধু হিন্দি গান বাজে, আর পুরনো গান বাজে ওই হেমন্তদা, মান্নাদা, আরতি, আমি। আমরা এই দলের মধ্যে আছি। কিন্তু আমরা যে তার পরেও অনেক নতুন বাংলা গান করেছি, সেগুলো হাজার গানের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে। এমন গান আছে আমি গেয়ে ভেবেছি গানটা ভাল হয়নি কিন্তু এফএমের দৌলতে লোকের কানে পৌঁছে গেছে।

ইউটিউবে এত শিল্পী, কিন্তু পুজোর গান লোকে জানে না

কাঁহাতক তুমি নিজে গান গেয়ে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে বা ফেসবুক লাইভে দেবে! কজন লোক দেখল, ভাল বলল, ওই হিসেবে কি আর জনপ্রিয়তা হয়? অনেক ছোটরা বলে আমায়, গান করে ইউটিউবে দিয়েছে তাদের চার হাজার কি পঞ্চাশ হাজার শ্রোতা হয়েছে। এইটা দেখে খুশি হওয়ার কী কারণ আছে? সেগুলো ধর্তব্যের মধ্যে নয়। একটা পুজোর গান লোকের মুখেমুখে ফিরবে, তবে তো সেটা জনপ্রিয় গান।

এত সাবস্ক্রাইবার, ফলোয়ার তবে নতুন পুজোর গান হচ্ছে না কেন? কোথাও বাজছে না কেন? কারণ গানের লিঙ্ক হারিয়ে গেলে গানটাও হারিয়ে গেল। নতুন ছেলেমেয়েরা গাইছে, চেষ্টা করছে, কিন্তু ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ঠিক প্ল্যাটফর্ম নয়। আমায় পাঠাল গানের লিঙ্ক, আমি শুনে না হয় বললাম আহা বড্ড ভাল হয়েছে। কিন্তু সেটা কি জনসাধারণের কাছে পৌঁছোল? না তো।

নতুন গান গাইলে শোনে না

এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আমাকে ভালবাসছে, আমার গান শুনছে এটা তো একটা বিরাট পাওয়া। আমি গান গাইলাম যখন আমি সে ও সখা তে এমন স্বপ্ন কখনও দেখিনি আগেসে গান এখনও লোকের মুখেমুখে ফেরে। অনুষ্ঠানে দেখি সামনের সারিতে সব গাইছে আমার সঙ্গে।

আমাকে দেখে আমার বলার কিছু ছিল না‘, ‘এমন স্বপ্ন কখনও দেখিনি আগে‘, ‘এখনও সারেঙ্গীটা বাজছেএই গানগুলোই রোজ শুনতে চায় দর্শকরা। আমরা যদি ভাবি এ গানটা তো বহুবার গেয়েছি আর গাইব না, নতুন গান শোনাই, তখনই দেখবে শ্রোতারা পাশের লোকের সঙ্গে কথা বলছে। এটা শ্রোতাদের স্বভাব।

প্রযুক্তির ভাল-খারাপ দুই-ই আছে

আমি গান ছাড়া কিছু ভালোবাসি না, কিছু চাইনা। সেই গানের জায়গাটা স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে। এখন গান রেকর্ড অনেক সোজা হয়ে গেছেআমাদের ঘরভর্তি মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে এক টেকে সব ঠিক করতে হত। প্রযুক্তির ভাল-খারাপ দুইই আছে। আমি মান্না দের সুরে এত গান গেয়েছি, মান্নাদা বলতেন বাড়ি যাও দিন পনেরো খুব করে গাও। গলায় বসলে তার পর রেকর্ড করবে।এখন স্টুডিওতে গিয়ে গান শিখে সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ড করছে। আমাদেরও ডাকে, দিদি করে দিন বলে, আরে গানে একাত্ম হওয়া যায় ওটুকু সময়ে?

সেদিনও একটি অল্পবয়সি মেয়েকে বললাম, তুমি ঘাঁইঘাঁই করে গানটা রেকর্ড থেকে শুনে গাইছো ঠিকই, কিন্তু একটু গলায় সুর সাধতে হবে।’ আর এক্সপ্রেশন তো আর্টিস্টকে শেখানো যায় না, তাঁর একটা অভিব্যক্তি গানের ভিতর দিয়ে বেরোবে।

আমরা তো জীবন প্রায় কাটিয়েই ফেললাম। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমার কষ্ট হয়। তাঁরা তাঁদের গান নিয়ে জনসমক্ষে কীভাবে আসবেন!

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.