HeaderDesktopLD
HeaderMobile

ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে লক্ষ্মী পুজো! আকর্ষণে ঘটি উত্তম, আপ্যায়নে বাঙাল সুপ্রিয়া

0 448

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

উত্তম কুমারের বাড়ির লক্ষ্মী পুজো বলতে আজকাল আমরা বুঝি ভবানীপুরে গিরিশ মুখার্জী রোডের বাড়ির লক্ষ্মী পুজো। এই কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো চট্টোপাধ্যায় পরিবারের চিরাচরিত পারিবারিক লক্ষ্মী পুজো। যেটা উত্তম ‘উত্তমকুমার’ হওয়ার বহু আগে থেকেই হয়ে আসছে। উত্তম কুমার ফিল্মে এসে বিখ্যাত হওয়ার পরে এই পুজো গ্ল্যামার জগতের তকমা পায়। সেই পুজোটাই এখন উত্তম কুমার-তরুণ কুমার-বরুণ কুমারের পৌত্র, পৌত্রী, দৌহিত্র, দৌহিত্রীরা করেন। এই পুজো আজও কোজাগরীতে খবরের শিরোনামে থাকে।

কিন্তু আজ বলব উত্তম কুমার-সুপ্রিয়া দেবীর আলাদা সংসারের লক্ষ্মী পুজোর গল্প। যে পুজোর কাহিনি সংরক্ষিত হয়নি। কিন্তু সেই পুজোয় বসত তারকাদের চাঁদের হাট। আধ্যাত্মিকতাও কম ছিল না। উত্তম কুমারের মহাপ্রয়াণের চল্লিশতম বছরে তাই ফিরে দেখা উত্তম-সুপ্রিয়ার লক্ষ্মী পুজোর ইতিহাসের পাতা।

উত্তম-সুপ্রিয়ার নতুন সংসারে লক্ষ্মীর আরাধনা

তিন নম্বর ময়রা স্ট্রিট উত্তম-সুপ্রিয়ার প্রেমের তীর্থক্ষেত্র যে বাড়ি, সেখানেই হত এই লক্ষ্মী পুজো। উত্তম সুপ্রিয়া দুজনেই কাকভোরে বড় গঙ্গায় গিয়ে গঙ্গা স্নান সেরে পরিষ্কার কাপড় পরে ময়রা স্ট্রিটে ফিরে পুজোর প্রস্তুতি করতেন।

একটা প্রশ্ন সকলেই করে থাকেন, কেন দুটো পুজোর ব্যবস্থা? উত্তরটা খুবই সরল, আবার জটিলও। উত্তম কুমারের দুটি সংসার ছিল, তাই দুটি লক্ষ্মী পুজো হত। এসব প্রশ্নে অবশ্য উত্তমকুমারের কিছু যায়-আসেনি।

এই ময়রা স্ট্রিটের লক্ষ্মী পুজো দেখেছেন স্বচক্ষে, উপস্থিত থেকেছেন, এমন মানুষ এখন বিরল। সম্ভবত একজনই জীবিত ও শেষ প্রতিনিধি রয়েছেন এ পুজোর সাক্ষী হিসেবে, তিনি সাহিত্যিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কন্যা এবং উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর কন্যাসমা সর্বাণী মুখোপাধ্যায়।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা প্রচুর কালজয়ী সাহিত্যে উত্তম-সুচিত্রা-সুপ্রিয়া  অভিনয় করেছেন। ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘কাল তুমি আলেয়া’, ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘নবরাগ’ প্রভৃতি। সর্বাণী মুখোপাধ্যায় বাবার সঙ্গে যেতেন তাঁর উত্তম কাকু আর বেণু আন্টির এই লক্ষ্মী পুজোতে।

‘বেণু আন্টির প্রতি সমাজ আজও হিংস্র’

সর্বাণী বললেন, “আমার বাবা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বোনের মতো ছিলেন বেণু আন্টি। তাই আমাদের পরিবারের সঙ্গে খুবই হৃদ্যতা ছিল উত্তম কাকু আর বিশেষ করে বেণু আন্টির।

১৯৬৩ সালের পৌষ মাসে উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর বিয়ে হয়। এখন তো লিভ ইন ঘরেঘরে হচ্ছে, কিন্তু তখন সেটা বাঙালি সমাজে এতটাও সহজ ছিল না। পৌষ মাসে কিন্তু সাধারনত বিয়ে হয় না, ওঁদের হয়েছিল। কারণ বেণু আন্টির বাবা গোপালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন এভাবে লিভ ইন করা যাবে না। তোমরা বিয়ে করো। আগেও তো কৌলিন্য প্রথায় দুজন স্ত্রী থাকতে পারতেন, তাতে প্রথম জনকে ডির্ভোস দেওয়ার দরকার নেই। তাই হল।

তবে সমাজের সমস্যার শেষ নেই। বেণু আন্টি খুবই স্নেহশীলা মানুষ ছিলেন। তবু সমাজ সুপ্রিয়া দেবীর প্রতি এত হিংস্র। বেণু আন্টি কারও ঘর ভাঙেননি কারণ বেণু আন্টি উত্তম কুমারের ভবানীপুরের বাড়িতে গিয়ে কোনও দিন ওঠেননি, থাকেননি। উত্তম কুমারই আশ্রয় চেয়েছিলেন সুপ্রিয়া দেবীর কাছে। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, এর আগে আরও দুজন প্রথম সারির খ্যাতিমান নায়িকার বাড়ি উত্তম কুমার যান। তাঁরা ফিরিয়ে দেন।

এর পরেই একদিন রাতে বেণু আন্টি স্নান সেরে শুতে যাবেন, দরজায় কলিং বেল। দেখেন উত্তম কুমার দাঁড়িয়ে। অত রাতে পরিশ্রান্ত আশ্রয়প্রার্থী মানুষটাকে বেণু আন্টি ফেরাতে পারেননি। একরাতের জন্য থাকতে দেন। তখন ভবানীপুরের কেউ খবর নেননি উত্তম কুমারের। শেষমেষ উনি থেকে গেলেন বেণু আন্টির কাছে। উত্তম কুমারের ঘর ছাড়া এটাই প্রথম বার নয়। এর আগেও উনি এক নায়িকার বাড়ি ওঠেন। তখন উত্তম কুমারের বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় বেঁচে, উনি আর উত্তম কুমারের প্রথম স্ত্রী গৌরী দেবী গিয়ে সেই নায়িকার বাড়ি থেকে উত্তম কুমারকে ফিরিয়ে আনেন। বেণু আন্টির বেলায় সেটা ঘটেনি।

অনেকেই বলে থাকেন উত্তম কুমার সুপ্রিয়া দেবীকে সিঁদুর পরাননি কখনও। যেটা একদম মিথ্যে কথা। আমার বাবা আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নিজে উপস্থিত ছিলেন এই বিয়েতে। বেণু আন্টির বাবাও ছিলেন। বেণু আন্টিকে ওঁর ছোড়দা সম্প্রদান করেন। শালগ্রাম শিলার সামনে উত্তম কুমার সিঁদুর পরিয়ে দেন সুপ্রিয়া দেবীকে। মালাবদল করে বৈদিক মতে বিয়ে হয় ওঁদের। বড় গিন্নির উপর আক্রোশও বেণু আন্টির কোনও দিনও ছিল না, বরং ওঁকে রান্না করে পাঠাতেন।

পুরোহিতের সঙ্গে উত্তমও পুজোয় বসতেন গরদ পরে

বেণু আন্টির মুখ থেকেই শোনা, লক্ষী পুজোটাও ময়রা স্ট্রিটে ঠিক ওঁদের বিয়ের পরপরই শুরু হয়, ১৯৬৪ থেকে সম্ভবত। তাই বিয়ের ইতিহাসটা বলা জরুরি। এই পুজোতে আমিই যেতাম বাবার সঙ্গে। এই পুজো নিয়ে বলার লোকও এখন আর কেউ নেই। সুপ্রিয়ার কন্যা সোমা তখন বোর্ডিংয়ে আর পরে বিয়ের পর ও ফ্রান্সে থাকত। ও সেভাবে পায়নি এই পুজোটা।

ভবানীপুরের বাড়ির পুজোতে দুয়েকবার গেছি বাবার সঙ্গে, তবে সেখানে ভোগ খাইনি কখনও। ভোগ খাওয়া হত বেণু আন্টির কাছেই। তবে উত্তম কাকু কিন্তু দুই বাড়িতেই যেতেন। উত্তম কাকু আর বেণু আন্টি সারাদিন উপবাস করে থাকতেন। উত্তম কাকু পৈতৃক বাড়ির পুজো আগে সেরে তার পর ময়রা স্ট্রিটে আসতেন। কারণ ময়রা স্ট্রিটের পুজো শেষ হতে হতে রাত হয়ে যেত।

উত্তম ও গৌরী। গিরীশ মুখার্জী রোডের বাড়ির পুজোয়।

উত্তম কুমার গরদ পরে নিজে লক্ষ্মী পুজো করতেন। পুরোহিত আসতেন কিন্তু উত্তম কুমার বসতেনও।”

বাঙাল বেণু শ্বশুরবাড়ির ঘটি নিয়মে লক্ষ্মী পুজো করতেন

পুজোর আয়োজন থেকে সব রান্না একা হাতে করতেন সুপ্রিয়া দেবী। যেহেতু উত্তম কুমাররা এদেশী ছিলেন তাই পুজোর ভোগ থেকে নিমন্ত্রিতদের জন্য নিরামিষ বিভিন্ন বাঙালি পদ রান্না করতেন সুপ্রিয়া। সবাইকে যত্ন করে খাইয়ে উত্তম কুমারকে উপবাস ভেঙে ভোগ খাইয়ে তার পর সবার শেষে নিজের উপবাস ভাঙতেন সুপ্রিয়া দেবী। সুপ্রিয়া কিন্তু তখন এক নম্বর নায়িকা, বম্বে থেকেও ফিল্ম করে এসেছেন। কিন্তু আন্তরিকতায় এতটুকু খামতি ছিল না সুপ্রিয়ার। সুপ্রিয়ারা তো অনেক বোন, সব দিদি বোনরা উপস্থিত থাকতেন এই পুজোয়। লক্ষ্মী পুজোর বিশেষ নাড়ু নিজে হাতে আগে থেকে বানিয়ে রাখতেন সুপ্রিয়া দেবী।

আর ময়রা স্ট্রিটে গানের ঘরোয়া জলসাও হত রাতে। কত না লেজেন্ড শিল্পী গান গেয়েছেন উত্তম কুমারের হারমোনিয়াম বাজিয়ে! সঙ্গে বিশেষ আকর্ষণ উত্তম কুমারের কণ্ঠে গান।

লক্ষ্মীর মুখে কার আদল?

গিরিশ মুখার্জী রোডের পৈতৃক বাড়ির পুজোটা চিরাচরিত। উত্তম কুমার বিখ্যাত হয়ে বড় করে করতেন। ওঁকে দেখতে এবং ওঁর বাড়ির পুজো দেখতে অনেক সাধারণ লোক আসতেন। ভবানীপুরের বাড়ির লক্ষ্মী প্রতিমার মুখ গৌরী দেবীর আদলে করতেন উত্তম কুমার। তাহলে কি ময়রা স্ট্রিটের প্রতিমার মুখ সুপ্রিয়া মুখশ্রীর হত? না একদমই নয়। সুপ্রিয়া এসব কোনও দিন চাননি। সাধারণ সব বাড়িতে যেমন হয় তেমনই পটুয়াপাড়া থেকে মূর্তি এনে পুজো হত। সেখানে মূর্তিতে কোন বিশেষত্ব ছিল না।

সর্বাণী আরও বললেন “বেণু আন্টি বলতেন ‘আমি হলাম পাঁড় বাঙাল আর ও (উত্তম কুমার) ছিল কাঠ ঘটি।‘ বেণু আন্টি আগে বাপের বাড়ির মতে বাঙাল নিয়মে লক্ষ্মী পুজো করতেন। সেটা ছোট করে হত। বেণু আন্টির প্রথম স্বামী বিশ্বনাথ চৌধুরী যদিও পুজো নিয়ে আগ্রহী ছিলেন না, তখন বেণু আন্টিও ছবি করায় ব্যস্ত, তাই কেরিয়ারের শুরুতে তখন পুজো অতটা হত না। তার পরে নিজে যখন একা থাকতেন ময়রা স্ট্রিটে, তখন বাঙাল মতে লক্ষ্মী পুজো করতেন বেণু আন্টি। ওই বাড়িতে উত্তম কাকুর কোন আর্থিক ব্যাপার ছিল না। বেণু আন্টির বুকের পাটা ছিল অসম্ভব পোক্ত। তাই উনি একাই ভাড়া নেন এই সুবিশাল বাড়ির একটা অংশ। সেটাও ছিল বিশাল। পরে এখানে আশ্রয় চেয়ে উত্তম কুমার আসেন।

মেয়েরা যেমন বিয়ের পর সব শ্বশুরবাড়ির নিয়ম পালন করে, তেমন বিয়ের পর থেকে আর বাঙাল মতে পুজো না করে উত্তম কুমারদের চট্টোপাধ্যায় বাড়ির মতেই পুজো করতেন বেণু আন্টি। সরা থেকে লক্ষ্মী মূর্তি এনে পুজো শুরু হল। বাঙালদের লক্ষ্মী পুজোয় লক্ষ্মীকে এয়ো স্ত্রী ভেবে আলতা-সিঁদুর, পান পাতা-সুপুরির সঙ্গে মাছ ভোগ দেওয়া কিন্তু উত্তম সুপ্রিয়ার যৌথ দাম্পত্যে এসে সুপ্রিয়া সব নিরামিষে ভোগের আয়োজন করতেন।

আকর্ষণে উত্তম, আপ্যায়নে সুপ্রিয়া

ভবানীপুরের পুজোটা বহু আগে শুরু। পরে উত্তম কাকু সেটা বড় করে করতেন। আর ময়রা স্ট্রিটের পুজোয় উত্তম ও সুপ্রিয়া দুজন স্টার একসঙ্গে ছিলেন তাই স্বভাবতই বেশি আকর্ষণীয় ছিল। আর হেন তারকা নেই সঙ্গীত জগত, অভিনয় জগত, খেলার জগত, রাজনৈতিক জগতের, যিনি আসতেন না এই পুজোয়। তারকাদের মেলা বসে যেত। বম্বে থেকেও অনেক স্টার এসেছেন। তবে মধ্যমণি মহানায়কই ছিলেন। আর পুজোা ছিল উত্তম-সুপ্রিয়ার যৌথ পুজো।

তবে পুজোর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন উত্তম কুমারই। বেণু আন্টি ছিলেন গুড হোস্ট। সবাইকে যত্ন করে নিজ হাতে খাওয়াতেন। সেখানে কোনও প্রতিযোগিতা বা বায়না ছিল না ভবানীপুরের পুজোর সঙ্গে। অনেকে অনেক কথা আজকাল বললেও তাঁরা আদতেই অনেক কিছু না জেনে বলেন। বেণু আন্টির মধ্যে তীব্র মাতৃত্ববোধ ছিল। অসুস্থ শরীরেও শেষের দিকে সবাইকে বলতেন, ‘আমার কাছে একদিন আয় সারাদিন থাকবি আমি রেঁধে খাওয়াব।‘ এটা কজন বলে? তার উপর একজন লেজেন্ডারি নায়িকা!”

লক্ষ্মীশ্রী নয়, সাহসী সাজে সুপ্রিয়া

পুজোতে গরদ পরে উত্তম কুমার বসতেন ষোড়শোপচারে পুজো করতেন। পরে চুরুট করা সাদা ধুতি পাঞ্জাবিতেই দেখা মিলত মহানায়কের।

সুপ্রিয়া সাজতেন রাজেন্দ্রাণীর মতো সালঙ্কারা রূপে। তবে শুধু যে সনাতনী সাজেই লক্ষ্মী পুজোয় সুপ্রিয়া সাজতেন তা নয়। এক একবার এক এক রকম সাজতেন। স্লিভলেস ব্লাউজের সঙ্গে ঢাকাই পরতেন। হংসীগ্রীবা গলায় মুক্তোর চিক পরতেন। নাকে হীরের জ্বলজ্বলে নাকছাবি, কখনও বা বড় নথ। সমাজে বোধহয় একজন মেয়ের আকর্ষণীয়া চেহারা চিরকালই অন্য মেয়েদের হিংসার কারণ। তাই সুপ্রিয়াকে আরও দুষতেন সমাজের মহিলারা। সুপ্রিয়াও এটা বুঝতেন, তবে কখনওই পাত্তা দিতেন না। তাই বলে নিজের অহংবোধ আর সাজেই ডুবে যাননি কখনও সুপ্রিয়া, সকলকে যত্ন করে রেঁধেবেড়ে খাওয়াতেনও।

‘দুঃখটা হোক আজ শুধুই আমার’

কিন্তু রাত গ্যয়ি বাত গ্যয়ির মতো উত্তম সাম্রাজ্য শেষ হতেই এই পুজোও শেষ হয়ে গেল। আসলে যে মানুষটাকে ঘিরে এত কিছু, সেই তো আর নেই। ১৯৭৯ সালে ময়রা স্ট্রীটে উত্তম সুপ্রিয়ার সংসারে শেষ লক্ষী পুজো হয়। ২৪ শে জুলাই ১৯৮০ উত্তম কুমারের অকাল প্রয়াণ, যা মেনে নিতে পারেনি সারা বাংলা। সুপ্রিয়াও পারেননি উত্তমকে ছাড়া এই পুজোর আযোজন করতে। ময়রা স্ট্রিটের বিশাল বাড়িতে একা সুপ্রিয়া, খাঁ খাঁ করত গোটা বাড়ি। সঙ্গে সমাজের নিন্দার ঝড় তো ছিলই। অথচ এঁরা কেউ মানুষ উত্তমকে বোঝেননি। স্টার উত্তমকে ভালবেসেছেন কেবল।

‘আমি একা বসে আছি স্মৃতি নিয়ে তাঁর, ‘আনন্দ নিয়ে গেছে ওরা সকলে, দুঃখটা হোক আজ শুধুই আমার’ … উত্তম স্মৃতি নিয়ে দোর দিয়েছিলেন সুপ্রিয়া।

কিন্তু জীবন তো থেমে থাকে না, তাই কাজ করতেই হবে। শেষমেশ অত বড় বাড়ি একা না থাকতে পেরে লাউডন স্ট্রিটে উঠে আসেন সুপ্রিয়া দেবী। ময়রা স্ট্রিটে উত্তমের সব কোট, প্যান্ট পোশাক দিয়ে দেন উত্তম পুত্র গৌতমকে। সুপ্রিয়া দেবী এবং মহানায়কের ভরত পুরস্কারও ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জী রোডের বাড়িতে দিয়ে দেন সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়া কিছুই নিজের বলে জবরদখল করে রাখেননি।

ময়রা স্ট্রিটের সেই বাড়ি এখন হোটেল।

ময়রা স্ট্রিটের ঐ বিলিতি বাড়ি পরে  কিনে নেন এক ব্যবসায়ী। এখন সেখানে অভিজাত হোটেল। তবু ওই মাটিতে রয়ে গেছে উত্তম-সুপ্রিয়ার সংসারের স্মৃতি। বাড়ি পাল্টে গেছে কিন্তু আজও বহু উত্তম ফ্যান ময়রা স্ট্রিটে ওই প্রেমের তীর্থক্ষেত্র দর্শন করে আসেন। আজও উত্তম-সুপ্রিয়ার বাড়ি বলেই পরিচিত সেটি। দুই লেজেন্ড তারকার সংসারের ইতিহাস মুছে দেবে, কার সাধ্যি!

উত্তমের সেবায় ‘কোজাগরী’ সুপ্রিয়া

লক্ষ্মী মানে শ্রী। উত্তম কুমারের শুরু জীবনে যেমন গৌরী দেবীর অবদান আছে তেমনি পরবর্তী জীবনে সুপ্রিয়া দেবীরও অবদান আছে। উত্তমের লক্ষ্মীশ্রী তো সুপ্রিয়াও। সমাজ কিন্তু উত্তম কুমারকেই জেনেছে মানুষ উত্তমকে জানেনি। উত্তম কুমার দুই সংসারেই দায়িত্বে কোনও দিন গাফিলতি করেননি। সুপ্রিয়া যে সেবা আর ভালবাসা দিয়েছিলেন উত্তমকে, তা উত্তমকে বহু ঘাত প্রতিঘাতের পরও বাঁচিয়ে রেখেছিল। কোজাগরীর অর্থ ‘কে জেগে আছো’-র মতোই উত্তমের সেবায় রাতের পর রাত জেগেছেন সুপ্রিয়া।

একলা স্মৃতির ভার।

সেই পুজোও নেই আজ, নেই লক্ষ্মী পুজোর শঙ্খধ্বনি, নেই সেই বাড়িও। কিন্তু রয়ে যাবে ওঁদের জুটির ভালবাসা, যা কোনও কিছুর পরোয়া করেনি।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.