HeaderDesktopLD
HeaderMobile

ভেবেছিলাম নাতিকে কোলে করে নাচব বাড়ির পুজোয়, সব ভেস্তে দিল মহামারী: রঞ্জিত মল্লিক

0 1,144

কলকাতার বনেদী পুজোর তালিকায় প্রথম সারিতেই থাকে ভবানীপুরের মল্লিকবাড়ির পুজো। এই পুজোতে সাবেকিয়ানার সঙ্গে মিশে গেছে রুপোলি জগতের গ্ল্যামার। দ্য ওয়ালের প্রতিনিধি শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মল্লিক বাড়ির পুজোর গল্প নিয়ে আড্ডায় খোদ রঞ্জিত মল্লিক।

বস্তুত, রঞ্জিত মল্লিকের হাত ধরেই মল্লিক বাড়িকে চেনেন সকলে। বাবার ধারা বজায় রেখেছেন টলিউডের প্রথম সারির নায়িকা কোয়েল মল্লিক। কিন্তু মল্লিক বাড়ির কৃতিত্ব আরও অনেক আগেই এই বংশের পূর্বপুরুষরা প্রমাণ করেছেন। যেমন ইকমিক কুকারের আবিষ্কর্তা, চিকিৎসক ইন্দুমাধব মল্লিক এই পরিবারেরই সন্তান।

আবার বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী প্রমিতা মল্লিক এ বাড়ির বউ। নবমীর রাত্রে এ বাড়ির থিয়েটার উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান ছিল এককালে। সেই থেকেই রঞ্জিত মল্লিকের অভিনয়ের প্রতি ভালবাসা। এ বছর করোনা জয় করে সদ্য সুস্থ হয়েছেন অভিনেতা নিজে। তাই পুজোয় যে প্রবল সতর্কতা থাকবে, তা বলাই বাহুল্য।

এবারের পুজো পুরোপুরি প্রাইভেট

এমনিতে তো প্রতিবার হাজার হাজার লোকজন মল্লিকবাড়ির পুজো দেখতে আসেন, এমনকি বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকেও লোকজন আসেন। কিন্তু এবছর করোনার জন্য পুরোপুরি শুধুমাত্র পারিবারিক লোকদের নিয়েই ব্যক্তিগত ভাবে পুজো হবে এই প্রথম। একশো শতাংশ প্রাইভেট করে দেওয়া হয়েছে এ বছর আমাদের পুজো।  আমরা আসলে হেল্পলেস! কোনও রকম ভাবেই কোন দর্শনার্থীদের অনুমতি দিচ্ছি না এবার। এটা তো জনগণের স্বার্থেই আমরা করতে বাধ্য হয়েছি।
আসলে যাঁরা মল্লিকবাড়ির পুজোয় এসেছেন, আসেন তাঁরা জানেন আমাদের বাড়িটা বন্ধ জায়গা। একদম বাড়ির ভিতর ঠাকুর দালানে পুজো হয়, খোলা মাঠ নয়। এটুকু পরিসরে সামাজিক দুরত্ব মেনে চলা  কোনও ভাবেই যাবে না। তাই দর্শনার্থীদের এবার আমরা প্রবেশাধিকার দিচ্ছিনা মল্লিকবাড়ির পুজোতে।

ছোটো প্রতিমা এই প্রথম

মল্লিকবাড়ির পুজোতে হয়ে আসা অনেক নিয়ম-নীতিও এবার আমাদের পাল্টাতে হয়েছে। সতর্কতা মেনে পুজো করার সিদ্ধান্ত আমরা নিজেদের মধ্যে নিয়েছি। যেমন আমাদের ঠাকুরের উচ্চতা এবার অনেক ছোট করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবার আমাদের চব্বিশ জন কুলি লাগত ঠাকুর কাঁধে করে নিয়ে যাবার জন্যে। সেটা তো এবার সম্ভব নয়। চব্বিশ জন কুলি গায়ে-গায়ে অত বড় ঠাকুর নিয়ে যাওয়া এ বছর কোনও ভাবেই উচিত না। সুতরাং সেই কারণে প্রতিমার সাইজ ছোট করা হয়েছে। এবং মল্লিকবাড়ির বিসর্জনের ঐতিহ্যমন্ডিত শোভাযাত্রাও এবারে হবে না।

কাটা ফল নিষিদ্ধ

এবার পুজোয় মাকে সব আস্ত ফল প্রসাদ দেওয়া হবে। কোনও একটা ফলও কাটা হবে না। আগে এভাবে কখনও মল্লিক বাড়িতে মায়ের ফলপ্রসাদ হয়নি। সেটা সাবধানতার জন্য করতে হচ্ছে। বড় বড় যে ফল মিষ্টির বারকোশ কাঠের থালা হত সেগুলো এবার পুজোয় না হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। বড় থালায় প্রসাদ দেওয়া হবে কিনা ঠিক নেই। না হলে কলা পাতায় প্রসাদ খুব সতর্কতার সঙ্গে দেওয়া হবে স্যানিটাইজ করে।
এখনও জানি না ঘরামীরা আর রান্নার ঠাকুররা সব এসে পৌঁছতে পারবেন কিনা।

সীমিত মায়ের ভোগ

পাঁচ দিন পুজোতে তিনশো চারশো মানুষকে ভোগ খাওয়ানোর রেওয়াজ আমাদের। কিন্তু সেটা আমরা মাত্র পনেরো জনে কমিয়ে এনেছি। ঠাকুর মশাই ও তাঁর সহকারীরা এবং কয়েকজন বাড়ির লোকের জন্যই ভোগ করা হবে। ভোগ বিতরণ এবার রাখিইনি আমরা। পুজোর পুরো ব্যাপারটাই সাঙ্ঘাতিক রকম কমিয়ে আনা হয়েছে এ বছরে।

নিষিদ্ধ মিডিয়া

মিডিয়াকেও প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে না এবার। মল্লিক বাড়ির পুজো লাইভ, প্রতিবার যা করতে দেওয়া হয়, সেটা আমরা একদমই রাখছি না। মল্লিকদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে। কিন্তু কোনও বহিরাগত চ্যানেল, সাংবাদিকদের এবার ঢোকার অনুমতি থাকছে না। মল্লিকদের একদম নিজেদের ব্যাপার করেই পুজোটা হবে। এটা সবাইকে জানিয়ে দিলাম ‘দ্য ওয়াল’-এর মাধ্যমে।

নাতির প্রথম পুজো

এবার কখন কীভাবে যাব আমরা ভবানীপুরে সেটা নিজেও জানি না। একবার তো আমাদের সবার করোনা সংক্রমণ হয়ে গেছে। খুব জোর উদ্ধার পেয়েছি। যদি যাই মায়ের মুখ দেখতে অল্প সময়ের জন্য গিয়ে পাঁচ মিনিট থেকেই চলে আসতে হবে।

নাতিকে নিয়ে এবার আমাদের প্রথম পুজো। কিন্তু আমাদের সব প্ল্যান উল্টেপাল্টে গেল এ বছর। ইচ্ছে ছিল নাতিকে কোলে করে নিয়ে গিয়ে ঠাকুর দেখাবো, নাতিকে সবার সঙ্গে পরিচয় করাব, নাতিকে কোলে করে নাচব… সেসব ইচ্ছে নাতির প্রথম পুজোতে ওলট-পালট হয়ে গেল। আর নাতি এত ছোট ওকে পুজোর ভিড়ে এবার নিয়ে যাওয়াও উচিত হবে না। এরকম যে হতে পারে এ তো ভাবার বাইরে। আমরা তো জন্ম থেকে পুজো দেখছি পুজো বাড়িতে বড় হলাম কিন্তু এমন পুজো সারা জীবনে দেখিনি। সব ইচ্ছে এবার ভেস্তে গেল।

আত্মীয় কুটুম্বতেও কাটছাঁট

আমাদের ভবানীপুরের মল্লিকবাড়ির বাইরেও আরও গোটা দশেক বাড়ি আছে যেখানে মল্লিকরা থাকে। কারণ মল্লিক বাড়িটা তো একশো বছর আগেকার এত লোকের জায়গা ধরা সম্ভব নয় রোজকার থাকার জন্য। আমি নিজেও যেমন জায়গার অপ্রতুলতার কারণে আলাদা বাড়ি করে চলে এসেছি। সেরকম নানা জায়গায় অনেক আমাদের ভাই বোন আত্মীয়রা থাকেন। বাড়ির পুজো মানে সব আত্মীয় স্বজনদের একত্র হওয়া। কিন্তু তাঁরা অনেকেই আসছেন না। দূরের আত্মীয়দের কথা ছেড়েই দিলাম। পুজো তো বন্ধ করা যায় না, তাই একদম ছোট করে ঘরোয়া ভাবে করা হচ্ছে। আমি আর কোয়েল পুজোয় গেলেও হয়তো খুব কম সময়ের জন্যই যাব এবার। প্রতিবার পুজো দালানেই আমরা সবাই বসে থাকি। এবার সেসব একদমই থাকবে না।

মল্লিক পরিবারের তরফ থেকে সবাইকে শারদ শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। সবার সুস্থ থাকা খুব জরুরি, সবাই ভাল থাকুন।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.