HeaderDesktopLD
HeaderMobile

পুজোয় অনাথ শিশুদের বিরিয়ানি রেঁধে খাওয়াই, এবার খুব মিস করব: গাজি আবদুন নূর

0 536

গাজি আবদুন নূর নামটা শুনলেই মনে পড়ে যায় বাবু রাজচন্দ্র দাশকে। ‘করুণাময়ী রাণি রাসমণি’ সিরিয়ালে রাসমণির স্বামী রাজচন্দ্রর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন নূর। সেই নূর আদতে বাংলাদেশের বাগেরহাটের ছেলে, কিন্তু পড়াশোনা ও স্কুলজীবন যশোরে। তার পরে একাই কলকাতায় চলে আসা প্যাশনের টানে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক নিয়ে স্নাতক ও মাস কমিউনিকেশনস নিয়ে স্নাতকোত্তর।

‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’  সিরিয়ালে রাজচন্দ্র চরিত্র শেষ হবার পর নূর এখন বাংলাদেশের যশোরে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক নার্গিস আখতারের ‘যৈবতী কন্যার মন’, শাহনেওয়াজ কাকলীর ‘ফ্রম বাংলাদেশ’ ছবিতে অভিনয় করে ফেলেছেন তিনি। তিনিই ভাগ করলেন দুই বাংলার দুর্গাপুজোর অভিজ্ঞতা, দ্য ওয়ালের প্রতিনিধি শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

দুই বাংলার পুজোর গল্প

নূরের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন যেহেতু কলকাতায় তাই কলকাতার পুজো ঘিরে নূরের অনেক স্মৃতি। নূর বললেন ‘যশোরে আমি বড় হয়েছি কিন্তু কলকাতাকেও মনে হয় আমার শহর। আমি ঢাকার সব রাস্তা চিনি না। কিন্তু কলকাতায় একা একাও ঘুরতে পারব, রাস্তাগুলো সব চেনা। যখন কলেজ জীবনে ছিলাম তখন পুজো মানেই ছিল হোল নাইট বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখা। আমরা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেন গেটের সামনে মিট করে সারা কলকাতার ঠাকুর দেখতাম রাত জেগে।

শুধু তাই নয় আমার যেহেতু আর্টওয়ার্কের প্যাশন আছে তাই থিম পুজো ভীষন ভাবে টানে। থিম মণ্ডপের ভিতর যে কত দুর্লভ শিল্প আছে সেগুলোর থেকে আমি নিজের কাজের রসদ নিই। এমনও হয়েছে কোন থিম মণ্ডপ ভিড়ে ভালো করে দেখতে পারিনি, পরে দু তিন বার আর্ট ওয়ার্ক দেখতে একই মণ্ডপে গেছি। আমায় খুব টানে বনেদী বাড়ির প্রতিমার অলঙ্কার সাজ। যেমন শোভাবাজার রাজবাড়ি, সুতানুটির দিকে আরও কতগুলো বনেদী বাড়ি। মফস্বলে কিছু পুজো বাড়িতে আমার চেনা বন্ধুরা থাকায় ওঁদের আমন্ত্রণে পুজোয় গেছি, ঠাকুরকে কেমন ভাবে সাজাচ্ছে দেখতে।

বাংলাদেশেও দুর্গা পুজো হয় কিন্তু সেটা কলকাতার মতো কানির্ভাল নয়। বাংলাদেশে যশোরের বালিয়াডাঙা, বেচপাড়া অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিমরা মিলে বারোয়ারী দুর্গা পুজো করেন। আবার যশোরে কিছু হিন্দু স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের বাড়িতে বনেদী দুর্গা পুজো হয়।

কিন্তু আমি খুব মিস করি কলকাতার পুজো। কলকাতার বন্ধুদের। যেমন কলকাতায় কুণ্ডু বাড়ির দুর্গা পুজোতে গেছিলাম। ওঁদের প্রতিমা ‘ব্যাঘ্রবাহিনী’ খুব অভিনব। রানি রাসমণির মেয়ে পদ্মমণির বাড়ির পুজোতেও আমি গেছি। ওঁদের পরিবারের বিয়েতেও আমায় নিমন্ত্রণ করেছিল। কয়েকবার পুজোতে যাত্রা করার জন্য দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে গিয়েছি। সপ্তমী এবং দশমীতে ‘নটী বিনোদিনী’ যাত্রা করেছি। সেখানে রাঙাবাবুর চরিত্র করেছিলাম।

কলকাতার পুজোয় মুখে মাস্ক পরে ঘুরতেন রাজচন্দ্র, করোনার আগেই

টেলিভিশন মারফত সবার অন্দরমহলের তারকা হয়ে ওঠেন টেলিঅভিনেতারা।  ‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ লকডাউনে আবার শুরু থেকে দেখানো হয়েছিল, যা নূরকে আরও পরিচিতি ও ভালবাসা দিয়েছে। সিরিয়াল করার সময়েও পুজোয় কলকাতায় ঠাকুর দেখতেন তিনি। বাবু রাজচন্দ্রকে দেখে অনেকেই ছুটে আসতেন। কিন্তু কলকাতার পুজোর ভিড়েও নূর নিজেকে মাস্কে বা সানগ্লাসে আড়াল করে রেখেছে আগেই। তখন করোনা ছিল না, তবু নূর মাস্ক পরে কলকাতার পুজোয় ঘুরতেন। খ্যাতির বিড়ম্বনা যাকে বলে।

“দর্শক ভালোবাসেন বলেই আজও আমায় মনে রেখেছেন। আসলে পুজোয় কেন, এমনি সময়েও রাজচন্দ্র করার সময়ে আমি রাস্তায় মুখ ঢাকতে মাস্ক পরেই ঘুরতাম। মাস্ক পরে বন্ধুদের সঙ্গে দক্ষিন কলকাতার অনেক মণ্ডপেই  ঠাকুর দেখেছি। সেই কলেজ জীবনটা মিস করতাম রাজচন্দ্র হয়ে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা, পাপড়ি চাট খেতে পারতাম না সবাই চিনে ফেলে ঘিরে ধরত। সেই ভিড় কাটানো খুব মুশকিল হত। আর যেহেতু আমার লুকটাও রাজচন্দ্রর মতোই, গোঁফটাও আসল আমারই, হেয়ার কাটও একই, তাই লোকে সহজে চিনতে পারত। মাস্ক পরলেও চোখ দেখে চিনে ফেলত। এখানেও বাংলাদেশে এসে বহুদিন মাস্ক পরেই ঘুরেছি। এটা তো প্রাপ্তি। বাবু রাজচন্দ্রর ছবি কেউ দেখেনি ইতিহাসে, কিন্তু সবাই ভাবে আমিই রাজচন্দ্র।”

রাজচন্দ্র গোঁফ আজও পুজো স্টাইল, অনুকরণীয়

রাজচন্দ্র নূর কথা বলতে বলতে আজও প্রায়ই গোঁফে তা দেন। এই গোঁফ গাজী আবদুন নূর নিজের আইডিয়া থেকেই রেখেছিলেন তারপর সেটাই হয়ে গেল আইকনিক গোঁফ।

“আমি এরকম গোঁফটা যখন রাখি তখন গৌরবদাকে (মথুরবাবু) খুব বলতাম তুমিও গোঁফ রাখো। ওঁর তখন ছোট গোঁফ দাড়ি ছিল। তারপর গৌরবদাও (চ্যাটার্জী) গোঁফ রাখল। মথুর বাবুর রোলে সেটাও হিট করল। আমার দেখে অনেকেই আমাদের ইউনিটে, আমার বন্ধুমহলে এমনকি কলকাতাতেও দেখেছি রাজচন্দ্র গোঁফ ফ্যাশন ট্রেন্ড হয়ে গেছে। যখন আমি স্কুল কলেজে পড়তাম পুজোর সময় চুল-গোঁফে লুক চেঞ্চ করতাম। বরং রাসমণির শ্যুটিং থাকত বলেই সিরিয়াল চলার সময় পুজোয় অন্য হেয়ার কাট গোঁফে বদল করতে পারিনি।”

এবার পুজোয় কী করছেন নূর?

নিউ নর্মাল বলছি বটে, কিন্তু আদতে কিছুই নর্মাল নয়। আমার জন্মদিন ছিল কয়েক দিন আগে, কেক কাটিনি। আমার বন্ধুরা এমনকি নতুন ছবির প্রোডিউসাররাও কেক পাঠিয়েছিলেন। করোনার মধ্যে নিজের জন্মদিন ঘটা করে পালন করার মন নেই। করোনায় আমার আত্মীয় প্রতিবেশী আক্রান্ত, অনেকে মারা গেছেন, তাই মন ভাল নেই। ঈদেও ঘরোয়া খাবার দাবার খেয়েছি। বাড়িতে বেশিরভাগ সময় মায়ের সঙ্গেই সময় কাটাই। কোনও দিন ইচ্ছে হলে মায়ের জন্য স্পেশাল ডিশ করি, কখনও হয়তো ইলিশ বিরিয়ানি রাঁধলাম। তবে এবার বাংলাদেশের বন্ধুরা বলেছে পুজোতে মাস্ক পরেও একদিন আয়। একদিন ছোট গেট টুগেদার হবে।

কলকাতার পুজো খুব মিস করি। কলকাতার পুজো মানে ঐতিহ্য, বাঙালিয়ানা, কলেজে একসঙ্গে পড়া বান্ধবীদের পুজোয় শাড়িতে নারী হয়ে ওঠা। আমি অন্য ধর্মের হলেও পুজোয় ষষ্ঠী, অষ্টমী নিরামিষই খেতাম সকলের সঙ্গে।

যাদের কেউ নেই তাদের নূর আছে

তখন আমি রবীন্দ্রভারতীতে পড়ি নাটক নিয়ে। তো আমাদের নাটকের রিহার্সাল করার কোন জায়গা ছিলনা । ইউনিভার্সিটির পেছনে একটা বাড়িতে করতাম। সেখানে একটি অনাথ শিশুদের স্কুল ওখানকার একজন শিক্ষক আমায় ডেকে বললেন তুমি এই অনাথ শিশুদের নাচ গান নাটক এসব শেখাবে? বলেছিলেন আমাদের সহপাঠীদের সবাইকেই কিন্তু কেউ আর ওই বাচ্চাগুলোর সঙ্গে সময় কাটায়নি, কিছু শেখায়নি। আমি একমাত্র ওদের পড়িয়েছিলাম। অনেক কিছু শেখাতাম, আঁকা থেকে নাটক। পুজোর সময়টাও ওদের সঙ্গে সময় কাটাতাম অনেক সময়।

স্কলারশিপের টাকা পেয়ে দশমীতে ওদের নিজের হাতে বিরিয়ানি রান্না করে খাইয়েছিলাম। ওদের তো বিরিয়ানি খাওয়ানোর কেউ নেই। ওই বাচ্চাগুলোর আনন্দে ভরা তৃপ্ত মুখ আমার পুজোর সেরা প্রাপ্তি হতো।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.