HeaderDesktopLD
HeaderMobile

পিতৃপক্ষের শেষে যেভাবে শিউলি ফোটে

4 351

সুদীপ্ত  মাজি

অন্ধকারের সমুদ্র পেরিয়ে তখনও আলোর ছটা আসেনি চারপাশে। বাবার চটজলদি ঠেলা খেয়ে, উঠে পড়ার শশব্যস্ত ডাক শুনে ঘুমচোখে উঠে এসে দাঁড়িয়েছি ভাড়াবাড়ির বারান্দায়। হাতে মিনিট পাঁচেক সময়। রংচটা রেডিও সেটটাকে আর একটু পরেই মনে হবে অনির্বচনীয়, আলোর বলয়ে ঘেরা অসামান্য আনন্দপ্রভব। জলদগম্ভীর স্বরে জেগে উঠবেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ। সুপ্রীতি ঘোষের কণ্ঠে বেজে উঠবে আলোর বেণুর অলৌকিক সমারোহ! বিস্ময়াবিষ্ট হওয়ারই বয়স ছিল সেটা — বাবার ধ্যানগম্ভীর মুখে দেখতে পেতাম অপূর্ব এক আলোর ছটা।

বেসরকারি আপিসের আখমাড়াইয়ের কলে প্রতিদিন পিষ্ট হতে থাকা বাবার মুখে জেগে ওঠা ওই বর্ণালীর বিভা আমাকে বালকবয়সেই শিখিয়েছিলো উৎসবের আসঙ্গের নিরুচ্চার সংজ্ঞা! মায়ের হাতে তৈরি চা আর বিস্কুট খেতে খেতে বাইরে তাকিয়ে বুঝতে পারতাম একটু একটু করে আলো জাগছে চারপাশে। আমাদের ভাড়াবাড়ির ছাদে এসে নামছে মাতৃপক্ষের মায়া। খুশিরঙের রোদ জাগছে পরিপার্শ্বে। দুর্গাপুজোর স্মৃতি বলতেই কেন জানিনা— মহালয়ার এই অনির্বচনীয় ভোরবেলাটুকুই মনের মধ্যে জেগে ওঠে সবার আগে!

তখনও তো বিশ্বায়িত পৃথিবীর নবরামায়ণ রচিত হয়নি পৃথিবী জুড়ে। হাইরাইজের পাহাড় এসে ঢেকে ফেলেনি জেলাশহর ও মফসসলের আকাশ। দূষণমাত্রার পিপিএম কাকে বলে— ঠিক সেভাবে জানা হয়ে ওঠেনি আমাদের! ব্লিচ মেখে চকচকে হয়ে ওঠেনি অধুনাতন মেগাসিটির মৌলিক ত্বক! তখনও শিশির অবিশ্রাম, আশ্বিনের ভোরবেলা! তখনও শিউলি ঝরে আলোর বাগান হয়ে ওঠে সরু গলিপথ! তখনও শেফিল্ড শহর জুড়ে কৃষিক্ষেত, এদিকে ওদিকে। বাঁশবাগানের বিজন আঁধার এখানে ওখানে। রাত্রি গভীর হলে দূর থেকে গান গায় সেইসব শেয়ালেরা! তেমনই এক অশ্বিনী আলোয় পুজোর গন্ধমাখা কৈশোর দৌড়ে যেতে চাইতো কোথায় যেন! আলোর উৎসব যেখানে ডাকে! পড়শির ঈর্ষা যখন আমাদের গর্ব হয়ে ওঠেনি— তেমনই এক সকালবেলায়, রেললাইনের ধারে জেগে ওঠা কাশফুলের গুচ্ছ দেখে আমাদের শারদ-অভিষেক ঘটে যেত!

শেফিল্ডশহরের বুকে জেগে থাকা মৃদু মফসসলে পুজোর আমেজ গায়ে মেখে নিতে, আমরা, পায়ে হেঁটে ইস্কুলফেরৎ বন্ধুরা দাঁড়িয়ে যেতাম নিতাইদার অস্থায়ী আস্তানার সামনে। খড়ের মেড়ের ওপর একটু একটু করে এঁটেল মাটির প্রলেপ লাগানো থেকে দেবীমূর্তির হাত-পায়ের আঙুলগুলির চমৎকার বিন্যাস, একটু একটু করে চোখ-মুখ এঁকে তোলা থেকে জরির পোশাক দিয়ে আভূষিত করে তোলা মাতৃমূর্তি — এইসব দেখতে দেখতে হাতের আঙুলের কড় গুনতাম, আর ক’দিন বাকি হিসেব করার জন্য। কোনও কোনও বছর বর্ষাকাল অতিপ্রলম্বিত হত। আকাশের মতো মুখ ভার হয়ে উঠত আমাদেরও। অদ্ভুত এক উৎকণ্ঠায় দীর্ঘ ছাতা মাথায় দিয়ে নিতাই পালের আস্তানায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম, কীভাবে ব্যাহত হচ্ছে প্রতিমা গড়ার কাজ! ব্লোয়ার ল্যাম্পের তীব্র ছটায় দেবীমূর্তি শুকিয়ে তোলার সেই প্রাণপণ সংগ্রাম শিল্পীরাই করতেন না শুধু, মনে মনে আমরাও করতাম — এখনও মনে পড়ে!

আমার সৌভাগ্য, আমাদের দারিদ্র্যের সংসারে অনটন ছিলো যথেষ্ট, কিন্তু তার জন্য অসহিষ্ণু অশান্তি ছিলো না তেমন! আমাদের ভাইবোনেদের বস্তুগত চাহিদাও ছিলো সামান্যই! পুজোর পাঁচদিনে পাঁচটি জামার বস্তুগত আকর্ষণ ছিলো না, এটার বদলে ওটা চাই জাতীয় চাপসৃষ্টিকারী আবদার ছিলো না। কেবল একটি শান্তরঙের অপেক্ষা ছিলো, কবে বাবা তাঁর সামান্য বোনাসের টাকাটুকু অফিস থেকে পাবেন! আর তারপর অতিকষ্টে চালিয়ে নেওয়া সংসারের সমস্ত চাপ সরিয়ে আমাদের নিয়ে বাসে চড়ে পৌঁছে যাবেন ধর্মতলার বিধান মার্কেটে! একটি করে নতুন পোশাক হাতে নিয়ে যে হাজার ওয়াটের হ্যালোজেন জ্বলে উঠতো আমাদের চোখ-মুখের অভিব্যক্তির ভেতর, তেমন অমল আলো আজকের ভোগবাদী সভ্যতায় সত্যিই বিরল! পোশাকের পর জুতো কেনার উদ্দেশ্যে আমরা রওনা দিতাম চিনাদের জুতোর দোকানে। বিচিত্র চিনা নামের সেইসব দোকান থেকে বেছে বেছে কেনা হত নিজেদের পছন্দের জুতো, যেগুলি পায়ে গলিয়ে সপ্তমীর রাতে বাবার হাত ধরে মাইলের পর মাইল প্যাণ্ডেল হপিঙে ফোস্কার রাঙা ফুল পায়ে ফুটে উঠবে এরপর!

থিমের জাঁকজমকে, কর্পোরেটের প্রবলতর আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠা আধুনিক দুর্গোৎসবের পাশে আমাদের ফেলে আসা ছেলেবেলার পাড়ার পুজো কিংবা বারোয়ারি দুর্গামণ্ডপের ম্যাড়ম্যাড়ে, একঘেয়ে মণ্ডপের ছবিগুলি ছিল একেবারেই সাদামাটা। বিত্তের চমক নয়, সেইসব প্যাণ্ডেলে ছিলো চিত্তের প্রণোদনা, প্রাণের আরাম। আবরণে, আভরণে সালঙ্কারা জাঁকজমকপূর্ণ নারীর পাশে যেমন অন্যরকম লাল পাড় সাদা শাড়ির আভরণহীন সৌন্দর্য — তেমনই এক অন্তর্গত দীপনে আলোকিত হয়ে উঠত সেদিনের পাড়ার পুজোর পরিমণ্ডল! প্রাণের গভীরে এক অন্তঃসলিলা গান জাগাতে জানত সেই সময়ের শারদোৎসব। সময়ের নিয়মে সমস্তই পাল্টায় — তাকে মেনে নেওয়া যেমন সময়ের নিজস্ব চাহিদা, তেমনই তার পাশে আমাদের স্মৃতির জাবেদা পুরাতনের সঙ্গে নতুনকে মিলিয়ে দেখতে চাইবে — মানবমনের এ-ও এক অনিবার্য চাওয়া। শুধু যে সময় বা সমাজ বদলায় তা তো নয়, ভেতরে ভেতরে আমরাও বদলে যেতে থাকি ক্রমাগত, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে! বদলে যাওয়ার এই ক্রমিক অনিবার্যতা হয়ত আমাদের বোধের ভেতরেও তাই নানারকম ভালো-লাগা মন্দ-লাগার পারমুটেশন-কম্বিনেশন গড়ে চলে আজীবন! তবুও, অপাংক্তেয় হয়ে পড়া নির্জন তুলসীতলার মতোই সেইসব নিভৃত ও আন্তরিক শারদোৎসব কেন যে মনের কোণে আজও কড়া নেড়ে যায় বারবার!

আমাদের কৈশোরে দুর্গোৎসবের আরেকটি অনিবার্য আকর্ষণ ছিলো বিভিন্ন পত্রিকার শারদ-সম্ভার। এক পিতৃবন্ধু তখন চাকরি করতেন ‘দেব সাহিত্য কুটীর’-এ। তিনি ফি বছর একটি করে শারদীয় শুকতারা বাবার হাতে আমার জন্য উপহার পাঠাতেন। আর বাবার অফিসের অদূরে থাকা আনন্দবাজারের সেলস্ কাউন্টার থেকে আকর্ষণীয় ছাড়ে বাবা একটি আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী কিনতেন আমার জন্য। সেগুলি যেদিন বাড়িতে আসত, উত্তেজনায় রাতে ঘুম আসতে চাইত না মোটেই। এই আকর্ষণীয় পত্রিকা দু’টি হাতে পাওয়ার ব্যাপারে একটি বিচিত্র নিয়মের প্রচলন করেছিলেন আমার বাবা। অনেকটা বড়ো হওয়া ইস্তক সেটাই ছিলো অবশ্য পালনীয় বিধি। নিয়মটি হল — ষষ্ঠীর দিন অফিসের হাফ-ছুটির পর বাড়ি ফিরে খবরের কাগজের মোড়কবন্দি পত্রিকাদু’টি বাবা আমার হাতে তুলে দিতেন। ষষ্ঠীর আগে পত্রিকাগুলির পাতা ওল্টানোর অধিকার ছিল না পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কায়। সেই নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তে তখন এক অসহনীয় মনখারাপে ভরে থাকত মন। কেবলই এক ছটফটানি নিয়ে ষষ্ঠীর বিকেলের অপেক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর ছিলো না! একটু বড়ো হয়ে, মা-কে ম্যানেজ করে কোনও কোনও বছর বাবার অগোচরে পাঁচ-দশ মিনিটের জন্য পত্রিকাগুলির পাতা উল্টে-পাল্টে দেখার সাধ পূরণ হত অবশ্য! শারদ সম্ভারের জন্য সেই উন্মুখ অপেক্ষা যে আমার আজীবনের নিয়তি — খুব অল্প বয়সে সেকথা অবশ্য বুঝতে পারিনি। আজও, এই প্রৌঢ়ত্বের বিকেলেও ছোটো-বড় অসংখ্য শারদীয়ার জন্য অপেক্ষাকেই প্রকৃতপ্রস্তাবে আমার ব্যক্তিগত শারদোৎসব বলে মনে হয়! লেখার সূত্রে প্রাপ্য সৌজন্য-কপি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে না পেরে অধীর হয়ে কতবার যে কত শারদীয়ার কপি স্টল থেকে আগাম কিনে নিয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই!

খুব ছোটো বয়স থেকেই পত্রিকা সম্পাদনায় হাতেখড়ি হওয়ার কারণে কোনও কোনও বছর বন্ধুসঙ্গবিরহিত দুর্গাপুজোর দিনগুলি নির্জনে কেটে গেছে আমার। তখন লেটার প্রেসের যুগ। পাইকা আর স্মল পাইকায় সাজানো লেখার গ্যালি প্রুফ দেখতে দেখতে হয়ত মহাষ্টমীর মহিমাময় রাত্রি পেরিয়ে গেছে। কাঠের কিংবা জিঙ্কের ব্লকে লেগে থাকা ছাপার কালির গন্ধ-ই হয়ত অবচেতনে হয়ে উঠেছে পুজোর উপাচার! দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দের তালে তালে দুলতে দুলতে মুদ্রিত হওয়ার আগে শেষ মুহূর্তের প্রুফে চোখ বুলিয়ে নেওয়াই তখন মঙ্গলারতির বিকল্প মুদ্রা হয়তো বা! এরপর সেলাই, কাটিং এবং বাইণ্ডিং-এর বাউণ্ডারি পেরিয়ে পত্রিকা কাঁধে তুলে যখন বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছি — পরিবেশ দেখে বুঝতে পেরেছি, দশমীর সন্ধ্যা উপস্থিত। এয়োতি যুবতীরা পাড়ার পুজোর চাতালে মা-কে ঘিরে সিঁদুর খেলায় মেতেছেন। বাইরে দেবীর বিসর্জনের আবহ, অথচ আমার কাঁধে বয়ে নিয়ে চলা শারদ সংখ্যার নতুন গন্ধে আমার মনের ভেতরঘরে যেন-বা বোধনেরই আলোকিত সানাইয়ের সুর জেগে উঠছে তখন!

বয়ঃসন্ধির সময়পর্ব থেকেই একটু একটু করে পাল্টে যেতে থাকে আমার বন্ধুবৃত্ত। রোয়াকের খিস্তিভরা আড্ডার ভেতর, ইভটিজিং-এর উগ্রতার অন্ধকারের ভেতর একটু একটু করে বদলে যেতে থাকে বালক বয়সের বন্ধুসকলের অমল আলোর দিনগুলি! চেনা মুখগুলি অচেনা হয়ে উঠতে থাকে ক্রমে। মানসিক নিঃসঙ্গতার এক অনিবারণীয় অন্ধকারে চাপা পড়ে যেতে থাকে আমার যা কিছু ব্যক্তিগত উদ্ভাস, উচ্ছ্বাস ও বেদনার অশ্রুজল! কবিতার গর্ভগৃহ চোরাবালির মতো আমাকে টেনে নিতে থাকে এক অন্ধকূপের ভেতর। নাট-বল্টু-স্ক্রুয়ের সাম্রাজ্যে লোহার স্ক্র্যাপের বিক্রির লোভনীয় দখলদারিতে মজতে থাকে সেইসব হারানো-ফুরোনো দিনের বন্ধুরা!  ওদের মদ-মাংস-হুল্লোড় আর পকেটে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রের পাশে, খিস্তিখেউড়ের পাশে নির্জন হয়ে জ্বলতে থাকে আমাদের কষ্টবেষ্টিত ভাড়াবাড়ির ষাট ওয়াটের হলুদ রঙের বাল্ব। আর এই দুর্মর একাকিত্বের ভেতর সাদা পৃষ্ঠার দিকে আরও কিছুটা সংবদ্ধ হয়ে ঝুঁকে পড়তে থাকি আমি। বদলে যেতে থাকে আমার আনন্দ, আমার উৎসব! দুর্গোৎসবের খুশি তখন প্যাণ্ডেল, প্রতিমা, আলোকসজ্জা আর সার্বজনীন বৃন্দগানের উচ্ছ্বাস থেকে অনেকটা দূরে সরে এসে বসেছে কোনও এক একাকিত্বের নিবিড় অন্ধকারে! পাল্টে যেতে থাকে আমার এ-যাবৎ দেখা শেফিল্ড শহর, তার উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনার ধরণ। শারদ সংখ্যার পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায়, না-পড়া বইয়ের অক্ষরসমূহের মাঝখানে এক নির্জন দ্বীপের মতো জেগে উঠতে থাকে আমার ব্যক্তিগত শারদোৎসবের দিনগুলি, রাতগুলি! বাইরে উৎসবের আড়ম্বর ও হুল্লোড় যত বাড়ে, ক্রমে তত ফাঁকা হয়ে উঠতে থাকে আমার ভেতরজগৎ! আর, উৎসবের দিনগুলিতে ক্রমাগত নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া আমি একান্তে ভাবতে থাকি — কবে কখন নির্বাপিত হবে বাইরের এই আড়ম্বর ও জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ ও পরিসর! স্বাভাবিকতার জলবাতাসে আবার কবে পল্লবিত হয়ে উঠবে আমাদের রঙচটা দৈনন্দিনের চেনা পরিবেশ! এই অ্যালিয়েনেশনের অভিশাপ থেকে বাঁচতে তাই ক্রমাগত পালাতে ইচ্ছে করত কোনও দূর গ্রামে! যেখানে চণ্ডীমণ্ডপ হয়তো তখনও স্নিগ্ধতর, যেখানে দূর থেকে ক্ষীণস্বরে জেগে উঠবে ঢাকের বোল, যেখানে লাউডস্পিকারের দাম্ভিক ও প্রমত্ত চেঁচামেচি নেই।

তেমন একটি মহানবমীর সন্ধ্যা স্মৃতিতে জেগে থাকবে আজীবন। অদূরে অপেক্ষারত লক্ষ্মীপূর্ণিমার অর্ধস্ফুট রাকা এক প্ররোচনাময় আলো নিয়ে পরিপার্শ্বে জাগিয়ে তুলছে স্নিগ্ধদীপ। কোনও এক অপ্রাপনীয়ার কেশরাশির ভেতর কুয়াশা জমে উঠছে গ্রামীণ পথে। আর লক্ষ্মীমন্ত পদচ্ছাপের দিকে তাকিয়ে সুন্দরের বিগ্রহকে আবিষ্কার করা আমি আর আমার সামান্য কবিতারা দুর্গোৎসবের রাতে সাতটি তারার তিমির পেরিয়ে ‘অমল আলোর কমলখানি কে ফুটালে’— এই বিস্ময়সূচকের সামনে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে কয়েক পলক!

পড়ন্ত এই বিকেলবেলা যখন প্রবালরঙের আলোয় ঘিরে ধরছে অস্তিত্বের চারপাশ — তখন খুব মনে পড়ে যায় বাবার হাত ধরে মণ্ডপ থেকে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর সেই অপাপবিদ্ধ বালকবয়সটিকে। ছেলের হাত ধরে বাধ্যতামূলক প্যাণ্ডেল পরিক্রমায় অনুভূত হতে থাকে পিতৃসত্তার সেই স্বতঃশ্চল প্রবহমানতার অনিবার্য ধারাটি-ই। আর, মনে পড়ে যায় এমনই এক শারদোৎসবের দিনরাত্রির কথা — যখন ভেতরমহল অন্ধকার করে অন্তিমশয্যায় এক অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন আমার বাবা! এমন করুণরঙের শরৎকাল এর আগে কখনও দেখিনি। দেবীপক্ষের আকাশ যখন অদ্ভুত আঁধারে ভরা, কোনও তারা জেগে নেই অশ্বিনী-নিশীথে! এমন অসামান্য ভয় আর অজ্ঞাত রাত্রির গল্পে ভারী হয়ে ওঠা শারদোৎসবের স্মৃতি হয়তো অবশিষ্ট আয়ুষ্কালের এক চিরস্থায়ী সম্পদ-ই হয়ে রয়েছে মনের গভীরে। মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোর ঢাক ও কাঁসরের শব্দ পেরিয়ে এক অনিবার্য বন্যাভয় যখন দানা বাঁধছে মনে মনে, আমাদের অপর্যাপ্ত হাত যেখানে অপেক্ষা করছে এক ভাঙা সাঁকোর ওপর, ওদিকে শ্বাসে শ্বাসে ঘন কষ্টপুর পেরিয়ে অনন্তের দিকে এগিয়ে যাবেন এরপর বাবা- দুর্গোৎসবের এমন ভীত প্রার্থনাময় রাত্রিও আমার স্মৃতিকে স্বস্তি দেবে না কোনওদিন! দুর্গা-ভাসানের শেষে ফাঁকা মণ্ডপে জেগে থাকা আলো-অবশেষ যেমন এক শূন্যতার জন্ম দেয়, জন্ম দিতে থাকে! আমার দুর্গোৎসবের স্মৃতির ভেতর শিউলি ও শালুকের পাশে, আকাশভর্তি সিরাসমেঘের পাশে তাই গানের নোলক পরে ভরে ওঠা এক কান্নার উঠোনও জেগে থাকে!

(লেখক নতুন কৃত্তিবাস পুরস্কারে সম্মানিত কবি, অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক)

You might also like
4 Comments
  1. বাসুদেব মণ্ডল says

    লাবণ্যময় ভাষা । ভালো লাগলো।

  2. Anushree Tarafder says

    অসাধারণ স্মৃতিচারণ। ভালো লাগা মন্দ লাগা ছেলেবেলা থেকে মাঝবয়সের প্রতিটি পর্যায়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সাদামাটা জীবনের উৎসবের আমেজ। পড়তে পড়তে অনেক কিছু ছবির মতো দেখা দিল মনের মধ্যে। এক নিঃশ্সাসেই পড়লাম প্রায়। ধন্যবাদ কবি কে এমন সুন্দর লেখা পড়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
    ভালো থেকো শরতের ফুল
    ভালো থেকো শাপলা বকুল।
    🙏🙏🙏🙏🙏🙏

  3. Palash Ganguly says

    অনবদ্য একটা গদ্য পড়লাম। নস্টালজিক তো বটেই তার সঙ্গে অদ্ভুত এক মনন রেশ আবিষ্ট করে রাখে।

  4. Palash Gangopadhyay says

    এক অদ্ভুত শিহরণ জাগানো উপস্থাপনা। অনন্য গদ্য। নস্টালজিক শুধু নয় অক্ষরের পরতে পরতে এক বলিষ্ঠ আবেশ হৃদয় ছুঁয়ে গেল।

Leave A Reply

Your email address will not be published.