HeaderDesktopLD
HeaderMobile

নারাণ সূত্রধরের মুখোশ

5 568

সায়ন্তন ঠাকুর

কার্তিকমাসের অপরাহ্ণ, উঠানে বসে সামনের অরণ্যাবৃত টিলা-পাহাড়টির দিকে চেয়ে দেখছি কী আশ্চর্য কৌশলে শাল আর মহুয়া গাছের মাথায় ধীরে ধীরে বৈকালিক রৌদ্র তার গেরুয়া বসনখানি বিছিয়ে দিচ্ছে… কতক্ষণ যে একইভাবে বসে আছি খেয়াল নেই। হঠাৎ মহাদেবের ডাকে সম্বিৎ ফিরল। মুখ তুলে তাকাতেই সামান্য হেসে সে বললে, সাঁঝ লাগ্যাছি, উটান্যে না বসি ঘর চলেন,ই সোময় বহালে বহালে উয়ারা আসেক!

একটু অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, বহালে মানে?

–মাঠ! মাঠে আসেক উয়ারা!

আজ কয়েকদিন হল মাঠা গ্রামে এসেছি। বহুবছর আগে একটি ট্রেকিং দলের লেজুড় হয়ে এই অঞ্চলে প্রথম এসেছিলাম, মহাদেব ওঁরাওয়ের সঙ্গে আলাপ তখনই। তাও নয় নয় করে পনেরো ষোলো বছর তো হবেই।  প্রতি বছর শীতকালে মাঠাবুরু পাহাড়ের তলদেশে বিভিন্ন ট্রেকার্স ক্লাবের তাঁবুর মেলা বসে যায়। মহাদেব তাদের দেখাশোনা রান্নাবান্না সবই করে, দুটো পয়সা আসে ঘরে। এখন ট্রেকার্স গাইড হিসাবে মহাদেব এই অঞ্চলে মোটামুটি পরিচিত একটি নাম। তবে এবার একাই এসেছি। এখনও ট্রেকিংয়ের মরশুম শুরু হয়নি, সে হতে হতে সেই পৌষ মাস। দিনমানে আশেপাশে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াই, পাখি পাহাড়ের নীচে বসে থাকি। কোনওদিন মাঠাবুরুর পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরের দিকে উঠি। ঘন গাছপালা লতাগুল্মে আচ্ছন্ন পথ, বুনো ফুলে ছাওয়া বনতলি, পুটুস ঝোপের পাশে পাশে চোরকাঁটার জঙ্গল। কার্তিকের দ্বিপ্রহর বড় মধুর এই বন-পাহাড়ে আলোফুল হয়ে যেন ফুটে আছে। অনাড়ম্বর শান্ত জীবনের মতো তিরতির করে বয়ে চলে সময়। তবে সন্ধ্যাদেবী তাঁর আঁচল চরাচরে বিছিয়ে দেওয়ার আগেই ঘরে ফিরে আসতে হয়,মহাদেব বারবার করে সাবধান করে দিয়েছে সূর্যাস্তের পর যেন কোনওভাবেই ঘরের বাইরে না থাকি! এই বন-পাহাড়ের মানুষদের সংস্কার বড় বিচিত্র। সত্য মিথ্যা জানা নেই, তবে তাদের কথা মেনে চলার চেষ্টা করি। এই অচেনা বনভূমি, ওই পুরাতন মাঠাবুরু পাহাড়ের কতটুকুই বা আমরা জানি! বুদ্ধির দৌড় যে খুব বেশি নয় তা এসব অঞ্চলে এলে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

উঠান থেকে ঘরের দাওয়ায় এসে বসি। মহাদেবের ঘরখানি ছোটো হলেও শ্রীমণ্ডিত। মাটির গাঁথনির উপর টিনের চাল, দুখানি ঘর, ছোটো চৌকো জানলা, আলকাতরা মাখানো শাল কাঠের শক্তপোক্ত দরজা। মহাদেব বিয়ে থা করেনি, একা মানুষের জন্য দিব্যি বন্দোবস্ত! বাইরে দাওয়ার একপাশে মাটির উনানে কাঠের জ্বালে রান্নাবান্না হয়। এরমধ্যেই সন্ধ্যার পর মিহি কাপাসতুলোর মতো ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করেছে এদিকে। মহাদেব রান্না চাপিয়েছে, একটু দূরে বসে রয়েছি, দু চারটে আলগা কথা হচ্ছে, উনানের আঁচের আভায় বসে থাকতে বেশ লাগছে। মহাদেবকে শুধোই, আচ্ছা এই যে সন্ধের পর আমাকে বাইরে থাকতে দিতে চাও না, কেন বলো তো ?

কড়ার তেলে কচি ঝিঙে ছেড়ে আমার কথা শুনে একবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় মহাদেব। বয়সে প্রৌঢ় হলেও দেহের বাঁধুনি এখনও অটুট। কালো দোহারা চেহারা, সরু তামার তারের মতো পাকানো কাঁচাপাকা একমাথা চুল, পরনে একখানি সাদা মালকোঁচা মারা ধুতি, খালি গা, গহিন অরণ্যের মতো গলায় বলল, উ কিইছ্যু লয়, লতুন লোক, কুঁথায় বনে বাঁদাড়ে পথ হারায় ঘুরবেন, তার লেগে কইছি!

–তাহলে যে একটু আগে বললে কারা নাকি সব মাঠে ঘুরে বেড়ায়!

–উ হাঁতির পাল আসে লয়, উর লিইগ্যে

–হাতি? হাতি তো তোমাদের রোজকার সঙ্গী, তাকে আবার অত ভয় পাও নাকি তোমরা?

দু-এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে মহাদেব, তারপর কথা ফেরানোর চেষ্টায় জিগ্যেস করে,

–চা খাবেন লাই? একটু জল বসাঁইন দি ?

অল্প হেসে বলি,

–সে না হয় খাব কিন্তু তুমি আসল কথাটা কী, সেটা বললে না তো!

গাঢ় সন্ধ্যা চারপাশে, মহাদেবের উঠান পার হয়ে মিশকালো বড়রাস্তাটি কৃষ্ণসর্পের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে। এদিকে লোকবসতি নেই বললেই চলে। জনমানবশূন্য চরাচরে একটিও আলোর রেখা নেই, শুধু ধিকিধিকি করে মৃত্যুপথযাত্রীর মতো আমাদের দাওয়ায় জ্বলছে একখানি কুপি। উত্তরপথগামী বাতাসে ভেসে আসছে কষাটে বন্য সুবাস। অদূরে মাঠাবুরু পাহাড়ের দিক থেকে ক্যাঁও ক্যাঁও করে কর্কশ গলায় হঠাৎ একটি ময়ূর ডেকে উঠল। কড়াইয়ে ঢাকা চাপিয়ে আমার কাছে এসে মহাদেব নীচু গলায় বলল, উ ম্যালা কথা বুলতে হবেক তাইলে!

–বলো না! শুনি কী বৃত্তান্ত!

সামান্য ইতস্তত করে মহাদেব জিগ্যেস করে,

–আপনি পাখি পাহাড় যেছেন লয়?

–হ্যাঁ! আজই তো দুপুরের দিকে গেছিলাম!

–কিছুটো বুইঝতে লারছেন?

একটু অবাক হয়েই শুধোলাম,

–মানে ? কী বুঝব ? কীসের কথা বলছ তুমি ?

–বুলছি জায়গাটো ক্যামন লাগলক আপনার?

এ প্রশ্ন শুনে মনে মনে একটু থমকালাম আমি। এভাবে কী এককথায় বলা যায়! একদল শিল্পী গহিন অরণ্যের মাঝে একটি পাহাড় কেটে কতদিন আগে শুরু করেছিল কাজ। ধীরে ধীরে ফুটে উঠছিল অপরূপ সব মূর্তি। সামনেই ছিল শিল্পীদের থাকার জায়গা। ঠিক যেন পুরাতন কালের ভারতবর্ষ। হয়তো এভাবেই একদিন সেই সুদূর বিস্মৃত অতীতে তৈরি হয়েছিল ইলোরা। কিন্তু হায়! এখানে তার কিছুই হল না। কী এক গোলমালে মাঝপথেই বন্ধ হয়ে গেল সমস্ত কাজ। এখন প্রত্নচিহ্নের মতো পড়ে রয়েছে ওই পাহাড়, একটি অতিকায় পাখির চিহ্ন খোদাই করা আছে তার শরীরে। কাজ সম্পূর্ণ হলে হয়তো পাখিটি ডানা মেলে জেগে উঠতো! মৃত পাখির চিহ্নটি শুধু রয়ে গেছে। লোকমুখে পাহাড়টির নতুন নাম হয়েছে পাখি পাহাড়। তার পাদদেশেও কত অসমাপ্ত প্রস্তর মূর্তি অবহেলায় পড়ে রয়েছে। আগাছা, বুনো লতাপাতা, ঝোপে ঢেকে গেছে তাদের শরীর। দুপাশে সার সার মহুয়া গাছ। চৈত্রমাসে সাদা কুসুমে ছেয়ে যায় মূর্তিগুলো। হয়তো সন্ধ্যার পর শেয়াল কি ভালুক ঘুরে বেড়ায়, জ্যোৎস্নারাত্রে অলীক কুসুম আলোয় অরণ্য বাতাস বয়ে যায় আপনমনে। আজও দেখলাম কার্তিকের নরম রৌদ্রে একটি আধগড়া মূর্তির কাঁধে তিরতির করে কাঁপছে অচেনা হলদে মতো কী এক বুনো ফুল, লাল ধুলায় ঢেকে গেছে সর্বাঙ্গ। মূর্তিটিকে দেখে কেন জানি না আমার কোনও গন্ধর্বমূর্তি বলেই মনে হল! এসব কথা কী আর কাউকে বলা যায়! আনমনা গলায় মহাদেবকে বললাম,

–জায়গাটা খুব অন্যরকম মহাদেব! যতবার গেছি আমার খুব মনখারাপ হয়েছে!

–উ কথ্যাটোই আপনাকে বুলছি, উখেনে সাঁঝের পর উয়ারা আসেক। পাথর লিয়ে মুত্তি গড়েক!

মহাদেবের কথা শুনে সোজা হয়ে বসি। উনানের কাঠ আগুনে পেকে টকটকে লাল রঙের হয়ে উঠেছে। উঠানের বড় তেঁতুলগাছে কীসের যেন সরসর শব্দ হচ্ছে, কলাবাদুড়ের দল এসেছে মনে হয়। বিস্মিত গলায় শুধোই,

–কারা আসে মহাদেব?

–তা বুলতে লারব, ইদিকে জনমনিষ লাই, কারা আসেক বুলতে লারব। তব্যে উয়ারা মুত্তি গড়তি আসেক!

–কী করে বুঝলে?

–আজ ধরিন দ্যাখল্যাম বড় পাথর পড়ি আছেক, দুদিন বাদ উয়াই মুত্তি হয়ি গেছেক!

–মানে? আজ পাথর পড়ে থাকতে দেখলে আর কাল কি পরশু তা মূর্তি হয়ে গেছে ?

–হঁ

–কী যা তা বলছ! এরকম আবার হয় নাকি! নিশ্চয়ই তোমার চোখের ভুল। তাছাড়া ওই জঙ্গলে কে রাতবিরেতে মূর্তি গড়তে আসবে ?

উনান থেকে কড়াই নামাতে নামাতে মহাদেব অবজ্ঞার সুরে বলে,

–উ লেগ্যেই তো বুলতে যেছিলাম না! কারুকে বলিক লাই, উ মানষের মনে বিশ্বাস লাই বুলে কী হবেক!

ঝিঁঝিঁ পোকার ঝমঝম বাজনা শুরু হল কোথাও, পাখি পাহাড়ের দিক থেকে কোটরা হরিণ ব্বাক ব্বাক শব্দে বিকট গলায় ডেকে উঠল। রাতবিরেতে বনপাহাড়ে ও ডাক শুনলে এক মুহূর্তের জন্য গা ছমছম করে ওঠে। হঠাৎ কী মনে হওয়ায় মহাদেবকে বললাম,

–কাল আমাকে ওইরকম কোনও একটা মূর্তি দেখাতে পারবে ?

ছোটো হাঁড়িতে চায়ের জল চাপিয়ে মুখ না ফিরিয়েই দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল,

–হঁ, লিয়ে যাবক।

জানি না কাল কী দেখাবে! নাকি দীর্ঘদিন বনে পাহাড়ে একা একা থেকে মাথা খারাপ হতে শুরু করেছে মহাদেবের ? কী জানি কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা!

পরদিন খাওয়া দাওয়া সাঙ্গ করে দুপুর গড়াতেই দুজনে পাখি পাহাড়ের দিকে রওনা দিলাম। এখান থেকে কাছেই, পায়ে হাঁটা পথ। কার্তিক মাসের দ্বিপ্রহর বড় দরিদ্র। অপরাহ্ণের সাপিতে তার সকল ঐশ্বর্য্য দুহাতে তুলে দিয়ে দূর দিগন্তের দিকে সবার অলক্ষ্যে ভুস করে মিলিয়ে যায়। শীর্ণ জংলা একখানি পথ বেয়ে হেঁটে চলেছি, সামনে মহাদেব আর পেছনে আমি। লাল ধুলোয় পা ভরে উঠেছে। দুপাশে ঘন পুটুস ঝোপ কুশি কুশি ফুলে ভরে আছে, মাথার উপর মরকত মণির মতো আকাশে পীতবসনা আলো যেন তার আঁচলখানি বিছিয়ে রেখেছে। মহাদেবের হাতে একখানি পাকা বাঁশের লাঠি, চলতে চলতে ঝোপের মাথায় মাঝে মাঝে বাড়ি দিচ্ছে আর বিড়বিড় করে কীসব বলছে! একটু অবাক হয়ে শুধোলাম, ও কী বলছ মহাদেব ?

–ও কিছ্যু লয় গ, আসেন আসেন!

–তা আজ হঠাৎ লাঠি নিলে সঙ্গে?

–ফিরতি সাঁঝ হলি হাতে লাঠিখান থাকলি…ভালু মালু কত্য কী আসেক ইদিকে

–ভালুক বেরোয় নাকি এখন?

–উদের কি মজ্জির ঠিক আছেক গ!

মহাদেব চলছে আর ভাবছে, হ, মুত্তি দেখবেক!দুদিনের বৈরিগি ভাতকে কয় অন্ন! বিশ বচ্ছর হল ই পাহাড় গাছ পাথর ইদের লিয়ে আছি, তবেক না উ মুত্তি দেখলি মু। উয়ারা কি ই জগতের মনিষ্যি বটেক! উয়ারা আসেক হুই গন্ধব্বলোক হতি। নারাণ, নারাণ সুত্তধর মুকে বলেছিল উ কথা!

ক্রু ক্রু করে কী একটা পাখি ডাকছে, রঙিন ফুলের পাপড়ির মতো একঝাঁক প্রজাপতি আমাদের পায়ের শব্দ শুনে আরও গহিন ঝোপের দিকে উড়ে গেল। বেলা দুটো কি আড়াইটে বাজে, এর মধ্যেই দুপাশের অরণ্যে হিমরঙা ছায়া নেমে এসেছে। প্রকাণ্ড শাল মহুয়া শিমুল গাছের মাথায় আলো সাপের মণির মতো ঝলমল করছে। এমন বনপথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় জগত একটি ছলনা মাত্র, আমি কল্পনা করেছিলাম বলেই আমার দুদিকে এমন মায়াবনভূমি তৈরি হয়েছে… ওই যে পাখি পাহাড়ের চুড়ো দেখা যাচ্ছে, আশ্চর্য রৌদ্রে তার শরীরে ডানা ছড়িয়ে শুয়ে আছে সেই অসমাপ্ত বিশাল পাখিটি। হঠাৎ আমার মনে হল ও কি জটায়ু? কী জানি, যে শিল্পীদল তৈরি করতে শুরু করেছিলেন কী ছিল তাঁদের মনে!

পাখি পাহাড়ের নীচে বড় বড় পাথর আলগোছে কে যেন ছড়িয়ে রেখেছে। তার উপরে লতা পাতা ফুল নর-নারীর মুখ খোদাই করা। দু-একটি রঙিন ছবিও রয়েছে। সবই অসমাপ্ত কাজ। গতকালও এসব দেখেছি, অপরাহ্ণের আলোয় অলীক কোনও জগতের মতোই তাদের দেখাচ্ছে। কিন্তু যে মূর্তির কথা মহাদেব বলছিল সেগুলো কোথায় ? একটু দূরে ডালপালা ছড়ানো মহুয়া গাছের তলায় মহাদেব বসে আছে, স্থির দৃষ্টিতে সামনের দিকে চেয়ে কী যেন দেখছে, সাদা ধুতি আর ফতুয়া পরনে, মুখের ভাব দেখে বোঝা যায় তার মন ইহজগতে আর নাই! ধুলোর উপর অস্ত আলোর রেণু মেখে মহাদেবকে বসে থাকতে দেখে আমার হঠাৎ মনে হল এইভাবে জোর করে এসে আমি ঠিক কাজ করিনি। এই জগত যেন এতদিন অব্দি ওই মানুষটির নিজস্ব ভুবন হয়ে বেঁচে ছিল, আজ আমি অনুপ্রবেশকারীর মতো ঢুকে পড়েছি। হয়তো ওইরকম কোনও মূর্তিই কোথাও নেই, মহাদেবের কল্পলোকে সেগুলি তৈরি হয়েছিল। আমি নিতান্তই স্থূল জগতে তাদের দেখতে চাইছি! কাছে গিয়ে নীচু গলায় বললাম, মহাদেব ফিরবে না?

আমার কথা শুনে একটু যেন চমকে উঠল, দু-এক মুহূর্ত মাত্র,তারপর স্বাভাবিক গলায় জিগ্যেস করল,

–মুত্তি দ্যাখবেন লাই?

–তোমার যদি ইচ্ছে করে দেখাও, নাহলে চল, ফিরে যাই!

সামান্য হাসি ফুটে ওঠে মুখে, ফিসফিস করে বলে,

–অ্যাতদূর আসলেন আর দ্যাখবেন লাই! চলেন চলেন! দেঁখাইন দি!

মহাদেবকে অনুসরণ করে পাখি পাহাড়ের গা দিয়ে সরু পাকদণ্ডী বেয়ে উঠতে শুরু করলাম।  সবুজ ছায়া ঘন হয়ে এসেছে বনতলির পথে, আরও উপরের দিকে গাছগুলি দিনান্তের রং মেখে হোরিখেলায় মেতে উঠেছে। জায়গাটি অনেকটা পুরাতন মজাদিঘির তলদেশের মতো-হিমহিম। একটিও পাখপাখালি নেই। জনমানবশূন্য স্থানটি যেন এই মায়াভুবন থেকে অনেক দূরের কোনও জগত। অতীতে সন্ধ্যার মুখেও কত অরণ্যে ঘুরেছি, কিন্তু আজ কেন জানি না হঠাৎ অন্তরে কেউ কু ডেকে উঠল। ঠিক কী মনে হয়েছিল সেদিন, তা বলতে পারব না, তবে অস্পষ্ট একটি প্রাচীরের অস্তিত্ব অনুভব করেছিলাম, যেন একটি লক্ষ্মণরেখা, যা অতিক্রম না করলেই হয়তো ভালো হত।

যত উপরের দিকে উঠছি গাছপালা ক্রমশ পরস্পরের কাছে চলে আসছে। প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে চারপাশ। বুনো ঝোপ, কাঁটালতা আর পরজীবী উদ্ভিদের দল সম্মুখে পথরোধ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এমন শ্বাসরোধী অরণ্য যে এই অঞ্চলে থাকতে পারে তা কল্পনাও করিনি কখনও। তীব্র কী একটা অচেনা সুবাসে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে চরাচর। বুনো গাছপালা, কি কোনও জন্তুর গন্ধ তো এমন হয় না, ও তাহলে কীসের গন্ধ? কেমন যেন ঝিমঝিম বিষের মতো সুবাস! মহাদেবকে শুধোলাম, ও কীসের গন্ধ মহাদেব?

ভারি অবাক হয়ে মহাদেব বলল,

–উ গাছপালার বাস বটে!

–না না, সে গন্ধের কথা বলছি না, কেমন একটা ঝিমধরা গন্ধ পাচ্ছ না?

মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে অদ্ভূত দৃষ্টিতে একবার তাকাল মহাদেব, কয়েক মুহূর্ত পর নীচু স্বরে বলে উঠল,

–উ দিকে মন দিবেক লাই, আসেন, চইল্যাই আসছিক!

আরও অল্প কিছুক্ষণ চলার পর পাকদণ্ডী পথটি এসে মিশে গেল প্রায় সমতল একটি স্থানে। গাছপালাও এখানে কিছুটা ছাড়া ছাড়া, একটি বাঁক নিয়ে আবার পথ উঠে গেছে পাখি পাহাড়ের চুড়োর দিকে। এই অঞ্চলটি যদিও মেঘাচ্ছন্ন আষাঢ় বেলার মতো, উষ্ণতা যেন হঠাৎ করে কমে এসেছে! শিমশিম উত্তুরে বাতাস বইছে ক্রমাগত। ছায়াচ্ছন্ন মলিন আলোয় মহাদেব হাতের লাঠিখানি তুলে দূরে পড়ে থাকা কতগুলি পাথরের দিকে নির্দেশ করে বলে উঠল,

–হুই মূত্তিগুলান উয়াদের

আবছা অন্ধকারে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। পাথরগুলি আয়তনে খুব একটা বড় নয়। কাছে যেতেই বুঝতে পারলাম ওগুলো আসলে শুধু পাথর নয়, বরং বলা ভালো পাথর দিয়ে তৈরি অপরূপ মুখোশ। যেমন ছৌনাচের মুখোশ তৈরি করা হয় অবিকল তেমনই, শুধু পার্থক্য হল এগুলি পাথরের তৈরি। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে উজ্জ্বল আলোয় আরও কাছে গিয়ে দেখলাম, এমন আশ্চর্য নিখুঁত পাথরের কাজ আমি এর পূর্বে কোথাও দেখিনি। বহু প্রখ্যাত ভাস্করের কাজ দেখেছি, কিন্তু এ তো প্রায় অলৌকিক! সবগুলি মুখোশই দেবী দুর্গার! অপূর্ব কোমল মুখখানি, সমাধিস্থা যোগিনীর ভাব সুস্পষ্ট মুখমণ্ডলে অথচ চোখ দুটি করুণা ও স্নেহে পরিপূর্ণ, ইহ জগতের সকল প্রাণীর বেদনা যেন জমাট বেঁধে রয়েছে অক্ষিপটে। কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলে মনে হয় এই মুহূর্তে মহামায়ার চোখ দুখানি থেকে নক্ষত্রের মতো অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে নেমে আসবে। নতজানু হয়ে ধুলোর উপর বসে করজোড়ে মনে মনে বললাম, মা তোমার এমন করুণামূর্তি দেখে আমার জন্ম সার্থক হল। কৃপা করে তুমি কি সত্যই আমায় এই নির্জন বনস্থলীর মাঝে চিন্ময়ীরুপে দেখা দিলে ?

প্রকৃতপক্ষেই ওই প্রস্তর মূর্তিগুলি সেই জনহীন অরণ্য-সন্ধ্যায় যেন প্রাণময়ী হয়ে উঠেছিল! কোন অজানা শিল্পী এই মূর্তি তৈরি করেছেন, কেনই বা তা লোকচক্ষুর অন্তরালে এই নিভৃত অরণ্য পাহাড়ে পড়ে রয়েছে-এসব প্রশ্ন ক্ষণিকের জন্যও সেই মুহূর্তে মাথায় আসেনি। প্রায়ান্ধকার পাহাড়ে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে দিনমণির আলো। কতগুলি উজ্জ্বল শরত মেঘের মতো সাদা রঙের বনফুলে ভরে আছে স্থানটি। ফুলগুলি বোধহয় সন্ধ্যায় ফোটে, সুবাস নেই তেমন, কিন্তু কী রূপ! একমুঠি ফুল তুলে দেবীকে অর্পণ করতে যাব, এমন সময় পেছন থেকে মহাদেব কোনও প্রাচীন গর্ভগৃহের ঘণ্টাধ্বনির মতো গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,

–ফুলগুলান ছিঁড়বেন লাই!

চমকে উঠে পেছনে ফিরে জিগ্যেস করলাম,

–কেন? এই বুনো ফুল মা’কে দিলে কী হয়েছে ?

–মা কারুর থিক্যা ইখানে পূজ্যা লিতে লারেন!

–মানে?

–ইখানে মায়ের পূজ্যা করেক বাতাস, রোঁদের আলা, হুই আকাশ, আপনে আপনে ফুল খস্যে পড়েক মায়ের কাছ্যে!

প্রচণ্ড বিস্ময়ের ভাব কাটিয়ে কোনওক্রমে প্রশ্ন করি,

–তোমাকে একথা কে বলল মহাদেব ?

আমার কথা শুনে মুখে একচিলতে হাসি ক্ষণিকের জন্য ফুটে ওঠে! রহস্যময় গলায় কোনও অতিপ্রাচীন কিংবদন্তীর মতো মহাদেব বলে,

–নারাণ, নারাণ সুত্তধর!

বাস থেকে চরিদা গ্রামে যখন নামলাম তখন আকাশ ঘন মেঘে আচ্ছন্ন, মাঝে মাঝেই জোলো বাতাস বইছে। পুরাতন সান্নিপাতিক জ্বরের মতো ঢিমেতালে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। পথেঘাটেও লোকজন তেমন নেই। দোকানগুলি অধিকাংশই সব বন্ধ আজ। মহাদেব বলে দিয়েছে নারাণ মানে নারাণ সূত্রধরের বাড়ির ঠিকানা, সেই দিকেই চলেছি। চরিদা অনেকদিন আগে একবার এসেছিলাম, গ্রামটি আর পাঁচটা সাধারণ গ্রামের মতো নয়, এখানে প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ছৌনাচের মুখোশ তৈরি করা হয়। সেদিক থেকে দেখলে চরিদা আসলে মুখোশ শিল্পীদের গ্রাম। ছৌ-নৃত্য শিল্পীরাও রয়েছেন এখানে। তাঁদের সঙ্গে মুখোশ-শিল্পীদের সম্পর্ক নিবিড়। হাঁটছি আর দুপাশের বাড়িঘর দেখছি। পাকা বাড়ির পাশাপাশি মাটির ঘরও চোখে পড়ছে, প্রায় প্রতিটি বাড়িরই সামনেই মুখোশ তৈরির সরঞ্জাম চোখে পড়ছে। ইদানীং শহর থেকে মানুষজন এখানে আসেন মুখোশ কিনতে, তবে সেগুলি নাচের মুখোশ নয়, ওই ঘর সাজানোর জন্য তৈরি করা হয়, বড় মুখোশের ছোটো সংস্করণ। একটানা বৃষ্টির কারণেই মনে হয় আজ লোকজন বিশেষ নেই। প্রায় সব বাড়িরই সামনে দোকানঘর বন্ধ। পশ্চিম আকাশ আবার মিসির মতো কালো মেঘে আকুল হয়ে উঠেছে, এলোঝেলো বাতাসে কেমন মাটি মাটি সুবাস। নারাণ সূত্রধরের সঙ্গে দেখা করতেই আজ আসা। ওই যে সামনে দোলমঞ্চ, ওইটি পার হয়ে বাঁদিকের সরু পথ ধরে এগিয়ে গেলেই ওঁর বাড়ি, মহাদেব তেমনই বলেছে।

গতকাল রাত্রে পাখিপাহাড় থেকে ফিরে মহাদেব বিচিত্র কিছু কথা আমায় বলেছে, ঠিক স্বাভাবিক মানুষের মতো নয়। নারাণ সূত্রধরের কথা উঠতেই বলে, নারাণই নাকি প্রথম ওই পাথরের মুখোশগুলি মহাদেবকে দেখায়! কৌতূহলী গলায় জিগ্যেস করি,

–পাথরের দেবী মুখোশের কথা নারাণ জানল কী করে?

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মহাদেব বলে,

–উ বুলতে লারব! উ কুতা থিক্যা জানছে তা বলেক লাই!

–তুমি জিগ্যেস করো নি কিছু?

আমার কথা শুনে একটু হাসে মহাদেব, খর চৈত্রে যেমন আপনমনে পথ আলো করে ঘেঁটু ফুল ফোটে তেমন নিরাসক্ত গলায় বলে,

–আপোনাদের খালি খোঁজ আর খোঁজ, ওত জ্যেইনে হবেক কী? মুখোশগুলান দেইখ্যে মন ভরেক লাই ? কী বেত্তান্ত, কুঁথা থ্যেইকে এলো, অত্ত খতেনে কাম কী ?

–কিন্তু ওই অপরূপ মূর্তিগুলি কারা তৈরি করেছে তাদের নাম জানতে তোমার ইচ্ছা হয় না?

–উ কি মানষে বানাইছেক?

অবাক হয়ে জিগ্যেস করি,

–তাহলে কে তৈরি করেছে?

আমার মুখের দিকে চোখ তুলে তাকায় মহাদেব, বাইরে তখন শিমশিম বাতাসে ভর করে বৃষ্টি নেমেছে, মাঠাবুরু পাহাড়ের দিক থেকে বাতাসের দোলায় গাছপালাদের জেগে ওঠার শব্দ ভেসে আসছে, রহস্যময়ী কোনও রমণী যেন পায়ে নূপুর পরে ভুবনপাড়ায় অভিসারে বেরিয়েছেন। ফিসফিস করে মহাদেব বলে,

–নারাণ বলেক উ সব গন্ধব্বদ্যার বানানো বটেক!

–গন্ধর্ব?

–হঁ, উয়ারা মানষি লয়, কুন জম্মে মানষি ছিলক, উয়াদের খালি রূপ আর রূপ, রূপের তাড়নায় ঘুইর‍্যে বেড়ায়, আর পাথর লিয়ে ফুল লিয়ে বাতাস লিয়ে আলো লিয়ে রূপ বানাইছেক, নারাণ বলেক উয়াদের পিরিত সোন্দরের সাথে!

–আর কী বলে তোমার নারাণ সূত্রধর?

–বলেক মুরা মুখোশ বানাইছি আর উ মুখোশ পরে লিয়ে যারা লাচেক তারা প্রাণ পতিষ্ঠা করেক! একা কেউ কিইছ্যু পারেক লাই, য্যামন মা বাপ মিললে ছ্যালা বিটিছ্যালা জম্ম, ত্যামন মুখোশ কারিগর আর লাচনীবালা লাচনেবালা মিললে মুখোশে প্রাণ আসেক!

একথা শোনার পর নারাণ সূত্রধরের সঙ্গে দেখা না করে আমার আর উপায় ছিল না। সেই তার খোঁজেই আজ চরিদা গ্রামে আসতে হল। ওই যে সরু পথখানি দেখা যাচ্ছে…নারাণ সূত্রধরের বাড়ির পথ। মুখোশ কারিগর নারাণ সূত্রধর, মহাদেবকে যে বলেছিল, মুখোশ পরে যখন ছৌনাচের আসরে নেচে ওঠে নৃত্যশিল্পী তখন সেখানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। বিচিত্র এক ভাব, ওই ভাবই বোধহয় আমার দেশের মূল সুর! কত দেবালয়, তাদের শরীরে কত অপরূপ কারুকাজ, কত গুহাচিত্র, প্রকাণ্ড সব স্থাপত্য…কোন বিস্মৃত অতীতে কারা সেসব সৃষ্টি করেছিল তাদের নাম অব্দি জানি না আমরা। সেইসব নিরাসক্ত শিল্পীর দল নিজেদের নামটুকু অবধি কখনও কাউকে জানতে দেয়নি। সে বাসনাও ছিল না। হয়তো সত্যিই তারা কোনও গন্ধর্ব, সৌন্দর্যের টানে তাঁরা এসেছেন আবার কালস্রোতে মুছেও গেছেন। যাওয়া আর আসা…ওই যে একচালা একটি মাটির দাওয়া চোখে পড়ছে, পেছনে দেবীপ্রতিমার চালচিত্রের মতো ভুবনডাঙার আকাশ মেঘবসনে সেজে উঠেছে…ওই গৃহেই হয়তো থাকে নারাণ সূত্রধর…জানি না তার দেখা পাব কিনা, তবু যেতে হবে আমাকে…এগিয়ে যেতে হবে, যতদিন না হৃদয় সৌন্দর্যকথা অনুভব করতে পারে।

(সায়ন্তন ঠাকুর গল্পকার, ঔপন্যাসিক, ভ্রমণপিপাসু।)
You might also like
5 Comments
  1. Joyeeta Banerjee says

    কী অসাধারণ গল্পখানি। মনে হচ্ছে যেন দ্বিতীয়বার আরণ্যক পাঠ করলাম।

  2. Shankha Sathi Paul says

    চমৎকার ।অনেকদিন পর এত সুন্দর একটা গল্প পড়লাম।

  3. Teesta Chakraborty says

    মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে গেলাম। শ্রদ্ধা জানাই লেখককে।

  4. খুব খুব ভাল লাগল ৷ সায়ন্তন ঠাকুর অসাধারণ লেখেন ৷

  5. সুমন ঘোষ says

    এত ভাল গল্প বহুকাল পড়িনি। লেখককে আমার শ্রদ্ধা জানাই।
    দ্য ওয়ালকে ধন্যবাদ এরকম একটি গল্প পড়ানোর জন্য। অপূর্ব।

Leave A Reply

Your email address will not be published.