HeaderDesktopLD
HeaderMobile

বিজয়ার খাওয়াদাওয়া

0 193

রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায় 

মা দুগ্‌গা জলে না পড়লে তো বিজয়া নয়। আগে বিজয়ার দিন সন্ধেবেলায়, প্রত্যেক গেরস্ত বাঙালির বাড়িতে কিছু রীতি-নিয়ম মেনে চলার প্রথা ছিল। আমাদের বাড়ির বেলায় এর প্রথমটি হল, একটি তালপাতার পাখায় কিংবা লালরঙা খেরোর খাতার একটি পাতার, ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত মোট বারোবার ‘শ্রীশ্রীদুর্গা সহায়’ কথাটি লাল কালির পেন দিয়ে লেখা। এই কালিটি আমাদের ঝরনা কলমের সময় ছিল ‘সুলেখা’ কোম্পানির। পরে এটা ডটপেন দিয়েও লিখেছি— এমনও স্মৃতি আছে। এর পরের নিয়মটি হল পূর্বপুরুষদের রজনীগন্ধার মালা-পরানো ছবিতে প্রণাম করা। তারপর ঘরে ঘরে গিয়ে জ্যাঠামশাইদের পা ছুঁয়ে প্রণাম, কোলাকুলি, আবার প্রণাম। সঙ্গে সঙ্গে জ্যাঠাইমাদেরও প্রণাম। আমার বাবা ছিলেন ভায়েদের মধ্যে সবার ছোটো। তাই তাঁকে আর আমার মা-কে প্রণাম সবার শেষে। বিজয়ার এই কোলাকুলিটি নিয়ে আমার স্মৃতি বড়োই সুখের।

সাদা হাফহাতা গেঞ্জি আর মালকোঁচা-মারা ধবধবে ধুতি-পরা নতুনজ্যাঠা, আমার দু’বগলে হাত ঢুকিয়ে শূন্যে তুলে নিতেন। তারপর তাঁর দুই দিকের কাঁধের সঙ্গে আমার উড়ন্ত কোলাকুলি চলত। ব্যাপারটা আরও ভালো লাগত কারণ কোলাকুলিটা বড়োদের কোলাকুলির মতো মাত্র তিনবারে থেমে যেত না। ছ’-সাতবার পর্যন্ত গড়াত। আর আমার নতুনজ্যাঠাইমা, যাঁর কাছে আমার আবদারের কোনো সীমা ছিল না, আমি যখন প্রায় তাঁর মাথায়-মাথায়, তখনও তিনি আমার সঙ্গে হাসিহাসি মুখে কোলাকুলি করতেন। আর কোলাকুলি করার সময়, তাঁর দুই কবজিতে পরে থাকা সোনার চুড়িগুলোর রিনরিন শব্দ এখনও আমার কানে বাজে।

বিজয়ার দিন সন্ধে হতে না হতেই, আমাদের ভবানীপুরের বাড়িটা আত্মীয়-বন্ধুদের হাজিরায় যেন গমগম করত। আর এঁদের খাওয়া-দাওয়ার জোগাড় শুরু হয়ে যেত সে-ই সকালবেলা থেকে। প্রথমেই নিরামিষ ঘুগনির জন্যে মটর ভেজানো আর এর সঙ্গে মেশানোর জন্যে কিছুটা নারকোল ডুমো-ডুমো করে কুচিয়ে রাখা। তারপর নারকোল-নাড়ুর জন্যে অন্তত সাত-আটখানা নারকোল কুরোনো। কুচো নিমকির জন্যে, আমাদের বাড়িতে যার চলতি নাম ছিল ট্যানট্যানা, ভালো করে ময়াম দিয়ে ময়দা মেখে রাখা। এসবের মধ্যে একটা সাজ-সাজ ব্যাপার ছিল। পুরোনো পুরোনো বাড়িগুলোয় আমাদের মতো যত নয়া-পয়সারা ছিল, তারা সেদিন সকাল থেকেই জেঠিমা- খুড়িমাদের আশেপাশে কেবল ঘুরঘুর করতাম। কেউ হয়তো তার মধ্যেই একটু কুরোনো নারকোল, সামান্য চিনি ঠেকিয়ে, আমাদের ছোট্ট হাঁ-য়ের মধ্যে আলগোছে ফেলে দিতেন। তাতেই এত আনন্দ হত যে বলার নয়।

দশমীর দিন সকালে নতুনজ্যাঠার সঙ্গে দুটো অত্যন্ত দরকারি জিনিস কেনাকাটা করতে বেরতাম। প্রথমটা হল সিদ্ধিপাতা আর দ্বিতীয়টা হল শুকনো বোঁদে। সিদ্ধিপাতা ঠিক কোন্‌ দোকান থেকে নেওয়া হত, তা আমার মনে নেই। কিন্তু দোকানটার সামনের দিকে জানলার মতো লোহার গরাদ আর একটা সাইনবোর্ডে  হলুদের ওপর কালো দিয়ে বড়ো-বড়ো করে লেখা ‘এখানে সিদ্ধি পাওয়া যায়’— এই কথা ক’টি এখনও পরিষ্কার মনে পড়ে।

গোলাপি গায়ের ওপর ছোট্ট-ছোট্ট হলুদ ফুল আঁকা একটা বড়ো সাইজের পাতলা কাচের জগ ছিল আমাদের বাড়িতে। তাতে অনেকটা সাদা টকদই চিনি দিয়ে ফেটিয়ে, ছোটো এলাচ-গুঁড়ো আর দু’চিমটে সিদ্ধিপাতা-বাটা মিশিয়ে, হালকা পেস্তা রঙের একটি অপূর্ব শরবত তৈরি করতেন নতুনজ্যাঠা। সেই জগের ওপর নিজের নাক এগিয়ে নিয়ে গিয়ে একটা অদ্ভুত গন্ধ পেতাম, যার সঙ্গে বিজয়ার ঢাকের বাদ্যি, কোলাকুলি, প্রণাম, পাড়ার মাইকের ভুলভাল এবং আন্তরিক অ্যানাউন্সমেন্ট, লরিতে চড়া প্রতিমার সন্দেশ-মাখানো ঠোঁট— সব মিলেমিশে কেমন একাকার হয়ে যেত। সন্ধেবেলায় বাড়িতে বিজয়া করতে আসা মানুষদের স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সেই মায়াবী সিদ্ধির শরবত ছোটো-ছোটো চিনেমাটির কাপে করে পরিবেশন করা হত। আর চুমুক দিয়েই তাঁরা খুব আহা-বাহা করতেন।

আমাদের বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিমে দু’মিনিট হাঁটলেই আদিগঙ্গার মুখার্জি ঘাট, যেখানে এখনও দক্ষিণ কলকাতার প্রায় সমস্ত নামকরা এবং প্রাচীন পুজোর প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। সেসময় স্কুল রোডের বাড়ির সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে, কখনো বা খাটে বসে লুচি-ঘুগনি খেতে-খেতে আমরা বিসজর্নের সারসার শোভাযাত্রা দেখেছি। মুখার্জি ঘাটের আরও দক্ষিণে বলরাম বসু ঘাট। এই ঘাট লাগোয়া ডাকের সাজের দুর্গাপুজোটির বয়স কম করে একশো পাঁচ বছর তো বটেই। এই ঘাটের ঠিক উল্টোদিকের রাস্তা বলরাম বসু ঘাট রোড ধরে গুনে গুনে কুড়ি পা এগোলেই, বাঁ হাতে সাবেক মিষ্টির দোকান গোপীনাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সেখানে এখনও দক্ষিণ কলকাতার সেরা শুকনো বোঁদে এবং নারকোলছাপা পাওয়া যায় দুগ্‌গা পঞ্চমী থেকে লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত। দুটো বিশাল কাঁসার বারকোশে চুড়ো করে রাখা ঘি-রঙা শুকনো বোঁদের থেকে, আমাদের বাড়ির জন্যে দু’কিলো মেপে উঠে আসত ব্রাউনপেপারের পোক্ত ঠোঙায়। হাফহাতা ধবধবে গেঞ্জি-পরা দোকানের বয়স্ক মিষ্টিকাকু, হাতে একমুঠো বোঁদে নিয়ে কাচের শোকেসের ওপর একটু ঝুঁকে পড়ে জিগ্যেস করতেন—কী, একটু চাখবে নাকি খোকা? আর আমি ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলতেই, আমার জড়ো-করা অঞ্জলি ভরে শুকনো বোঁদের বৃষ্টি, সেই শারদ সকালে ঝমঝম করে ঝরে পড়ত।

কুঁচো-নিমকি তৈরি করার জন্যে, ময়দাকে বেলনা দিয়ে বেলে একটা গোল চাকতি বানানো হত। গামার কাঠের সাতপুরনো চাকিটার ওপর সেটা চিত হয়ে শুয়ে থাকত। তার বুকের ওপর মা-জ্যাঠাইমারা পেতলের খুন্তির ধারালো আগা দিয়ে, আড়াআড়ি আর লম্বালম্বি— এই দু’ধরনের দাগ এমনভাবে টানতেন, যাতে এই দাগের মধ্যে তৈরি হওয়া চৌকো খোপগুলো, এক-একটা নিমকির টুকরো হয়ে, আপনা-আপনিই উঠে আসত ওপরে। একবার ন’জ্যাঠাইমার কাছে অনেক কাকুতি-মিনতি করে, এই দাগ-টানার কাজটা জোগাড় করে এমন ছড়িয়ে ফেলেছিলাম যে, তাঁকে সেই ছেঁড়াখোঁড়া ময়দার চাকতিটা তুলে নিয়ে, আবার লেচি পাকিয়ে, বেলনা দিয়ে বেলে নিতে হয়েছিল। তারপর থেকে আমার ডিউটি হল, বেলবার মাঝখানে, ওই ময়দার চাকতিগুলোর ওপর একটু করে কালোজিরে আর জোয়ান ছড়িয়ে দেওয়া। বিজয়ার রাতে, কোনো আত্মীয় কুঁচো-নিমকির প্রশংসা করলে আমায় দেখিয়ে বলা হত— নিমকিতে যে কালোজিরে আর জোয়ান দেখছেন, ওগুলো কিন্তু ও ছড়িয়েছে! আর যাঁকে বলা হল, তিনি হয়তো চোখে-মুখে হাসি ছড়িয়ে আমায় জড়িয়ে ধরে বলতেন— ওমা, তাই নাকি! এ তো আগে বলতে হয়!

ছেলেবেলায় এই দিনটিতে যে ঘন চাপ-চাপ অসামান্য ঘুগনিটি আমাদের বাড়িতে তৈরি হতে দেখেছি, তার স্বাদ কিন্তু সারাবছর বাড়িতে তৈরি হওয়া ঘুগনির মধ্যে একদমই খুঁজে পেতাম না। ঠিক যেমন এখনও পাই না। ওপরে চকোলেট রঙের ভাজা জিরের গুঁড়ো ছড়ানো, তেঁতুল জল ছিটোনো রূপসি ঘুগনিটিকে ছোট্ট-ছোট্ট ফুলকো লুচির মধ্যে খামচে তুলে নিঃশব্দে খেতে-খেতে, মুখে টুকটাক নারকোল কুচি পড়লে, কী যে চমৎকার লাগত তা বলার নয়!

খোয়াক্ষীর দিয়ে বানানো মালপোয়াদের গাওয়া ঘিয়ে ভাজার পরে যখন একটি কাচের জামবাটিতে বানানো ঘন চিনির রসের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হত, তখন আবার আমার ডিউটি ছিল— চামচ দিয়ে ওদের আরও ভালো করে রসের মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়া। সেই অপার্থিব মালপোয়াটি না-হত শক্ত, না-হত ভ্যাদভেদে নরম। একটি কামড় দিলেই মুখের মধ্যে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকা তার স্বর্গীয় শরীর, ঘন রস, গাওয়া ঘি আর দামি ছোটো এলাচের ভুরভুরে সুগন্ধ মনের মধ্যে কেমন যেন একটা ঘোর-ঘোর ভাব তৈরি করত। আমার ছেলেবেলার বন্ধু রিজুর (রাজর্ষি রায়চৌধুরী) মাসিরা, বিজয়ার প্রণাম করতে গেলে এক অসামান্য পাউরুটির মালপো খেতে দিতেন আমাদের। থান পাউরুটির এক-একটি টুকরোকে দু’ফালি করে কেটে, ঘন ক্ষীরে মাখিয়ে নিয়ে, ভালো ঘিয়ে ভেজে, চিনির ঘন রসে ডুবিয়ে দিতেন আগের দিন রাতে। আমরা গেলেই সুদৃশ্য কাচের থালায়, পুরনো দিনের কাজ-করা চামচ দিয়ে সাজিয়ে, যত্ন করে খেতে দিতেন আমাদের। আমরা সেগুলো মুখে তুলতে তুলতে তাঁদের ভালোবাসার সুগন্ধও পেতাম।

পুজোর পর এখনও তো বিজয়া আসে। কিন্তু সিদ্ধির ফিকে সবুজ শরবত চিনেমাটির কাপে ঢেলে এগিয়ে দেওয়ার সেই হাতটা কবে যেন হারিয়ে গেছে। বদলে গেছে পুরোনো কলকাতার সেই একান্নবর্তী পাড়াগুলোর ছবি। ছোটো ছোটো ভাগে ভেঙে গেছে পুরোনো শরিকি বাড়িগুলো,আর সেই বাড়ির মধ্যে থাকা চেনা সংসারগুলোও। এই ভাঙন যত না দুঃখের, তার চেয়ে ঢের বেশি দুঃখের সেই বাড়িগুলোর বাসিন্দাদের মনের মধ্যে থেকে ভালোবাসার সিমেন্ট, বালি, সুরকি, স্টোনচিপস—  এগুলোর ভাগ কমে যাওয়াটা। বিজয়ার ঘুগনির মধ্যে থাকা নারকোলের কুচি, মালপো ভিজিয়ে রাখার ঘন রস—  এগুলো আসলে তো ছোটো ছোটো ভালোবাসার স্পর্শ, যা আমাদের যত্ন করে ঘিরে রাখত একসময়। সেই যত্ন, সেই ভালোবাসার স্পর্শগুলো আমি এখনও টর্চ-হাতে অন্ধকার খাটের তলায়, একতলার সিঁড়ির নিচে, দেওয়াল-আলমারির ওপরের ধুলো-মাখা কোণটিতে প্রাণপণে খুঁজতে থাকি। খুঁজতেই থাকি।

লেখক রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, কবি, গল্পকার, শিল্পী
অঙ্কনশিল্পী: শুভ্রনীল ঘোষ
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.