HeaderDesktopLD
HeaderMobile

রম্যরচনা: ডাক্তারি 

0 381

অমিতাভ প্রামাণিক

– আপনি কি বহুদিন ধরেই এই রকম আত্মহত্যাপ্রবণ? ঠিক কোন সময় আপনার মনে হল যে আপনার মনের মধ্যে এই ধরনের ইচ্ছেরা দানা বাঁধছে?

– বহুদিন আগে। বহু বছর তো বটেই। ডাক্তার, সে ধরো তোমার জন্মেরও বহু আগে থেকে। ইনফ্যাক্ট আমার জন্মের আগে থেকেও হতে পারে। জানোই তো, আমরা, হিন্দুরা, জন্মান্তরে বিশ্বাসী। আজকাল লোকে হিন্দু বলতে ভয় পায়, ভাবে অন্যে বুঝি ছোটোলোক ভাববে। আমি তো হিন্দুই, পৈতেও রেখেছি, ভয় পাওয়ার কী আছে, তাই না!

– আপনি জন্মান্তরে বিশ্বাস করেন?

– অফ কোর্স। শুধু বিশ্বাসই করি না, আমি আগের অন্তত চার জন্মের কথা ভাসা ভাসা স্মরণ করতেও পারি। মা-বাবা তো আমার কথা শুনে চমকে চমকে উঠত। ঐ যে তোমার সত্যজিতের সোনার কেল্লা, ও আমার পূর্বজন্মের তুলনায় কিছুই না। আগে তো ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে চোদ্দজন্মের কাহিনি একেবারে দিনের আলোর মত ফুটে উঠত। ভয় পেয়ে এক আধ বার ছোটোবেলায় বিছানাও ভিজিয়েছি, জানো? কিন্তু সকাল হলেই সেগুলো ভুলে যেতাম। আসলে মেমরি সেলগুলো ফ্রি না হলে চোখ খুলে যা নতুন দেখছি, সেই ছবিগুলো তো ব্রেনে সেভ করা যায় না, তাই না? তাই ক্যাশ মেমরি ফ্রি হয়ে যেত, আমার সেই বহুমূল্য চোদ্দজন্মের স্মৃতিও ধূলিসাৎ।

– কী রকম ছবি ফুটে উঠত আপনার মনে? মানে একটুও যদি স্মরণ করতে পারেন –

– সে এখন তোমায় বললে ভাববে বানিয়ে বানিয়ে বলছি। একবার কাকে যেন একটুখানি বলেছিলাম। প্রায় সবটাই তো ভুলে গেছি। তবে এক জন্মে আমি চেঙ্গিস খানের – হ্যাঁ হ্যাঁ ঐ চেঙ্গিসই, হিস্ট্রি বইতে তোমরা যার কথা হয়ত অল্প একটু পড়েছ। ছোটবেলায় ওর নাম ছিল তেমুজিন, আমি ওর দলে ছিলাম। কাশগড়, তাসখন্দ, সমরকন্দ-টন্দ ছারখার করে অর্ডার দিলাম সেই শহরগুলোকে নতুন করে বানানোর। আমার বার্ডস আই ভিউ, মানে দূর থেকে একটা বড়সড় জিনিস কেমন দেখাবে, তার এস্থেটিক সেন্সটা খুব প্রখর ছিল, জানো? এইসব শহরের খুঁটিনাটি প্ল্যানিং সব আমার। সেগুলো মাটির ওপর রাফ স্কেচ করে ওদের বুঝিয়ে দিতাম। চিন থেকে, পারস্য থেকে সব আর্কিটেক্ট আর ইঞ্জিনিয়ার এসে শহর বানালো আমার আইডিয়ায়। আমার ঘোড়াটার ওপর খুব লোভ ছিল চেঙ্গিসের মেজো ছেলের, বুঝলে? আমি দিইনি। ফুল স্পিডে যখন ঘোড়াটা ছুটত, তার পিঠে চেপে আমি পাঁচ সাতশো মিটার দূর থেকে তির ছুঁড়ে ছুটন্ত শজারু মারতে পারতাম। আমাদের নাম শুনলেই ইওরোপিয়ান ছিঁচকেগুলো ‘জিসাস, জিসাস’ করতে করতে দরজায় খিল তুলে দিত। সোজা ঘোড়া ছুটিয়ে দিতাম ওদের পাঁচিলের ওপর দিয়ে। পালাবি কোথায়!

– বাব্বা, আপনার সব ডিটেইলস মনে আছে দেখছি। এখনকার হিস্ট্রি বইগুলো যারা লেখে, আপনি তাদের হেল্প করতে পারেন তো। এত কিছু স্বচক্ষে দেখেছেন।

– ডিটেইলস আর কই মনে আছে, ডাক্তার? ডিটেইলস মনে থাকলে তো এতদিনে লিখেই ফেলতাম। ঘরে দুটো পয়সা আসত। হিস্ট্রি বইগুলো তো দেখেছই, একেবারে অখাদ্য। এ রাজা হল, এর ছেলে ওকে কেটে ফেলে রাজা হল, তার সেজোশালা আবার তাকে বিষ খাইয়ে রাজা হল, শুধু এই দিয়ে ভরা। রামোঃ! কত বিচিত্র সব ঘটনা ঘটেছে, ডাক্তার, সে আর তোমায় কী বলব! গুছিয়ে লিখতে পারলে এসব হ্যারি পটার-ফটার কিস্যু না। লোকে হুড়িয়ে কিনত, আমিও দুটো পয়সার মুখ দেখতাম। পয়সা খরচের ভয়েই তো সুইসাইড করতে চাই। এই যে এখন তোমাকে দেখাতে এলাম, তুমি তো আর বিনি পয়সায় আমাকে দেখছ না। এর জন্যে তোমায় ফিজ দিতে হবে, বাইরে গিয়ে যেই এ কথাটা ভাবব, অমনি মনে হবে, দূর, এইভাবে পয়সা খরচা করার চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল।

– যে কোনও ব্যাপারে খরচ হলেই কি আপনার এ রকম চিন্তা হয়?

– কী জানি! সব রকম ব্যাপারে না বোধহয়। আমার ঠাকুরদা ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত, বুঝলে? নামের পাশে ইয়া লম্বা লম্বা সব উপাধি। তখন তো ডিগ্রি বলা হত না, এখনকার মত খাতায় লিখে পরীক্ষাও দিতে হত না। তর্কযুদ্ধ ছিল সেয়ানে সেয়ানে লড়াই। বড় বড় লোকে ভালোবেসে উপাধি দিত। তর্কপঞ্চানন, ন্যায়শাস্ত্রী, বিদ্যার্ণব, মহামহোপাধ্যায় – এইসব। কিন্তু জানো বোধ হয়, যত বড় পণ্ডিত, তত বেশি গরিব। বুনো রামনাথের গল্প তো শুনেছ নিশ্চয়ই, সেই যে নদিয়ার পণ্ডিত এইটিন্থ সেঞ্চুরির, তিনি ছিলেন তর্কসিদ্ধান্ত। তেঁতুল পাতার ঝোল খেতেন। আমার ঠাকুরদাও ঐ গোত্রেরই। আমাকে বলতেন, শিক্ষাদানের চেয়ে পুণ্য কর্ম কিছু নেই। আমি ওঁর কথা শুনিনি। সংসার চালাতে গেলে কিঞ্চিৎ পয়সাকড়ির দরকার হয়, তাই না, ডাক্তার? দিনকাল এমন পড়েছে, শিক্ষকদের সম্মানই বা কোথায়? লাইফে একটু সচ্ছলতা আনতে সি-এ পড়লাম। অল্পস্বল্প দানধ্যান যে করি না, তাও না। কিন্তু জানো তো, ওসব কথা কাউকে বলতে নেই। কিন্তু নিজের ব্যাপারে পয়সা খরচা হবে ভাবলেই আমার মনে সুইসাইডের ইচ্ছেটা একেবারে চাগিয়ে ওঠে। মনে হয়, দূর, দূর, পয়সা খরচা করে চিকিৎসা করানোর চেয়ে মরে যাওয়াই ভাল।

– কিন্তু মরে যাওয়া কেন? পয়সা খরচ না করতে চাইলে করবেন না। মরে গিয়ে লাভ কী?

– সে আর তোমাকে কী বোঝাব, ডাক্তার, লাভ দিয়ে কি সবকিছুর বিচার হয়? তুমি যদিও হিন্দুই, গীতাটা কি ভালো করে পড়েছ? মানে বাংলা পদ্য গীতার পাঁচালিগুলো না, সংস্কৃত শ্লোকওয়ালা যে সপ্তশতী গীতা, সেইটা? সময় পেলে সটীক একপিস কিনে এনে পোড়ো, খারাপ লাগবে না। গীতায় বলা আছে – জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুঃ ধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ, মানেটা বুঝলে তো? লাভ-ক্ষতির ব্যাপার আদৌ নেই এখানে। জন্ম-মৃত্যু এসব সিম্পল জিনিস, যে জন্মাবে সে মরবেই, যে মরবে সে আবার জন্মাবে। একই জিনিস, বিভিন্ন তার রূপ। সব সময় সে একই রূপে বিরাজ করবে কেন? কয়লা আর হিরে যেমন বেসিক্যালি একই জিনিস, আমি আর একটা ছাগলও তাই। দ্যাখো, ছাগল তো দিনরাত বলি হয়ে যাচ্ছে মানুষের পেটে যাওয়ার জন্যে, তাহলে একটা মানুষের মৃত্যু নিয়েই বা এত আদিখ্যেতার কী আছে, তাই না? আমার সমস্যাটা আসলে আমার মরে যাওয়া নিয়ে ততটা নয়। কিন্তু বাড়ির লোকেদের তো সেটা বোঝানো যায় না। তারা চায় আমি না মরি, সুইসাইড না করি। সেজন্যেই ঠেলে ঠেলে পাঠায় ডাক্তারদের কাছে চিকিৎসার জন্যে। আর আমি যতই ভাবি, ডাক্তারদের ফিজ দিতে দিতে আমার পয়সা ধ্বংস হচ্ছে, ততই আমার মৃত্যুচিন্তা প্রগাঢ় হয়ে ওঠে।

– ওহ, স্যরি। আচ্ছা, আমি যদি আমার ফিজটা না নিই?

– না নাও! কেন? ফিজ কেন নেবে না তুমি? আমি কি উপযুক্ত পেশেন্ট নই, ডাক্তার? জানো, আমাদের হিন্দুধর্মে বলেছে, কর্মের মধ্যে দিয়ে ধর্মপালন কর, নিজের ধর্মে মতি রাখো। স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ। পেশেন্টের ধর্ম রোগ বাধানো, ডাক্তারের ধর্ম পেশেন্টের কাছ থেকে ফি নিয়ে রোগ সারানো, তাই না? আমি যদি আমার ধর্মে মতি রাখতে পারি, তুমি কেন তোমার ধর্ম পালন করবে না? তুমিও তো হিন্দুই। আজকাল অবশ্য অনেকে –

– হিন্দু স্বীকার করতে ভয় পায়? না, না, সে জন্যে না। আমার কথা বাদ দিন। দাতব্য চিকিৎসাও তো চিকিৎসাই। আপনার ফি-টা যদি আমি মকুব করে দিই?

– মকুব করে দেবে? তা বেশ, দাও। প্রেসক্রিপশনে লিখে দাও এইখানে। চেম্বার থেকে বেরিয়ে তোমার অ্যাসিস্ট্যান্টকে তাহলে ফাইলটা দেখিয়ে বলব, ডাক্তার আমার ফি মকুব করে দিয়েছে। গুড, গুড। বাড়ি গিয়ে অবশ্য আমার এ জন্যে অনুশোচনা হবে। ভাবব, আমার মত একজন তুচ্ছ মানুষের জন্যে একজন গুণী, ইয়াং ডাক্তারের – যার সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দিতে পারলে আমি যাকে বলে ধন্য হয়ে যাব – একটা হকের রোজগার মাটি হল। এ পোড়া জীবন আমার রেখে লাভ কী? যাই, সুইসাইডটাই করে ফেলি।

– ও হো। ফি নিলেও সুইসাইড, না নিলেও তাই? এ যে দেখছি শাঁখের করাত।

– উপায় কী বলো ডাক্তার? মাথার ওপর বিবাহযোগ্যা মেয়ে বসে থাকলে বাবাদের কী অবস্থা হয়, সেটা তুমি এখুনি তো বুঝতে পারবে না, বাবা হওয়ার পর বুঝবে। তুমি হিন্দু হলেও নির্ঘাৎ পরজন্মে বিশ্বাস কর না, তাই না? বিশ্বাস না করলে পূর্বজন্মের স্মৃতি কোনও কালেই তুমি স্মরণে আনতে পারবে না। পারলে দেখতে, আগের কোনো জন্মে তোমার কেমন দিন গেছে। কন্যাদায় বলে একটা ভয়াবহ কথা ছিল সমাজে। শরৎ চাটুজ্জে পড়েছ নিশ্চয়ই একটু আধটু? ওরে বাবা, একটা মেয়ে পার করা কি চাড্ডিখানি কথা? এই চাড্ডি মানে কিন্তু ব্যঙ্গার্থে হিন্দু নয়, এটা মনে রেখো, ডাক্তার, আজকাল অবশ্য লোকে তাই বলে। চারটিখানি থেকে চাড্ডিখানি, বুঝলে? আমার মেয়ে অবশ্য এমন নয় যে দেখলে তাকে কারও অপছন্দ হওয়ার কথা। আর বাপ হয়ে তার গুণের কথা নিজের মুখে আর কী বলব? কিন্তু সে যাক, যতক্ষণ না পাত্রস্থ হচ্ছে, চিন্তা কি যায়, বলো? তোমার কি দিদি বা বোন –

– নাহ্‌ কেউ নেই। আমি মা-বাপের এক সন্তান। দিদি বা বোনের বিয়ে নিয়ে বাবাকে ভাবতে হয়নি।

– ভাগ্যিস! মহা পুণ্যবান বলতে হবে তোমার বাবাকে। খুবই ভাগ্যবান। আসলে এও তো তোমার সেই পূর্বজন্মেরই রীতি। এই পণ-টনও আমাদের পূর্বপুরুষদেরই বদখেয়াল। চিন্তা করে দেখো, পণ বলতে লোকের বোঝা উচিত প্রতিজ্ঞা – ‘জলস্পর্শ করব না আর চিতোর-রানার পণ, বুঁদির কেল্লা মাটির ‘পরে থাকবে যতক্ষণ’ – সেখানে আমাদের অভিধানে তার নতুন অর্থ ঢুকে গেল কী? না, কন্যা পার করার পারানি। কী মুশকিল বল তো! তোমার মা-বাবা বেঁচে গেছেন, এই ঝামেলায় পড়তে হয়নি। আমিও ভাবছি, বেঁচে যাব কিনা। তোমার মত একজনকে পাত্র পেলে নিশ্চয়ই পণ-টনের প্রসঙ্গই উঠবে না। মেয়ের বিয়েতে পণ দিতে হবে, ভাবলেই আমার মনে হয় –

– সুইসাইড করি? আশ্চর্য মানুষ আপনি।

– আশ্চর্যই বটে। সব ডাক্তারই তাই বলেছে, আপনি মশাই আশ্চর্য লোক। আমি তো আর আজকেই চিকিৎসা শুরু করছি না, আগে অনেক ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছি। জেনারেল ফিজিশিয়ান, সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট, গ্যাস্ট্রো-এন্টারোলজিস্ট –

– গ্যাস্ট্রো-এন্টারোলজিস্ট? সুইসাইড প্রবণতার সঙ্গে গ্যাস্ট্রো-এন্টারোলজির কী সম্পর্ক?

– সে কি ছাই আমি বুঝতাম? সেও আমার মেয়ের পরামর্শেই। আসলে সুইসাইডাল ব্যাপারটা তো আর মেয়েকে বলিনি, এসব গুহ্যকথা কি কারও আত্মজাকে বলা যায়, তুমিই বলো! জানলে তার নার্ভাস ব্রেকডাউন হতে কতক্ষণ! সে জানে আমার চিন্তাভাবনার মধ্যে কখনও কখনও অতিরিক্ত বৈচিত্র্য দেখা দেয়, বিশেষ করে আমি যখন পূর্বজন্মের স্মৃতিগুলো স্বপ্নের মধ্যে দেখতে পাই। সে একদিন গুগল ঘেঁটে বলল, আমাদের চিন্তাভাবনা নাকি সব ব্রেন থেকে আসে না, বেশ খানিকটা আসে আমাদের ডাইজেস্টিভ সিস্টেম থেকেও। ঐ যে গাট ফিলিং বলে কথাটা আছে, ওটা নাকি স্রেফ কথার কথা নয়। অন্ত্র-ফন্ত্রে যেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাণু আছে, তারা নাকি ব্রেনে সিগন্যাল দেয়, ভালো থাকার বা না-থাকার। সকালে বাওয়েলটা ক্লিয়ার হয়ে গেলে যেমন ঝরঝরে একটা ভাব আসে, সেও নাকি ঐ গাট ফিলিংয়ের জন্যেই। তো ওর কথা শুনে গেছিলাম এক গ্যাসের ডাক্তারের কাছেও। তবে সে ডাক্তার বোধহয় এতকিছু জানে না বা বিশ্বাসও করে না। আমাকে কীসব গুলি-ফুলি দিলো, তাতে তেমন কিছু ফল হল বলে তো মনে হয় না।

– বুঝলাম। এসব নিয়ে পড়াশোনাও করেছেন তার মানে?

– না, না, কী যে বলো। আমি না, এসব পড়াশোনা আমার মেয়ের। আমি বোধহয় গুছিয়ে বলতেও পারলাম না ঠিক করে, সব কি আর আমি নিজেই ভালো বুঝি? চরক-সুশ্রুত এটসেট্রা বোধহয় তোমাদের সিলেবাসে ছিল না, তাই না ডাক্তার? আধুনিক চিকিৎসা মানে তো ওয়েস্টার্ন মেডিসিন, মানেই ট্যাবলেট ক্যাপসুল, সিন্থেটিক কেমিক্যালস। দ্যাখো, ডাক্তারের কাজ তো রোগীর সেবা করা, তাই না? সংস্কৃতে একেই বলে শুশ্রূষা। এ হচ্ছে তোমার শ্রু-ধাতু, যার মানে শ্রবণ করা, তার সঙ্গে ইচ্ছার্থে সন্‌-প্রত্যয় যোগ প্লাস অ প্লাস স্ত্রীয়াং টাপ্‌। মানে, শুশ্রূষা হচ্ছে গিয়ে তোমার শ্রবণ করিবার ইচ্ছা। শুশ্রূষাকারী একজন ডাক্তারের রোগীর সমস্যা সম্যকরূপে শ্রবণ করার ইচ্ছা থাকা দরকার, যেমন তোমার আছে। এ আর এখনকার ডাক্তারদের মধ্যে কতজনের আছে, বল? যা শ্রবণ করা হয়েছে, তাকে বলে শ্রুত আর শ্রবণ করে মনে রাখতে হত বলে বেদকে বলা হয় শ্রুতি। ডাক্তারি পড়েছ যখন জয়েন্ট-ফয়েন্টে র‍্যাঙ্ক করেছ ভালো, এসব তো তুমি জানবেই। আসলে সুন্দরভাবে শ্রবণ করতেন বলেই বৈদ্যরাজ ছিলেন সুশ্রুত, তাঁর লেখা সুশ্রুত সংহিতা। সেই রকম চরক সংহিতা। আমি তো চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি করেছি, ডাক্তারির ড-ও জানি না। তবে ঐ যে, বললাম, হিন্দুধর্মে কিঞ্চিৎ মতি রাখি বলে চরকের বইটা খানিকটা ঘাঁটাঘাঁটি করেছিলাম। এই চরকের সঙ্গে কিন্তু চৈত্র সংক্রান্তির গাজনের মেলার চড়ক মিলিয়ে দিও না। এটা ব-এ শূন্য র, ওটা ড-এ শূন্য ড়।

– আচ্ছা! আপনার চরক সংহিতাতেও ইন্টারেস্ট আছে?

– ইন্টারেস্ট মানে তেমন কিছু নয়, ডাক্তার। ওসব বই কি আমাদের মত অডিটরদের কোনো কাজে লাগে? বইটা আমার মেয়ের। টেবিলে থাকে, তাই মাঝে মাঝে উল্টিয়ে দেখেছি, এই আর কী। এর বেশি কিছু না।

– আপনার মেয়েও ডাক্তারি পড়ে নাকি?

– আরে না, না। মেয়ে ডাক্তারি পড়লে কি আর মেয়েকে ছেড়ে হাজার আজেবাজে ডাক্তার ঘুরে তোমার কাছে আসি আমি? হায়ার সেকেন্ডারির সময় অবশ্য তাকে জোরাজুরি করেছিলাম, ডাক্তারিটা পড়্‌, পরিবারের লোকেদের তাহলে রোগের সময় অন্য কারও শরণাপন্ন হতে হয় না। নিমরাজি মত হয়েও গেছিল। কিন্তু আমার গৃহিণী, বুঝলে কিনা – সংসারের সমস্ত শান্তি ও অশান্তির মূলে কাউকে তো থাকতেই হয় – বাগড়া দিয়ে বসলেন। ডাক্তারদের নাকি লাইফ নেই, মাঝরাতেও রোগীর চিন্তা করতে হয়। আরে বাপু, টাকার চিন্তার চেয়ে তো একজনের জীবন বাঁচানোর চিন্তা অনেক বেশি পুণ্যের, তাই না? আমাদের হিন্দুধর্মে বলেছে … আচ্ছা, ঠিক আছে, হিন্দুধর্ম বাদ দাও। গিন্নির পছন্দ ইঞ্জিনিয়ারিং। মেয়ে নাকি আমার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বুর্জ খলিফা, ম্যাগলেভ রেললাইন, ভাকরা-নাঙ্গাল বাঁধ এসব বানাবে, এরোস্পেস টেলিকমিউনিকেশনে বিপ্লব আনবে। বাপ-মায়ের ইচ্ছায় জয়েন্টে বসল দুটোর জন্যেই। দুটোতেই এত ভাল র‍্যাঙ্ক হল তার, বেচারা ঠিক করতেই পারল না, কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়বে।

– মানে? ইঞ্জিনিয়ারিং-ও পড়তে গেল না?

– নাহ্‌। আজকালকার মেয়ে, বোঝই তো। বাপ-মায়ের ঝগড়া হোক, মতান্তর থেকে মনান্তর হোক, তা কি চায়? দুজনকেই বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিজের ইচ্ছেয় পড়তে গেল কম্পারেটিভ লিটারেচার। কী সব খটোমটো জিনিস, এক বর্ণ আমার মাথায় ঢোকে না। আমাকে বলল, তোমার অত কষ্ট করে বুঝে কাজ নেই, আমি বুঝলেই তো হল। তো আমি বললাম, ঠিক আছে, বাপের সাহায্য ব্যতিরেকেই যদি জীবনে উন্নতি করতে পারো, করো। গার্গী, লীলাবতী, লোপামুদ্রা, ঘোষা, মৈত্রেয়ীরা যে দেশে জন্মেছে, বেদ-ফেদের শ্লোক লিখেছে, সেখানে আমি কে, বলো! আমার ঠাকুরদার জিনটা নিশ্চয়ই তার মধ্যে বেশ প্রকট হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব যুগের সংস্কৃত ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে পরস্পরের প্রভাব নিয়ে গবেষণা তার। ওই জন্যেই বেদ-উপনিষদ থেকে শুরু করে পাণিনি-পতঞ্জলি চরক-ফরক সবই পড়তে হয় তাকে। তো সে সব যাকগে। বিদুষী মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যে কী ঝঞ্ঝাটের, তা আর তোমায় কী বলি। আচার্য ভাস্কর তাঁর বিদুষী অনূঢ়া কন্যার জন্যে লীলাবতী নামে পাটিগণিতের একখানা বই-ই লিখে ফেলেছিলেন। আমার তো আর সেই গুণ নেই। তাই তার কথা যতই ভাবি, মনে হয়, সুইসাইড করি।

– কিন্তু আপনি সুইসাইড করলে বিয়েটা তার কী করে হবে? আপনি বাবা –

– সেই জন্যেই তো করতে পারছি না, ডাক্তার। একটিমাত্র কন্যা আমার, সেই আমার সব। এই দ্যাখো, সামনে পুজো আসছে, পুজোয় দেবী দুর্গা শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে নাকি পিত্রালয়ে যায়। আমার দেবীটি তো এখনও শ্বশুরবাড়িই গেল না। ওহো, পুজোর কথা উঠতে মনে পড়ল, পুজোর বাজার করতে সকন্যা আদি মোহিনীমোহন কাঞ্জিলালে গেছিলাম। পুজোয় চাই নতুন শাড়ি, বুঝতেই পারছ। ওদের মালিকের ছেলে না কে-যেন ওখানেই ছিল সেদিন। আমাকে এসে ধরেছে, মেয়েকে যদি ওদের শাড়ি পরিয়ে বিজ্ঞাপনের জন্যে ব্যবহার করতে পারে। আমি বাপু এসব একেবারেই বুঝি না। সে শ্বশুরবাড়ি যাবে, পুজোর সময় পিত্রালয়ে আসবে, এই ভাবনাতেই আমার মন সবসময় –

– কিন্তু আমি বুঝে পাচ্ছি না, তাকে নিয়ে আপনার এত চিন্তার কারণ কী! মেয়ে আপনার গুণী, রূপবতীও, তার বিয়ে নিয়ে আপনাকে কেন ভাবতে হবে? সে নিজের ইচ্ছেয় –

– ঐটাই তো ভাবনা, ডাক্তার। তুমি আমার কথাই ভাবছ, কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে তার ভাবনাটা একেবারে বিচ্ছিরি, একেবারে সেকেলে, সেইটে বুঝছ না। হাজার হোক, হিন্দু ঘরের মেয়ে –

– মানে? কী বলতে চাইছেন? সে কি স্বয়ম্বর সভা করতে চায় নাকি?

– তা চাইলেও আপত্তি করতাম না। বুঝিয়ে সুঝিয়ে নেমন্তন্ন করে আনতাম কয়েক ডজন প্রস্পেক্টিভ পাত্রকে। অজেয় বীর চেঙ্গিস খানের দলের লোক ছিলাম আমি, চাইলে কী না করতে পারি! এক সময় যোদ্ধা ইওরোপিয়ানদেরও কচুকাটা করেছি। কিন্তু সে তো সেসব চাইছে না।

– কী চাইছে তবে?

– পরিষ্কার বলে দিয়েছে, আমাকে যে সম্পূর্ণ সুস্থ করে দেবে, তাকেই সে বরমাল্য প্রদান করবে। আচ্ছা, এ কী ধরনের গোঁ বলো দেখি, ডাক্তার? এইসব শুনেই মনে হয়, যাই, এই দেহ রেখে আর কাজ কী, করেই ফেলি সুইসাইডটা। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, আহা, তবে তো আমার মা জননীর বিয়েটাই হবে না। আমার বংশ লুপ্ত হয়ে যাবে। আমাদের হিন্দুধর্মে … না, না, সে বড় অলুক্ষুনে কথা। এখন তুমি ভেবেচিন্তে বলো দেখি, ডাক্তার, আমার এই রোগ কি সারবে? তুমি কি পারবে আমায় সম্পূর্ণ সুস্থ করে দিতে?

(লেখক বেঙ্গালুরু নিবাসী গবেষক, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক)

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.