HeaderDesktopLD
HeaderMobile

ভাবনাগাছ 

0

অনিমিখ পাত্র

 

আপনি বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এটা কিন্তু আদতে কোনও গল্পই নয়। এ আসলে এক্কেবারে আমার নিজেরই জীবনের কথা।  

আসলে, আমি কবিতা লিখতাম। খেয়াল করুন, আমি কিন্তু পাস্ট টেন্স ব্যবহার করলাম! ছাপা-টাপাও হত। ল্যাপটপ বা মোবাইল ফোনে লেখার সুবিধা থাকলেও আমি পছন্দ করতাম খাতাতেই লিখতে। গত দু’বছর ধরে একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করছিলাম আমি। শুরুর দিনটার কথাই প্রথমে বলি আপনাদের। 

 

কবিমাত্রেই জানেন যে, কবিতা নানানরকমভাবে আসে লেখকের কাছে। কখনও একসঙ্গে গোটা কবিতাটা লেখা হয়ে যায়, আবার কখনও বা এক একটা পঙক্তি ধরা দেয় মাথায়। তাকে ফেলে রাখতে হয়। পরে পরে আবার তার সঙ্গে যোগ হয় কিছু পঙক্তি আর গড়ে ওঠে একটা কবিতা। সেদিন সকালবেলা একটা পঙক্তি এল মাথার মধ্যে, আমি তখন বাজারে যাব বলে তৈরি হচ্ছিলাম। এই এক অদ্ভুত জিনিস! লেখা যে কখন আসবে তা কিছুতেই ঠাহর করা যায়না। সমস্তরকম যোগাড়যন্ত্র, পরিবেশ-প্রতিবেশ আদর্শমতো প্রস্তুত করে রাখলেও সে না-ও ধরা দিতে পারে, আবার এসে যেতে পারে তথাকথিত গদ্যময় পরিস্থিতিতে, অনাহুত অতিথির মতো। লেখকের তখন আর বিপদের শেষ নেই। তো, সেদিন এরকমই একটা পরিস্থিতি, কোনও পূর্বাভাস ছাড়াই একটা পঙক্তি ঝিলিক দিয়ে গেল মাথার মধ্যে। বাধ্যত, খাতাটা টেনে লিখে রাখলাম লাইনটা –

 ‘কবেকার নির্জনতা, স্বজনকাঁপানো হাহাকার’ 

 

তারপর যথারীতি বাজারে চলে যাই। ভাবি, ফিরে এসে রাতের বেলায় ফের বসা যাবে খাতা খুলে। তারপর যা হয় আর কী! নানাবিধ সাংসারিক কাজেকর্মে ভুলেই গেছি, হয়তো বা যেরকম প্রিয় বেদনাকে এড়িয়ে এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে মানুষ, হয়তো বা যেরকম সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার হাত থেকে দূরে দূরে থেকে যেতে চায়। অনেক রাতে, চমকে উঠে খাতার কাছে যাই। সেই পঙক্তি লেখা পাতাটা খুলি। দেখি, লেখা আছে – 

 

‘কবে কার নির্জনতা, স্বজনকাঁপানো হাহাকার’

 

প্রথমটায় ধরতে পারি না। খটকা একটা লাগে অবশ্যই। খাতার পাতার দিকে, নিজেরই হাতের লেখার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকি। বুঝতে পারি আমার অজান্তেই ভ্রূ কুঁচকে যাচ্ছে আমার। যাকগে, আমারই মনের ভুল হবে হয়তো বা, এমনটা স্থির করে সেই খটকায় প্রবোধ দিই আমি। আর এসে যায় তার পরের লাইন –

 

‘বিপরীত মুদ্রায় যেরকম শরৎস্বভাব’

 

তার মানে এই লেখা এইভাবেই একটু একটু করে গড়ে উঠবে– এই কথাটা বুঝতে পারি। দ্বিতীয় এই লাইনটারও হয়তো আসারই কথা ছিল। কারণ, আমি দেখেছি যে কোনও ঋতুবদলের সঙ্গে মনবদলের একটা যোগ থাকে। বিশেষত, এই এখন, বৃষ্টির দাপট সবে শেষ হয়েছে। অক্টোবরের দিকে ঢলে পড়ছে হাওয়া। কাশফুল গজিয়ে উঠেছে রাস্তার ধারে। পারফেক্ট শারদ আবহাওয়া! কী যেন একটা হারিয়ে যাচ্ছে আর কী যেন একটা আসছে। কী আসছে তা তো জানি, কী হারিয়ে যাচ্ছে জানি কি? হায়! কী আসলে আসছে, সত্যিই কী জানি!                   

 

 ধাক্কাটা লাগে পরেরদিন। দুপুরবেলা খাতাটা খুলে বসেছি বাকিটুকু লিখে ফেলব বলে। ওমা! দেখি কালকের চেয়ে আরও খানিকটা পালটে গেছে তারা –

 

‘কবে কার নির্জনতা, স্বজনভোলানো হাহাকার

বিপরীত অনুপানে যেরকম উপমাপৃথিবী’

 

আমি বেশ বুঝতে পারি একটা গভীর গণ্ডগোল হচ্ছে কোথাও। আমারই লেখা অক্ষর, পঙক্তি দেখাচ্ছে তাদের ইগো। প্রাণ পেয়ে যাচ্ছে তারা। নিজেদের মতো করে নিজেদের গড়েপিটে নিচ্ছে তারা। ‘কবে’র সঙ্গে ‘কার’ একসঙ্গে বসতে চাইছে না। প্রপার নাউন বদলে বদলে যাচ্ছে। আমি কিন্তু প্রথমেই হাল ছেড়ে দিইনি, বিশ্বাস করুন! বন্ধুকবিরা নিশ্চয়ই পাগল ঠাওরাবে আমায়, এই ভেবে বলিওনি কাউকে কিচ্ছুটি। আমি তো রীতিমতো চ্যালেঞ্জই নিয়েছিলাম একটা। দেখি না, কী হয়! আমারই লেখা অক্ষরের সঙ্গে শেষে যুদ্ধে হেরে যাব? প্রথমদিকে যুদ্ধটাও ছিল সুবিধেজনক। কেবলমাত্র শব্দগুলো টুকটাক পাল্টে যাচ্ছিল। আমার লেখার মূল কাঠামোটাকে অমান্য করার সাহস দেখায়নি তারা। এই যেমন, একদিন লিখলাম – 

 

‘বাড়ি ফেরার পথে কেউ নভেম্বর সাজিয়ে রাখেনি’

 

খানিক পরে ফিরে দেখি বাকি বাক্যটি ঠিকই আছে, শুধু নভেম্বর-এর জায়গায় লেখা ‘মার্চ মাস’। যদিও, এ-ও ভীষণরকমই অঙ্গহানির সামিল, তবু আমি ওইটুকু মেনে নিয়েছিলাম। তা নইলে তো কবিতা লেখা ছেড়েই দিতে হয়! আর তাহলে একজন কবির জীবনে আর থাকেটাই বা কী? কিন্তু ক্রমশ বদলে যাবার মাত্রা বাড়তে থাকল। এক একসময় মনে হতে থাকল আমারই লেখা যেন আসলে নিঃশব্দ হাসি-তামাশায় মেতেছে তার স্রষ্টাকে নিয়ে। অথবা ডাহা ভুল  বলছি– নিজেকে আর ‘স্রষ্টা’ বলে দাবি করবার অধিকারও হারিয়েছি আমি। যেমন, উপরোক্ত লাইনটি লেখার এক সপ্তাহ পরে খাতা খুলে দেখলাম তা দাঁড়িয়েছে এইরকম –

 

 ‘বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখি মার্চ মাস দাঁড়িয়ে রয়েছে’

 

হায়! যেন কী নিদারুণ ইয়ার্কি মারা হচ্ছে আমার সঙ্গে! তবু, লক্ষ্য করুন, এ পর্যন্ত পঙক্তিকাঠামোটি আমি যেরকম লিখেছিলাম মোটামুটি সেরকমই বজায় রয়েছে। এক মাস পরে, এই লাইনটিকেই দেখলাম সে বিস্তর অন্যরকম, দুরন্ত বাচ্চার মতো সে হুটোপাটি করে যেন ভেঙে নিচ্ছে নিজেকে, উল্লম্বভাবে গড়িয়ে নামছে –

 

‘বাড়ি ফিরতে গিয়ে দেখি
কোথাও বাড়িই নেই,
শুধু এক মার্চ মাস
আর তার সবুজ পাতারা’

 

আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম যে খেলা হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। একে আর কোনওভাবেই আমার লেখা কবিতা বলে দাবি করা চলে না। তবুও, সত্যি বলছি, এরপরও একটা শেষ চেষ্টা আমি করেছিলাম। আমি ভাবলাম যে, কলমে লেখা ছেড়ে ডিজিটাল মোডে চলে গেলে হয়তো আমি আবার কর্তৃত্ব ফিরে পাব। এই ভেবে, লিখতে শুরু করলাম মোবাইল ফোনে। হায়! আমার ভাগ্যাকাশে তবুও আর সূর্যোদয় ঘটল না মোটে। ফলে, একদিন লেখা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলাম আমি। এর সূত্র ধরে এল আরেকটা সমস্যা, যদিও সে নেহাতই মাইনর। সম্পাদকেরা লেখা চাইছেন, আমি আর কতই বা তাদের নিরস্ত করি। কয়েকজনের সঙ্গে তো সম্পর্কও রীতিমতো খারাপ হয়ে গেল এই কারণে। শেষে, একদিন সবাই বুঝতে পারলেন যে আমি সত্যিই লেখা ছেড়ে দিয়েছি। তা, লেখা ছেড়ে দেবার ঘটনা সাহিত্যজগতে খুব বিরল নয়। ফলে, তেমন কোনও সমস্যা হল না। এই অধমকে সকলেই অনতিবিলম্বে বিস্মৃত হলেন।  

 

লেখা ছেড়ে দেবার পর আমার দশা হল মারাত্মক। আমি তো আসলে কবিত্ব হারিয়ে ফেলিনি! জোর করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে লিখবনা। সুতরাং একজন কবির যেমন হয়, হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎচমকের মতো কবিতার লাইন মাথায় ভর করে। কিন্তু লিখিনা। তাড়িয়ে দিই। আবার তারা মজাপুকুরের কচুরিপানার মতো সরিয়ে দেওয়া জলের বৃত্ত বুজিয়ে ফিরে ফিরে হানা দেয়। এইবার যুদ্ধটা শুরু হয় মাথার ভেতর। অক্ষরেরা ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। না লিখবার ফলে তাদের স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রথমদিকে কিছুটা বাধা দিতে সক্ষম হয়েছিলাম আমি। যেন, অপ্রত্যাশিত চালের সামনে পড়ে শত্রুসৈন্য কিছুটা দিশেহারা। তারপর, লেখা– এখন অবশ্য তাদের আর লেখা না বলে ‘ভাবনা’ বলাই ভালো– নিজেদের আপডেট করতে থাকল ক্রমশ। একটা সময় এল অচিরেই, যখন আর তাদের লিখিত হবার দরকার হল না। আমার মাথাতেই খেলে বেড়াতে লাগল তারা। না লেখার চাপ আর নিজেরই মাথার মধ্যে চলা যুদ্ধের সাঁড়াশি আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়লাম আমি।

এইভাবে কয়েক মাস গেল। তারপর সমস্ত প্রতিরোধ শেষ হয়ে গেল আমার। ভাবনাগুলো স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠতে থাকল। অবশ্য একেবারে স্বয়ম্ভূ নয় তারা, নিজে নিজেই গজিয়ে উঠতে তখনও সক্ষম নয়। তাদের প্রয়োজন কেবল একটা ট্রিগার পয়েন্ট, আমার ভাবনাঘরের দরজার একটুকু ফাঁক, একটা শুরুর বিন্দু। যেন ‘মাদার অফ মিলিয়ন্স’ নামের এক পাথরকুচি গাছ, যার পাতা একটু পরিণত হলেই পাতার ধারে লাইন করে জন্ম নেয় ছোট ছোট কুঁড়ি-পাতা, মাটিতে পড়ে তারা হয়ে ওঠে এক একটা স্বতন্ত্র গাছ। কেবল, এক্ষেত্রে এই ঘটনাটা ঘটে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়, বলতে গেলে চোখের নিমেষে। পার্থিব হিসেবনিকেশ, মামুলি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, দায়-দায়িত্বের ভাবনায় অবশ্য সেই ভাবনাগাছের কোনও উৎসাহ নেই। সে বা তারা অপেক্ষা করে নান্দনিক ভাবনার। যেই না বিশেষ কিছু একটা ভাবতে শুরু করেছি আমি, অমনি সেই ভাবনাসূত্র ছিনতাই হয়ে যায়। যেন রিলে রেসের ব্যাটন– অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় আমার হাত থেকে আমার ভাবনাকে কেড়ে নিয়ে দৌড়তে শুরু করে কেউ। আমারই মাথার মধ্যে আমি তখন নীরব ও অসহায় দর্শক মাত্র। আমারই মাথার মধ্যে আমারই ভাবনাচারা কিলবিল করে।

আমি ছিলাম পেশায় শিক্ষক। সাহিত্য পড়াতাম। ক্লাসে নিজের জীবন-অভিজ্ঞতা, ভাবনা, কল্পনা জুড়ে দিতাম পাঠের সঙ্গে। এখন আর সে উপায় রইল না। ফলে, আমার পড়ানো হয়ে উঠল মামুলি, কেবলই টেক্সট আর তার মানে করে দেওয়া। এরপর একদিন চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম আমি। লোকচক্ষুর সামনে থেকে পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম। পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হলাম, কারণ বাইরে থেকে আমাকে দেখে কিছু বোঝার উপায় ছিল না। অথচ আমি বেশ টের পাচ্ছিলাম যে অচিরেই এমন একটা দিন আসবে যখন এই ট্রিগার পয়েন্ট অর্থাৎ কিনা আমার ভাবনা শুরু করার পরিসরটাও আর থাকবে না। আমি পরিণত হব সম্পূর্ণভাবে ভাবনাগাছের আজ্ঞাবহ দাসে।  

 

 

আমার লেখারা যখন আমার কর্তৃত্ব ছেড়ে ক্রমে স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠতে থাকল তখন বুঝিনি, কিন্তু এখন ধীরে ধীরে টের পাচ্ছি যে আজকের দিনের জন্যই সেসব ছিল প্রস্তুতিপর্ব মাত্র। আজ সেই চূড়ান্ত পর্ব, যখন সমস্ত কিছুর ওপর দখল ছেড়ে দিতে হবে আমাকে। ভাবনার অধিকারও। এই সবুজ শ্যামল পৃথিবীতে, তার শ্রেষ্ঠ সন্তান মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করেও, হায়, এ কী পরিণতি হতে চলেছে আমার! কোনওকিছুর ওপর মালিকানা নেই– তাকে আর মানুষ বলা যায় নাকি? 

 

মনে পড়ে, খুব ছোটোবেলায় মা-বাবার সঙ্গে একবার পুরী বেড়াতে গেছিলাম। ফেরবার সময় সেখানকার এক দোকান থেকে এক দিদিকে একসেট কাঠের পুতুল কিনে দিয়েছিল তার বাবা। সবচেয়ে বড়ো পুতুলের কোমরের কাছে একটা প্যাঁচ, ঘোরালেই তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে আরেকটা হুবহু পুতুল। তার ভেতর থেকে আরও একটা, এইরকম। আমার উপস্থিতিটাও যেন ঠিক সেইরকম বোধ হচ্ছে এখন। যেন একটা স্বপ্নের ভেতরে আছি। যার ভেতরে আরেক স্বপ্ন। তার ভেতরে আরও এক। এইরকম। এখন আর গলা দিয়ে কোনও আওয়াজও বেরচ্ছে না আমার। বস্তুত, বহুদিন কারও সঙ্গে কথা বলিনি আমি। সে কারণেই কি মনে হচ্ছে নিজের কণ্ঠস্বর শুনলে আমার নিজেরই ভয় করবে এখন? হায়! নিজের ছবির দিকে বড় একটা তাকাতে পারি না। ভিড়ে কিংবা নির্জনতায় হঠাৎ হঠাৎ নিজেরই কাঁধের ওপর টোকা পড়ে। চমকে ফিরে দেখি কেউ না, কেউ নেই। আসলে আমিই আমাকে ডাকছি। শুধু মাঝেমধ্যে মাথা ঝাঁকিয়ে দেখছি যে আমি আসলে একটা স্বপ্ন দেখছি কিনা! আমি অপেক্ষা করছি এক চূড়ান্ত বোঝাপড়ার জন্য। সেই মুহূর্ত সমাসন্ন। 

হঠাৎ করেই চোখ তুলে সামনে তাকিয়ে দেখি একজন মানুষ। আমারই মতো কুঁজো হয়ে বসে। আমারই দিকে মুখ ঘুরিয়ে। কিন্তু তার মুখ ভালো বোঝা যায় না। মুখে কোনও রেখা নেই। তা আয়নার মতো ভোঁতা। ভ্যান গঘের আঁকা শস্যক্ষেত্রের ছবিগুলিতে দু’একজন মানুষের মুখ যেমন।  

‘কে তুমি?’ আমি জিজ্ঞেস করি মানুষমূর্তিকে।

‘আমি একজন লেখক।’ সে বলে। অবিকল আমারই মতো কণ্ঠস্বর তার।

‘তাহলে আমি কে?’

‘তুমি আমার স্বপ্ন। অবশ্য তোমাকে আমার ভাবনাও বলা চলে।‘ 

‘তাহলে যে আমি ভাবছিলাম আগামীকাল আমার সঙ্গে বোঝাপড়া হবে। আগামীকাল সমস্তটাই ছেড়ে দিতে হবে আমাকে?’

‘আমি তোমাকে এইরকম ভ্রান্তির মধ্যে ইচ্ছে করেই রেখেছিলাম। আসলে আমি আগাগোড়াই আমার ইচ্ছাধীন রেখেছি তোমাকে।‘

‘অথচ আমি তো জানতাম সব অধিকার না হারালে আমি অভীষ্টে পৌঁছতে পারব না কখনও! আর আগামীকাল সেটা ঘটবে!’

এ কথা শুনে হা-হা করে হাসতে লাগলেন লেখকবাবু। 

‘এ কী তন্ত্রমন্ত্র নাকি হে? দিনক্ষণ দেখে তবে হবে?’ তার কণ্ঠস্বরে ভারী কৌতুকের ছোঁয়া।

‘শোনো, সব ছেড়ে দেওয়া যায়, কিন্তু ভাবনার অধিকার ছাড়া যায় না। রোল রিভার্সাল বোঝো?’

আমি কী বলব! তখন আমার মাথায় হাজার ওয়াটের বাল্ব জ্বলে শাদা হয়ে উঠেছে যেন! আমি কিচ্ছুই বুঝতে পারছি না। অতএব, মৌন থাকাই শ্রেয় মনে করি।

‘তুমি বুঝতে পারোনি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথমদিকে আমি পিছু হঠছিলাম ঠিকই, এই যেমনটি তুমি এতক্ষণ এই গল্পে লিখেছ। কিন্তু হাল আমি কখনওই ছাড়িনি। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত সৈনিক সেজে থাকার মতো আমিও নিষ্ক্রিয়তার ভান করেছিলাম। তারপর তোমার প্রতিরক্ষা আলগা হতেই টুক করে রোল রিভার্সাল অর্থাৎ জায়গা বদল করে নিয়েছি। তুমি ধরতেই পারোনি। মনে আছে, অল্পবয়সে যখন বার্থ-এর ‘ডেথ অফ দ্য অথর’ প্রবন্ধটি পড়েছিলে, একেবারেই মন থেকে মানতে পারোনি? অর্থাৎ অধিকারবোধ আমার বরাবরই বেশি। তুমি ভাবলে কী করে যে লেখকবাবু কোনওদিন ভাবনার অধিকারও ছেড়ে দিতে পারে?’ 

আমার চোখের সামনে তখন হাজার হাজার আলোর পর্দা সরে সরে যাচ্ছে। শতসহস্র ছবি, তার কোনোটা চিনতে পারি, কোনোটাকে পারি না। যা যা বই পড়েছি তাদের এক একটা লাইন ভেসে আসে। যা যা দেখেছি শুনেছি সেসবই ভেসে বেড়ায়, অজস্ররকম গলা গমগম করে মনের ভেতরে। ওথেলোর মুখ থেকে মিথ্যে দোষারোপ শোনার পর ডেসডিমোনার শরীর-মন জুড়ে যেমন ভীষণ ভারী একটা ঘুম নেমে আসতে চেয়েছিল, তেমনই একটা ভারী কিছু ঝেঁপে আসতে চায় আমার অস্তিত্ব জুড়ে। আমি শেষবারের মতো সর্বশক্তি দিয়ে প্রশ্ন করি–

‘তাহলে আমি কে তুমি বল আমাকে?’

‘তুমি একটা স্বপ্ন যাকে আমি আমার মতো গড়েপিটে নিয়েছি। কিংবা তোমাকে একটা টেক্সটও বলা যেতে পারে। যাকে আমি গড়ে তুলছি, একইসঙ্গে পড়ছিও, কিন্তু যার ওপর অধিকার আমি হারাইনি কখনও’। 

 

আচ্ছা, পাঠক, আপনি বলুন তো, তাহলে এই গল্পটা কে লিখল আসলে?

 

 

ছবি-  শুভ্রনীল ঘোষ

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.