HeaderDesktopLD
HeaderMobile

আলোর ফুলকি

0

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

 

যদি ছোটোবেলার দিকে চোখকে অন্তর্মুখী করে ফেরত পাঠাই, কেমন ঘোর-লাগা মনে ভেবে নিতে ইচ্ছে হয়, আমি তো জন্মেই ঘটোৎকচ! ছোটোবেলার বর্ডার শুধু মুছে মুছে যায়। তবে কি আমার ইস্কুলজীবন, কিংবা তারও আগে, সরস্বতী ঠাকুরের সামনে শ্লেটে হাতেখড়ি-দেওয়া আমি, বই উল্টো করে ধরে পড়তে-বসা আমি, যাতে বইখানা তাড়াতাড়ি না ফুরিয়ে যায়- এই আমিগুলোকে ডিসওউন করছি। না, এই প্রশ্ন যখন রাখা হবে নিজের সামনে, অমনি সেই হারিয়ে-যাওয়া ছোট্ট উঠোন থেকে শিউলিফুলের গন্ধ, গাছের জন্য টিনভর্তি মাটি, পাতায় লাগা শুঁয়োপোকা, সবসমেত আছড়ে এসে পড়বে বুক অবধি স্মৃতিজলে। কাম-সেপ্টেম্বর বাজতে থাকবে মস্তিষ্কের কোষে। অতৃপ্তি বদলে যাবে তৃপ্তিতে।

হ্যাঁ, তখন কাম-সেপ্টেম্বর ছিল। আমাদেরও রেকর্ড প্লেয়ারে ঝমঝম করে বাজত ছুটির দিনে, দুর্গাপুজোমুখী দিনগুলোতে। আমি আঙুল গুনতাম (এখনও গুনি বটে, কিন্তু সেই শিহরণ আর জাগে না) ষষ্ঠী কবে! উঁহু, শুধু পুজোর দিনগুলো নয়, মহালয়ার ক’দিন বাকি,তাও গুনতাম। কেননা, দেব সাহিত্য কুটিরের ঢাউশ পুজোসংখ্যাটি সেদিনই আলমারি খুলে বের করে দেবেন আমার কড়া ধাতের মা জননী। আমি তো টের পেয়েছি, বই এসে গেছে আগেই। আমি ঘুরঘুর করব আলমারির কাছেপিঠে। গন্ধ শোঁকার চেষ্টা চালিয়ে যাব।

মহালয়ার ভোর, এখন কি আর ঢেউ তোলে আলাদাভাবে? কী জানি! কিন্তু, প্রায়-অন্ধকার ঊষাকালে আমাদের মারফি রেডিও চালানো হত। মা তো আগেই উঠে চায়ের জল চাপিয়ে দিয়েছেন, স্টোভ জ্বেলে। উনুন ধরাতে ঢের দেরি তখনও। চোখ বুজে মহালয়া শুনছি, চিনি নাড়ার টুংটাং ধ্বনি, চামচের, স্টোভ নেভানোর তেলচিটে গন্ধ, চায়ে চুমুক দেওয়ার আওয়াজ আর অস্ফুট কথাবার্তা সারা ঘরজুড়ে, কানে আসছে। ভাবছি, মানবেন্দ্র-র গলায় তব অচিন্ত্য বেজে ওঠার আগেই আবার ঘুমিয়ে পড়ব না তো!

দুর্গাপুজো, কেমন যেন ছাড়পত্র মেলার সময় ছিল! পড়াশোনা থেকে, একটু বেশিক্ষণ বড় উঠোনে খেলা করার নিষেধাজ্ঞা থেকে, বড়দের আড্ডায় উঁকিঝুঁকি মারলেও ওই ক’টা দিন মা লালচোখ দেখাবে না। ওরা তো দফায় দফায় দীর্ঘশ্বাস ফেলত, দাদুর বাড়ির দুর্গাপুজোর কথা ভেবে। আমিও চেতনায় আঁচড়-না-কাটা বয়সে সে পুজোয় থেকেছিলাম। কিছুই মনে নেই। কিন্তু বড় হয়ে, সে বাড়ির খাঁ-খাঁ চণ্ডীমণ্ডপে, একলা ঘুরতে ঘুরতে কল্পনার প্রতিমা ঠিক উৎসব গড়ে নিয়েছে!

যা বলছিলাম, তদ্দিনে, মানে মহালয়ার আগেই আমার জন্য পুজোর বাজার শেষ। সেও পুজোর চেয়ে কম আনন্দঘন পর্ব নয়। দুর্গাপুজোর প্রিল্যুড যেন! সেও উৎসব! শুধু বাহারি পোশাকই নয়, সম্বৎসরের ইজের আর টেপজামাও ওইসময় কেনা হত।

নিউমার্কেট যাচ্ছি। নাহোমের কেকের গন্ধ মাছি ওড়ার মতো উড়ে এসে বসছে আমার চোখে নাকে মুখে। একে একে কেনা হল হাকোবা নেটের জামা, সেবছর লুঙ্গিড্রেস উঠেছিল, তাও কেনা হল। তারপর যদি মার শাড়ি কেনার ব্যাপার থাকত, তাহলে তখন যাওয়া হবে লিন্ডসে স্ট্রিট।হ্যান্ডলুম হাউসে। বাজারে, নিজের জামা কেনাতেও এমনকি, যত না উৎসাহ ছিল, তার চেয়ে ঢের বেশি ছিল, রেস্তরাঁবিহারে। ঠিক জানি, কেনাকাটা মিটলেই আমরা বাদশা-য় রোল খেতে ঢুকব। নয়তো কারকো-তে ফিশফ্রাই খাব। ও হ্যাঁ, আরেকটা ক্ষেত্রেও আমার যারপরনাই আনন্দ। চুলের মধ্যে সিঁথি যেমন, অমনই সরু সরু রাস্তা নিউমার্কেট ঘিরে। তার কোনও একটায় সারি সারি খেলনার দোকান। আমি গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে আছি। নড়ব না সেখান থেকে। কিনে না দিলে নর্দমার জল খাব, আমার থ্রেটনিং ছিল ওই চরম পর্যায়ের।

তাহলে পুজোশপিং (তখন অবশ্য বাজার কিংবা বড়জোর মার্কেটিং বলতাম)-য়ের নিটফল কী দাঁড়াল? জামা, খেলনা, মুখরোচক খাওয়াদাওয়া। সবুজরঙের একটা কোল্ডড্রিংক (সফট ড্রিংকস বলাটা অনেক পরে শিখেছি), নাম ছিল জুসলা, সেও আমি পথে দাঁড়িয়ে, ভাদ্র-আশ্বিনের চড়া রোদ মাথায় নিয়ে খাবই খাব। প্রতিবারই দেখা যেত, যে ক’খানা জামা হয়েছে, টেনেটুনে নবমী পর্যন্ত। তবে, দশমীতে কী হবে? বাবাকে টেনে নিয়ে ঢুকতাম হাতিবাগান বাজারে। কোটা কমপ্লিট করার জামাটা কেনা হত। জুতো ছিল এই পুজোর বাজারের অপরিহার্য অঙ্গ।শখেরটি বাদেও, স্কুলের জুতোর অবস্থা যদি শোচনীয় হয়ে থাকে, তো সেটাও কেনা হয়ে যেত মা দুর্গার দৌলতে। মনে রাখতে হবে, সেই জমানায় বারোমাস ওঠ বলতে জিনিস কিনতে ছোটার হিড়িক ছিল না মোটে। শুধু পুজোর আগে মধ্যবিত্ত বাঙালি বোনাসের টাকা পকেটে পুরে বেড়িয়ে পড়ত খরচ করবে বলে। তা, জুতো পায়ে গলিয়ে বিছানায় হাঁটতাম, প্র্যাকটিস না করলে ফোস্কা পড়বে না! তারপর তুলো গুঁজে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এক মণ্ডপ থেকে আরেক মণ্ডপ, এসব ম্যান্ডেটরি বিধান তো আছেই!

তোরঙ্গ খুলে ন্যাপথলিনের গন্ধ ঝেড়েঝুড়ে আমার ছোটোবেলার পুজো বের করছি। একেকটা পিকচার পোস্টকার্ডের মতো মেলে ধরছি। ভাবছি, তখন সবটাই রংচঙে ছিল। লিনিয়ার ছিল। ভুষোকালি মেখে দিন আর রাতগুলো জিভ ভেংচাতে শুরু করে দেয়নি, তখনও।

সুরে ফিরি আবার। সুর বলতে, পুজোর গান। গায়ক গায়িকাদের বেসিক ডিস্ক। বড়দেরও কৌতূহল, কী গান রেকর্ড করলেন এবার, মান্না, শ্যামল, আরতি, প্রতিমা…? রেকর্ডগুলো কেনা হত পরে, আগে গানের বই, গায়ক গায়িকাদের ছবি আর গানের কথাসমেত। আজ বুঝি, খুব নীচুমানের প্রিন্ট সেসব চটিবইয়ের। কিন্তু তখন, উৎসবের সঙ্গে জড়িয়েমড়িয়ে ওসবই পুজোর রঙ্গ! মণ্ডপে ঠাকুর আসার আগের দিন থেকেই তারস্বরে গান বাজত মাইকে। ঘেঁষাঘেঁষি প্যান্ডেল, ফলে এ পাড়ার শ্যামল মিত্রের গান, আর ওপাড়ার সনৎ সিংহের গানে কাটাকুটি হয়ে যাবে, যাবেই। বাড়িতে সবাই বলত, উফ্,কান ঝালাপালা! আর, আমি ভেতরে ভেতরে, দুর্গাপুজোর স্বাদ চাখতে চাখতে আহ্লাদে আটখানা হতাম।

আমাদের ভোজন-রসিক বাড়িতে পুজোর ক’দিন খাওয়াটাও তো পর্ববিশেষ! পুরনো ডায়েরির পাতা মেলে লেখা হত মহাষষ্ঠী- ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার… এইভাবে দশমী পর্যন্ত। ছোটোরা আনন্দে লাফালে কী হবে, মা বৌদির প্রাণ ওষ্ঠাগত। দেবীপক্ষের আঁচ গিয়ে মিশত রান্নাঘরের আঁচে। এটা লিখতে লিখতেই সম্বিৎ ফিরল। তখনও ফেমিনিজমের বীজ পোঁতা হয়নি মনে, তাই দিব্যি পিতৃতন্ত্রের চোখ দিয়ে এইসব গৃহকর্মনিপুণা নারীদের, নির্বিকার, দেখতে দেখতে আমার দুর্গোৎসবের ফূর্তিতে এতটুকু কম পড়ত না কিন্তু!

পুজোপ্যান্ডেল কাছাকাছির মধ্যে যেগুলো, পায়ে হেঁটে, দূরের বাঁধাধরা যে ক’টা, গাড়ি চেপে। চকোবার আইসক্রিম খাওয়া আর গ্যাসবেলুন কেনা অবশ্যই হত। সারা পথ কষে ধরে রাখার পরও, কখন যে সে হাত ফসকে শূন্যে উড়ে যেত! চোখের জলে, বেদম নশ্বরতাবোধ পেড়ে ফেলত আমাকে।

দশমীতে, বন্ধুদের লালচেহলুদ পোস্টকার্ডে, বিজয়ার ভালোবাসা, ক’টা ঠাকুর দেখলাম, কবে কবে মাংস খেলাম, সেসব লেখা সাঙ্গ করব, আর ঠাকুর জলে পড়বেন।

দশমী পেরিয়ে হঠাৎ নির্জন হয়ে পড়তাম আমি। তখন সেই বিপজ্জনক হেমন্তকাল আসবে কিংবা এসে পড়েছে পাতলা কুয়াশার চাদরমুড়ি দিয়ে। খুব মনখারাপ করত আমার। সেটা কতটা যে সম্ভাব্য অ্যানুয়াল পরীক্ষার কথা ভেবে আর কতটা নিতান্তই বিমূর্ত কিছু একটা, আজ আর জোর দিয়ে বলতে পারি না।

 

ছবি- সৌজন্য চক্রবর্তী

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.