HeaderDesktopLD
HeaderMobile

জৌলুস নেই, জীবন আছে! অনাথ শিশুদের আঁকা ‘সহজিয়া’ ছবিতে সাজছে হাজরা পার্কের মণ্ডপ

0 51

একসময় দলিত তথা নিচুজাতের মানুষজনদের কলকাতায় আয়োজিত দুর্গাপুজোর মণ্ডপে প্রবেশাধিকার ছিল না। এই রীতির বিরোধিতা করে হাজরা পার্কে শারদোৎসবের সূচনা করেছিলেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। সেই পুজোয় কলকাতা পৌর নিগমের দলিত তথা নীচুজাতের কর্মী ও তাদের পরিবার পরিজনরা শারদোৎসবের আনন্দে অংশগ্রহণ করত। সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেই এখনও দক্ষিণ কলকাতার প্রাণকেন্দ্র হাজরা মোড়ের যতীন দাস পার্কে কলকাতা পৌর কর্মচারী সমিতির দুর্গোৎসব হয়।

কালের মন্দিরার ধ্বনিতে হাজরা পার্কের পুজোতেও এখন থিমের রমরমা। ৭৮তম বর্ষের সেই পুজোয় হাজরা পার্কের এবারের থিম—সহজিয়া। শিল্পী কৃষাণু পালের ভাবনায় গড়ে উঠছে পুজো প্রাঙ্গণ থেকে মাতৃমূর্তি।

এবছর কোভিড-১৯ সংক্রমণের সঙ্গেই আরও একটি বড় ধাক্কা সামাল দিতে হয়েছে পুজো উদ্যোক্তাদের। গতবছর শারদোৎসবের পরেই কলকাতা কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে পুজো কমিটিকে জানিয়ে দেওয়া হয়, কালীঘাট মন্দিরের কাছে স্কাইওয়াক নির্মাণের জন্য সেখানকার ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন দিতে হবে। তাই অস্থায়ী দোকানপাট গড়ে তোলা হবে হাজরা পার্কে। ফলে পুজোর জন্যও বিকল্প জায়গার বন্দোবস্ত করতে হবে।

বর্তমানে যতীন দাস পার্কটি তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথমটি যেখানে এখন জোরকদমে অস্থায়ী দোকানপাট নির্মাণের কাজ চলছে। এই অংশেই গত ৭৭ বছর পৌর কর্মচারী সমিতির পুজোটি হয়ে আসছিল। দ্বিতীয় অংশে রয়েছে বাগান। তৃতীয় ছোট্ট একটি অংশ রয়েছে আশুতোষ কলেজ লাগোয়া। কলকাতা পুরসভার অবস্থান জানার পরেই তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট, আশুতোষ কলেজ লাগোয়া ওই তৃতীয় জায়গায় পুজো করার বিষয়ে মনস্থির করেন উদ্যোক্তারা।

এমনিতেই পুজোর পরিসর ছোট হয়ে গিয়েছিল, এর পরে পুজো কমিটির কোমর আর্থিক ভাবে ভেঙে দেয় করোনা সংক্রমণ। খোঁজ শুরু হয় এমন একজন শিল্পীর, যিনি স্বল্প সামর্থে ফুটিয়ে তুলবেন কলকাতা পৌর কর্মচারীদের দুর্গোৎসব। সেই অন্বেষণেই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলাপ হয় শিল্পী কৃষাণু পালের। স্বল্প ব্যয়ে অভিনব কিছু আইডিয়ার সন্ধান করছিলেন পুজো কমিটির সহ-সম্পাদক সায়নদেব চট্টোপাধ্যায়।

এমন সময়েই নিজের ‘সহজিয়া’ থিম প্রস্তাব আকারে কৃষাণু তুলে ধরেন উদ্যোক্তাদের সামনে। তাঁর মানবিক  ভাবনা মন ছুঁয়ে যায় উদ্যোক্তাদের। ‘সহজিয়া’-তেই সিলমোহর দেন তাঁরা। সহ-সম্পাদক সায়নদেব চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, “এবার আমাদের পুজোর বাজেট ৭০ শতাংশ কমে গিয়েছে। মূলত মণ্ডপ নির্মাণের মহার্ঘ সামগ্রীর জন্যেই পুজোর বাজেট বেড়ে যায়। শিল্পী কৃষাণু আমাদের বলেছিলেন অনাথ শিশুদের হাতে আঁকা ছবি দিয়ে তিনি দুর্গামণ্ডপ সাজাতে চান। এমন কথা শুনে আর দ্বিতীয়বার কোনও কিছু ভাবিনি। এবছর আমাদের অর্থ ও পরিসর উভয়ই কমে গিয়েছে। কিন্তু এটুকু বলতে পারি আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস অনেক বড় বাজেটের শারদোৎসবকে আইডিয়ার নিরিখে পিছনে ফেলে দেবে।”

শিল্পী কৃষাণু পালের থেকেই জানা গেল, কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অধীনে থাকা এক হাজার অনাথ শিশুদের হাতে কাগজ ও রংপেন্সিল তুলে দিয়েছিলেন পুজো উদ্যোক্তারা। তাদের হাতে আঁকা সেই ছবি দিয়েই তৈরি হচ্ছে কৃশানু পালের ‘সহজিয়া’ থিম। তাঁর কথায়, “শিশুমন জটিল কিছু বোঝে না। সহজ মনে যা আসে, তাই ভাবে, তাই করে। তাঁদের সেই সহজ ভাবনাই প্রাণ পাবে আমার সহজিয়া-য়।” থিম সহজিয়ায় আবহ সঙ্গীত পরিবেশন করবেন সঙ্গীত শিল্পী শতদ্রু কবীর। আলোকসজ্জার দায়িত্বে আশিস সাহা।

অর্থাভাবে পুজোর জৌলুস কমলেও, নিজেদের ঐতিহ্য হারাতে নারাজ হাজরা পার্ক পুজো কমিটি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনও প্রতি বছর অষ্টমী ও নবমী তিথিতে দলিত পৌর কর্মচারীদের মধ্যে ভোগ বিতরণ করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।

(ছবি: স্নেহাশিস দাস)
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.