HeaderDesktopLD
HeaderMobile

কালীতীর্থ কলকাতার সাত বিখ্যাত কালীবাড়ি

0 38

দশমহাবিদ্যা-র প্রথম দেবী কালী। তিনিই শ্যামা তিনিই আদ্যাশক্তি। তন্ত্রগ্রন্থ ‘ব্রহ্মযামল’ থেকে জানা যায় মা কালীই বাংলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। কারণ বাঙালি হিন্দু সমাজে সারাবছর জুড়ে মা কালীর পুজো করা হয়। তবে মা কালীকে সারাভারতে কলকাতানিবাসিনী বা ‘কালী কলকাত্তাওয়ালি’ বলা হয়। কারণ কোলকাতা শহর জুড়ে বিরাজ করছেন মা কালী। কলকাতাতেই রয়েছে একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম পীঠ, মহাতীর্থ ‘কালীঘাট’। এছাড়াও কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় দেখা মিলবে বেশ কিছু বিখ্যাত কালীমন্দিরের। দীপান্বিতা কালীপূজার প্রাক্কালে জেনে নেব কলকাতার সাতটি বিখ্যাত কালীমন্দিরের কথা।

কালীঘাটের কালীমন্দির

ভারতের বিখ্যাততম কালীমন্দিরটি আছে কলকাতার কালীঘাটে। কিংবদন্তি অনুসারে এই স্থানে সতীর ডান পায়ের আঙুল পড়েছিল। তাই এটিকে জাগ্রত শক্তিপীঠ বলে অভিহিত করা হয়। কালীঘাটের মন্দিরে বিরাজ করছেন মা দক্ষিণাকালী। এই পীঠে মায়ের ভৈরব হলেন নকুলেশ্বর। জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, আত্মারাম ব্রহ্মচারী ও ব্রহ্মানন্দ গিরি নামে দু’জন সাধক, কষ্টিপাথরের একড়ি খণ্ডকে মা কালীর বিগ্রহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে প্রথম পূজাপাঠ শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার আদিগঙ্গার তীরে নব্বই ফুট উঁচু মন্দিরটি তৈরি করে দেন। প্রায় ৩০,০০০ টাকা ব্যয়ে, ৮ কাঠা জমির ওপর ৮ বছর ধরে গড়ে ওঠা বর্তমান মন্দিরটির বয়স দু’শো বছরেও বেশি। সমগ্র মন্দির প্রাঙ্গণটি ১ বিঘে ১১ কাঠা ৩ ছটাক জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কালীঘাটের মা কালীর জিভ, দাঁত, হাত, মুণ্ডমালা ও মুকুট সোনা দিয়ে তৈরি। মন্দিরে সুরক্ষিতভাবে রাখা আছে সতীর প্রস্তরীভূত অঙ্গ। কখনও সেটি জনসমক্ষে আনা হয় না। সারাবিশ্ব থেকে সারাবছর ধরেই কালীঘাটের মন্দিরে প্রচুর ভক্ত ও পু্ণ্যার্থীর সমাগম ঘটে। তবে দীপান্বিতা কালীপূজার দিনের জনসমাগম বছরের অন্যান্য দিনকে ছাপিয়ে যায়।

বউবাজারের ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি

প্রাচীনকালে এই স্থানে ছিল গঙ্গায় পতিত হওয়া একটি খাল। সেই খালটির ধারে ছিল এক শ্মশান। সেই শ্মশানের ভেতরে ছিল হোগলাপাতায় ছাওয়া এক শিবমন্দির। সেই শিবমন্দিরে নিয়মিত আসতেন পর্তুগিজ কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। তাঁরই আগ্রহে পরবর্তীকালে এই স্থানে গড়ে উঠেছিল ‘শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী কালীমাতা’ ঠাকুরানির মন্দির। শ্রীমন্ত পণ্ডিতকে পুরোহিতের দায়িত্ব দিয়েছিলেন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি। প্রত্যহ মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর উপাসনা করতে শুরু করেছিলেন ফিরিঙ্গি কবিয়াল। মায়ের বিগ্রহের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে মা’কে গান শোনাতেন। তাই পরবর্তীকালে এই কালীমন্দিরের নাম হয়ে যায় ‘ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি’। এই মন্দির প্রাঙ্গণে আছে একটি কাঠচাঁপা গাছ। সেই গাছের গোড়ায় মনোবাসনা পূরণের জন্য কাপড় বাঁধার রীতি আছে। মনোবাসনা পূরণ হলে সিদ্ধেশ্বরী মায়ের পুজো দিয়ে যান ভক্তেরা। প্রতিবছর দীপান্বিতা কালীপুজোর দিন মাকে বিশেষভাবে সাজিয়ে তোলা হয়। মা’কে উৎসর্গ করা হয় নিরামিষ ভোগ। মা কালী এখানে উগ্ররূপে দেখা দেন না, তিনি যেন এক শান্তস্বভাবা বাঙালি কন্যা।

সিমলার নিস্তারিণী কালীবাড়ি

স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতি বিজড়িত উত্তর কলকাতার সিমলা অঞ্চলে এই বিখ্যাত কালীমন্দিরটি অবস্থিত। এই অঞ্চলে একসময় বাস করতেন কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ নামে এক ধনী ব্যবসায়ী। তিনি মা কালীর পরম ভক্ত ছিলেন। প্রত্যহ দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীকে দর্শন করতে যেতেন। তাঁর মনোবাসনা ছিল দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর বিগ্রহের মতো একই গঠনশৈলীর বিগ্রহ তাঁর বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করবেন। সেই মতো বারাণসীর একজন সুদক্ষ শিল্পীকে দিয়ে বহু অর্থব্যয়ে তৈরি করিয়েছিলেন মা নিস্তারিণী কালীর বিগ্রহ। কিন্তু বিগ্রহটি কলকাতায় আনার পর নানা সমস্যায় কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ বিগ্রহটিকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তাই কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ তাঁর প্রতিবেশী ঈশ্বরচন্দ্র নানকে মা নিস্তারিণীর বিগ্রহটি দিয়েছিলেন, যথাবিহিত উপাচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য। বিগ্রহটি পাওয়ার পর ইশ্বরচন্দ্র নান এরপর সিমলা অঞ্চলে তৈরি করেছিলেন নবরত্ন মন্দির। ১৮৬৫ সালের রথযাত্রার দিনে সেই মন্দিরে সাড়ম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন মা নিস্তারিণী কালিকা। আজও ‘দি ঈশ্বরচন্দ্র নান দেবোত্তর ট্রাস্ট’-এর ব্যবস্থাপনায়, প্রতিবছর দীপান্বিতা কালীপুজোর দিন জাঁকজমক সহকারে মা নিস্তারিণী কালিকার পূজার্চনা হয়ে থাকে।

বিধান সরণির ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি

এই কালীমন্দিরটি নিয়ে অনেক কিংবদন্তি আছে। এই মন্দিরে মা কালী সিদ্ধেশ্বরী রূপে বিরাজমানা। লোকশ্রুতি থেকে জানা যায় এই অঞ্চলে আগে ঘন জঙ্গল ছিল। সেই জঙ্গলে ছিল ডাকাতদের ডেরা। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে কালীপুজো করার রেওয়াজ ছিল প্রাচীনকালে। তাই কোনও এক ডাকাতদল জঙ্গলের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিল দেবী কালীকে। কিন্তু ডাকাত দল পরবর্তীকালে অন্যত্র চলে গেলেও দেবীকে নিয়ে যেতে পারেনি। কারণ মায়ের বিগ্রহকে বেদি থেকে তুলতে পারেনি তারা। এর পর সিদ্ধেশ্বরী দেবী স্বস্থানেই বিরাজ করছিলেন। তাই পরবর্তীকালে গভীর জঙ্গলের মধ্যেই তৈরি করা হয় মা সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির। সেখানেই নবসজ্জায় প্রতিষ্ঠিত হন মা সিদ্ধেশ্বরী।

অন্য আর একটি কাহিনি থেকে জানা যায়, ১৭০৩ খ্রিষ্টাব্দে উদয়নারায়ণ ব্রহ্মচারী নামে এক তান্ত্রিক এই স্থানে মাটি দিয়ে সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের মূর্তি তৈরি করে পুজো শুরু করেন। প্রায় একশো বছর পরে শঙ্কর ঘোষ নামে এক ব্যবসায়ী বর্তমান মন্দিরটি বানিয়ে দেন এবং মায়ের নিত্যপূজার ব্যবস্থা করেন। তবে মন্দিরটি প্রাচীন হলেও সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের মূর্তিটি প্রাচীন নয়। কারণ এই মন্দিরে মায়ের স্থায়ী বিগ্রহ নেই। প্রতিবছর নতুন করে মায়ের মাটির মূর্তি বানিয়ে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করাই রীতি। সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের প্রিয় ফল ডাব। এই মন্দিরে এসে ডাব ও চিনি দিয়ে সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের পুজো দিয়ে গিয়েছেন স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ। মাকে গান শুনিয়ে গিয়েছেন সাধক রামপ্রসাদ। ঠনঠনিয়ার এই সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের মন্দিরে জ্যৈষ্ঠ মাসে ফলহারিণী, কার্তিক অমবস্যায় আদিকালী এবং মাঘ মাসে রটন্তী কালীর বিশেষ পূজার্চনা করা হয়। স্থানীয় মানুষ যেকোনও শুভকাজে যাওয়ার আগে সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের পুজো দিয়ে যান।

টালিগঞ্জের করুণাময়ী কালীবাড়ি

আদিগঙ্গার তীরে অবস্থিত এই প্রাচীন কালীমন্দিরটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি অশ্রুসজল কাহিনি। রাজা সাবর্ণ রায়ের পরিবারের ২৭ তম বংশধর ছিলেন নন্দদুলাল রায়চৌধুরী। তাঁর ছিল তিনপুত্র, তাই তিনি মা কালীর কাছে এক কন্যা সন্তান প্রার্থনা করেছিলেন। মায়ের করুণায় এক ফুটফুটে কন্যা সন্তান লাভ করেছিলেন নন্দদুলাল রায় চৌধুরী। কিন্তু নিয়তির বিধানে মাত্র সাত বছর বয়েসে শিশুকন্যাটির মৃত্যু হয়েছিল। ভেঙে পড়েছিলেন নন্দদুলাল রায়চৌধুরী। সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। গৃহত্যাগ করার আগে স্বপ্নে দেবী কালিকা কন্যা করুণার রূপ ধরে দেখা দিয়েছিল। সে পিতাকে বলেছিল গঙ্গার ঘাটে পড়ে আছে একখণ্ড কষ্টিপাথর। পিতা যেন কষ্টিপাথরটি বাড়িতে নিয়ে আসেন এবং কষ্টিপাথরটি দিয়ে দেবী কালিকার মূর্তি তৈরি করে নতুন এক মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। সেই দেবী কালিকার মূর্তির মধ্যেই বিরাজ করবে নন্দদুলাল রায় চৌধুরীর কন্যা করুণা।

 কন্যা ‘করুণা’র নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে মন্দির তৈরি করেন নন্দদুলাল রায়চৌধুরী। গঙ্গার তীরে পাওয়া কষ্টিপাথর দিয়ে দেবী কালিকা ও শিবের বিগ্রহ বানিয়ে মন্দিরের ভেতরে প্রতিষ্ঠা করেন। কষ্টিপাথর দিয়ে তৈরি বলে মন্দিরের ভোলানাথও তাই কৃষ্ণকায়। কন্যার নামানুসারে এই মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম হয় ‘মা করুণাময়ী’। এই মন্দিরে পঞ্চমুণ্ডির আসনের উপর বিরাজ করছেন ‘মা করুণাময়ী’। দেবী কালিকা এখানে রায়চৌধুরী বাড়ির ঘরের মেয়ে। তাই এই মন্দিরে দেবীকে সাত বছরের কন্যা রূপে পুজো করা হয়। কন্যা করুণা যা যা খেতে ভালবাসত, পুজোর সময় সে সবই নিবেদন করা হয় মা করুণাময়ীকে। দীপান্বিতা কালীপুজোর দিন দেবীরূপী করুণাকে স্মরণ করে অনুষ্ঠিত হয় কুমারীপুজো।

কুমোরটুলির সিদ্ধেশ্বরী কালী

উত্তর কলকাতার কুমোরটুলির কাছে মদন মোহনতলায় জাগ্রতা দেবী সিদ্ধেশ্বরী কালী মায়ের অবস্থান। এই কালীমন্দিরটি নিয়ে আছে অনেক জনশ্রুতি ও কিংবদন্তি। কোনটা সঠিক তা অনুমান করা দুষ্কর। কারণ এই স্থানে কালীপূজা হচ্ছে প্রায় চারশো বছর ধরে। সেরকমই একটি জনশ্রুতি থেকে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে এই স্থানটিতে ছিল গভীর জঙ্গল। সেই জঙ্গলে ছিল চিতে ডাকাতের ডেরা। যার নাম থেকে চিৎপুর নামের উৎপত্তি। চিতে ডাকাতের কথাতেই কালীবর নামে এক কাপালিক সেই জঙ্গলের মধ্যে কালী মায়ের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে এই মন্দিরে চিতেশ্বরী কালী মাতার পুজো দিয়ে যেত। জনশ্রুতি আছে, কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এই মন্দিরে নরবলি দেওয়া হত। ১৭৩৭ সালের প্রবল ঝড়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল চিতেশ্বরী কালীমাতার মন্দির। পরবর্তীকালে গোবিন্দরাম মিত্র মন্দিরটি পুনরায় বানিয়ে দেন। দেবী কালিকার পূজার্চনার দায়িত্ব নেন দুই ব্রাহ্মণ সন্তান, তারাচরণ ও শম্ভুচরণ। এরপর থেকে নাকি দেবী চিতেশ্বরীই হয়ে ওঠেন দেবী সিদ্ধেশ্বরী কালী। ভয়কে দূরে সরিয়ে কল্যাণময়ী মায়ের দরবারে আসতে শুরু করেন গৃহস্থেরা। এই মন্দিরে মৃন্ময়ী মূর্তিতে বিরাজ করছেন মা কালিকা। অম্বুবাচির দিন দেবী সিদ্ধেশ্বরীকে মহাস্নান করানো হলেও মায়ের অসীম লীলায় মাটির প্রতিমার সামান্যতম ক্ষতিও হয় না। জাগ্রতা মা সিদ্ধেশ্বরীর কাছে নিয়মিত আসতেন শ্রীরামকৃষ্ণ ও গিরিশ ঘোষ।

কলেজ স্ট্রিটের দয়াময়ী কালীবাড়ি

এই বিখ্যাত কালীমন্দিরটিতে প্রবেশ করার পর চোখে পড়বে একটি শ্বেতপাথরের ফলক। ফলকটিতে লেখা আছে শ্রীশ্রীদয়াময়ী / সন ১১৭৮ / শ্রীগুরুপ্রসাদ তরে হেরি দিগম্বরী। এই দয়াময়ী কালীমন্দিরটি ১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দের জগদ্ধাত্রী পূজার দিন গুরুপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখানে দেবী কালিকা দক্ষিণাকালী রূপে বিরাজমানা। কষ্টিপাথরের তৈরি দু’ফুট উচ্চতার দেবীমূর্তিটি বসানো আছে কাঠের সুদৃশ্য সিংহাসনে। ‘ঠাকুর দালান’ রীতির স্থাপত্যে গড়ে ওঠা এই মন্দির রোজই প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়। তবে দীপান্বিতা কালীপুজোর সময় মন্দিরপ্রাঙ্গণে দেখা যায় জনপ্লাবন। এই মন্দিরে দেবী দয়াময়ী দক্ষিণাকালী পূজা শাক্তমতে হলেও মায়ের পূজায় বলি দেওয়ার প্রথা নেই। কারণ মা কালিকা এখানে দয়াস্বরূপা ও সর্ববিঘ্ননাশিনী। তিনি প্রাণ হন্তারক নন, তিনি প্রাণদাত্রী।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.