HeaderDesktopLD
HeaderMobile

পুজোয় নতুন চমক, কী আনছে ‘শর্বরী’! কেমন হতে চলেছে এই বছর ছেলেদের ট্রাডিশনাল ফেস্টিভ কালেকশন

0

ভারতীয় ট্র্যাডিশনাল মেন্সওয়্যার ডিজাইনার পোশাকের পাইয়োনিয়র ব্র্যান্ড ‘শর্বরী’। বর্তমানে এই ব্র্যান্ডের কর্ণধার অমলিন দত্ত এবং কনকলতা দত্ত। ইন্ডিয়ান ট্রাডিশনাল ডিজাইনে এবছর পুরুষদের ফেস্টিভ কালেকশন কেমন হতে চলেছে, কোন রং, কেমন কাট পূজোয় ইন-ফ্যাশন, সেসব নিয়েই এবার এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দিলেন শর্বরীপুত্র অমলিন দত্ত। তাঁর সঙ্গে আড্ডায় চৈতালি দত্ত

আপনি তো বিখ্যাত বাবা-মায়ের সন্তান। ফ্যাশন ডিজাইনার শর্বরী দত্ত আর ভাস্কর আলো দত্ত দুজনেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তাঁদের ছত্রচ্ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজের স্টাইল কিভাবে তৈরি করলেন?
অমলিন-
আমার বাবা স্বনামধন্য ভাস্কর হলেও তিনি পটারি, মিউরাল, শাড়ি প্রিন্ট, ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের আর্টিস্টিক ফিল্ডে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছেন। আমার বাবা শাড়িতে ব্লক প্রিন্ট নিয়ে অসামান্য কাজ করে গেছেন। বাবা তাঁর সময় যে ধরনের কাজ করে গেছেন তাকে নিঃসন্দেহে ট্রেন্ড সেটিং বলা যেতে পারে। সেই সময় বাবাকে নিয়ে সমাজের উঁচুতলার মানুষদের মধ্যে রীতিমতো মাতামাতি হত। আমাদের পরিবার খুবই ইন্টেলেকচ্যুয়াল। বাবা খুব পড়াশোনা করতেন। বাবা, মা দুজনে মিলে পটারি নিয়ে চমৎকার কাজ করেছেন। এক শিল্প পরিমণ্ডলে আমার বেড়ে ওঠা। বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের ক্রাফটসম্যানদের ছিল আনাগোনা। তাঁদের কাজ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। ফলে নানা জায়গা থেকে রকমারি ক্রাফটস আমি অ্যাডপ্ট করেছি। আমার তখন বয়স আট দশ বছর হবে। তখন থেকেই বাবা-মা আর কারিগরদের সঙ্গে সর্বক্ষণ থাকতাম। কখন যে টেকনিক্যাল দিকটা করায়ত্ত করে ফেলেছিলাম তা আমার জানা নেই। আমার মা শর্বরী দত্ত প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত হাউসওয়াইফ ছিলেন। আমার বিয়ের পর শর্বরী ব্র্যান্ড লঞ্চ করা হয়। তখন আমার বয়স ২৪, মায়ের বয়স ৪৮। ১৯৯১ তে শর্বরী ব্র্যান্ড লঞ্চ করি। সেই সময় এই ব্র্যান্ডের প্রোপ্রাইটারশিপ ছিল শুধু কনকলতা দত্তের। এই ব্র্যান্ডে আমি আর মা মাসিক বেতনে তখন চাকরি করতাম। প্রথমদিকে সেলস এবং মার্কেটিং সামলাতেন আমার স্ত্রী কনকলতা। আমার মা ছিলেন এই ব্র্যান্ডের ফেস। ২০০৮ সালে এই ব্র্যান্ড পার্টনারশিপে হয় ৫০% কনকলতার, ২৫% মার, আমার ২৫%। তবে এই ব্র্যান্ডের শুরুর থেকেই প্রথম ১০ বছর মা খুব খেটেছেন। আর প্রোডাকশনের প্রথম দিন থেকেই আমি সম্পূর্ণ ফ্যাক্টরি হোল্ড করতাম। ম্যানুফ্যাকচারিং দিকটাও আমি প্রথম থেকে কন্ট্রোল করে আসছি। আমার ইন্টারন্যাশনাল আর্ট এক্সপোজার আছে। কোথাও কিছু দেখে সেটাকে ইম্প্রোভাইজ করতে সব থেকে বেশি আমি আনন্দ পাই। আমার জোরের জায়গা হল টেকনিক্যাল জ্ঞান। ক্রমশ হাতেকলমে কাজ করতে গিয়ে তার ক্রমোন্নতি ঘটেছে।ছেলেবেলা থেকেই কী শিল্প সৃষ্টিতে আগ্রহ ছিল?
অমলিন
আসলে ছেলেবেলা থেকে খেলাধুলা আমাকে খুবই আকর্ষণ করত। ফুটবল খেলতে খুব ভালবাসতাম। সেটাতে ফোকাস ছিলাম। আমার পড়াশোনা করতে একদম ভালো লাগত না। শিল্প পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা মানুষ হিসেবে কোথাও বোধহয় ক্রাফটস ব্যাপারটা আমার ভেতরে ছিল। পরবর্তী সময় ডিজাইনিংকে পেশা করলাম। আমি নিত্যনতুন রকমারি জিনিস তৈরি করতে পারি। শর্বরী ব্র্যান্ডের কাজ করতে করতে ৭-৮ বছরের মধ্যে কখন যে নিজের অজান্তে ক্রাফটসম্যান হয়ে উঠলাম সত্যি তা জানা নেই।
অন্যান্য ডিজাইনার যাঁরা পুরুষদের পোশাক তৈরি করেন সেক্ষেত্রে আপনাদের কালেকশন কতটা স্বতন্ত্র?
অমলিন-
প্রথমেই বলে রাখি ভারতে পুরুষের ডিজাইনার মেনসলাইন কালেকশনে আমরাই পাইয়োনিয়র। সেটা আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি। বাজারে আমাদের গুডউইল আছে। আমাদের ব্র্যান্ডের খুব স্ট্রং রেপুটেশন আছে। আমরা খুব কম কাজ করলেও পার্সোনাল ওরিয়েন্টেড এবং লিমিটেড কালেকশন করি। যেটুকু করি মন দিয়ে করার চেষ্টা করি। কমার্শিয়াল ব্যাপারটা আমরা আজও সেকেন্ডারি রেখেছি। বছরে ৫০০ থেকে ৭০০ পিস পোশাক তৈরি করি। প্রতিটি পিস অথেন্টিক। আমাদের পোশাকই বিজ্ঞাপনের কাজ করে। এর জন্য আলাদা করে বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন পড়ে না। যখন আমাদের কালেকশন পরে ক্রেতারা কোনও অনুষ্ঠানে যান সেখান থেকে আরও দশটা ক্রেতা আমাদের কাছে আসেন। যা এত বছর ধরে লক্ষ্য করে আসছি। আমরা ইন্টারেস্টিং ডিজাইন, ক্রাফট ব্যবহার করি। খুব কমপ্লিকেটেড করে তৈরি করি বলে কপি করা হয় না। তাই আমাদের কাজ সবসময় ইউনিক থেকে যায়। বলতে দ্বিধা নেই যে আমাদের স্টাইল গোটা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি অ্যাডাপ্ট করেছে।মা শর্বরী দত্ত আপনাকে ডিজাইনার হতে কতটা উদ্বুদ্ধ করেছেন?
অমলিন- মা আমার প্রতি খুবই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। মা আমাকে ইনিশিয়ালি কোনও ভাল কিছুর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করাতেন। ওঁর তুলনায় আমার নতুন যুগের চোখ ছিল। বইয়ের পাতা থেকে শুরু করে ল্যান্ডস্কেপিং, ইলাস্ট্রেশন, বিজ্ঞাপন, স্কেচ যখনই কিছু নতুনত্ব দেখতেন আমাকে বলতেন। বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ডক্টর রনেন আয়ন দত্তের মর্ডানাইজেশন প্রেজেন্টেশন মাকে খুব মুগ্ধ করত। সত্তর দশকে আমি খুব ছোটো ছিলাম। সেই সময়ে মর্ডান কনসেপ্টে ট্রেড ফেয়ারে কোল ইন্ডিয়ার প্যাভিলিয়ন ডক্টর রণেন আয়ন দত্ত করেছিলেন যা আমি মার কাছ থেকেই জেনেছি। খুব ছোট্ট বয়স থেকে এইভাবে মা আমাকে ইনপুট দিতেন। কোনও জায়গায় নতুন কিছু দেখলে নিখুঁতভাবে সেটা বিবরণ দিতেন।
শর্বরী দত্ত এবং আপনি যখন একসঙ্গে কাজ করতেন সেই সময় কাজের ধরন ঠিক কী রকমের ছিল?
অমলিন- আমার মা শর্বরী দত্ত খুব ভালো পেনসিল দিয়ে ডিজাইন করতে পারতেন। যা ছিল উচ্চমার্গের। ফর্ম্যালি কিন্তু কোনওদিনই মা আঁকা শেখেননি। তাই টেকনিক্যালি অনেক অসুবিধা হত। কিন্তু ওঁর আর্ট অফ সেন্স ছিল মারাত্মক। যেকোনও জিনিস এক ঝলকে দেখে মনের ক্যানভাসে মা সযত্নে রেখে দিতে পারতেন। কোন ডিজাইন কোথায় ব্যবহার করলে খুব যুৎসই হবে সেই সেন্স ওঁর খুব ভাল ছিল। ইনিশিয়ালি উনি প্রথম দশ বছর খুব ভালোভাবে ডিজাইন করেছেন। আমি প্রথম থেকেই নানা রকমের লে-আউট বের করে সামলাতাম। মা ওয়ার্ল্ড ডিজাইন অ্যাডপ্ট করতেন। সেটাকে আমাদের মতো উপযোগী করে ডিজাইন করতাম। ওয়ার্ল্ড ডিজাইন থেকে ইনফ্লুয়েন্সড হলেও ক্রাফটস এবং কালার টোন নিজেদের মতো করে আমরা ব্যবহার করেছি, যা আজও অব্যাহত। শুধু তাই নয়, কোথায় কিভাবে কতটা ব্যবহার করব সবসময় আমাদের মধ্যে সেই বিষয়ে বিস্তর আলোচনা চলত। আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটা ডিজাইন নিয়ে আলোচনা করতাম। মা ছিলেন খুবই ট্যালেন্টেড। তবে যখন থেকে কম্পিউটারের যুগ এসে গেল, তখন থেকে মায়ের আলাদা করে ডিজাইনের দরকার হচ্ছিল না। কারণ তখন কম্পিউটারে আমরা ডিজাইন বের করে নিতে পারতাম।

এ বছরে পুরুষদের জন্য কী ধরনের ফেস্টিভ কালেকশন এনেছেন?
অমলিন- ত্রিশ বছর ধরে ৩৬৫ দিন আমরা ছেলেদের জন্য পোশাক প্রডিউস করি। তাই পুজো বলে আমাদের কিছু আলাদা হয় না। যেহেতু আমাদের পোশাক গ্লোবালি মানুষ কেনেন, তাই সারা বছর আমাদের কাজ করতে হয়। আমাদের ত্রিশ বছরের ক্লায়েন্ট ব্যাংক আছে। যাঁরা আমাদের পোশাক ছাড়া ভাবতেই পারেন না। যেহেতু ফেস্টিভ কালেকশন, তাই পোশাকে ব্রাইট কালারের ব্যবহার করা হয়েছে। শুধু তাই নয় অনেক কিছু চিন্তা-ভাবনা করে নতুন কালেকশন আমাদের করতে হয়। পুজো ছাড়াও দীপাবলি, ওয়েডিং সব মিলিয়ে ফেস্টিভ কালেকশন আমরা করে থাকি। বেশিরভাগ পোশাকের রং রেড, ইয়েলো, গ্রিন, ব্ল্যাক ইত্যাদি। সেই সঙ্গে জরিওয়ার্ক, থ্রেডওয়ার্ক ইত্যাদি ছাড়াও বেশ কিছু এমব্রয়ডারি রয়েছে যা আমাদের একেবারেই নিজস্ব। ফ্যাব্রিকের মধ্যে ভেলভেট, সিল্ক, র-সিল্ক, শাটিন, হাইগ্লাস কটন ইত্যাদি ব্যবহার করেছি। যাতে পোশাকে ফেস্টিভ মুড থাকে।

পুরুষের পোশাকে কী ধরনের অ্যাটেয়ার আছে?
অমলিন- কুর্তা, জ্যাকেট, আজকান, আঙরাখা, ঢোলা পায়জামা, ধোতি, উত্তরীয়, চাদর ইত্যাদি।
আপনাদের এমব্রয়ডারি স্পেশালিটি কী ?
অমলিন- আমি সব ধরনের স্টিচিং করি। যেমন আড়ি, কাঁথা, কাশ্মীরি ইত্যাদি। কিন্তু এই স্টিচিংকে আমি নানাভাবে ইম্প্রোভাইজ করি। অনেক এমব্রয়ডারিকে নিজেদের মতো করে বানিয়েছি। সত্যি সেগুলোর কোনও নাম নেই। আমরাই ক্রিয়েটর। আমাদের ব্র্যান্ডের পজিটিভ ফিল আছে। ফলে যে কোনও ট্রাডিশনাল অনুষ্ঠানে আমাদের ব্র্যান্ডের কথা মানুষের একবার হলেও মনে পড়ে। অথচ প্রথম ১০ বছর আমাদের কাজ কেউ বুঝতেই পারেননি। সাজগোজ যে শুধুমাত্র মেয়েদের একচ্ছত্র আধিপত্য নয়, পুরুষেরাও যে সাজগোজ করতে পারেন সমাজকে সেটা বোঝানো সেই সময় বড্ড কঠিন ছিল। ভারতীয় ট্র্যাডিশনে পুরুষের জন্য অসামান্য সুন্দর অ্যাটেয়ার আছে যা সমকালীন করে আমরা উপস্থাপনা এবং এস্টাবলিশ করার চেষ্টা করছি তা মানুষকে বোঝাতেই আমাদের তিন-চার বছর সময় লেগে গেছিল। ১৯৯১ সালে প্রথম যখন ‘শর্বরী’ ব্র্যান্ড লঞ্চ করে, সেই সময় কোনও মিডিয়া আমাদের পাত্তা দেয়নি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমাদের সুন্দর লাইন দেখে আজ অব্দি মিডিয়া আমাদের প্রচণ্ড সম্মান করেন। ‘শর্বরী’ ব্র্যান্ড আজও অন্য যেকোনও ব্র্যান্ডকে চ্যালেঞ্জে ফেলে দিতে পারে।

আপনাদের পুরুষের পোশাকের রেঞ্জ কী?
অমলিন- ১২ হাজার টাকা থেকে শুরু। এবারে পোশাকের কাজের ওপর দাম নির্ভর করে। কয়েক লক্ষ টাকা দামেরও পোশাক আছে।

২০১৪ তে আপনি তো মেয়েদের জন্য আলাদা লাইন লঞ্চ করেছিলেন- মেয়েদের জন্য কিছু কালেকশন কি তৈরি করেছেন?
অমলিন- কোভিড আবহে গত দু’বছর ব্যবসা অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোভিডের কারণে মেয়েদের জন্য আমরা আলাদা কিছুই পোশাক তৈরি করিনি। তার আগে মেয়েদের জন্য যেটুকু কাজ করেছি তখনই বিক্রি হয়ে গেছে। তবে দীপাবলির পর থেকে আবার মেয়েদের কালেকশন রেগুলারলি তৈরি করা শুরু করব।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.