HeaderDesktopLD
HeaderMobile

এবার পুজোয় চেখে দেখুন মাখনার নানা পদ

0

সাবিনা ইয়াসমিন রিংকু

‘আসি আসি’ বা ‘আসছে আসছে’ এই ব্যাপারটা আসার থেকে বেশি ভালো। কারও আসার আশায় পথ চেয়ে থাকা সবচেয়ে মধুর। এই যে পুজো আসার আগে প্রকৃতিতে একটা সুন্দর আবহ রচিত হয় এটা পুজোর প্রাক্কালে সবচেয়ে মধুরতম একটা পর্যায়। ঝকঝকে নীল মসৃণ আকাশে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ আনমনে ভেসে যেতে যেতে এক একটা অবয়ব রচনা ক’রে তোলে। হাতি, বিড়াল, বটবৃক্ষ, হেলে যাওয়া বাড়ির ছবি আঁকতে আঁকতে সে একদিন এঁকে ফ্যালে দেবীর মুকুট। কী স্পষ্ট! মেঘের সূক্ষ্ম মিনাকারি কাজে মুকুটের প্রতিটা খাঁজ ভীষণভাবে উজ্জ্বল। আমরা বুঝতে পারি তিনি আসছেন। দেশের বাড়ির উঠোন জুড়ে শিউলি আলপনা আঁকতে শুরু করে দেয়। শহরের ৬০০ স্কোয়ার ফুট ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতেও শিউলি ফোটার তোড়জোড় দেখে বোঝা যায় এসেছে শরৎ। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে শহরে গাছের আগায় হিমের দেখা না পাওয়া গেলেও গ্রামের দিকে শিশিরের চুম্বনে নদীনালায় শাপলা এবং পদ্ম ফুটে ওঠে। দেবীর আগমনের পটভূমিকা তৈরি করে প্রকৃতি। নদীর চরে জেগে ওঠে কাশবন। ” এক ধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।” মানুষের মধ্যেও পুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়। পুজো উপলক্ষ্যে বাড়িতে নতুন রঙের পোঁচ পড়ে। খাটের তলা আর আলমারির পেছন থেকে ঝুলগুলো টেনে নেন গৃহকর্ত্রী। সাহায্যকারিণী জবার মাকেও তো ঘর ঝাড়পোঁছ করতে হয়! হোক না টালির ঘর! পুজো আসার আনন্দে সুভাষগ্রামের বাসিন্দা জবার মা স্টেশন বাজারে ‘শ্রীময়ী’ সিরিয়ালের মতোন ‘বেলাউজ’ বানাতে দেয়। বাবুদের বাড়ি থেকে পুজোর বোনাস হিসেবে নগদ টাকা পাবে। বারুইপুরের ‘শ্যামসুন্দর’ থেকে ঝালর লাগানো ‘হ্যানলুম’-এর শাড়ি কিনবে। লাল পাড়। অনেকদিনের শখ। বড় ছেলে দিল্লির করোলবাগে সোনার দোকানে কাজ করে। সেবার তো করোনার জন্য আটকে গেল! অনেক কষ্টে বাড়ি এল। এবছর ষষ্ঠীর দিন আসবে। এই যে পরাণের বাপধন বাড়ি আসবে… এই পথ চাওয়াটুকুনিই সকল খুশির মূল। এলেই তো আবার ব্যাগ গুছিয়ে ফিরে যাওয়ার পালা।

বসিরহাটের জরিনা বিবি জানে এই কটা দিন হিঁদুদের সব চাইতে বড় পরব, ঠিক মোসলমানদের ঈদ এর মতোন। জেলেপাড়ায়, বামুনপাড়ায় দুগ্গা ঠাকুর ‘উঠবে’, মেলা বসবে, ইস্কুল মাঠে বনবন করে নাগরদোলা ঘুরবে। মাকড়সা-মেয়ে মাটির মধ্যে গলা ডুবিয়ে বসে থাকবে। দশ টাকার টিকিট। গোটা মাঠ আলোর রোশনাইয়ে ভেসে যাবে। সে আলোর ছটা রাসুদের কলাবাগানে ঢুকে কলাপাতায় পিছলে যাবে। জরিনা বিবি গাছ থেকে ঝুনো নারকেল পেড়ে চিনিতে পাক দিয়ে সাদা সাদা নাড়ু বানায়। একটু ছোট সাইজের। নাড়ুর ওপরে সাদা তিলের মুচমুচে পরত। মেলার একপাশে একটা চ‍্যাঙারিতে করে নিয়ে বসলে ছেলেপুলের দল কিনে খায়। চারটে নাড়ু দশ টাকা। এবারে ওই টাকায় দিতে পারবে কী না কে জানে! বুদ্ধিটা স্বামীই দিয়েছিল। স্বামী পুজোর সময়ে কলকাতা গিয়ে মণ্ডপ বাঁধার কাজ করে। ওখানে নাকি কোনও কোনও মণ্ডপের সামনে শহরের সুন্দর সুন্দর মেয়ে-বৌরা হাতে বানানো খাবারের ‘ইস্টল’ দেয়!
“জরিনা,তোর হাতের রান্নার কী সোয়াদ! পুজোর সুমায় বাদামের চাকতি, নারকোল নাড়ু বানিয়ে বামনপাড়ার মেলায় যেয়ে বসতে পারিস না! দুটো পয়সা পেতি।”
উত্তরে জরিনা বলেছিল “আমার হাতের বানানো নাড়ু উয়ারা খাবে?”
খাবে মানে মুখুজ্যে বাড়ির মেজকর্তা… যেমন ফর্সা তেমন সোন্দর চেহারা, তেমনি তার ব্যাভার! নিজে যেচে চেয়ে জরিনার হাতের নাড়ু খেল। প্রশংসাও করল কত! তারপর থেকে জরিনারও অপেক্ষা থাকে… কবে আসবে পুজো! আসুক… জরিনা চায় অনেকদিন ধরে পুজো আসুক। এলেই তো শেষ!

ফেসবুকে জন্মানো প্রেম পুজোর সময়ে হাতে হাত রাখার সুযোগ পায়। নর্থের ছেলে, সাউথের মেয়ে আলাদা আলাদা ট্রেনে এসে শেয়ালদায় নামে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে মহম্মদ আলি পার্ক, কলেজ স্কোয়্যার। গায়ে গা ঠেকে যায়। মেয়েটির পরনের শখের শাড়ির আঁচলে কপালের ঘাম মোছে ছেলেটি। আহিরিটোলায় পৌঁছে মণ্ডপের সামনে ছেলেটি বলেই ফ্যালে … “ভালোবাসি। দেখো, একদিন আমরা একসঙ্গে থাকব।”
পৃথিবীর সবাই খারাপ মানুষ হয় না। ফেরার পথে একটা এগরোল ভাগ করে খেতে খেতে হাঁটে তারা। মেয়েটি ভাবে, ইস্ দিনটা বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল! দেখা হওয়ার আগের তীব্র টানটুকুই তো বেশি ভালো ছিল! এলেই তো যেতে দিতে হয়! তাই মেয়েটিরও এই আসি আসি, আসছে আসছে ব্যাপারটি বেশি পছন্দ।
আসি আসি করে চলেই এল পুজো। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। কর্মক্ষেত্র থেকে কদিনের জন্য বাড়ি ফেরার আনন্দেও লাগে উৎসবের ছোঁয়া। সাজগোজ, আড্ডা, ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়া, করোনাবিধি পালন করে ঠাকুর দেখা… সব চলবে। মাঝে মাঝে পুরোনো স্মৃতি, পুরোনো সুর ফিরে আসবে… ‘চোখে চোখে কথা বল,মুখে কিছু বলো না’- অথবা ‘আমার পূজার ফুল ভালোবাসা হয়ে গেছে,তুমি যেন ভুল বুঝো না…’ এই কটা দিন যেন সবরকম ভুল বোঝাবুঝি থেকে আমরা বিরত থাকি। করোনা এসে কঠোরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে জীবন বড্ড ক্ষণস্থায়ী। তাই মুহূর্তের আনন্দগুলোকে চুমুক দিয়ে পান না করতে পারলে আমাদেরই ক্ষতি!

এবার একটু পেটপুজোর কথায় আসি। পুজোয় একঘেয়ে খাবারদাবারগুলো একটু অন্যভাবে খেয়ে দেখলে কেমন হয়! মাখনার নাম শুনেছেন? একটু স্ট্যান্ডার্ড মুদিখানায় পেয়ে যাবেন। পেস্তা, আমন্ড, খুর্মার বয়ামের পাশেই অন্য একটা কাচের বয়ামে রাখা থাকে মাখনা।
মাখনের সঙ্গে মাখনার কোনও মাখামাখি সম্বন্ধ নেই।
বলিউডে লাল্টুস টাইপের নায়কদের সামনে নেচে নেচে নায়িকা যখন লিপ দেন ‘ওয়ে মাখনা’ কিম্বা ‘মাখনা রে মাখনা মেরা দিল চুরাকে লে যা’… সে মাখনার সঙ্গে মুদিখানার বয়ামে থাকা মাখনার আকাশ পাতাল পার্থক্য।
নদীনালায় পদ্ম শাপলার গা ঘেঁষে আরেকটি জলজ উদ্ভিদ বেড়ে ওঠে। পদ্মফুলের মতোই পাতা, কিন্তু পাতাগুলো পদ্মের পাতার মতো তেল চুকচুকে নয়, কাঁটা কাঁটা। ফুলের মৃণালেও কাঁটা থাকে। এমনকী বীজেও। এই কাঁটার বৈশিষ্ট্যই একে পদ্ম আর শালুকের থেকে আলাদা করেছে।এই জলজ উদ্ভিদটির নাম কাঁটাপদ্ম। এর বীজের ভেতরে ছোলার মতোন একটা দানা থাকে। কাঁচা খেতে মিষ্টি মিষ্টি। আর ওই বীজটাকে শুকিয়ে বালিতে ভাজলে খই হয়। ফুলের বীজ থেকে খই… ব্যাপারটাই দারুণ তাই না? ওই খইগুলোকেই মাখনা বলে।সাদা ফুলের মতো দেখতে মাখনা দিয়ে দুর্দান্ত সব পদ রান্না করা যায়। দামও খুব চড়া। ১০০০ টাকা কেজি। তাতে রাঁধুনির কোনও সমস্যা নেই। কারণ মাখনা শরতের তুলো-মেঘের মতোই হালকা। মাত্র ৫০ টাকাতে প্রচুর মাখনা পাবেন।
এই পুজোতে মাখনা দিয়ে রেঁধে ফেলুন মাংস আর পায়েস।

চিকেন মাখনা

উপকরণ: একবাটি মাখনা, চিকেন, ঝিরি ঝিরি করে কাটা পেঁয়াজ অনেকটা, টক দই, আদা রসুন বাটা, ধনে জিরে বাটা, নুন, হলুদ, লংকার গুঁড়ো, গোলমরিচ গুঁড়ো, এক টুকরো জয়িত্রি, ১ টা বড় এলাচ, ৩টে ছোট এলাচ, ৩টে লবঙ্গ, ১টা দারচিনির কাঠি, ১ টা তেজপাতা। কাঁচা লংকা, পরিমাণ মতো তেল, ১ চা চামচ ঘি।প্রণালী: কড়াইতে তেল গরম করে ঝিরি ঝিরি করে কাটা পেঁয়াজগুলো সোনালি করে ভেজে তুলে রাখুন। এবার ওই তেলেই আদা রসুনবাটা ,টক দই আর গুঁড়ো মশলা দিয়ে চিকেন কষিয়ে নিন। ভাজা পেঁয়াজ দিন। আরও একটু কষিয়ে দু কাপ গরম জল দিয়ে নিজের পছন্দ অনুযায়ী গ্রেভি করে নিন। নুন দিন। এবারে অন্য একটা কড়াইতে ঘি গরম করে মাখনা, যাবতীয় গরমমশলা, তেজপাতা ফ্রাই করে নিয়ে মাংসে ঢেলে দিন । কড়াই ঢেকে কিছুক্ষণ রেখে দিন। মাখো মাখো হলে কাঁচা লংকা ছড়িয়ে গ্যাস অফ করে দিন।

মাখনার পায়েস

উপকরণ: দুধ ১ লিটার, ২ টেবিল চামচ গুঁড়ো দুধ, চিনি, মাখনা এক কাপ, ছোট এলাচ ২ টো, ১ চিমটে জাফরান, ঘি ১ চা চামচ।

প্রণালী:  ১ লিটার দুধ ভালো করে জ্বাল দিন। জ্বাল দেওয়ার সময় এলাচ দুটো দিয়ে দিন। পরে এলাচ দুটো তুলে ফেলে দেবেন। অল্প উষ্ণ দুধ কাপে ঢেলে ওর সঙ্গে গুঁড়ো দুধ মিশিয়ে দুধের পাত্রে ঢেলে দিন। ওদিকে আরেকটি প্যানে এক চা চামচ ঘি গরম করে মাখনাগুলো হালকা ভেজে নিন। ভাজার পরে দেখবেন মাখনাগুলো ভীষণ ক্রিসপি হয়ে যাবে। লোভে পড়ে সব কটা খেয়ে নেবেন না যেন! এবার কয়েকটা মাখনা আস্ত রেখে বাকিগুলো হাত দিয়ে গুঁড়িয়ে নিন। গুঁড়ো আর গোটা মাখনা গাঢ় দুধে দিয়ে দিয়ে নাড়ুন। মাখনা নরম হলে দুধে চিনি মেশান। নাড়ুন। নেড়েই চলুন। থকথকে হলে জাফরান ছড়িয়ে গ্যাস অফ করে দিন।ব্যস,পায়েস রেডি।সবাই আনন্দ সহকারে পুজোর দিনগুলো কাটান। ভালো থাকুন। সুস্থ থাকুন। অনেক ভালোবাসা রইলো আপনাদের জন্য।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.