HeaderDesktopLD
HeaderMobile

পেঁচা কেন মা লক্ষ্মীর বাহন? কী কাহিনি শোনায় উত্তরভারতের এই লোকগাথা

0

মা লক্ষ্মীর বাহন হল পেঁচা। জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রবাদপ্রতিম লেখক মন্ত্রেশ্বরের ভাষ্য অনুযায়ী পেঁচা হল শনিগ্রহের প্রতীক। কিছু শাস্ত্রকার বলেছেন, প্রাণীটি দিনেরবেলা ঘুমায় তাই সে জ্ঞানহীন, দিনের আলোয় চোখে ভালো দেখতে পায় না, তাই সে আত্মিক দিক থেকে অন্ধ। দুঃখ ও একাকীত্ব তার চিরসঙ্গী। এভাবেই প্রাণীটির নাম অন্ধকার, অভিশাপ, মৃত্যু ও জ্ঞানহীনতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।নিশাচর পেঁচা বাস করে নির্জন স্থানে। নিঃশব্দে ওড়ে রাতের আকাশে। তার ডাক অশুভ। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে থেকে পেঁচার ডাক শুনতে পাওয়া গেলে নাকি পরিবারে আর্থিক সমস্যা দেখা দেয়। উত্তর দিক থেকে পেঁচার ডাক শোনা গেলে, সেই ডাক নাকি প্রিয়জনের মৃত্যুবার্তা বয়ে আনে। অথচ লিঙ্গপুরাণ থেকে জানা যায়, নারদ মুনি বলেছিলেন মানস সরোবরের নিকটবর্তী স্থানে বাস করা পেঁচাদের কাছ থেকে সংগীত শেখা উচিত। এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন শাস্ত্রকারেরা। পেঁচার ডাকে সংগীতের সাতটি সুরের মধ্যে চারটি সুর বিদ্যমান। স্বয়ং দেবর্ষি নারদের করা প্রশংসা থেকেই বোঝা যায়, পৌরাণিক যুগে ও দেবদেবীদের কাছে পেঁচার ডাক অশুভ ছিল না। ছিল শ্রুতিমধুর।পেঁচা আর পেঁচার ডাককে অশুভ বলার পিছনে আছে কিছু পথভ্রষ্ট তন্ত্রের হাত। যাঁরা তন্ত্র-মন্ত্র-মারণ-উচাটন-বশীকরণ ইত্যাদি কালাজাদুর মতো ঘৃণ্য কুসংস্কারে আচ্ছন্ন, তাঁদের অনেকেই দীপাবলির রাতে পেঁচাকে হত্যা করে প্রাণীটির নখ ও হাড় সংগ্রহ করেন। ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে তাঁরা বিশ্বাস করেন পেঁচার শরীরের বিভিন্ন অংশে সঞ্চিত হয়ে থাকে অপরিমিত অশুভ শক্তি। প্রাণীটিকে হত্যা করে দেহাংশগুলি সংগ্রহ করে নিজেদের কাছে রাখলে তাঁরা ভূত, প্রেত, দৈত্য, দানব, পিশাচদের নিজেদের বশে আনতে পারবেন। শত্রদের বিনাশ করার কাজে ব্যবহার করতে পারবেন তাদের।

তাহলে কী পেঁচা সত্যিই অশুভ!

যদি তাই হয়, তাহলে মা লক্ষ্মী তাঁর বাহন হিসেবে পেঁচাকে বেছে নিয়েছিলেন কেন! আসলে হিন্দুশাস্ত্রের বেশিরভাগ শাস্ত্রকারেরাই পেঁচাকে শুভশক্তির প্রতীক বলে গিয়েছেন। শাস্ত্রেই বলা হয়েছে, পূর্ব দিক থেকে পেঁচার ডাক ভেসে এলে সংসারের আর্থিক উন্নতি হয়। যাত্রার সময় মাথার ওপর পেঁচা উড়লে বা পেঁচার ডাক শোনা গেলে যাত্রা শুভ হয়। আধ্যাত্মিক জগতের মানুষদের কাছে পেঁচা হল জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, প্রতিভা, অন্তর্দৃষ্টি, স্বাধীনতা, শক্তি ও সুরক্ষার প্রতীক…শাস্ত্রে বলা হয়েছে রাতের বেলা যখন সাধারণ মানুষেরা ঘুমিয়ে পড়েন, তখন জেগে ওঠেন সাধকেরা। নিঃশব্দ ও অন্ধকার পৃথিবী থেকেই জ্ঞানের আলো তাঁরা আহরণ করে নেন। আবার পৃথিবীর বুকে যখন ভোরের আলো ফুটে ওঠে, যখন জেগে ওঠেন সাধারণ মানুষেরা, তখন যোগনিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সাধককুল। ঠিক একই কারণে, সাধকদের কাছে পেঁচা কোনও অশুভ প্রাণী নয়, সে মহাযোগী। ধৈর্য ও আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞার প্রতীক। পেঁচা অন্ধকারেও দেখতে পায়, তাই সে দিব্যচক্ষুর অধিকারী। অন্ধকারে সে আলোর পথ খুঁজে নেয়। সাধকেরা বলেন, প্রতি রাতে পেঁচা বলে যায়, “জ্ঞানহীনতার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এস। অজ্ঞান থেকে জ্ঞানবান হও। আত্মিক সম্পদকে জাগিয়ে তোলার আদর্শ সময় হল নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের আবরণে ঢাকা রাত্রি।”

হিন্দি বলয়ে প্রচলিত এক লোকগাথা 

হিন্দিতে পেঁচাকে বলা হয় ‘উল্লু’। শব্দটি অপব্যবহারের ফলে ‘বোকা’ শব্দটির সমার্থক হয়ে উঠেছে। কিন্তু পেঁচা অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও কৃষকবন্ধু প্রাণী। ফসলের পক্ষে ক্ষতিকারক পোকামাকড় ও ভূমিশত্রু ইঁদুরকে খেয়ে ফেলে কৃষিজ সম্পদকে রক্ষা করে। কৃষিসম্পদের প্রধান রক্ষয়িত্রী হলেন মা লক্ষ্মী। তাই তাঁর বাহন পেঁচা। তবে পেঁচা কেন মা লক্ষ্মীর বাহন, সে প্রসঙ্গে সারা উত্তরভারত জুড়ে ছড়িয়ে আছে একটি অসামান্য লোকগাথা।বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সাথে সাথে, ত্রিদেব ছাড়া, বাকি দেবতাদের সৃষ্টি করেছিলেন দেবী আদিলক্ষ্মী। সৃষ্টিলাভ করার পর দেবতারা মর্ত্যে এসেছিলেন দেবীর সৃষ্টি করা জীবকূল দর্শন করার জন্য। মর্ত্যে দেবতাদের পায়ে হেঁটে একস্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে দেখে ব্যথিত হয়েছিল মর্ত্যের প্রাণীরা। কারণ তাদের সৃষ্টিই হয়েছে দেবদেবীদের কৃপায়। মর্ত্যের পশুপাখিরা দেবদেবীদের বলেছিল, তারা স্বেচ্ছায় দেবদেবীদের বাহন হতে চায়।
এভাবেই এক একজন দেব ও দেবী বাহন হিসেবে পেয়েছিলেন এক একটি পশু বা পাখিকে। দেবী লক্ষ্মীর বাহন বেছে নেওয়ার সময় এসেছিল সবার শেষে। খাদ্য ও জাগতিক সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর বাহন হওয়ার জন্য তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়েছিল পশুপাখিদের মধ্যে। তখন মা লক্ষ্মী বলেছিলেন, আমি এখন থেকে প্রত্যেক কার্তিক অমাবস্যায় পৃথিবীতে আসব। আগামী কার্তিক অমাবস্যার রাত্রে যে আগে আমার কাছে আসবে, তাকেই আমি আমার স্থায়ী বাহন হিসেবে বেছে নেব।

এসে গিয়েছিল কার্তিক মাস। এসে গিয়েছিল বহু প্রতীক্ষিত কার্তিক অমাবস্যার রাত। দেবীর অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল মর্ত্যের প্রাণীকুল। জেগে ছিল একমাত্র পেঁচা ও আরও কিছু নিশাচর প্রাণী। রাতে পেঁচার দৃষ্টিশক্তি হয়ে ওঠে অত্যন্ত প্রখর। তাই রাতের অন্ধকারে পেঁচা দূর থেকে দেবী লক্ষ্মীকে দেখতে পেয়ে, উড়ে গিয়ে বসেছিল দেবীর পায়ের কাছে। পেঁচার কর্তব্যপরায়ণতা, ভক্তি ও তাঁর বাহন হওয়ার আকুলতা দেখে তুষ্ট হয়েছিলেন মা লক্ষ্মী। দেবী লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে পাকাপাকি স্থান পেয়েছিল উলূক বা পেঁচা।সেই থেকে কোনও ঘটনা ঘটার আগেই, ব্রহ্মার মুখাবয়বের আলোকিত অংশ থেকে সৃষ্টি মা লক্ষ্মীর দূত হয়ে আগাম সতর্কবার্তা গৃহস্থের দ্বারে পৌঁছে দিয়ে যায় পেঁচা। উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বলে যায়, ধনসম্পদের জন্য লালায়িত হয়ো না। ধনসম্পদ আছে বলে উদ্ধত ও উশৃঙ্খল হয়ো না। লাগামছাড়া জীবনযাত্রার ফাঁদে পড়ে যেও না। মা লক্ষ্মীর কৃপায় সঞ্চিত ধন, পরোপকারে ব্যবহৃত না হয়ে অধর্মের কাজে ব্যবহৃত হলে মা লক্ষ্মী সেই ধন নির্মমভাবে কেড়ে নেবেন। পরিবারে তখন বিরাজ করবেন ব্রহ্মার শরীরের অনালোকিত অংশ থেকে সৃষ্টি হওয়া দুর্ভাগ্যের দেবী অলক্ষ্মী। সেই দেবীর বাহন হয়ে আমিই দিয়ে যাব তোমাদের দুর্ভাগ্যের আগমনবার্তা।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.