HeaderDesktopLD
HeaderMobile

কেন দুর্গাপূজার অবিচ্ছেদ্য উপকরণ হয়ে আছে বিভিন্ন প্রকার ‘মাটি’

0 81

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে গঙ্গায় চোখ ভাসালে চোখে পড়বে এঁটেল মাটি বোঝাই নৌকা। হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং মালদহের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মাটি নিয়ে নৌকাগুলি শ্লথগতিতে ভেসে চলেছে বিভিন্ন পটুয়াপাড়ার উদ্দেশ্যে। বিভিন্ন ঘাটের পাশে থাকা পটুয়াপাড়ায় মাটি নামিয়ে আরও উজানে এগিয়ে চলে নৌকাগুলি। পবিত্র গঙ্গার বুক বেয়ে আসা পবিত্র মাটি থেকেই কয়েকমাস পরে জেগে উঠবেন আদ্যাশক্তি মহামায়া। দুর্গতিনাশিনীর আগমনবার্তা বুঝি জানান দিয়ে যায় মাটি বোঝাই নৌকাগুলি। কাশবনে দোলা লাগার অনেক আগেই।

Kumartoli - The artisan village in the city of Calcutta - cnbctv18.com

প্রধানত এঁটেল মাটি ব্যবহার করা হয় মূর্তি তৈরির কাজে। লাগে সামান্য বালি মাটিও। এই দুই প্রকার মাটি ছাড়াও লাগে ‘দশমৃত্তিকা’ ও নবকন্যার উঠোনের মাটি। এই নবকন্যারা হলেন ব্রাহ্মণী, কাপালিনী (ভৈরবী), মালিনী,  শূদ্রাণী, ধোপানি,  নাপিতানি, গোয়ালিনি, নর্তকী ও পতিতা। সম্ভবত দুর্গতিনাশিনীর পূজায় সমাজের সর্বস্তরের নারীদের অংশগ্রহণের কথা ভেবেই, নবকন্যার উঠোনের মাটি ব্যবহার করার বিধান দেওয়া হয়েছে। যাতে সমাজের কোনও শ্রেণীর নারীই  সত্যানন্দস্বরূপিণী কাত্যায়নীর পূজায় নিজেকে অপাংক্তেয় বলে না ভাবেন। কারণ মা দুর্গা যে নারীশক্তির আধার। তাই সমাজের সকল শ্রেণীর নারীর অন্তর্নিহিত শক্তিকে একত্রিত করতেই প্রতিমার মৃন্ময়ী রূপে মেশানো হয়েছে নবকন্যার উঠোনের মাটি।

মা দুর্গার প্রতিমা গড়তে বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকার প্রয়োজন হয়। এটি নিয়ে সমাজে বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। তবে বেশিরভাগ মানুষ যে ব্যাখ্যাটি বিশ্বাস করেন সেটি হল, কামনা, বাসনা, লালসা নিয়ে যখন কোনও পুরুষ একজন যৌনকর্মীর ঘরে প্রবেশ করেন, দরজার বাইরের ধুলোয় পড়ে থাকে তাঁর সারাজীবন ধরে সঞ্চয় করা সকল পুণ্য। তাই বেশ্যাদ্বারের মাটি হয়ে উঠেছে গঙ্গাজলের মতোই পবিত্র ৷ প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রজ্ঞরা অনুধাবন করেছিলেন, নিষিদ্ধপল্লীর গণিকারাই প্রকৃতপক্ষে সমাজের সবচেয়ে পবিত্র অংশ। কারণ তাঁরাই পুরুষ মানুষের কামনা, বাসনা, লালসার গরল গ্রহণ করে সমাজকে বিষমুক্ত করেন, নিষ্কলুষ রাখেন।

These Pictures Of Idol Making Will Show You The Homecoming Of Maa Durga

দুর্গাপুজোর বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই মৃৎশিল্পীরা জোগাড় করতে শুরু করেন দুর্গা প্রতিমা গড়ার ক্ষেত্রে অপরিহার্য বেশ কিছু উপাদান। শাস্ত্রমতে দুর্গা প্রতিমা তৈরি করতে লাগে গো-চোনা, গোবর, ধানের শিষ। আর লাগে তুষ, বাঁশ, খড়, নারকেল ও পাটের দড়ি। আষাঢ় মাসে, রথদ্বিতীয়ার দিন থেকে বাংলায় মা দুর্গার আগমনবার্তা ধ্বনিত হয়। সেদিন থেকেই বাংলার বিভিন্ন পটুয়াপাড়ার ঘরে ঘরে ব্যস্ততা চরমে ওঠে৷ পরিবারের সবাই নেমে পড়েন খড় কাটা, মেড় তৈরি, কাদা মাখার কাজে।

মেড় বা খড়ের কাঠামো তৈরির পর, কাঠামোর গায়ে লাগানো হয় কাদামাটির প্রথম প্রলেপ। খড়ের কাঠামোয় ফুটে ওঠে মৃন্ময়ী দেবীর একমেটে রূপ। কিছুদিন পর, একমেটে প্রতিমার শরীরে দেওয়া হয় মাটির দ্বিতীয় স্তরের প্রলেপ। একমেটে থেকে দোমেটে রূপ ধারণ করেন মহিষাসুরমর্দিনী। এরপর দক্ষকন্যার বিবর্ণ অবয়বে পড়ে রঙের প্রলেপ। মহেশ্বরীর শরীর জুড়ে নামে লাবণ্যের ঢল। অঙ্গে ওঠে সুরাট থেকে আসা ঝলমলে শাড়ি, জরি বা শোলার গয়না। মাথায় ওঠে মাথার মুকুট। দশ হাতে ওঠে দশ ধরণের অস্ত্র। দশপ্রহরণধারিণী দশভুজার মৃন্ময়ী রূপের ছটায় মেতে ওঠে ভুবন।

Idol makers of Kumartuli | Deccan Herald

মূর্তিগড়া শেষ হলেও দুর্গাপূজায় মাটির প্রয়োজনীয়তা কিন্তু শেষ হয়না। পূজার সময় আসে মায়ের মহাস্নানের পালা। মায়ের  মহাস্নানের জন্য লাগে, সহস্রধারার জল, গঙ্গার জল, বৃষ্টির জল, সাগরের জল, সর্বতীর্থের জল, সরস্বতী নদীর জল সহ আরও প্রায় পনেরো ষোলো প্রকার জল। আর লাগে মাটি। মায়ের মহাস্নানের সময় ব্যবহার করা হয় গঙ্গা মৃত্তিকা, গজদন্ত মৃত্তিকা, বল্মীক মৃত্তিকা, বরাহ মৃত্তিকা, বৃষশৃঙ্গ মৃত্তিকা,  অশ্বদন্ত মৃত্তিকা, পর্ব্বত মৃত্তিকা, দেবদ্বার মৃত্তিকা, সরোবর মৃত্তিকা, নদীর উভয়কুল মৃত্তিকা, য‌জ্ঞশালা মৃত্তিকা, রাজদ্বার মৃত্তিকা, চতুষ্পথ মৃত্তিকা, কুশমূল মৃত্তিকা। এভাবেই দেবী কাত্যায়নীর আরাধনার অবিচ্ছেদ্য উপকরণ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে ধরাধামের মাটি।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.