HeaderDesktopLD
HeaderMobile

যে লীলায় দেবী কালিকা রূপ ধারণ করেছিলেন সত্যের সারথি শ্রীকৃষ্ণ

0 38

ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার এবং ভগবদ্গীতার প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ। বল্লভ সম্প্রদায় বা গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ভক্তবৃন্দ কৃষ্ণকেই সর্বোচ্চ দেবতা বলে মনে করেন। শ্রীকৃষ্ণের নানা লীলার কথা আমরা জানি। কিন্তু ভাবলে অবাক লাগে, শ্রীমধুসূদনের একটি লীলার সঙ্গে অকল্পনীয়ভাবে জড়িয়ে আছেন শাক্ত সম্প্রদায়ের শক্তি আরাধনা। অথচ শাক্ত ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ধর্মীয় চিন্তাধারার গতিপথ সম্পূর্ণ আলাদা। বৈষ্ণবদের কাছে যেমন শ্রীবিষ্ণু সর্বোচ্চ দেবতা তেমনি শাক্তদের কাছে শক্তিরূপিণী মহাদেবীই হলেন পরমব্রহ্ম। তিনিই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা। সকল দেবদেবী সেই মহাদেবীরই অবতারমাত্র।

বৈষ্ণব ও শাক্তদের প্রবল ধর্মীয় বৈপরীত্যের মধ্যে মিলনসেতু হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন স্বয়ং দেব দীনবন্ধু। তাঁর এক মনমুগ্ধকর লীলায় শ্রীকৃষ্ণ পরিণত হয়েছিলেন দেবী মহাকালিকায়। যে দেবীকে সাধারণ মানুষ চেনেন মা কৃষ্ণকালী নামে। শাক্ত ও বৈষ্ণব উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠা সহকারে এই দেবীর আরাধনা করে থাকেন। এই দেবীকে নিয়ে উভয়সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনও মতবিরোধ নেই। অনাথের নাথ শ্রীকৃষ্ণ, যে লীলায় পরিণত হয়েছিলেন দেবী কৃষ্ণকালিকায় তা নীচে বর্ণনা করা হল।

বেলা দ্বিপ্রহর। মেঘহীন নীল আকাশের নীচে থাকা সবুজ কুঞ্জে আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। মোহনবংশীধারী শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির প্রাণকাড়া সুর, সীমাহীন প্রান্তর পেরিয়ে চলে যাচ্ছিল অনেক দূরে। দূরের গ্রামে থাকা গোপনারীরা যদুকুলপতির বাঁশির সুর শুনে চঞ্চল হয়ে উঠেছিলেন। কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর, আনমনা শ্রীরাধা তখন সবে উনুন ধরিয়েছিলেন রান্নার জন্য। তাঁর কাছেও পৌঁছে গিয়েছিল মদনমোহনের বংশীধ্বনি। উতলা হয়ে উঠেছিলেন রাধা। কারণ রাস-রাসেশ্বরের আহ্বান ফিরিয়ে দেবার সাধ্য তাঁর নেই। সখীদের নিয়ে দ্রুতপদে রাধা এগিয়ে গিয়েছিলেন কুঞ্জের পথে।

ঘরেই ছিলেন রাধার স্বামী আয়ান ঘোষের বোন কুটিলা। রাধার নিঃশব্দ অভিসার যাত্রা বোন কুটিলা দেখেও না দেখার ভান করেছিলেন। রাধা বাড়ির চৌকাঠ পার হতেই কুটিলা ছুটে গিয়েছিলেন মা জটিলার কাছে। জটিলাকে বলেছিলেন, “মা, আবার সেই বাঁশি। সেই দুপুর বেলায়, রাধা ঘরে নেই। কী অধর্ম বলত মা! আয়ান দাদা একটু পরেই বাড়ি ফিরবে। আজই এই অন্যায়ের বিহিত করতে হবে। আজ হাতে নাতে ধরিয়ে দেব পাপিষ্ঠাকে। আজ আর নিস্তার নেই।” কুটিলার কথা শুনে জটিলার মুখে ফুটে উঠেছিল ক্রূর হাসি। চাপা কণ্ঠে বলেছিলেন, “আজ বাড়ি আসুক আয়ান, আজই এই পাপের হাঁড়ি ভাঙতে হবে।”

কিছুক্ষণ পরেই ঘরে ফিরেছিলেন রাধার স্বামী দুগ্ধ ব্যবসায়ী আয়ান ঘোষ, সম্পর্কে কৃষ্ণের পালিকা মা যশোদার ভাই। বয়েসে রাধার চেয়ে অনেক বড়। রাধার সঙ্গে আয়ানের বিয়ে দিয়েছিলেন কৃষ্ণের পালক পিতা নন্দ। প্রচণ্ড কালীভক্ত ছিলেন আয়ান ঘোষ। দুধের ব্যবসা আর দেবী কালিকা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভাবতেন না। সেদিন বাড়ি ফিরে রাধার খোঁজ করেছিলেন আয়ান। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল তাঁর। সাড়া না পেয়ে আবার ডেকেছিলেন। এবার বেশ জোরেই। কুটিলা বেরিয়ে এসেছিলেন অন্য ঘর থেকে। দাদাকে বলেছিলেন, “আরও জোরে চেঁচাও। না হলে তোমার রাধে যে শুনতে পাবে না।” বিরক্তি প্রকাশ করে আয়ান বলেছিলেন, “শুনতে পাবে না মানে! কোথায় রাধে?” কপট হাসি হেসে কুটিলা বলেছিলেন,

– দেখ, কুঞ্জে টুঞ্জে গেছে কিনা!
-কুঞ্জে মানে! কী বলতে চাইছিস পরিষ্কার করে বল কুটিলা। তামাশা করিস না আমার সঙ্গে। খিদেয় পেটে আগুন জ্বলছে। রাধে কোথায়?
– বললাম তো একটু আগে কুঞ্জে গেছে।
-এখন কুঞ্জে! কী করতে গেছে!
– ফুল তুলতে গো দাদা। ফুল তুলতে।
– এই ভর দুপুরে রাধে ফুল তুলতে গেছে। কোন দেবতার পায়ে দেবে শুনি!
– দেখ, তোমার জন্য মালা গেঁথে আনতে গেছে কিনা!

রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আয়ান বলেছিলেন, “তাহলে আমায় খেতে দেবে কে?” কুটিলা বলেছিলেন, “তা তো বলতে পারব না দাদা। তোমার রাধে বনভোজন করতে গেছে গো সখীদের নিয়ে। সেই বনভোজনে তোমার নামে কুকথা রটাবে হয়ত।” বোনের কথায় তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা আয়ান বলেছিলেন, “মাথা গরম করাস না কুটিলা। মা কোথায়! মাও কি বাড়িতে নেই!”

আয়ানের চিৎকার শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন আয়ান জননী জটিলা। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে আয়ানকে বলেছিলেন, “তোর বউ উনুন জ্বালিয়ে গেছে। অপেক্ষা কর, এসে ভাত রেঁধে দেবে।” হতভম্ব ও ক্ষুধার্ত আয়ান মা ও বোনকে বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে মশকরা না করে আসল কথাটা বলতে। মা জটিলা বলেছিলেন, ” তোকে অনেকবার বলেছি বাবা। আমাদের কথা তো কানেও তুলিসনি। যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। এখন তুই তোর বউকে নিয়ে থাক। আমাদের নিস্তার দে। আমাদের জন্য অন্য বাড়ি বানিয়ে দে বাবা। আমরা মা মেয়ে সেখানে চলে যাই। রোজ রোজ এই অধর্ম আর চোখে দেখা যাচ্ছে না। পাড়ায় কান পাতা যাচ্ছে না তোর বউয়ের জন্য।”

কাতর কণ্ঠে আয়ান বলেছিলেন,
-আর হেঁয়ালি কোরো না মা। আমায় বল, কী হয়েছে!
– রাতদুপুরে বাড়ি থেকে উধাও হওয়া তোর ওই বউয়ের সঙ্গে আমরা থাকতে পারব না বাবা।
– কিন্তু রাধে আমায় বলেছে রাতে সে আমার জন্য শ্যামাপূজা করে মা।

হাসিতে ফেটে পড়েছিলেন জটিলা আর কুটিলা। তাঁরা আয়ানকে বলেছিলেন, শ্যামাপূজা নয় শ্যামের পূজা করে আয়ান ঘরনি রাধা। আর এই জন্যই গ্রামে বাস করাই তাঁদের পক্ষে দুষ্কর হয়ে উঠেছে। গ্রামের লোকের দিকে তাঁরা মুখ তুলে তাকাতে পারেন না। সব সময় লজ্জায় মাথা হেঁট করে চলতে ফিরতে হয়।

রাগত কণ্ঠে জটিলা আয়ানকে বলেছিলেন, “তুই তো বাবা চোখ থেকেও কিছু দেখতে পাসনা। তোকে বলে আর কী হবে! তবে এক বাড়িতে থাকি, তাই আমরা বলে ফেলি। আগে গভীর রাতে কুঞ্জে যেত। এখন সব লজ্জার মাথা খেয়েছে তোর রাধা। দিনে দুপুরে যাচ্ছে অভিসারে। তুই আমাদের অন্য বাড়ি করে দে বাবা। মায়ে ঝিয়ে সেখানে চলে যাই।”

আষাঢ় মাসের আকাশের মতোই অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল আয়ান ঘোষের মুখ। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আয়ান বলেছিলেন,

-“তোরা হাতে নাতে ধরিয়ে দিতে পারবি তো? তাহলে আজই একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে।”
– নিশ্চয়ই। এই মুহূর্তে দুজনকেই কুঞ্জে পাবি। প্রেমলীলায় মগ্ন হয়ে আছে তোর বউ।
– চল মা, চল বোন, রাধে বলেছিল আমার জন্য নির্জনে শ্যামাপুজো করতে সে কুঞ্জে যায়। যদি তোদের কথা সত্যি হয়, তাহলে আজ রাধের একদিন কি আমার একদিন। আজ আমার হাতেই ওর মরণ লেখা আছে।”

এই বলে আয়ান হাতে তুলে নিয়েছিলেন প্রকাণ্ড একটা লাঠি। জটিলা চিনতেন তাঁর ছেলেকে। এমনিতে সহজ সরল হলে কী হবে, রেগে গেলে আয়ানের মাথায় খুন চেপে যায়। তাই জটিলা বলেছিলেন, স্ত্রী হত্যা করিস না বাবা। তার চেয়ে মেরে হাত পা ভেঙে দিয়ে মাথা ন্যাড়া করে ঘরে বেঁধে রাখ। তাতেও কুলের সম্মানটা বাঁচে। আর গঞ্জনা দেওয়ার জন্য আমরা তো আছিই। ভয়ঙ্কর মূর্তি ধারণ করা আয়ান ঘোষ বলেছিলেন, “না মা পাপের শেষ রাখব না। এক ঘায়ে পাপের বিনাশ করব। তোমরা বাধা দিও না। আজই ছলনার সমাপ্তি ঘটাব মা। মান রাখব কুলের।”

ওদিকে কালিন্দী নদীর তীরে, ফুলে ফুলে ভরে ওঠা কুঞ্জে নিজের হাতে মদনমোহনকে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন রাধা। সখীরা সাজি করে ফুল এনে দিচ্ছিলেন। কেউ বেটে দিচ্ছিলেন শ্বেত চন্দন। ঠিক তখনই সখীরা দেখতে পেয়েছিলেন আয়ানকে। হাতে লাঠি নিয়ে ক্রোধে উন্মত্ত আয়ান কালবৈশাখী ঝড়ের গতিতে কুঞ্জের দিকেই আসছিলেন। আয়ানের সঙ্গে ছিলেন জটিলা ও কুটিলা। ছুটে গিয়ে সেই সংবাদ তাঁরা দিয়েছিলেন ‘ব্রজের গোপাল’ ও শ্রীরাধাকে। কাতর কণ্ঠে রাধা বলেছিলেন, “এই ভয়ঙ্কর সঙ্কট থেকে আমাকে রক্ষা কর হে প্রভু, হে অনাদির আদি, হে ভব-ভয়হারী।” শ্রীরাধার কথা শুনে স্মিত হেসেছিলেন ‘গোপী মনোহারী’।

দেখতে দেখতে ‘দূর্বাদল শ্যাম’ ধারণ করেছিলেন এক অকল্পনীয় কলেবর। অখিলের সার শ্রীমধুসূদন পরিণত হয়েছিলেন এক চতুর্ভুজা কৃষ্ণকায়া দেবী প্রতিমায়। কুঞ্জবনে আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবী কৃষ্ণকালিকা। কপালে অর্ধচন্দ্রাকৃতি তিলক, কণ্ঠে ঝুলছে মুণ্ডমালা, চার হাতে ধারণ করে আছেন খড়্গ, বংশী, শঙ্খ ও খর্পর। দেবীর সর্বাঙ্গ থেকে নির্গত হচ্ছিল শতসহস্র নক্ষত্রের জ্যোতি। দেবীর রূপমাধুরীতে মোহাবিষ্ট হয়েছিল বিশ্বভুবন।

কুঞ্জে প্রবেশ করে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন মারমুখী আয়ান। তাঁরই আরাধ্য দেবী শ্রী শ্রী কালিকার এক অপরূপ শ্যামামূর্তির সামনে বসে আছেন রাধে। অপলকে তাকিয়ে আছেন দেবীর দিকে। ভাববিহ্বল শ্রীরাধার অশ্রুকণা সবুজ ঘাসে ঝরে পড়ছে মুক্তোবিন্দু হয়ে। অনুতপ্ত আয়ান রাধের পাশে বসে বলেছিলেন, ” তোমার জন্যই আজ মায়ের শ্যামামূর্তি দর্শন করার সৌভাগ্য হল রাধে। আর কখনও আমি তোমায় অবিশ্বাস করব না। আমি গর্বিত তোমার মতো ঘরনি পেয়ে। তুমিও ধন্য তুমি রাধে, তুমিই মা কালিকার সবচেয়ে বড় ভক্ত। তাই মা তোমায় নবরূপে দেখা দিয়েছেন।” এই বলে আয়ান দুই হাত জড়ো করে দেবী কাত্যায়নীর স্তবগাথা শুরু করেছিলেন।

জয় আদ্যা সতী, দেবি ভগবতী, অগতির গতি তারা !
নমো নারায়ণি, ব্রহ্ম সনাতনি, চন্দ্রাননি, হর-দারা !
শ্যামা সুরেশ্বরী, ভীমা ভয়ঙ্করী, দিগম্বরী, ঘোরবেশী !
শ্মশান-বাসিনী, শমন-ত্রাসিনী, সুহাসিনী, এলোকেশি !
উমেশ-অঙ্গনা, অঞ্জন-গঞ্জনা, নিরঞ্জনা নিরুপমা !
নামে পূর্ণ আশ, মুক্ত মোহপাশ, দিগবাস-মনোরমা !
নমো নৃত্যকালী, নিশানাথ-ভালী, মুক্তমালী, মহোদরি !
মৃত্যুঞ্জয়-জায়া, দে মা পদছায়া, মহামায়া, মহেশ্বরী !
বরাভয়-করা, অসি-মুণ্ড-ধরা, তাপহরা ত্রিনয়না !
নমো নিস্তারিণী, শিব-সীমন্তিনী, দেহি দীনে কৃপাকণা।

দেবীর স্তব করতে করতে ধ্যানে বিভোরে হয়ে গিয়েছিলেন আয়ান ঘোষ। নানান উপাচারে দেবী কৃষ্ণকালিকার পূজা করেছিলেন শ্রীরাধা। বিপদ আসন্ন অনুমান করে স্থান ত্যাগ করেছিলেন জটিলা-কুটিলা। সেই দিন থেকে পৃথিবীতে শুরু হয়েছিল মা কৃষ্ণকালীর পূজা। দেবী কৃষ্ণকালিকা অনেক জায়গায় মা রটন্তি-কালিকা নামেও পরিচিত। মাঘ মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী বা রটন্তী চতুর্দশী তিথিতে মা কৃষ্ণকালীর বাৎসরিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। শাক্ত ও বৈষ্ণব, উভয় সম্প্রদায় নিষ্ঠাভরে এই দেবীর আরাধনা করেন। দেবী কৃষ্ণকালিকার আরাধনা করলে গৃহস্থের সর্বপ্রকার দুঃখের বিনাশ হয়। মোক্ষলাভ করেন সাধক।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.