HeaderDesktopLD
HeaderMobile

ভক্তদের সকল মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন শিবপুরের ‘হাজার হাত কালী’ মা

0 40

হাওড়া জেলার অন্যতম বিখ্যাত ও অনন্য এই কালী মা বিরাজ করেন শিবপুরে। মায়ের নামেই এলাকার নাম হয়ে গিয়েছে ‘হাজার হাত কালীতলা’। লোকমুখে শোনা যায়, কয়েক শতাব্দী ধরে এই এলাকায় বাস করতেন কালীভক্ত মুখোপাধ্যায় পরিবার। সেই পরিবারের সন্তান আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তথা আশুতোষ তর্করত্ন ছিলেন তান্ত্রিক। একদিন রাতে দেবী কালিকাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন আশুতোষ তর্করত্ন। স্বপ্নে চতুর্ভূজা কালিকা ‘হাজার হাত কালী’ রূপে দেখা দেন। আশুতোষকে মন্দির গড়ে সেই মন্দিরে ‘হাজার হাত’ কালীর মৃন্ময়ী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে বলেছিলেন।

সে সময় এলাকায় ছিল ঘন অরণ্য। সেই অরণ্যেই তন্ত্রসাধনা করতেন আশুতোষ তর্করত্ন। দেবী কালিকার স্বপ্নাদেশ পেয়ে বিপাকে পড়েছিলেন। মা বলেছিলেন মন্দির তৈরি করে সেই মন্দিরে মায়ের অনন্য মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু ইটের মন্দির নির্মাণের সামর্থ তাঁর ছিল না। ১৯০৫ সালে আশুতোষ তর্করত্ন অরণ্যের ভেতরে তৈরি করেছিলেন কালী মায়ের মাটির মন্দির। বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে মাটির মন্দিরে পরম নিষ্ঠাভরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মায়ের অনন্য এক মৃন্ময়ী মূর্তি। সেই মূর্তিটি নির্মাণ করেছিলেন কুমোরটুলির শিল্পী প্রিয়নাথ পাল। কালী মায়ের এমন মূর্তি ভারতের অন্য কোথাও আছে কিনা জানা যায় না।

অরণ্যের গভীরেই চলছিল আশুতোষ তর্করত্নের মা কালীর আরাধনা। মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে ১৯১৪ সালে (মতান্তরে ১৯১৬) ‘হাজার হাত কালী’ মায়ের মন্দিরটি পাকা করে দেন স্থানীয় হালদার পরিবার। দালান শিল্পরীতির চাঁদনী আঙ্গিকে নির্মিত সেই মন্দিরে আজও বিরাজ করছেন ‘হাজার হাত কালী’ মা।

মায়ের মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করলেই শিহরিত হতে হয়। মন্দিরটির উত্তর দেওয়াল জুড়ে অবস্থান করছেন বারো ফুট উচ্চতার ‘হাজার হাত কালী’ মা। দেবীর বাম পা বাহন রুপোলি কেশর যুক্ত একটি সিংহের উপর। ডান পা রাখা আছে প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর। মায়ের দেহ সংলগ্ন বাম হাতে মা ধারণ করে আছেন খড়্গ, ডান হাতে পঞ্চশূল। বাকি ৯৯৮ টি হাত মায়ের পিছনে থাকা গোটা উত্তর দেওয়াল জুড়ে অবস্থান করছে। আমরা সাধারণত চতুর্ভূজা কালীমূর্তি দেখে থাকি। কিন্তু হাজার হাতের মা কালীর বিগ্রহ ভূ-ভারতে দেখা মেলে না। মা হাজার হাত কালীর রূপকল্প কিন্তু কাল্পনিক নয়। চণ্ডীপুরাণ, মার্কণ্ডেয় পুরাণে অসুরবিনাশিনী হাজার হাত কালী মায়ের বর্ণনা আছে। জনশ্রুতি আছে, জাগ্রতা হাজার হাত কালী মায়ের হাজারটি হাত গোণা যায় না এবং গুণতেও নেই।

মা হাজার হাত কালীর আরও কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা তাঁকে অন্যান্য কালী প্রতিমার চেয়ে সর্বাংশে আলাদা করেছে। মৃন্ময়ী মায়ের গায়ের রঙ নীলাভ সবুজ। পরনে রুপোলি পাড় দেওয়া রক্তলাল শাড়ি। কানে কানপাশা, নাকে নথ। মায়ের দুই কাঁধে বসে আছে ফণা তুলে থাকা দুটি সাপ। মা এখানে এলোকেশী নন, তাঁর মাথায় রূপোর মুকুট। মাথার উপর ধরা আছে রাজচ্ছত্র। বড় বড় দুটি চোখ মেলে মা চেয়ে থেকেন ভক্তের দিকে। সে দৃষ্টি কঠোর হলেও ভয়াবহ নয়।

তামিলদের কাছে এই মন্দিরটি অতি পবিত্র। নিয়মিত মাকে দর্শন করতে আসেন তামিল ভক্তবৃন্দ। তাই মন্দিরের বাইরে থাকা ফলকে তামিল ভাষায় লেখা আছে মন্দিরের নাম। শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের শুক্রবারে সবচেয়ে বেশি তামিলভক্ত আসেন। সেদিন মায়ের ভোগে থাকে সম্বর, বড়া, টক ভাতের মতো তামিল আহার্য।

বংশানুক্রমিকভাবে আজও হাজার হাত কালী মায়ের সেবা করে আসছে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পরিবার। তন্ত্রমতে প্রতিষ্ঠিত হলেও মন্দিরে পশুবলির প্রথা নেই। মন্দিরে নিত্যপূজা হলেও প্রতি বছর বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে মায়ের আবির্ভাব দিবস ও দীপান্বিতা কালীপুজোর দিন সাড়ম্বরে হাজার হাত কালী মায়ের পুজো করা হয়। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তেরা এদিন মাকে দর্শন করতে আসেন। ভক্তরা বিশ্বাস করেন কায়মনোবাক্যে স্মরণ করলে ভক্তদের সকল মনোস্কামনা পূরণ করেন হাজার হাত কালী মা।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.