HeaderDesktopLD
HeaderMobile

যে কালীমাতাকে দর্শন করতে গিয়ে এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন রানি রাসমণি

0 42

বাঁশবেড়িয়া রাজপরিবারের একটি শাখা হল সোড়াপুলি বা শেওড়াফুলি রাজপরিবার। রাজা মনোহর চন্দ্র রায় ছিলেন শেওড়াফুলি রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর পুত্র রাজা রাজচন্দ্র রায়ের প্রপৌত্র রাজা হরিশচন্দ্র রায় ছিলেন পরম কালীভক্ত। রাজবাড়িতে মহাসমারোহে দীপান্বিতা কালীপুজো করতেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সেই রাজা হরিশচন্দ্র রায় জড়িয়ে পড়েছিলেন এক মর্মান্তিক ঘটনায়। সেই সময় বাংলায় উড়ে এসে জুড়ে বসা ডেনিসদের সঙ্গে শ্রীরামপুরের জমি নিয়ে বিবাদ চলছিল রাজা হরিশচন্দ্র রায়ের। অপরদিকে রাজার তিন স্ত্রীয়ের মধ্যে ছিল বিবাদ। রাজবাড়িতে কলহ লেগেই থাকত তিন স্ত্রীয়ের মধ্যে। একদিন রাজা স্ত্রীদের কলহ থামাতে রাজবাড়ির অন্দরমহলে দ্রুত যেতে গিয়ে ধাক্কা লাগে বড় রানির সঙ্গে। পড়ে দিয়ে মারাত্মক আঘাত পান বড় রানি নিস্তারিণী। তাঁর মৃত্যু হয়। নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন অনুতপ্ত রাজা হরিশচন্দ্র।

শেওড়াফুলি এলাকাটির কাছেই ছিল এক গভীর অরণ্য। সেই অরণ্যের ভেতর সারাদিন কাটানোর পর, ক্লান্ত হরিশচন্দ্র এক বিশাল বৃক্ষের তলায় পড়ে থাকা একটি প্রস্তরখণ্ডের উপর বসে পড়েছিলেন। দিন গড়িয়ে রাত নেমেছিল অরণ্যে। বৃক্ষের নীচে থাকা প্রস্তরখণ্ডের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন রাজা। গভীর রাতে স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন দেবী কালিকা। রাজা হরিশচন্দ্র রায়কে দেবী কালিকা বলেছিলেন, যে প্রস্তরখণ্ডের ওপর হরিশচন্দ্র শুয়ে আছেন সেই প্রস্তরখণ্ডটি দিয়ে মা দক্ষিণাকালীর মূর্তি নির্মাণ করে, গঙ্গার তীরে নতুন মন্দিরে মূর্তিটিকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই হবে তাঁর পাপস্খালন।

আত্মহত্যা করার অভিপ্রায় ত্যাগ করে রাজা হরিশচন্দ্র রায় ফিরে এসেছিলেন রাজবাড়িতে। রাজকর্মচারীদের দিয়ে পাথরটি রাজবাড়িতে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রস্তরখণ্ডটি রাজবাড়িতে আনার পর জানা গিয়েছিল অরণ্যের ভেতরে অনাদরে পড়ে থাকা প্রস্তরখণ্ডটি আসলে অমূল্য কষ্টিপাথর। যে পাথর দিয়ে ভারতে দেবদেবীর বিগ্রহ নির্মাণের প্রথা হাজার হাজার বছরের পুরোনো। রাজা হরিশচন্দ্র ও রাজপরিবারের সদস্যদের বিস্মিত করে সেদিনই রাজবাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন এক ভিনদেশি ভাস্কর। তিনি রাজাকে জানিয়েছিলেন, মা কালীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি রাজবাড়িতে মায়ের বিগ্রহ নির্মাণ করতে এসেছেন।

মা কালীর লীলায় অভিভূত রাজা হরিশচন্দ্র, অচেনা সেই ভাস্করকেই দক্ষিণাকালীর মূর্তি নির্মাণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিছুদিন পর কষ্টিপাথরের খণ্ডটি ভাস্করের নৈপুণ্যে মা দক্ষিণাকালীর বিগ্রহে পরিণত হয়েছিল। ১২৩৪ সনের জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে, পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে নির্মিত কালীমন্দিরে মা নিস্তারিণী কালীর বিগ্রহটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা হরিশচন্দ্র। মন্দিরের সামনে বানিয়েছিলেন একটি চালাঘর। রাজকার্য ভুলে দিনের বেশিরভাগ সময় সেই চালাঘরেই কাটাতে শুরু করেছিলেন রাজা হরিশচন্দ্র। মা নিস্তারিণী কালীর পায়ে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে অর্পণ করেছিলেন। জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত করে গিয়েছিলেন মা নিস্তারিণীর সেবা।

হুগলি জেলার শেওড়াফুলির শরীর ছুঁয়ে বয়ে চলা ভাগীরথী নদীর তীরে, আজও আছে রাজা হরিশ্চন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠিত জাগ্রতা দেবী মা নিস্তারিণী কালীর মন্দির। মন্দিরের গায়ে শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা আছে, বর্ধমান জেলার অন্তর্ভুক্ত পাটুলির দত্ত রাজবংশজাত সাড়াপুলি বা শেওড়াফুলি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা / ‘ক্ষত্রিয়রাজ’ রাজা মনোহর রায়ের পুত্র রাজা / রাজচন্দ্র রায় / রাজচন্দ্রের প্রপৌত্র রাজা হরিশ্চন্দ্র রায় / ১৮২৭ খৃঃ (১২৩৪ সালে জ্যৈষ্ঠ মাসে)

সিঁড়ি দিয়ে উঠে নাটমন্দির পেরিয়ে প্রবেশ করতে হয় দালান লাগোয়া মূল মন্দিরে। মন্দিরের অভ্যন্তরে পাতা আছে পঞ্চমুণ্ডির আসন। সেই আসনের ওপর রাখা আছে তাম্রনির্মিত ‘এক পাপড়ি’ পদ্ম। মাথার দিকে দুই হাত তুলে সেই পদ্মের উপর শুয়ে আছেন মহাদেব। তাঁর বুকের উপর দাঁড়িয়ে আছেন শ্রীশ্রী নিস্তারিণী কালীমাতা। মায়ের উচ্চতা তিনফুটের কাছাকাছি। মায়ের মাথার ওপর মখমলের চাঁদোয়া।

সারাবছর ধরেই বাংলার বিভিন্ন স্থান থেকে জাগ্রতা কালী মা নিস্তারিণীকে দর্শন করতে আসেন ভক্তবৃন্দ। প্রতি অমাবস্যায় মায়ের বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। তাই সেদিন মন্দিরে জনসমাগম অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশি হয়। তবে দীপান্বিতা কালীপুজোর দিন মন্দির প্রাঙ্গণে দেখা দেয় জনজোয়ার। শ্রীশ্রী নিস্তারিণী কালীমাতার কাছে সকল দুঃখ দুর্দশা থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করেন আকুল ভক্তবৃন্দ। নিস্তারিণী কালী মায়ের মন্দিরে বলি দেওয়ার প্রথা চালু আছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, রাজত্ব না থাকলেও আজও নিস্তারিণী কালী মায়ের মন্দিরটি পরিচালনার দায়িত্বে আছে শেওড়াফুলির রাজপরিবার।

শেওড়াফুলির নিস্তারিণী কালী মায়ের মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জানবাজারের রানি রাসমণির স্মৃতি। মন্দির প্রাঙ্গণে এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন স্বয়ং রানি রাসমণি। ১৮৪৭ সালে রানি রাসমণি ঠিক করেছিলেন তীর্থযাত্রায় যাবেন। কাশীতে গিয়ে বাবা বিশ্বনাথ ও মা অন্নপূর্ণার পূজা দেবেন। সেই মতো রানির তীর্থযাত্রার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল ২৪টি নৌকো ও বজরা। তীর্থযাত্রায় বের হওয়ার ঠিক আগের রাতে রানি রাসমণির স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন মা ভবতারিণী। তিনি রানিকে বলেছিলেন, “তোর কাশী যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তুই এই গঙ্গার তীরে আমার মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পূজা কর। আমি এখানেই অবস্থান করে তোর পূজা গ্ৰহণ করব।”

তীর্থযাত্রা বন্ধ করে আবেগবিহ্বল রানি রাসমণি সেই ভোরেই গঙ্গার বুকে ভাসিয়েছিলেন তাঁর বজরা। মা ভবতারিণীর মন্দিরের উপযুক্ত স্থান খোঁজার জন্য। এভাবেই দিনের পর দিন চলছিল মন্দির স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থানের অন্বেষণ। একদিন রানিমা’র বজরা ভাসতে ভাসতে পৌঁছে গিয়েছিল শেওড়াফুলিতে। রানি রাসমণি জানতেন শেওড়াফুলির অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রীশ্রী মা নিস্তারিণী কালীর কথা। বজরার মাঝিদের রানিমা বলেছিলেন শেওড়াফুলির ঘাটে বজরা নোঙর করার জন্য। রানিমার বজরা শেওড়াফুলির ঘাটে লাগবার আগেই রানিমা ও মাঝিরা দেখতে পেয়েছিলেন ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা এক পরমাসুন্দরী কিশোরীকে। কিশোরীটি হাতছানি দিয়ে রানিমাকেই ডাকছিল।

বজরা নোঙর করার পর ঘাটে নেমে রানি রাসমণি এগিয়ে গিয়েছিলেন কিশোরীটির দিকে। কিশোরীর কাছে পৌঁছে রানি মা কিশোরীকে অনুরোধ করেছিলেন, নিস্তারিণী কালীমন্দিরের পথ দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। হাসিমুখে রাজি হয়েছিল কিশোরীটি। রানি রাসমণি কিশোরীটিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তার বাড়ি কোথায়! স্মিত হেসে কিশোরীটি বলেছিল, সে শেওড়াফুলির গঙ্গার ধারেই থাকে। তারপর কিশোরীটি রানি মাকে নিয়ে মা নিস্তারিণী কালীমন্দিরের পথে এগিয়ে গিয়েছিল।

রানি রাসমণিকে পথ চিনিয়ে শ্রী শ্রী মা নিস্তারিণী কালীমন্দিরে নিয়ে এসেছিল ওই কিশোরী। তারপর রানি রাসমণির চোখের সামনেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। রানির সঙ্গীরা অনেক খুঁজেও সেই পরমাসুন্দরী কিশোরীর সন্ধান দিতে পারেননি রানিমাকে। বিস্ময়াবিষ্ট রানি রাসমণি বুঝতে পেরেছিলেন, পরমাসুন্দরী কিশোরীটি আর কেউ নয়, স্বয়ং মা নিস্তারিণী। পরম ভক্তকে পথ দেখিয়ে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়ে মিলিয়ে গিয়েছেন অসীম অনন্তে। এরপর মা নিস্তারিণীর বিগ্রহ দর্শন করেছিলেন রানি রাসমণি। দিয়েছিলেন পুষ্পাঞ্জলিও। ফিরে আসবার সময়, যখন শেওড়াফুলির ঘাট থেকে তাঁর বজরা কলকাতার অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছিল, তখনও রানি রাসমণিকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছিলেন কিশোরী রূপে দর্শন দেওয়া মা নিস্তারিণী কালীমাতা।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.