HeaderDesktopLD
HeaderMobile

তন্ত্রমতে দেবী কালিকার যে নয়টি রূপকে পূজা করার বিধান দেওয়া হয়েছে

0 66

‘মুণ্ডমালা তন্ত্র’ অনুযায়ী দশমহাবিদ্যা হলেন তান্ত্রিকদের আরাধ্যা প্রধান দশ জন দেবী। এই দশ দেবী হলেন মা পার্বতীর অবতার। এই দেবীরা হলেন কালী, তারা, ষোড়শী, ভৈরবী, ভুবনেশ্বরী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলাকামিনী। অপরদিকে মালিনীবিজয় গ্রন্থ অনুযায়ী মহাবিদ্যার সংখ্যা বারো। তাঁরা হলেন কালী, নীলা, মহাদুর্গা, ত্বরিতা, ছিন্নমস্তিকা, বাগ্বাদিনী, অন্নপূর্ণা, প্রত্যঙ্গিরা, কামাখ্যাবাসিনী, বালা, মাতঙ্গী ও শৈলবাসিনী। তবে দুটি তালিকাতেই সর্বপ্রথম নাম দেবী কালিকার। তাই দশমহাবিদ্যাই হোক কিংবা দ্বাদশমহাবিদ্যা, মহাবিদ্যার শ্রেষ্ঠ বিদ্যা যে মা কালী তা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কারণ দেবী পার্বতীর প্রথম ও প্রধান অবতার হলেন দেবী কালিকা। শাক্ত বা শক্তিদেবীদের উপাসকরা মনে করেন মা কালীই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন।

বাংলায় দেবী কালিকার আরাধনার ইতিহাস সুপ্রাচীন। কয়েক হাজার বছর ধরে বাংলায় মা কালীর আরাধনা করা হয়। তাই তন্ত্রগ্রন্থ ব্রহ্মযামল-এ লেখা হয়েছে, বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন মা কালী। বিভিন্ন শাস্ত্র ও পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী মা কালী নগ্নিকা, এলোকেশী, ঘোর কৃষ্ণবর্ণা ও চতুর্ভুজা। চারটি হাতের দু’টি হাতে ধারণ করে আছেন খড়্গ ও অসুর মুণ্ড। দুটি হাত থাকে বরদা ও অভয়মুদ্রায়। মায়ের গলায় শোভা পায় মুণ্ডমালা। বিশাল জিভ বের করে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন মহাদেবের বুকের ওপর। তবে মা কালীর এই রূপের ব্যতিক্রমও আছে। বাংলার বিভিন্ন স্থানে মা কালীর বিভিন্ন মূর্তিকে বিভিন্ন নামে পূজা করার প্রথাও কিন্তু সুপ্রাচীন।

বাংলার ঘরের মেয়ে মা কালীকে ডাকা হয় বিভিন্ন নামে। যেমন দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, চামুণ্ডা, সিদ্ধকালী, আদ্যাকালী ,ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, শ্রীকালী, ভবতারিণী, ব্রহ্মময়ী, নিস্তারিণী, সিদ্ধেশ্বরী,আনন্দময়ী, ইচ্ছাময়ী, করুণাময়ী, বকুলেশ্বরী, দিগম্বরী, শিয়ালেশ্বরী, বাঞ্ছাময়ী, নিত্যকালী, ভাটেশ্বরী, রটন্তীকালী, ফলহারিণী কালী, ওম্বর কালী, তীর্থকালী, ইন্দির কালী, রমণী কালী, জীবকালী, ঈশানকালী, রুদ্রকালী, মহাকালী, কালগ্নিরুদ্রকালী, চণ্ডকালী, ধনদাকালী, অষ্টভুজাকালী, সপ্তার্ণকালী, রক্তকালী, সৃষ্টিকালী, সংহারকালী, স্থিতিকালী, স্বকালী, মৃত্যুকালী ,আদ্যাকালী, রক্ষাকালী, কামকলাকালী, হংসকালী, প্রজ্ঞাকালী, বশীকরণকালী, যমকালী, পরমার্থকালী এবং মহাভৈরবঘোর কালী নামে ডাকা হয়ে থাকে মা কালীকে। তবে এইকটি নাম ছাড়াও আরও অসংখ্য নামে ডাকা হয় মা কালীকে।

তোড়লতন্ত্রে আট প্রকার কালীর উল্লেখ থাকলেও ‘মহাকাল সংহিতা’ গ্রন্থে মোট নয় প্রকার কালীর পুজো করার বিধান দেওয়া হয়েছে। এঁরা হলেন দক্ষিণাকালী, গুহ্যকালী, শ্মশানকালী ,ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, সিদ্ধকালী, মহাকালী, চামুণ্ডাকালী ও আদ্যাকালী। এবার জেনে নেব এই নবকালীর পরিচয়।

দক্ষিণাকালী

বাংলায় মা কালীর সবচেয়ে প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ মূর্তি হল দক্ষিণাকালী মূর্তি। অনেক তন্ত্রশাস্ত্রী বলে থাকেন মা দক্ষিণাকালীই দেবী কালিকার প্রধান রূপ। দক্ষিণাকালীর প্রতিমায় দেবীর ডান পা অবস্থান করে শিবের বুকে, তাই দেবী কালিকার এই রূপের নাম দক্ষিণাকালী। আবার অনেক শাস্ত্রজ্ঞ বলে থাকেন, দক্ষিণ দিকে যমের আবাস এবং যে কালী প্রতিমা দর্শনে যমও ভয়ে স্থানত্যাগ করেন তিনিই দক্ষিণাকালী।

মা দক্ষিণাকালী দিগম্বরী, মুক্তকেশী, করালবদনা ও চতুর্ভুজা। প্রকাণ্ড জিহ্বাটি মুখের বাইরে অবস্থান করছে। জিহ্বাকে ছুঁয়ে আছে উপরের পাটির দুধসাদা দাঁতগুলি। গায়ের রঙ ঘোর অমানিশার মতো কালো। দক্ষিণা কালীর ত্রিনয়নের নীচে সূর্য, চন্দ্র এবং অগ্নির প্রতীক আঁকা থাকে। দেবীর দুই কানে অলঙ্কার হিসেবে ঝুলতে থাকে দু’টি শবদেহ। তাঁর কণ্ঠে শোভা পায় ৫১ বা ১০৮ টি নরমুণ্ড দিয়ে গাঁথা মুণ্ডমালা। দেবীর নিম্নাঙ্গ ঢাকা থাকে নরহস্ত দিয়ে প্রস্তুত করা কটিবাস দিয়ে। দেবীর উপরের বাম হাতে থাকে শক্তির প্রতীক খড়্গ। খড়্গের বুকে একটি চোখ আঁকা থাকে। দেবীর নীচের বাম হাতে থাকে নরমুণ্ড। উপরের ডান হাত ও নীচের ডান হাত থাকে বর ও অভয় মুদ্রায়। বাংলার বেশিরভাগ মন্দিরে দক্ষিণা কালীর পুজো করা হয়।

মা গুহ্যকালী

দুর্গম অসুর অবিশ্বাস্যভাবে চতুর্বেদের অধিকার লাভ করার পর পৃথিবীর বুকে দেখা দিয়েছিল চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা। দেবতারা ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় ও স্বর্গ বেদখল হয়ে যাওয়ায় পৃথিবীর অবস্থাও হয়েছিল অত্যন্ত শোচনীয়। জলের দেবতা বরুণদেব দৈবশক্তি হারানোয় পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছিল প্রবল খরা। পৃথিবীর আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছিল মৃত্যুপথযাত্রীদের আর্তনাদ। সেই কাতর আর্তনাদ বিচলিত করেছিল দেবী পার্বতীকে। তাঁর সর্বাঙ্গ জুড়ে সৃষ্টি হয়েছিল একশত চক্ষু। দেবী পার্বতী পরিণত হয়েছিলেন দেবী শতাক্ষীতে। একশত চক্ষু থেকে অবিশ্রান্তভাবে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছিল অশ্রু। দেবী শতাক্ষীর অশ্রুজলে আবার সজল হয়ে উঠেছিল বসুন্ধরা। দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে দেবী শতাক্ষীর শরীর থেকে সৃষ্টি হয়েছিলেন মা গুহ্যকালী।

মা কালীর অতীব ভয়ঙ্কর রূপ হলেন মা গুহ্যকালী। দেবী দ্বিভুজা, গায়ের রঙ ঘন কালো মেঘের মতো। মাথায় জটা, সেই জটার ওপর অবস্থান করছে অর্ধচন্দ্র। জিহ্বাটি মুখের বাইরে অবস্থান করছে। মা গুহ্যকালীর গলায় শোভা পায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ড দিয়ে গাঁথা মালা। দু’টি কান থেকে ঝুলছে দু’টি শবদেহ। মায়ের কোমরে ঘনকালো কটিবাস। মায়ের কাঁধ থেকে পৈতার মতো ঝুলে আছে সাপ। এমনকি মাকে চারদিক থেকে ঘিরে আছে ফণা তোলা সাপের দল। মায়ের বাম কঙ্কণে বিরাজ করছে তক্ষক ও ডান কঙ্কণে নাগরাজ। গৃহস্থ বাড়িতে মা গুহ্যকালীর পুজো হয় না। সাধারণত সাধকরাই এই কালীর আরাধনা করে থাকেন। বীরভূম জেলার আকালীপুর গ্রামে আছে মা গুহ্যকালীর মন্দির। ব্রাহ্মণী নদীর তীরে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত মা গুহ্যকালীর মন্দিরটি বাংলার অন্যতম বিখ্যাত গুহ্যকালী মন্দির। জনশ্রুতি বলে, গুহ্যকালী মায়ের মূর্তিটি নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং মগধরাজ জরাসন্ধ।

মা শ্মশান কালী

শ্মশান কালীর নাম শোনেননি এমন মানুষ বাংলাতে নেই। মা শ্মশান কালীর গায়ের রঙ কাজলের মতো কালো। এলোকেশী মায়ের চোখ দুটি রক্তবর্ণ। কপালে শোভা পায় অর্ধচন্দ্র। শরীরে শোভা পায় নানান অলঙ্কার। মায়ের ডান হাতে নরমুণ্ড ও বাম হাতে নরকরোটি নির্মিত পানপাত্র। মা দাঁড়িয়ে আছেন শবরূপী মহাদেবের ওপর। গৃহস্থবাড়িতে শ্মশান কালীর পূজা হয় না।

শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন গৃহস্থের বাড়িতে শ্মশানকালীর ছবি রাখাও উচিত নয়। তান্ত্রিকেরা মদ ও মাংস দিয়ে শ্মশান কালীর পূজা করে থাকেন। তবে বীজমন্ত্র ছাড়া পূজার বাকি পদ্ধতি দক্ষিণা কালীর পূজার মতোই। শোনা যায় কাপালিকেরা যখন শবের ওপর বসে ধ্যান করতেন, তখন তাঁরা শ্মশান কালীর রূপটিকেই চোখের সামনে ভাসিয়ে রাখতেন। প্রাচীনকালে ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে শ্মশান কালীর পুজো করে দেবীর সামনে নরবলি দিয়ে যেত। পশ্চিমবাংলার বেশিরভাগ শ্মশানে শ্মশান কালীর পূজা করা হয়। কোনও কোনও শ্মশানে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে শ্মশান কালীর নিত্যপূজা করা হয়। আবার কোথাও কোথাও শ্মশানে বছরে একবার মায়ের পূজা হয়।

মা ভদ্রকালী

দেবী কালিকার মঙ্গলময়ী রূপটি প্রকাশ পায় মা ভদ্রকালীর মূর্তিতে। মা ভদ্রকালীর গায়ের রঙ অতসীফুলের মতো। মাথায় জটা, জটার ওপর বিরাজ করে মুকুট ও অর্ধচন্দ্র। ত্রিনয়ন থেকে নির্গত হয় অতীব উজ্জ্বল জ্যোতি। মায়ের কর্ণে শোভা পায় আভাযুক্ত কর্ণকুণ্ডল। গলায় ঝোলে নাগহার। মা ভদ্রকালীর ষোলটি হাত। সেই হাতগুলিতে মা ধারণ করে আছেন শূল, চক্র, খড়্গ, শঙ্খ, বাণ, শক্তি, বজ্র, দণ্ড, খেটক, চর্ম্ম, চাপ, পাশ, অঙ্কুশ, ঘণ্টা, পরশু, মুশল। মহাভারত, কালিকাপুরাণ ও দেবীপুরাণে দেবী দুর্গাকেই ভদ্রকালী বলা হয়েছে। কখনও তিনি দক্ষযজ্ঞবিনাশিনী। কখনও তিনি মহিষাসুরমর্দিনী। কখনও তিনি ভয়ংকরী চামুণ্ডারূপিণী। মা দুর্গার মতোই ভদ্রকালীর বাহন সিংহ।

মার্কণ্ডেয় পুরাণেও মহিষাসুরমর্দিনী দেবী চণ্ডী এবং দেবী ভদ্রকালী একই দেবী। দেবী ভদ্রকালীর মূর্তিতেও তার প্রমাণ মেলে। ভদ্রকালী মায়ের মূর্তিতে দেখা যায়, সিংহের পিঠে দাঁড়িয়ে মা ভদ্রকালী বাম পা দিয়ে আক্রমণোদ্যত মহিষাসুরকে আঘাত করে শূলবিদ্ধ করেছেন। আবার মা সরস্বতীকেও ভদ্রকালী বলা হয়। যা সরস্বতী পূজার পুষ্পাঞ্জলির মন্ত্র থেকেই আমরা বুঝতে পারি। তন্ত্রমতে দেবী ভদ্রকালী হলেন পাতালের দেবী। তন্ত্রসার গ্রন্থে দেবী ভদ্রকালীর একটি রূপের বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে দেবীর মঙ্গলময়ী রূপ অদৃশ্য। অতীব ভীষণা মা ভদ্রকালী মুক্তকেশী, দুই হাতে মা ধারণ করে আছেন অগ্নিপাশ। তাঁর দাঁতগুলির রঙ পাকা জামের মতো। আবার সারদাতিলক ও প্রপঞ্চসার গ্রন্থ অনুযায়ী মা ভদ্রকালীর গায়ের রঙ ঘনমেঘের মতো। কপালে অর্ধচন্দ্র। ত্রিনয়না দেবীর দাঁত ধবধবে, মাথায় জটা। চতুর্ভুজা দেবী চার হাতে ধরে আছেন ত্রিশূল,পরশু, নরকপাল ও ডমরু ।

মা রক্ষাকালী

মা রক্ষাকালী কখনও দ্বিভুজা, কখনও চতুর্ভুজা। ঘোর অমানিশার মতো গায়ের রঙ। নয়নদুটি রক্তবর্ণ, গলায় ঝোলে মুণ্ডমালা ও নাগহার। পরনে ব্যাঘ্রচর্ম নির্মিত কটিবাস। ডান হাত দুটিতে থাকে খড়্গ ও নীলপদ্ম। বাম হাত দুটিতে ধরে থাকেন খর্পর এবং অসি। বাম পা শবদেহের বুকে ও ডান পা থাকে সিংহের পিঠে। মা রক্ষাকালীর মূর্তির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল বেশিরভাগ মূর্তিতেই মায়ের জিহ্বা দেখা যায় না।

অনেক শাস্ত্রজ্ঞ বলে থাকেন মা রক্ষাকালী আসলে মা দক্ষিণাকালীরই গৃহস্থ রূপ। প্রাচীনকালে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মহামারী, দুর্ভিক্ষ থেকে গ্রাম ও নগরের রক্ষা করার জন্য মা রক্ষাকালী পূজা করা হত। বসন্তের শেষ থেকে বর্ষার আগমনের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত শনি অথবা মঙ্গলবারে তান্ত্রিক মতে মা রক্ষাকালীর পূজা করা হয়। পূজার পরদিনই প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।

মা সিদ্ধকালী

মা সিদ্ধকালী হলেন সাধকদের কালী। তাই গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পূজা করার নিয়ম নেই। কালীতন্ত্র অনুযায়ী মা সিদ্ধকালী মুক্তকেশী, দিগম্বরা, ত্রিনয়নী ও সালঙ্কারা। মাথায় মুকুট, নীলপদ্মের মতো গায়ের রঙ। দেবীর দুই কানে শোভা পাচ্ছে চন্দ্র ও সুর্য্যের মতো উজ্জ্বল কর্ণকুণ্ডল। দ্বিভুজা দেবীর ডান হাতে খড়্গ এবং বাম হাতে নরকরোটি নির্মিত অমৃতের পাত্র। খড়্গ দিয়ে চাঁদের বুক বিদীর্ণ করেছেন দেবী। চাঁদ থেকে ঝরে পড়া অমৃত পান পাত্রে ধরে পান করছেন দেবী। অমৃতরসে ভিজে গিয়েছে দেবীর সর্বাঙ্গ।

 

এই দেবীর আরাধনা পদ্ধতি বেশ জটিল। সাধক ছাড়া সে পদ্ধতি অবলম্বন করে মা সিদ্ধকালীর করুণালাভ করা গৃহস্থের পক্ষে সম্ভব নয়। সেই কঠিন পথ ধরে, বছরের পর বছর মা সিদ্ধকালীর সাধনা করে, সিদ্ধিলাভ করেন সাধকেরা।

মা মহাকালী

শ্রী শ্রী চণ্ডীতে মা মহাকালীর আবির্ভাবকে সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। শ্রীবিষ্ণুর কর্ণ থেকে জন্ম নিয়েছিল মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুর। অসুরদ্বয় প্রজাপতি ব্রহ্মাকে আক্রমণ করলে ব্রহ্মা শ্রীবিষ্ণুর স্তব করেছিলেন। কিন্তু শ্রীবিষ্ণু তখন ছিলেন যোগনিদ্রায়। উপায় না দেখে ব্রহ্মা তখন আদিশক্তি মহাদেবীর স্তব শুরু করেছিলেন। তুষ্ট মহাদেবী তখন শ্রীবিষ্ণুর যোগনিদ্রা ভঙ্গ করেছিলেন। ধারণ করেছিলেন তাঁর অসুরবিনাশিনী ভৈরবী রূপ। আবির্ভাব ঘটেছিল শ্রী শ্রী মহাকালীর।

তন্ত্রসার মতে মহাকালীর গায়ের রঙ ঘন নীল। তিনি দশভুজা ও পঞ্চদশ নয়না ( মতান্তরে ত্রিংশ লোচনা)। তাঁর দশ হাতে থাকে খড়্গ চক্র, গদা, ধনুক, বাণ, পরিঘ, শূল, ভূসুণ্ডি, নরমুণ্ড ও শঙ্খ। তন্ত্রশাস্ত্রের পণ্ডিতেরা বলেন, আরাধনার শুরুতে মা মহাকালী সাধককে বিভিন্নভাবে ভয়ভীত করে তোলার চেষ্টা করেন। ভয়কে জয় করে সাধক তাঁর সাধনায় সফল হলে তবেই মা মহাকালী সাধককে সিদ্ধি দান করেন।

মা চামুণ্ডা কালী

দেবীভাগবত ও মার্কণ্ডেয় পুরাণ থেকে জানা যায়, চণ্ড ও মুণ্ড নামের দুই অসুরকে বিনাশ করার জন্য মা দুর্গার ললাট থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন মা চামুণ্ডা কালী। চণ্ড ও মুণ্ডকে বিনাশ করেছিলেন বলেই তাঁর নাম চামুণ্ডা। বৃহৎ তন্ত্রসার গ্রন্থ থেকে জানা যায়, শবদেহের ওপর বসে থাকা মা চামুণ্ডা কালীর গায়ের রঙ অন্ধকার রাত্রির মতো। চুলের রঙ বাদামি। মুখের ভেতরে থেকে বেরিয়ে এসেছে বিশাল ও রক্তাভ জিহ্বা। দেবীর গলায় ঝোলে মুণ্ডমালা, কখনও তাঁর নাভির কাছে আঁকা থাকে বিছের ছবি। পরনে বাঘের ছাল। দাঁতগুলি আকারে বড় ও অতীব ভয়ঙ্কর।

চতুর্ভুজা দেবী তাঁর ডানদিকের হাত দুটিতে ধারণ করে আছেন খট্টাঙ্গ ও বজ্র। বামদিকের হাত দুটিতে ধারণ করে আছেন পাশ ও নরমুণ্ড। দুর্গাপূজার সময় অনুষ্ঠিত সন্ধিপূজায় মা চামুণ্ডা কালীর পূজা করা হয়। এছাড়াও দুর্গাপূজার সপ্তমীর দিন সকালে মণ্ডপে কলাবউ প্রবেশের আগে মা চামুণ্ডা কালীর পূজা করা হয়। অগ্নিপুরাণ মতে মা চামুণ্ডা কালীর আটটি রূপ আছে। কোনও কোনও শাস্ত্রজ্ঞ বলেন, মা কালীর মঙ্গলময়ী রূপটি তুলে ধরার জন্য কিছু শাস্ত্রে মা চামুণ্ডা কালীর উগ্ররূপকে পরিবর্তন করে শান্তস্বভাবা কল্যাণময়ী রূপ দেওয়া হয়েছে। তবে কল্যাণময়ী রূপ দেওয়া হলেও মা চামুণ্ডা কালীর আরাধনা গৃহস্থের বাড়িতে করার বিধান নেই। চামুণ্ডা কালী মায়ের পূজার অধিকারী কেবল সাধকেরাই।

মা আদ্যাকালী

মা আদ্যাকালীর গায়ের রঙ ঘন মেঘের মতো। মুখ থেকে জিভ সামান্য বেরিয়ে থাকে। চতুর্ভুজা আদ্যাকালী মায়ের চার হাতের বাম হাত দুটিতে থাকে অসি ও নরমুণ্ড। ডান হাত দুটি থাকে বরাভয় ও বরদা মুদ্রায়। কপালে চন্দ্রকে ধারণ করে থাকা ত্রিনয়নী মা রক্তবস্ত্র পরে রক্তপদ্মের ওপর বসে থাকেন। তবে এই রূপের ব্যতিক্রমও আছে। কোনও কোনও মূর্তিতে সামনের দিকে মাথা করে মহাদেবকে শুয়ে থাকতে দেখা যায় মায়ের পদতলে। মহাদেবের মাথার জটা দেখা যায়, কিন্তু মুখ দেখা যায় না। কোনও কোনও মূর্তিতে আদ্যাকালী মাকে লালপেড়ে সাদা শাড়িতে দেখতে পাওয়া যায়।

মহানির্বাণ তন্ত্রে মা আদ্যাকালীর বর্ণনা পাওয়া যায়। শাস্ত্রজ্ঞেরা বলেন এই দেবী কালস্বরূপা এবং আদিভূতা সনাতনী। তাই তিনি সবার মা। গৃহী থেকে সাধক, সবাই তাঁর পূজা করতে পারেন। সকলের মনোকামনা পূরণ করেন এবং ভক্তের দারিদ্র নাশ করেন মা আদ্যাকালী।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.