HeaderDesktopLD
HeaderMobile

প্রতিমা ছাড়াই গ্রামবাংলা যেভাবে করে থাকে কোজাগরি লক্ষ্মীর আরাধনা

0 26

সংসারের মঙ্গল কামনায় অনেকে বছরের প্রত্যেক বৃহস্পতিবার ধনসম্পদ, আধ্যাত্মিক সম্পদ, সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী শ্রী শ্রী লক্ষ্মীর আরাধনা করে থাকেন। অনেক গৃহস্থ বাড়িতে ভাদ্র সংক্রান্তি, পৌষ সংক্রান্তি, চৈত্র সংক্রান্তি ও দীপাবলিতে শ্রী শ্রী লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা করা হয়। তবে শারদীয় দুর্গোৎসবের পর, পূর্ণিমা তিথিতে কোজাগরি লক্ষ্মী আরাধনাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ আরাধনা বলে মানেন সনাতন ধর্মের শাস্ত্রজ্ঞেরা। শাস্ত্র অনুসারে মাটির লক্ষ্মী প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে কোজাগরি লক্ষ্মীপুজো করার চল আছে সারা বাংলায়। কিন্তু কোজাগরি লক্ষ্মীপুজোর দিন প্রতিমা ছাড়াও নানারূপে পূজিতা হন মা লক্ষ্মী গ্রামীণ বাংলায়।

লক্ষ্মী সরা

গ্রামীণ বাংলার পটচিত্রে মা লক্ষ্মী বিরাজ করছেন কয়েক শতাব্দী ধরে। ওপার বাংলায় মাটির সরায় মা লক্ষ্মীর ছবি এঁকে সেই ছবিকে পূজা করা হয়। মা লক্ষ্মী চিত্র সম্বলিত মাটির সরাগুলিকে বলা হয় ‘লক্ষ্মী সরা’। তবে কেবলমাত্র পূর্ব-বঙ্গেই নয়, পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন এলাকাতেও কোজাগরি লক্ষ্মী পুজোর দিন, লক্ষ্মীসরা প্রতিষ্ঠা করে লক্ষ্মীপুজো করার চল আছে। প্রায় প্রতিটি সরাতেই মা লক্ষ্মীর সঙ্গে বিরাজ করেন জয়া-বিজয়া ও বাহন লক্ষ্মী প্যাঁচা। কখনও কখনও লক্ষ্মী সরায় উঠে আসেন সপরিবারে মা দুর্গা, এমনকি রাধা কৃষ্ণও।

লক্ষ্মী ঘট

এগুলি আসলে পোড়ামাটির ঘট। শস্য সম্পদের দেবী মা লক্ষ্মীর মুখ সম্বলিত পোড়া মাটির ঘটে চাল বা নদীর জল ভরে ঘটটিকে মা লক্ষ্মীর প্রতীক হিসেবে জলচৌকিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর ঘটটিকে মা লক্ষ্মী কল্পনা করে যথোপচারে পূজা করেন গৃহবধূরা।

আড়ি লক্ষ্মী

গ্রামবাংলার বহু গৃহস্থ বাড়িতে সাবেক প্রথা মেনে আড়ি লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। একটি ছোট বেতের ঝুড়ি বা কুনকেতে নতুন ওঠা ধান ভরে, ধানের ওপরে লাল চেলিতে মুড়ে দুটি সিঁদুর কৌটো রাখা হয়। এই ঝুড়িটিকেই মা লক্ষ্মীর শস্যদাত্রী ও সৌভাগ্যদাত্রী রূপ হিসেবে কল্পনা করা হয়। আসলে প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামবাংলায় শস্য রাখার ঘর বা গোলাঘরকে মা লক্ষ্মী হিসেবে ভাবা হত। এই ধানভর্তি কুনকেটিই এক্ষেত্রে সেই গোলাঘর বা মা লক্ষ্মীর প্রতীক। কোজাগরি লক্ষ্মীপূজার দিন গৃহবধূরা উপবাস করে, জলচৌকিতে প্রতিষ্ঠা করা আড়ি লক্ষ্মীকে যথোপচারে পূজা করে, মা লক্ষ্ণীর ব্রতকথা ও পাঁচালি পাঠ করে থাকেন।

‘বের’ লক্ষ্মী

নবীন কলাগাছের ছাল লম্বা ও সমান করে কাটার পর, ছালগুলিকে পাকিয়ে নারকেল গাছের নতুন কাঠি দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। এভাবে ন’টি বের তৈরি করা হয়। কলাগাছের বেরগুলির গায়ে তেল-সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকা হয়। এরপর জলচৌকিতে আলপনা দিয়ে তার উপর ন’টি চোঙাকৃতি বের রাখা হয়। বেরগুলিতে পাঁচ প্রকার শস্য ভরে একত্রিত বেরগুলির ওপর একটি শিষ-ডাব রেখে বেরগুলিকে লাল চেলি দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়। এভাবেই অবয়ব ধারণ করেন ‘বের’ লক্ষ্ণী। এরপর গৃহবধূরা সংসারের মঙ্গল-কামনায় নিষ্ঠাভরে মা লক্ষ্মীর আরাধনায় ব্রতী হন।

সপ্ততরী

গ্রামবাংলার অনেক জায়গায় লক্ষ্মীর আসনে সপ্ততরী বসিয়ে মা লক্ষ্মীর আরাধনা করা হয়। সপ্ততরী আসলে সাতটি কলার পেটো দিয়ে তৈরি সাতটি নৌকা। সেই নৌকাগুলিতে রাখা হয় হলুদ, চাল, ডাল, হরিতকি, খুচরো পয়সা ও টাকা। প্রাচীনকালে জলপথে নৌকার সাহায্যে ব্যবসাবাণিজ্য চলত, আর কে না জানে ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’! বড় বড় বণিকেরা সপ্তডিঙা ভাসিয়ে বাণিজ্যে যেতেন। সম্ভবত সেই প্রেক্ষাপট থেকেই সপ্ততরী’কে মা লক্ষ্মী হিসেবে পূজা করার প্রথা শুরু হয়েছিল।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.