HeaderDesktopLD
HeaderMobile

নীল, লাল ও কালো দুর্গা! কী ইতিহাস জড়িয়ে আছে পূজাগুলির সঙ্গে!

0

রূপাঞ্জন গোস্বামী

পুরাণ অনুসারে সনাতন ধর্মের সকল দেবদেবীর গাত্রবর্ণ নির্দিষ্ট। বর্ণগুলি দেবদেবীদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক। যেমন দেবাদিদেব মহাদেব, দেবী গৌরী ও দেবী সরস্বতীর গাত্রবর্ণ শ্বেতশুভ্র। শ্রীবিষ্ণু ও তাঁর দুই অবতার শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরামচন্দ্রের গাত্রবর্ণ সন্ধ্যার মতো নীল। দেবী কালিকা কৃষ্ণবর্ণা। দেবী লক্ষ্মীর গাত্রবর্ণ সোনালি। সিদ্ধিদাতা গণেশের গাত্রবর্ণ পদ্মের মতো গোলাপি।

কিন্তু দেবী দুর্গা শতরূপা। তাই তাঁর নানা অবতারের অঙ্গে প্রকৃতির নানা রং। যেমন দেবী শাকম্ভরীর বর্ণ নীলাভ সবুজ। দেবী কালরাত্রি ও দেবী যোগমায়া ঘন নীলবর্ণা। দেবী ধূমাবতী ও দেবী কৌশিকী কৃষ্ণকায়া। দেবী সিদ্ধিদাত্রীর বর্ণ হালকা গোলাপি। দেবী ব্রহ্মচারিণী শ্বেতবর্ণা।

ঘন নীল রঙের দেবী কালরাত্রি, এই দেবীরই পূজা হয় সপ্তমীতে

দেবী দুর্গার বর্ণ কী!

শাস্ত্রমতে দেবী দুর্গার গাত্রবর্ণ অতসী ফুলের মতো হরিদ্রাভ। তবে তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে শাস্ত্রকারদের মধ্যেই। দেবীর গাত্রবর্ণ বোঝাতে অনেক শাস্ত্রকার ব্যবহার করেছেন ‘তপ্তকাঞ্চনবর্ণাভ্যাম্’ শব্দটি। অর্থাৎ দেবীর গায়ের রং উত্তপ্ত সোনার মতো। অন্যদিকে শ্রীশ্রীচণ্ডী বা দুর্গা সপ্তশতীতে দেবতারা বলেছেন, দেবীর মুখে চাঁদের লাবণ্য। অর্থাৎ দেবী শ্বেতবর্ণা। আবার আকাশবাণী থেকে সম্প্রচারিত প্রভাতী বেতার অনুষ্ঠান ‘মহিষাসুরমর্দ্দিনী’তে বলা হয়েছে দেবী ‘অগ্নিবর্ণা অগ্নিলোচনা’।

অতসী ফুলের মতো গায়ের রং, চেনা দুর্গামূর্তি

লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরী, ১৬১০ সালে কলকাতায় প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। তাঁর দুর্গার গায়ের রং ছিল শিউলি ফুলের বৃন্তের মতো। পরবর্তীকালে কলকাতা ও বাংলার বিভিন্ন জায়গায় নানা বর্ণের দুর্গা প্রতিমা বানানো শুরু হয়েছিল। স্থানভেদে দেবীর গাত্রবর্ণ হয়ে উঠেছিল বাসন্তী, সোনালি, কমলা ও গোলাপি। কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা, এই বাংলার বুকে শত শত বছর ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন প্রথাবহির্ভূত বর্ণের দুর্গা। এবং প্রত্যেকটি পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিস্ময়কর ইতিহাস।

লাল দুর্গা

হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে লাল রং হল দেব-দেবীদের তেজ, ক্রোধ, ক্ষমতা, শক্তি, সাহসিকতা, উদ্যমের প্রতীক। সেই লাল রঙের দুর্গা বড়দেবী, পূজিতা হন কোচবিহারের রাজবাড়িতে। পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস। কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের ভাই ও সেনাপতি চিলা রায়, একবার দাদা নরনারায়ণকে হত্যা করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অস্ত্র নিয়ে তিনি একদিন সত্যিই চলে গিয়েছিলেন রাজসভায়। কিন্তু রাজসভায় পৌঁছনোর পর, একটি দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন চিলা রায়। সিংহাসনে বসে ছিলেন মহারাজা নরনারায়ণ। তাঁকে দশ হাত দিয়ে জড়িয়ে ছিলেন দেবী দুর্গা।

আতংক গ্রাস করেছিল চিলা রায়কে। অনুতপ্ত চিলা রায় দাদা নরনারায়ণকে সব জানিয়ে, তাঁর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেছিলেন। অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেছিল মহারাজ নরনারায়ণের চোখ। তিনি সত্যিই পাপী, নাহলে ভাই চিলা রায় দেবীর দর্শন পেল, অথচ তিনি দেবীর উপস্থিতি টেরও পেলেন না! এই ঘটনাটি মহারাজা নরনারায়ণের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনেছিল। আহার নিদ্রা ত্যাগ করেছিলেন নরনারায়ণ। প্রাসাদ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন নির্জন স্থানে।

কোচবিহারে রাজা নরনারায়ণের রাজপ্রাসাদ

তৃতীয় রাত্রিতে মহারাজা নরনারায়ণের স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন দানবদলনী লাল দুর্গা। তিনি মহারাজা নরনারায়ণকে বলেছিলেন, “আমি যে রূপে তোমায় দেখা দিলাম, শরৎকালে তুমি সেই রূপের প্রতিমা স্থাপন করে আমার আরাধনা করবে। আমার আশীর্বাদ সবসময় থাকবে তোমার ওপর।” এরপর মহারাজা নরনারায়ণ, ১৫৬২ সালে, সংকোশ নদীর ধারে চামটা গ্রামে, লাল দুর্গার পূজা শুরু করেছিলেন। আজও কোচবিহারের রাজবাড়িতে নিষ্ঠাভরে পূজিতা হন লাল দুর্গা মা ‘বড়দেবী’।

দানবদলনী লাল দুর্গা বড়দেবী

নবদ্বীপের যোগনাথতলার ভট্টাচার্য বাড়িতে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর ধরে পূজিতা হন লাল দুর্গা। পরিবারের পূর্বপুরুষ রাঘব ভট্টাচার্য (মৈত্র) পূর্ববঙ্গে এই পারিবারিক দুর্গাপূজার সূচনা করেছিলেন। প্রথমে প্রতিমার রং ছিল হরিদ্রাভ। কিন্তু একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে প্রতিমার রং হয়ে গিয়েছিল রক্ত-লাল।

পরিবারসূত্রে জানা যায়, কোনও এক বছর দুর্গা পূজার সময় রাঘব ভট্টাচার্য ভক্তিভরে চণ্ডীপাঠ করছিলেন। পূজায় তন্ত্রধারকের আসনে ছিলেন তাঁর পুত্র রামেশ্বর। চণ্ডীপাঠের সময় কোনও একটি আচারে ত্রুটি হয়ে গিয়েছিল রামেশ্বরের। ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন দেবী দুর্গা। তাঁর গাত্রবর্ণ হয়ে গিয়েছিল রক্তের মতো লাল। দক্ষিণ দিকে থাকা দেবীর মুখ ঘুরে গিয়েছিল পশ্চিমে। দেবীর গাত্রবর্ণ ও দিক পরিবর্তন দেখে রুষ্ট রাঘব পুত্রকে দিয়েছিলেন অভিশাপ। তিনি বলেছিলেন দেবীর পূজা সমাপ্ত হওয়ার আগেই রামেশ্বরের মৃত্যু হবে। ফলে গিয়েছিল রাঘব ভট্টাচার্যের অভিশাপ। দশমীর সন্ধ্যায় মৃত্যু হয়েছিল রামেশ্বরের। সেই থেকে ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গা প্রতিমার রং লাল। আজও দেবী পূজার সময় বেদিতে বসেন পশ্চিমমুখী হয়ে।

নবদ্বীপের ভট্টাচার্য পরিবারের লাল দুর্গা

তবে শুধু কোচবিহার বা নবদ্বীপেই নয়, উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির দুর্গা প্রতিমার রংও লাল। এমনকি পূর্ববঙ্গের পাঁচগাঁওয়ে সর্বানন্দ দাসের বাড়িতেও প্রায় তিনশো বছর ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন লাল দুর্গা।

নীল দুর্গা

শাস্ত্রমতে নীল রং হল শান্তি, সংকল্প ও সুরক্ষার প্রতীক। কৃষ্ণনগরের চট্টোপাধ্যায় পরিবারে যুগের পর যুগ ধরে পূজিতা হয়ে আসছেন নীল দুর্গা। পুজোটি শুরু হয়েছিল পূর্ববঙ্গের বরিশালের বামরাইল গ্রামে। শুরু করেছিলেন পরিবারের পূর্বপুরুষ চিন্তাহরণ চট্টোপাধ্যায়। দেবী প্রতিমার রং আজ অপরাজিতা নীল। কিন্তু পুজোটি শুরুর সময় দেবী প্রতিমার রং ছিল অতসী ফুলের মত হরিদ্রাভ। একটি বিস্ময়কর ঘটনায় দেবী হয়ে গিয়েছিলেন নীলবর্ণা।

প্রতি বছরের মতো সে বছরও ঠাকুরদালানে ঠাকুর গড়ার কাজ করছিলেন বৃদ্ধ মৃৎশিল্পী। রাত পোহালেই পুজো শুরু, কিন্তু তখনও প্রতিমার গায়ে রঙের প্রলেপ পড়েনি। রাত জেগে প্রতিমায় রং করতে শুরু করেছিলেন বৃদ্ধ। পাশে টিম টিম করে জ্বলছিল প্রদীপ। বৃদ্ধ মৃৎশিল্পী অন্ধকারে রং বুঝতে না পেরে, ভুল করে প্রতিমার অঙ্গে দিয়ে ফেলেছিলেন নীল রঙের প্রলেপ। ভোরের আলো ফুটতেই বৃদ্ধ বুঝেছিলেন, শিল্পী জীবনের সবথেকে বড় ভুলটি তিনি করে ফেলেছেন। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল নীলদুর্গার খবর। মানুষের ঢল নেমেছিল চট্টোপাধ্যায় বাড়িতে।

কৃষ্ণনগরের চট্টোপাধ্যায় বাড়ির নীল দুর্গা

মুষড়ে পড়েছিলেন চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সদস্যরা। দেবীকে তাঁর বর্ণ ফিরিয়ে দিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন বৃদ্ধ মৃৎশিল্পী। কিন্তু নীলবর্ণা দেবীকে কিছুতেই আর হলুদ রঙে রাঙানো যায়নি। পরের রাতে দেবী দুর্গাকে স্বপ্নে দেখেছিলেন পরিবারের কর্তা চিন্তাহরণ চট্টোপাধ্যায়। দেবী তাঁকে আদেশ দিয়েছিলেন, তাঁর নীলবর্ণা রূপকেই যথাবিহিত উপচারের মাধ্যমে পুজো করার জন্য। সেই থেকে চট্টোপাধ্যায় পরিবারে পূজিতা হয়ে আসছেন নীল দুর্গা। দেশভাগের পর পরিবারটি চলে এসেছিল পশ্চিবঙ্গে। তবে আজও সাবেক রীতি মেনে নীল দুর্গার পূজা করে কৃষ্ণনগরের চট্টোপাধ্যায় পরিবার। তাঁদের বাড়িটি ‘নীলদুর্গা বাড়ি’ নামে বিখ্যাত।

কালো দুর্গা 

শাস্ত্রমতে কালো রং সাহস, শক্তি, আত্মসংযম ও শৃঙ্খলার প্রতীক। কৃষ্ণবর্ণের দেবদেবীরা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, শত্রুর হাত থেকে ভক্তদের রক্ষা করেন। বিনাশ করেন অশুভশক্তিকে। কৃষ্ণবর্ণা দুর্গার পূজা ভারতে বিরল। তবে দক্ষিণ ভারতের দুর্গা মারিয়াম্মা কৃষ্ণবর্ণা। বাংলাতে কৃষ্ণবর্ণা দুর্গার পুজো হয় বেলেঘাটার ভট্টাচার্য বাড়িতে। এই পরিবারে কৃষ্ণবর্ণা দুর্গার পূজা শুরু হয়েছিল পূর্ববঙ্গের স্থলবসন্তপুরে। নাটোরের রানি ভবানীর আমলে। এই পুজাটির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে একটি কাহিনি।

দক্ষিণ ভারতের মহা মারিয়াম্মারূপী দুর্গা

ভট্টাচার্য পরিবারের পূর্বপুরুষ, জমিদার হরিদেব ভট্টাচার্য ছিলেন কালীভক্ত। সাড়ম্বরে তাঁর বাড়িতে কালীপূজা হত। একদা দেবী দুর্গা হরিদেবের স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাঁকে কৃষ্ণবর্ণা দুর্গার পূজা করার আদেশ দিয়েছিলেন। চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন হরিদেব। কারণ কৃষ্ণবর্ণা দুর্গার পূজা শাস্ত্রসম্মত নয় বলে তাঁর মনে হয়েছিল। কিন্তু দেবীর আদেশ অমান্য করার মতো সাহস তাঁর ছিল না। তাই তিনি বিভিন্ন শাস্ত্রজ্ঞের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের মতামত নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের দেওয়া কোনও ব্যাখ্যা ও বিধানই হরিদেবের মনঃপুত হয়নি।

বাধ্য হয়ে তীর্থভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছিলেন হরিদেব। যদি সাধুসন্তদের কাছ থেকে উপযুক্ত ব্যাখ্যা ও বিধান মেলে। নানা তীর্থ ঘুরে হরিদেব এসেছিলেন বারাণসীতে। গঙ্গার তীরে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল এক প্রাজ্ঞ সন্ন্যাসীর। হরিদেব সেই সন্ন্যাসীকে জানিয়েছিলেন দেবীর আদেশের কথা। চিন্তিত হরিদেবকে সন্ন্যাসী বলেছিলেন, দেবী দুর্গা সপ্তশতীতে কৃষ্ণবর্ণা দুর্গার ব্যাখ্যা আছে। হরিদেবকে দেবী দুর্গার ভদ্রকালী রূপের নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছিলেন সন্ন্যাসী।

বেলেঘাটার ভট্টাচার্য বাড়ির কৃষ্ণবর্ণা দেবী দুর্গা

চিন্তা দূর হয়েছিল হরিদেবের। গ্রামে ফিরে তিনি শুরু করেছিলেন কৃষ্ণবর্ণা দুর্গার পূজা। দেশভাগের পর থেকেই পরিবারটি কলকাতার বাসিন্দা। পূর্ববঙ্গের স্থলবসন্তপুরের কালো দুর্গার পূজা এখন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতার বেলেঘাটায়। পুজোর বয়স পেরিয়ে গিয়েছে তিনশো বছর।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.