HeaderDesktopLD
HeaderMobile

মহালক্ষ্মী একবারই হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র, বধ করেছিলেন কোলাসুরকে

0 50

রূপাঞ্জন গোস্বামী

মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত শহর কোলাপুর, ভারতের অন্যতম প্রাচীন নগর। যে নগরীর উল্লেখ আছে দেবীভাগবত পুরাণেও। এই নগরের ছত্রে ছত্রে এক অকল্পনীয় রূপ নিয়ে মিশে আছেন সৌভাগ্যের দেবী মহালক্ষ্মী। মা লক্ষ্মীর সেই রূপের সঙ্গে আমরা একেবারেই পরিচিত নই। এখানে তিনি ক্রোধান্বিতা, রণরঙ্গিণী রূপধারিণী মা অম্বানি। কিন্তু ঐশ্বর্য, আধ্যাত্মিক সম্পদ, সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী মা লক্ষ্মী হঠাৎ রুদ্ররূপ ধারণ করেছিলেন কেন! শত শত বছর ধরে এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চলেছে এক কিংবদন্তি। যে কিংবদন্তিতে লুকিয়ে আছে কোলাপুর নামের উৎস।

মহালক্ষ্ণী ‘দেবী অম্বানি’

প্রজাপতি ব্রহ্মার  ছিল তিন অসুর সন্তান

তাঁদের নাম ছিল গয়া, লোন ও কোল। তিনজনই ছিলেন ভয়ানক অত্যাচারী ও নৃশংস প্রকৃতির। বাধ্য হয়ে দেবতারা ব্রহ্মার এই তিন সন্তানকে বধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। উত্তর ভারতের ফল্গু নদীর তীরে শ্রীবিষ্ণু বধ করেছিলেন গয়াসুরকে। স্থানটির নাম হয়ে গিয়েছিল গয়া। বিদর্ভের লোনার হ্রদের কাছে শ্রীকৃষ্ণ বধ করেছিলেন লোনাসুরকে। তৃতীয় পুত্র কোলাসুর চলে গিয়েছিলেন রক্ষালয়ে। রক্ষালয়ের অধিপতি অসুররাজ কেশিকে বধ করে রক্ষালয়ের রাজা হয়েছিলেন। স্ত্রী কদম্বা ও চার সন্তানকে নিয়ে রক্ষালয়ে রাজত্ব শুরু করেছিলেন কোলাসুর।

কোলাসুরের চার পুত্রের নাম ছিল করবীর, বিশাল, কুলান্ধক ও লজ্জাসুর। পুত্ররা বড় হওয়ার পর, কোলাসুর চার পুত্রকে রাজ্য ভাগ করে দিয়ে গভীর অরণ্যে গিয়ে দেবাদিদেবের তপস্যা শুরু করেছিলেন। কোলাসুরের চার পুত্র শাসন ক্ষমতা হাতে পেয়ে রক্ষালয়বাসীদের ওপর ভয়ানক উৎপীড়ন করতে শুরু করেছিলেন। কোলাসুরের পুত্রদের অত্যাচারে দিশেহারা জনগণ প্রাণ বাঁচাতে রাজত্ব ছেড়ে দিগবিদিকে পালাতে শুরু করেছিলেন। অসুর চতুষ্টয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রক্ষালয়ের মুনি ঋষিরাও কঠোর তপস্যা করতে শুরু করেছিলেন।

সাড়া দিয়েছিলেন দেবতারা

মুনি ঋষিদের তপস্যায় সাড়া দিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভগবান শঙ্কর। বধ করেছিলেন করবীরাসুরকে। তারপর দু’জায়গায় নামিয়ে রেখেছিলেন তাঁর ত্রিশূল। স্থানদু’টি পরিণত হয়েছিল পুণ্যতীর্থে। তীর্থ দুটির নাম করবীরেশ্বর ও শূলেশ্বর। পরবর্তীকালে শ্রীবিষ্ণু নিজ হাতে এই স্থানে সৃষ্টি করেছিলেন এক সমৃদ্ধ নগর, যাঁর নাম করবীর। বর্তমান মহারাষ্ট্রের কোলাপুরের একটি তহশিল হল করবীর। কথিত আছে, করবীরে এলে মানুষ নাকি সমৃদ্ধি ও মুক্তি দুই’ই লাভ করেন। ভগবান শঙ্করের হাতে করবীরাসুরের মৃত্যুর পর, ভগবান বিষ্ণু কোলাসুরের আর এক পুত্র বিশালাসুরকে সিঙ্গানাপুরে বধ করেছিলেন। সেই স্থানে সৃষ্টি হয়েছিল বিশালতীর্থ। কোলাসুরের পুত্র কুলান্ধক অসুরকে বধ করেছিলেন দেবরাজ ইন্দ্র। সবশেষে কোলাসুরের কনিষ্ঠ পুত্র লজ্জাসুরকে বধ করেছিলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা স্বয়ং।

রক্ষালয়ে ফিরেছিলেন কোলাসুর

চারপুত্রের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ক্রোধে উন্মত্ত কোলাসুর মাঝপথে তপস্যা ভঙ্গ করে ফিরে এসেছিলেন রক্ষালয়ে। রক্ষালয়ের অধিষ্ঠাত্রী মহাদেবীর পূজা শুরু করেছিলেন। পূজায় তুষ্ট হয়ে মহাদেবী উপস্থিত হয়ে কোলাসুরকে বর চাইতে বলেছিলেন। মহাদেবীকে রক্ষালয় ত্যাগ করে একশ বছরের জন্য চলে যেতে বলেছিলেন কোলাসুর। নিরুপায় মহাদেবী কোলাসুরকে সেই বর দিয়ে রক্ষালয় ছেড়ে হিমালয়ে চলে গিয়েছিলেন। মহাদেবী রক্ষালয় ত্যাগ করার পর, একশ বছর ধরে রক্ষালয়বাসীদের ওপর ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়েছিলেন কোলাসুর। কারণ রক্ষালয়বাসীদের আহ্বানেই দেবতারা এসে তাঁর চার পুত্রকে হত্যা করেছিলেন।

একশো বছর ধরে কোলাসুর কত সহস্র নিরপরাধ মানুষের রক্তে রক্ষালয়ের মাটি ভিজিয়েছিলেন কে জানে! রক্ষালয়ের মানুষদের শোচনীয় ও মর্মান্তিক অবস্থা দেখে স্বর্গের দেবদেবীরা মহাদেবীর আরাধনা করতে শুরু করেছিলেন। কোলাসুরের হাত থেকে রক্ষালয়বাসীদের মুক্তি দিতে দেবী ফিরে এসেছিলেন কেদারেশ্বর, মহারগালেশ্বর ও উজ্জলম্বাকে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু নিজেরই দেওয়া বরের কারণে রক্ষালয়ে মহাদেবীর প্রবেশ নিষেধ। তাই দেবী অবস্থান করেছিলেন শ্রীলয়াতে (বর্তমানে সাঙ্গলি জেলার শিরালা তহশিল)।

 সাঙ্গ হয়েছিল মহাদেবীর নির্বাসনকাল

রক্ষালয়ের বাইরে একশো বছর কাটানো দেবী কাত্যায়নী গিয়েছিলেন মহালক্ষ্মীকে নিয়ে আসার জন্য। কারণ কোলাসুরের কারণে সম্পদ ও সৌভাগ্য হারিয়ে শ্রীহীন, বিবর্ণ হয়ে উঠেছিল রক্ষালয়। দেবী কাত্যায়নীর সঙ্গে মহালক্ষ্মীর যেখানে দেখা হয়েছিল, সেই জায়গাটির নাম ‘মঙ্গলে’। শিরালা তহশিলে আজও আছে সেই গ্রামটি।

কোলাসুর বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর অন্তিম সময় আগত। কারণ মহাদেবীর ফিরে আসবার সময় হয়ে গিয়েছে। তবুও বিনাযুদ্ধে মৃত্যুবরণ করবেন না বলে পণ করেছিলেন কোলাসুর। রক্ষালয়ের চার দিক প্রহরায় রেখেছিলেন চার অসুরকে। পূর্ব দিকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন অসুর রক্তলোলকে, পশ্চিমে ছিলেন অসুর রক্তাক্ষ, উত্তরে ছিলেন অসুর রক্তভোজ ও দক্ষিণে অসুর রক্তবীজ। একশো বছরের সময়কাল সমাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেবদেবীরা একযোগে আক্রমণ করেছিলেন রক্ষালয়।

শুরু হয়েছিল দেবাসুরে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ

দেবী উজ্জলম্বা বধ করেছিলেন রক্তলোলকে। ভৈরব ও দেবী কাত্যায়নী বধ করেছিলেন রক্তবীজকে। সিদ্ধা গণেশ হত্যা করেছিলেন পশ্চিম দিকে থাকা অসুর রক্তাক্ষকে। অসুর রক্তভোজ একাই তুমুল লড়াই করে যাচ্ছিলেন উত্তর দিকের রণক্ষেত্রে। রক্তভোজকে বিনাশ করার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন ভগবান কেদারেশ্বর। সৃষ্টি করেছিলেন দেবী চারপাতম্বাকে। দেবী চারপাতম্বা বধ করেছিলেন রক্তভোজকে।

চার সেনানায়ক নিহত হওয়ার পর একাই বীরবিক্রমে লড়াই করে যাচ্ছিলেন কোলাসুর। কোলাসুরের রণনিপুণতায় তুষ্ট হয়েছিলেন ভগবান শঙ্কর। বর দিতে চেয়েছিলেন। কোলাসুর বলেছিলেন, মহাদেবী যেন তাঁর প্রতি রুষ্ট না হন এবং তিনি যেন মহালক্ষ্মীর রূপ ধারণ করে কোলাসুরকে হত্যা করেন। চতুর কোলাসুর জানতেন মহালক্ষ্মী উগ্রস্বভাবা নন। তাই তিনি কোনওদিনই কোলাসুরকে বধ করতে পারবেন না। ফলে কোলাসুরকে বধ করা দেবতাদের পক্ষে কোনওমতেই সম্ভব হবে না। কোলাসুরের প্রার্থনা শুনে, হাসিমুখে মহাদেব কোলাসুরকে তাঁর ইপ্সিত বরই প্রদান করেছিলেন। কোলাসুরের অট্টহাসিতে কেঁপে উঠেছিল রক্ষালয়। কিন্তু পরমুহূর্তেই থেমে গিয়েছিল কোলাসুরের হাসি। বুকের রক্ত জল হয়ে গিয়েছিল।

রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন রণরঙ্গিণী মহালক্ষ্ণী

কোলাসুরকে বিস্মিত করে, কোলাসুরের রণকৌশল ফুৎকারে উড়িয়ে পূর্বদিক থেকে রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হয়েছিলেন আঠারো হাত যুক্ত মহালক্ষ্মী ‘মা অম্বানি’। দেবীর সর্বাঙ্গ ক্রোধে কাঁপছিল। এই অসুরের জন্যই রক্ষালয় আজ শ্রীহীন। এই অসুরের জন্যই আজ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদি পরাশক্তি মহাদেবী স্বয়ং রক্ষালয় থেকে বিতাড়িত। শান্তস্বভাবা মহালক্ষ্মীর এই রুদ্ররূপ দেখে চমকে গিয়েছিলেন কোলাসুর। পরক্ষণেই প্রবল রণহুঙ্কারে রণক্ষেত্র কাঁপিয়ে আক্রমণ করেছিলেন সর্বাস্ত্রধারিণী মহালক্ষ্মীকে।

কোলাসুর জানতেন না রণক্ষেত্রে মহাসংগ্রামের জন্য অবতীর্ণ হওয়া মহালক্ষ্মী, গৃহস্থের সৌভাগ্যের চিন্তায় অধীর, শান্তস্বভাবা, অতি সুরূপিণী মহালক্ষ্মী নন। মহাশক্তির তেজপুঞ্জের প্রতীক মহালক্ষ্মীর এই সংহারমূর্তির সঙ্গে পরিচিত ছিল না বিশ্ব। পরিচিত ছিলেন না দেবদেবীরা। পরিচিত ছিল না পাপিষ্ঠ কোলাসুরও। আশ্বিনের শুদ্ধ পঞ্চমীতে উগ্ররূপা মহালক্ষ্মী ‘মা অম্বানি’ রূপে বধ করেছিলেন কোলাসুরকে। শান্তি ফিরে এসেছিল রক্ষালয়ে। যে স্থানটিতে মহালক্ষ্মী ও কোলাসুরের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল তার নাম লক্ষ্মীতীর্থ। আজও আছে সেই স্থানটি।

মৃত্যুর পুর্বে ভূলুণ্ঠিত কোলাসুর মহালক্ষ্মীর কাছে বর চেয়েছিলেন

কোলাসুর দেবীকে অনুরোধ করেছিলেন রক্ষালয়ের নাম যেন হয় কোলাপুর এবং প্রতিবছর কোলাসুরকে স্মরণ করে একটি কুমড়ো যেন বলি দেওয়া হয়। মৃত্যুপথযাত্রী কোলাসুরের কথা রেখেছিলেন মহালক্ষ্মী। সেই দিন থেকে রক্ষালয়ের নাম হয়ে গিয়েছিল কোলাপুর। শুরু হয়েছিল কুমড়ো বলির প্রথা। আজও দেবী ত্রিয়াম্বুলির সামনে আশ্বিনের শুদ্ধ পঞ্চমীতে কোলাসুররূপী কুমড়ো বলি দেওয়া হয়। আশ্বিনের শুদ্ধ পঞ্চমীকে আজও স্থানীয়রা বলেন ‘কোলা পঞ্চমী’ বা ‘কোহাল পঞ্চমী’। এভাবেই মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত শহর কোলাপুরের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন কোলাসুর ও শক্তিরূপিনী মহালক্ষ্মী ‘মা অম্বানি’

কোলাপুরে অম্বানি দেবীর মন্দির
You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.