HeaderDesktopLD
HeaderMobile

শাক্তমতে পার্বতীর মহাপরাক্রমী রূপ হলেন এই দেবী, বধ করেছিলেন ভণ্ডাসুরকে

0

রূপাঞ্জন গোস্বামী

মদনভস্ম

সতীর দেহত্যাগের পর জগৎসংসার সম্পর্কে নির্লিপ্ত হয়ে গিয়েছিলেন মহাদেব। ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতেন হিমালয়ের গুহায়। আতঙ্কিত হয়েছিল দেবলোক। কারণ ত্রিলোকের প্রতি ত্রিলোকেশ্বর বিমুখ হয়ে থাকলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধ্বংস অনিবার্য। এ ছাড়াও মর্ত্যে তখন তাণ্ডব শুরু করেছিলেন ব্রহ্মার বরে বলীয়ান তারকাসুর। তাঁকে বিনাশ করার জন্য প্রয়োজন মহাদেবের সপ্তমবর্ষীয় পুত্র। কিন্তু সেই পুত্র পেতে গেলে মহাদেবকে সংসারমুখী করতে হবে।চিন্তিত দেবতারা তখন স্মরণাপন্ন হয়েছিলেন কামদেব মন্মথের। স্ত্রী রতিদেবী ও ঋতুরাজ বসন্তকে নিয়ে কামদেব গিয়েছিলেন মহাদেবের কাছে। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনে হিমালয়ে এসেছিল অকাল বসন্ত। ধ্যানমগ্ন মহাদেবের সামনে কামদেব ও রতিদেবী প্রদর্শন করেছিলেন কামনৃত্য। কিন্তু মুদিত নয়ান মহাদেব ছিলেন নির্বিকার। কামদেব তখন মহাদেবের ওপর পুস্পধনু থেকে নিক্ষেপ করেছিলেন কামবাণ।

ধ্যানভঙ্গ হওয়ায় কুপিত হয়েছিলেন মহাদেব। উন্মোচিত হয়েছিল তাঁর তৃতীয় নেত্র। নির্গত হয়েছিল তীব্র তেজরাশি। সেই তেজে ভস্ম হয়ে গিয়েছিলেন কামদেব মন্মথ। স্বামীকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন রতিদেবী। মহাদেব আশ্বাস দিয়েছিলেন, সময় হলেই প্রাণ ফিরে পাবেন কামদেব।

ভস্ম থেকে জন্ম নিয়েছিল এক বালক

মহাদেবের সামনে পড়েছিল কামদেবের দেহভস্ম। মহাদেবের সেনাধ্যক্ষ চিত্রকর্মা, খেলার ছলে সেই ভস্ম দিয়ে গড়েছিলেন একটি পুতুল। সেই পুতুলটির ওপর দৃষ্টি পড়েছিল মহাদেবের। জীবনের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল পুতুলটির মধ্যে। বালকে রূপান্তরিত হয়েছিল পুতুলটি। আনন্দে আত্মহারা চিত্রকর্মা বালকটিকে শিখিয়েছিলেন শত-রুদ্রেয় মন্ত্র, বলেছিলেন প্রাণদাতা ভূতনাথের তপস্যা করার জন্য। বালকটি বসেছিল কঠোর তপস্যায়।তুষ্ট হয়েছিলেন মহাদেব। বালক ভক্তকে দিতে চেয়েছিলেন বর। পশুপতির কাছে অদ্ভুত একটি বর চেয়েছিল বালকটি। সে বলেছিল, “আমাকে এই বর দিন, যে আমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসবে, তার শক্তি হ্রাস পেয়ে অর্ধেক হয়ে যাবে। আর সেই শক্তি আমার দেহে প্রবেশ করবে।” ভক্তকে তার ইপ্সিত বরই দিয়েছিলেন আশুতোষ। এছাড়াও দিয়েছিলেন ষাট হাজার বছর রাজত্ব করার বর। মানসচক্ষে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা। দেবাদিদেবের সঙ্গে প্রতারণা করার জন্য তিনি বালকটিকে বলেছিলেন ‘ভণ্ড’। সেই থেকে নামহীন বালকটির নাম হয়ে গিয়েছিল ‘ভণ্ড’।

ভণ্ড থেকে ভণ্ডাসুর

কামদেবের ভস্ম থেকে একই সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল আরও দুই বালক বিশুক্র ও বিশাঙ্গ এবং কয়েক কোটি দানব। হীনমতি ভণ্ড, ভাই বিশুক্র ও বিশাঙ্গকে নিয়ে, দীর্ঘকালের চেষ্টায় গড়ে তুলেছিলেন এক হাজার অক্ষৌহিণীর এক বিশাল ও অপরাজেয় সেনাবাহিনী। তিন ভাইয়ের কথা জানতে পেরে, দৈত্য ও অসুরদের গুরু শুক্রাচার্য স্বয়ং গিয়েছিলেন ভণ্ডের কাছে। তিনি ভণ্ডকে বলেছিলেন অসুরকূলে যোগ দিতে।শুক্রাচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন ভণ্ড ও তাঁর সেনাবাহিনী। গুরু শুক্রাচার্য ময়দানবকে দিয়ে মহেন্দ্র পর্বতের নীচে নির্মাণ করিয়েছিলেন এক সুরম্য নগররাজ্য শোণিতপুর। ভণ্ডকে করে দিয়েছিলেন শোণিতপুরের রাজা। বিশুক্র ও বিশাঙ্গ হয়েছিলেন যুবরাজ। যুবক ভণ্ড পরিণত হয়েছিলেন অসুররাজ ভণ্ডাসুরে।

প্রমাদ গুণেছিলেন দেবতারা 

সিংহাসনে বসেই ত্রিলোক জুড়ে প্রবল অত্যাচার শুরু করেছিলেন ভণ্ডাসুর। স্বর্গের অধিকার হারানোর আশঙ্কায় দেবতারা আক্রমণ করেছিলেন ভণ্ডাসুরকে। কিন্তু দেবতাদের সঙ্গে হওয়া প্রতিটি যুদ্ধে আরও শক্তিশালী হয়েছিলেন ভণ্ডাসুর। অর্ধেক শক্তি হারিয়ে স্বর্গে ফিরেছিলেন দেবতারা। ভণ্ডাসুরকে বধ করতে না পেরে, কামদেবকে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন দেবতারা। কারণ কামদেব প্রাণ ফিরে ফেলেই অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে, কামদেবের চিতাভস্ম থেকে জেগে ওঠা ভণ্ডাসুর ও তার চেলাচামুণ্ডারা।

দেবতাদের এই অভিপ্রায় জেনে ফেলেছিলেন ভণ্ডাসুর। তাঁর রাজ্যের সমস্ত অসুরকে ডেকে বলেছিলেন, ” কামদেবকে কোনওভাবেই জীবিত হতে দেওয়া যাবে না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা বাতাস হয়ে প্রবেশ করব দেবতা ও প্রতিটি জীবের দেহে। শুকিয়ে দেব তাদের দেহে থাকা সমস্ত রস। নিস্তেজ হয়ে যাবে ত্রিলোক। শুকিয়ে দেব বীর্য। বন্ধ্যা হয়ে যাবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। নিস্তেজ ত্রিলোকের অধীশ্বর হব আমি।” প্রবল হর্ষোল্লাসে মেতে উঠেছিল অসুরেরা, ভণ্ডাসুরের পরিকল্পনা শুনে।

শুকিয়ে গিয়েছিল ত্রিলোক

মায়াবী ভণ্ডাসুর তখন তাঁর এক হাজার অক্ষৌহিণী সেনাকে (প্রায় এগারো কোটি) অদৃশ্য করে মিশিয়ে দিয়েছিলেন বাতাসে। সেই দূষিত বাতাস ছড়িয়ে পড়েছিল ত্রিভুবনে। শুকিয়ে গিয়েছিল দেবতাদের শরীরের জলীয় অংশ। চিন্তাশক্তি হারিয়েছিলেন তাঁরা। হারিয়ে ছিলেন প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা। সৌন্দর্য্য হারিয়ে হয়ে উঠেছিলেন কুৎসিত।

বিশুক্র ও বিশাঙ্গ দূষিত বাতাস হয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন মর্ত্য ও পাতালে। বন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল মর্ত্য ও পাতাল। বিবেক হারিয়ে হানাহানি ও কলহে লিপ্ত হয়েছিল ত্রিলোক। লোপ পেতে বসেছিল সৃষ্টি-স্থিতি-লয়। জরাজীর্ণ দেবতারা গিয়েছিলেন শ্রীহরির কাছে। তিনি দেবতাদের মুখে সব শুনে বলেছিলেন, ত্রিলোকের বাইরে নিরাকারে বিরাজ করছেন সর্বশক্তিমান মহা শম্ভু। তাঁর সঙ্গে বিরাজ করছেন পরাশক্তি। তাঁদের ওপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা ভণ্ডাসুরের নেই। একমাত্র মহাশম্ভুই পারেন ত্রিলোককে উদ্ধার করতে।

দেখা দিয়েছিলেন মহাশম্ভু

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বাইরে গিয়ে শ্রীবিষ্ণু ও দেবতারা শুরু করেছিলেন মহা শম্ভুর স্তব। ঘন কালো মেঘের মতো দেহ ধারণ করে দেখা দিয়েছিলেন নিরাকার ‘মহাশম্ভু’। তাঁর এক হাতে ছিল ত্রিশূল, অন্য হাতে নর-করোটি। তাঁর পাশে বিরাজ করছিলেন চাঁদের আলোর মত স্নিগ্ধ ‘পরাশক্তি’। তাঁর দুই হাতে ছিল, জপের মালা ও পুস্তিকা।মহাশম্ভু দেবতাদের বলেছিলেন, প্রলয় তিন ধরণের। মহা প্রলয়, অবান্তর প্রলয় ও কাম প্রলয়। আমি তোমাদের বাঁচাতে পারি মহা প্রলয় থেকে। শ্রীবিষ্ণু বাঁচাতে পারেন অবান্তর প্রলয় থেকে। কিন্তু কামদেব ভস্ম হওয়ার পর সৃষ্টি হয়েছে কাম প্রলয়। সেই প্রলয় থেকে ত্রিলোককে একমাত্র উদ্ধার করতে পারেন, পরাশক্তির সৃষ্টি করা দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী। সেই নবাগতা দেবীই সৃষ্টি করবেন এক পরমব্রহ্ম পুরুষ, তাঁর নাম কামেশ্বর। দেবী স্বয়ং হবেন তাঁর প্রকৃতি, কামেশ্বরী। এই দু’জন দেবদেবী নতুন করে সৃষ্টি করবেন আগের থেকেও সুন্দর এক ব্রহ্মাণ্ড। জন্ম দেবেন জীবকুলের। দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরীই বধ করবেন ভণ্ডাসুরকে। বাঁচিয়ে তুলবেন কামদেব মন্মথকে।

কামেশ্বর কামেশ্বরী

মহাশম্ভুর মহাযজ্ঞ

পরাশক্তির স্তব শুরু করেছিলেন দেবতারা। তুষ্ট হয়েছিলেন পরাশক্তি। বায়ু হয়ে ত্রিলোকে প্রবেশ করেছিলেন মহাশম্ভু। বায়ুশক্তি হয়ে মহা শম্ভুর সঙ্গেই ত্রিলোকে প্রবেশ করেছিলেন পরাশক্তি। মহাশম্ভু শুকিয়ে দিয়েছিলেন সপ্ত সাগরের একটি সাগর। হোমকুণ্ডে পরিণত হয়েছিল সাগরটি। মহাশম্ভুর তৃতীয় নেত্র থেকে নির্গত হওয়া আগুনে, দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করেছিল শূন্য সাগরের বুক।

শুরু হয়েছিল মহাশম্ভুর মহাযজ্ঞ। ললিতা মন্ত্র উচ্চারণ করতে শুরু করেছিলেন যজ্ঞের পুরোহিত মহা শম্ভু। অজানা এক আশংকায় কাঁপতে শুরু করেছিলেন ভণ্ডাসুর। মহাশম্ভুর নির্দেশ মতো যজ্ঞের আগুনে একে একে আত্মাহুতি দিতে শুরু করেছিলেন দেবতারা। এক সময় অগ্নিকুণ্ড থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ত্রিলোকের সব থেকে রূপবতী নারী। দেবী ললিতা বা ত্রিপুরাসুন্দরী। শাক্তমতে যিনি দেবী পার্বতীর সর্বোচ্চ ও মহাপরাক্রমী  রূপ। তিনিই শ্রীবিদ্যা। তিনিই মহাবিদ্যাদের অন্যতমা। তিনিই দেবী ষোড়শী, কামেশ্বরী, রাজ-রাজেশ্বরী ও ললিতা গৌরী।চতুর্ভুজা দেবীর গাত্রবর্ণ কাঁচা সোনার মতো। শ্রীচক্রে আসীন দেবী, চারটি হাতে ধারণ করে ছিলেন নাগপাশ, অঙ্কুশ, ইন্দ্রধনু ও বাণ। তাঁর পরনে ছিল লাল ও হলুদ রঙের বস্ত্র। সিঁথিতে সিঁদুর। লাবণ্যময়ী দেবীর দেহ থেকে নির্গত হচ্ছিল শতসহস্র সূর্যের তেজ। দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরী প্রথমেই যজ্ঞের আগুনে আত্মবিসর্জন দেওয়া দেবতাদের প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

এরপর দেবীর পদযুগল থেকে সৃষ্টি হয়েছিল নতুন এক পৃথিবী। কেশ থেকে সৃষ্টি হয়েছিল অন্ধকার। দেবী তাঁর হৃদয় থেকে সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর বাল্যরূপ। আবির্ভূতা হয়েছিলেন দেবী ‘বালা ত্রিপুরাসুন্দরী’। কুণ্ডলিনী থেকে সৃষ্টি করেছিলেন দেবী গায়ত্রীকে। অহংবোধ থেকে সৃষ্টি করেছিলেন দেবী বরাহীকে। বুদ্ধি থেকে সৃষ্টি করেছিলেন দেবী মাতঙ্গীকে। এভাবেই সৃষ্টি করেছিলেন দেবী সম্পতকারী, দেবী অশ্বারূঢ়া, দেবী নকুলেশ্বরী, দেবী জ্বালামালিনী ও আরও অসংখ্য শক্তিদেবীকে।

দেবী বালা ত্রিপুরাসুন্দরী

শুরু হয়েছিল ভয়ঙ্কর যুদ্ধ

আবির্ভাবের পর কালক্ষেপ না করে, দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী তাঁর শ্রী-চক্র রথে চড়ে, তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন শোণিতপুরের দিকে। রণসাজে সজ্জিতা হয়ে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বালা ত্রিপুরাসুন্দরী, দেবী সম্পতকারী, দেবী অশ্বারূঢ়া, দেবী বরাহী ও দেবী মাতঙ্গী। দূর থেকে দেবী ত্রিপুরাসুন্দরীর শঙ্খনিনাদ শুনতে পেয়েছিলেন ভণ্ডাসুর। চর এসে খবর দিয়েছিল, শোনিতপুরের দিকে এগিয়ে আসছে দেবীদের এক বিশালবাহিনী।

দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী

অট্টহাসিতে ভূবন কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ভণ্ডাসুর। নারীদের সঙ্গে নিজে যুদ্ধে লিপ্ত হলে অসুরকুলের কাছে সম্মান হারাবেন, তাই বলদর্পী ভণ্ডাসুর তাঁর তিরিশ জন পুত্রকে পাঠিয়েছিলেন রণক্ষেত্রে। পুত্রদের সঙ্গে ছিল কয়েকশো অক্ষৌহিণী অসুরসেনা। প্রবল গর্জন করতে করতে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন ভণ্ডাসুরের তিরিশ জন পুত্র। স্মিত হেসেছিলেন দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী। তাঁর ইশারায় ভীষণ মূর্তি ধারণ করে, রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেবী ‘বালা ত্রিপুরাসুন্দরী’। শুরু হয়েছিল ভয়ঙ্কর যুদ্ধ। ভণ্ডাসুরের তিরিশ জন পুত্রকে একে একে বধ করেছিলেন বালা ত্রিপুরাসুন্দরী। বধ করেছিলেন তাদের সঙ্গে আসা অসুরদেরও।খবর গিয়েছিল ভণ্ডাসুরের প্রাসাদে। পুত্রদের হারিয়ে উন্মাদপ্রায় ভণ্ডাসুর রণক্ষেত্রে পাঠিয়েছিলেন তাঁর ভাই বিশাঙ্গকে। দেবী মাতঙ্গী রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন বিশাঙ্গের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য। প্রবল যুদ্ধের পর, দেবী মাতঙ্গীর হাতে নিহত হয়েছিলেন বিশাঙ্গ ও তাঁর সৈন্যদল। এরপর রণক্ষেত্রে এসেছিলেন বিশুক্র। দেবী ত্রিপুরাসুন্দরীর আদেশে ভয়াবহ মূর্তি ধারণ করে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন দেবী বরাহী। বধ করেছিলেন বিশুক্র ও তাঁর সৈন্যদলকে। মৃত্যুর আগে বিশুক্র, রণক্ষেত্রে স্থাপন করে গিয়েছিলেন জয়-বিঘ্ন-যন্ত্র। দেবীর সেনাবাহিনী অসুরের মায়ায়, পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। এক পা এগোবার মতোও শক্তি ছিল না কারও দেহে।

পুত্র ও ভাইদের হারিয়ে ক্রোধে উন্মত্ত ভণ্ডাসুর, ভীষণ মূর্তি ধারণ করে নিজেই রণক্ষেত্রের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল অবশিষ্ট কয়েক অক্ষৌহি অসুরসেনা। দেবীর সেনাবাহিনী তখনও নিশ্চল। যদিও জয়-বিঘ্ন-যন্ত্রের প্রভাব পড়েনি দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী, দেবী বালা ত্রিপুরাসুন্দরী, দেবী সম্পতকারী, দেবী অশ্বারূঢ়া, দেবী বরাহী ও দেবী মাতঙ্গীর ওপর। দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী তখন কামেশ্বরী রূপ ধারণ করে মিলিত হয়েছিলেন কামেশ্বরের সঙ্গে। জন্ম নিয়েছিলেন মহা গণপতি। তিনি ধ্বংস করেছিলেন জয়-বিঘ্ন-যন্ত্র। পুনরায় সচল হয়ে উঠেছিল দেবীর সৈন্যবাহিনী।

দেবীর সঙ্গে ভণ্ডাসুরের যুদ্ধ

রক্তজল করে দেওয়া রণহুংকার দিয়ে রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী। যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ভণ্ডাসুরের সঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভণ্ডাসুর অনুভব করেছিলেন, শিবের বরের প্রভাব পড়ছেনা দেবীর ওপর। কণামাত্র হ্রাস পাচ্ছেনা দেবীর শক্তি। বরং তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি জানতেন না পরাশক্তির অংশ দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী, তাই তাঁর ওপর মহাদেবের বরেরও প্রভাব ফেলার ক্ষমতা নেই।তবুও উন্মাদের মতো চিৎকার করতে করতে, দেবী ত্রিপুরাসুন্দরীর ওপর খড়গ হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ভণ্ডাসুর। কিন্তু দেবীর গতি আলোকের চেয়েও দ্রুত। চকিতে ভণ্ডাসুরের দেহে আঘাত হেনে দূরে সরে যাচ্ছিলেন দেবী। রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছিল ভণ্ডাসুরের দেহ। দেবীর সঙ্গে নিজে যুদ্ধে এঁটে উঠতে না পেরে, রক্তস্নাত ভণ্ডাসুর মায়াবলে সৃষ্টি করতে শুরু করেছিলেন সেই সমস্ত রাক্ষস, দৈত্য ও অসুরদের, যাদের বধ করেছিলেন শ্রীবিষ্ণুর অবতারেরা। রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন হিরণ্যকশিপু থেকে শুরু করে রাক্ষসরাজ রাবণ।দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী তখন তাঁর দশ নখে সৃষ্টি করেছিলেন শ্রীবিষ্ণুর দশ অবতারকে। তাঁরা বধ করেছিলেন ভণ্ডাসুরের সৃষ্টি করা রাক্ষস, দৈত্য ও অসুরদের। ক্ষিপ্ত ভণ্ডাসুর এরপর সৃষ্টি করেছিলেন মহাপরাক্রমী অসুররাজ মহিষাসুরকে। পুনর্জন্ম লাভ করে, হুংকার দিতে দিতে রণক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন মহিষাসুর। দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী তখন ধারণ করেছিলেন মহিষাসুরমর্দিনী দেবী দুর্গার রূপ। দেবী দশভুজা বধ করেছিলেন মহিষাসুরকে।

ভণ্ডাসুর বুঝেছিলেন বিনাশকাল আসন্ন

দেবী ত্রিপুরাসুন্দরীকে পরাস্ত করা অসম্ভব বুঝে, রণক্ষেত্র ছেড়ে পালাবার চেষ্টা করেছিলেন ভণ্ডাসুর। পলায়নরত ভণ্ডাসুরের ওপর দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী নিক্ষেপ করেছিলেন নাগপাশ। বন্দি হয়ে গিয়েছিলেন ভণ্ডাসুর। এরপর বিদ্যুতের ঝলকের মতো দেবীর হাত থেকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল মহা-পাশুপত অস্ত্র। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন ভণ্ডাসুর। রণক্ষেত্রের রক্তভেজা মাটিতে।

ভণ্ডাসুরকে বধ করার পরেও কমেনি দেবী ত্রিপুরাসুন্দরীর ক্রোধ। কামেশ্বরকে নিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন ভণ্ডাসুরের সাধের শোণিতপুর। এরপর দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী, রণক্ষেত্রে শুয়ে থাকা নিথর ভণ্ডাসুরের ওপর নিক্ষেপ করেছিলেন আরও একটি তির। সেই তিরের তেজে ভস্ম হয়ে গিয়েছিল ভণ্ডাসুরের দেহ। সেই ভস্ম থেকে পুনর্জন্ম লাভ করেছিলেন কামদেব মন্মথ।

কামদেবের পুনর্জন্মের ফলে, ত্রিলোকে আবার ফিরে এসেছিল বিবেক, বুদ্ধি, প্রেম ও কাম। বর্ণময় হয়ে উঠেছিল বর্ণহীন ত্রিলোক। সরস হয়েছিল শুকিয়ে যাওয়া বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্য ফিরে পেয়েছিলেন দেবতারা। বন্ধ্যা জীবকুলে শুরু হয়েছিল সৃষ্টি সুখের উল্লাস।

দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরীর ওপর পুস্পবৃষ্টি করেছিলেন দেবতারা। করেছিলেন দেবীর জয়গান। দেবীর দেহে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন দেবী কামেশ্বরী ও দেব কামেশ্বর। ধ্বংসের হাত থেকে ব্রহ্মাণ্ডকে বাঁচিয়ে দিয়ে, পরাশক্তির রূপ ধারণ করে, দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী চলে গিয়েছিলেন চিদাকাশে বিরাজমান মহাশম্ভুর কাছে। ভুলোক জুড়ে শুরু হয়েছিল দেবী ললিতা ত্রিপুরাসুন্দরীর পূজা।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.