HeaderDesktopLD
HeaderMobile

শাল-পিয়াল-মহুয়া-পলাশে ঘেরা গড়পঞ্চকোট, প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটুক পুজো

0 59

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

“মন খারাপ করা বিকেল মানেই মেঘ করেছে, দূরে কোথাও দু–এক পশলা বৃষ্টি  হচ্ছে”… বর্ষা কারও কাছে বিষণ্ণতার সুর, কারও কাছে মন উদাসী হাতছানি। রবি ঠাকুর থেকে অক্ষয় বড়াল, অতুলপ্রসাদ থেকে হালের কবীর সুমন কেউই এড়াতে পারেননি আষাঢ়–শ্রাবণের অনিবার্য অভিঘাত। এ সবই হল মনোরাজ্যের কথা। ব্যবহারিক অবস্থাটি অবশ্য তেমন রোম্যান্টিক নয়। বৃষ্টি মানে ঘরবন্দি দিন, বৃষ্টি মানে বানভাসির আশঙ্কা। এমন মেঘ–ছায়া দিনে হঠাৎ যদি বেজে ওঠে টেলিফোন আর ও প্রান্ত থেকে ভেসে আসা কণ্ঠস্বর শোনায় — কাল সকাল ছটা পনেরোয় ব্ল্যাক ডায়মন্ড, হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে যাস — তখন সে শুধু বার্তা থাকে না আর, হয়ে যায় রবিশঙ্করের মেঘ রাগে তার-সপ্তকের ঝোড়ো তান।

ট্রেনে যখন উঠলাম, তখন কালো করে এসেছে আকাশ। দুএকটা স্টেশন পেরোনোর পর হাওয়ায় ভেসে এল বৃষ্টির গন্ধ। কাগজের চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ট্রেনের ভেতরেও তখন জমে উঠেছে আড্ডা। কোথায় যাব, কী দেখব, কতদিন থাকব এইসব শুনতে শুনতে কোথা দিয়ে যে কেটে গেল ট্রেনজার্নির সমস্ত সময়টা! প্রায় চার ঘণ্টা পার করে বরাকর স্টেশনে নামলাম আমরা চার বন্ধু। বন্ধুদের মধ্যে কেকা সরকারি কর্মচারী, স্মার্টনেসে আদব কায়দায় সে বেশ অন্যরকম, কেতাদুরস্ত। এই বর্ষা ভ্রমণের ছকটিও তারই মস্তিষ্কপ্রসূত। তার কাছ থেকেই জানা গেল আমাদের এবারের গন্তব্য শাল পিয়াল মহুয়া পলাশে ঘেরা পুরুলিয়ার গড়পঞ্চকোট।

বরাকর থেকে গড়পঞ্চকোটের পথে গাড়ি অটো দুইই মেলে। তবে আমরা অটোই নিলাম। দূরত্ব ২০ থেকে ২১ কিলোমিটার। কখনও বৃষ্টিস্নাত সবুজ ধানক্ষেতের বুক চিরে, কখনও ঘন জঙ্গল, ভরাট খাল-বিল আর লাল মাটির রাস্তা পেরিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা পঞ্চকোট রাজাদের রাজধানীর উদ্দেশ্যে। কেকার মুখ থেকে আগেই জেনে নিয়েছিলাম আমাদের রাত্রিবাসের ব্যবস্থা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের বনবাংলোয়। এই ভরা শ্রাবণের মেঘ বৃষ্টির সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছেও গেলাম গড়পঞ্চকোটের সেই বিখ্যাত বন বাংলোর সামনে।

সবুজ পাহাড়ি ঢালে কেয়ারি করা বাগানের মধ্যে ছড়ানো ছেটানো রঙিন কটেজ। প্রথম দর্শনেই মনের মধ্যে খুশির তুফান বইয়ে দিল। আমাদের জন্য যে ঘরদুটি বরাদ্দ হয়েছে তাদের নামের মধেও যেন প্রকৃতির মূর্ছনা। ‘দামোদর’ ও ‘বরাকর’, একমাত্র এই দুটি ঘরের বারান্দা থেকেই দেখা যায় পাঞ্চেত জলাধারের রুপোলি জলরেখা। মুগ্ধতার প্রথম পর্বের শুরু এখান থেকেই।

মাথা তুললেই চোখ গেল সবুজে সবুজ পাঞ্চেত পাহাড়ের দিকে। ভরা বর্ষায় শ্যামল প্রকৃতি আরও ফুলেফেঁপে উঠেছে। ঠিক যেন বাসুকি নাগের ফণা। আকাশের ঘন কালো মেঘ ঝুঁকে রয়েছে পাহাড়ের মাথার উপরে, যেন টোকা দিলেই ঝর ঝর করে ঝরে পড়বে। দূরে ক্রমশ ধোঁয়াটে হয়ে আসছে জলাধার। তারপরেই শুরু হল প্রবল বর্ষণ। বৃষ্টির ছাঁটে চোখের সামনে থেকে মুছে যাচ্ছে জলাধার, পাহাড়ের সবুজ সীমা। হাওয়ার দাপটে বড় বড় গাছগুলো এমন লুটোপুটি খেতে শুরু করেছে যেন কেউ তাদের উপর নির্মম ভাবে চাবুক চালাচ্ছে। মাঝে মাঝে মেঘের কামান গর্জে উঠে কাঁপিয়ে দিচ্ছে অন্তরাত্মা। এমন বিকট সেই আওয়াজ, যে সুপার স্টিরিওফোনিক সাউন্ডও তার কাছে হার মেনে যায়। সমতলের মানুষ আমরা, এরকম পাহাড়ি বৃষ্টির মুখোমুখি আগে কখনও হইনি। বৃষ্টির মধ্যেই ডাইনিং হল থেকে দিয়ে গেল গরম গরম চা। চা পান করতে করতে যেন সমস্ত সত্তা দিয়ে উপভোগ করতে লাগলাম এই অভিনব বর্ষামঙ্গল।

ঘরে লাঞ্চ বা ডিনারের অনুমতি নেই, তাই স্নান সেরে মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য গেলাম ডাইনিং হলে। ভারি চমৎকার এই খাওয়ার ঘরের পরিবেশ। গাছপালা ঘেরা ঘরটির চারপাশের দেওয়াল কাচের, মাথাটি গোলাকার ছাতার মতো। সবকিছুই বেশ সাজানো গোছানো, রুচিসম্মত। রাত্রিবেলায় চারিদিকের নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে যখন এই হলঘরের ঝাড়বাতিগুলো জ্বলে ওঠে তখন দূর থেকে মনে হয় অন্ধকারের সমুদ্রে লাইট হাউস। কাচের মধ্যে দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতেই মধ্যাহ্নভোজ সারলাম আমরা। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গত রেখে ম্যেনুটিও ছিল জব্বর – খিচুড়ি, অমলেট, আলুর দম আর আচার। যত্ন করে তৈরি করা সেই ঘরোয়া রান্নার স্বাদ, মনে থেকে যাবে অনেকদিন।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে কাবেরী ও পামলির ইচ্ছে ছিল একটু গড়িয়ে নেওয়ার। কিন্তু বেড়াতে এসে হোটেলের রুমে সময় কাটানোর পক্ষপাতী নই আমি। ফলে ঘুমের দাবিকে পাত্তা না দিয়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম অতীত ইতিহাসের খোঁজে। পথের মধ্যেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে গেল আমাদের। ভিজে প্রায় জবজবে হয়ে আশ্রয়ের খোঁজে আমরা যেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম সেটি আসলে পাঞ্চেৎ পাহাড়ের উল্টো দিক। সামনে আদিগন্ত প্রসারিত উপত্যকা। বাংলো থেকেই আমাদের সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল একজন গাইডকে। তার কাছ থেকে পঞ্চকোটের যেটুকু ইতিহাস জানা গেল তার সারমর্ম হল — আজ থেকে প্রায় ছাব্বিশশো বছর আগে এই জঙ্গলাকীর্ণ পুরুলিয়া ছিল বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত আদিবাসী আর অনার্য জাতিগোষ্ঠীর বাসভূমি। প্রথম আর্যজাতির প্রতিনিধি হিসেবে ২৪ তম তীর্থঙ্কর মহাবীর এখানে পা রেখেছিলেন। পরবর্তী কালে আর্যজাতির প্রতিনিধি হিসাবে পুরুলিয়ায় এলেন পঞ্চকোট রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা দামোদর শেখর।

পঞ্চকোট রাজারা এসেছিলেন রাজস্থানের মাউন্ট আবু থেকে। এরা ছিলেন প্রখর (পরমার) বংশীয়। রাজাদের নামের ও পদবির সঙ্গে ‘শেখর’ শব্দটা থাকত অলংকার হয়ে।পঞ্চকোটই পুরাণের শেখর পর্বত। এই রাজবংশ রাজপুতানা থেকে রাঢ় বঙ্গে আসার আগে উজ্জয়িনীতেও বেশ কয়েক বছর রাজত্ব করেছেন। এই রাজ পরিবারের ইতিহাস নেহাত অল্পদিনের নয়। ৮০ খৃষ্টাব্দ থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭২ সাল – এই দীর্ঘ ১৯০০ বছরের শাসন ইতিহাস এই রাজবংশের। পৃথিবীর ইতিহাস খুঁজলে এত দীর্ঘকালব্যাপী রাজ্যশাসন আর কোথাও পাওয়া যাবে না। পুরুলিয়ার সাধারণ জীবনযাত্রার ভিতরেও এই রাজবংশের অবদান অনেকখানি। ৯৬২ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ আটশ বছর রাজপরিবারটি ছিল পাঁচেট পাহাড়ের  পাদদেশে।

এত বৃষ্টির মধ্যে তেমনভাবে ছবি তোলা যাচ্ছিল না। বরং ইতিহাসের পাতাতেই মনোনিবেশ করে ফেলেছিলাম আমরা সবাই। হঠাৎ পামলি তালভঙ্গ করে বলে উঠল, দাঁড়ান দাঁড়ান, পাঁচেট পাহাড়টি আবার কোথায়? ওর প্রশ্নে একেবারেই হকচকিয়ে না গিয়ে গাইডদাদা আরও সহজ করে বুঝিয়ে দিলেন ব্যাপারটি। এই যে সামনের পাহাড়, এর পাঁচটি চূড়া বা পাঁচটি ঢাল। একে বলা হয় কূট, তা থেকেই কোট। ব্রিটিশদের উচ্চারণে পঞ্চকোট হয়েছে পানচেট তা থেকেই পাঞ্চেত। পাঞ্চেতই আবার স্থানীয় উচ্চারণে হয়ে গেছে পাঁচেট।

ভূগোল পার করে গাইডদাদা আবার ফিরে গেলেন তার গল্পে। এই রাজবংশের এক রাজা কল্যাণশেখর বল্লাল সেনের কন্যা সাধনাকে বিবাহ করেন। সেই বিয়েতে যৌতুক হিসাবে পান সেন বংশের কুলদেবী শ্যামারূপা দেবীর হাতের তলোয়ার, আর কালিঘুড়ি নামের ঘোটকী। এই দেবীই কল্যাণেশ্বরী নামক স্থানে অবস্থান করছেন। কল্যাণশেখরই কল্যাণেশ্বরী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। আকবরের রাজত্বকালে পঞ্চকোটের রাজা ছিলেন গরুড় নারায়ণ। তার সময়েই পঞ্চকোট এলাকার দেবমন্দির ও দেবমূর্তিগুলি ধ্বংস করেছিলেন কালাপাহাড়। এরপর ১৬০০ খ্রীষ্টাব্দে গড়পঞ্চকোটের দখল নেন বিষ্ণুপুরের মহারাণা হাম্বীর মল্লদেব। ১৮৫৫-৫৬ খ্রীষ্টাব্দে এই বংশের শেষ রাণা নীলমণি সিংহদেবকে সাঁওতাল বিদ্রোহে মদত দেবার অভিযোগে ইংরেজরা বন্দি করে ও নৃশংসভাবে হত্যা করে।

শুধু কী তাই, এই পঞ্চকোট রাজবংশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাইকেল মধুসূদন দত্তেরও নাম। ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে সিংদেব এস্টেটের ম্যানেজারের পদ অলংকৃত করেছিলেন মাইকেল স্বয়ং। ‘পঞ্চকোট গিরি, ‘পঞ্চকোট রাজশ্রী’ এবং ‘পঞ্চকোট গিরি বিদায়’ নামে তিনটি কবিতাও তিনি রচনা করেছিলেন এই সময়ে।

গল্প শুনতে শুনতে এতটাই বুঁদ হয়ে গিয়েছিলাম আমরা, যে খেয়ালই করিনি দিনের আলো কমে আসছে। অতীতের স্মৃতি বুকে নিয়ে পশ্চিম সূর্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক সুপ্রাচীন রাজবংশের রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ আর মন্দির। পঞ্চকোট পাহাড়ের মাথায় রাজাদের এই রাজপ্রাসাদ বা গড় থেকেই এখানকার নাম গড়পঞ্চকোট। গড়ের ডানহাতে রয়েছে ভাঙা জরাজীর্ণ দেউল, বিগ্রহহীন। প্রায় ২ বর্গমাইল জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রাজাদের মন্দিরক্ষেত্র। কালের প্রহার উপেক্ষা করে এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে যে সব স্থাপত্য, তার মধ্যে অন্যতম হল পোড়া ইটের তৈরি পঞ্চরত্ন মন্দির। মন্দিতের উপরে ওঠার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। অতীতে হয়ত পাঁচটি চূড়াতেই ওঠা যেত। তবে এখন সে পথ বন্ধ। গাইডের কথা অনুযায়ী এটি ছিল রাসমন্দির। আমরা চারজনেই মরা গোধূলির আলোয় নির্বাক নিষ্পন্দ হয়ে মন্দিরটির দিকে তাকিয়ে রইলাম, অনেকক্ষণ…

পঞ্চরত্ন মন্দিরটির একটু দূরে ঘন জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে বিশাল এক গম্বুজ আর তার পাশেই পরিখা। যেতে প্রথমে একটু ভয় ভয় করলেও সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গেলাম। মনে হল এটি একটি ওয়াচ টাওয়ার। বাঁদিকের সিঁড়ি অক্ষত থাকলেও বর্ষাকাল সাপখোপের ভয়ে আর এগোনোর ঝুঁকি না নিয়ে ফিরে এলাম সবাই। মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে রাজবাড়ির ভাঙা প্রাচীর, পাহাড়ের মাথায় আরও কিছু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেলাম। গ্রামবাসীদের সাহায্যে হয়তো পৌঁছনো যায় সেখানে, কিন্তু সে সৌভাগ্য এ যাত্রা হল না। বাদুড়, পেঁচার ডানায় ভর করে ততক্ষণে নেমে এসেহে জমাট অন্ধকার। একে বৃষ্টি তায় অন্ধকার, মনে হল যেন নাগরিক কোলাহল থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে দাঁড়িয়ে আছি আমরা কয়েকজন বিহ্বল, মোহাচ্ছন্ন মুসাফির। দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশীর সুর। তন্ময়তা কেটে যেতেই বুজলাম, আর নয়, এবার ফিরতে হবে। পিছনে পড়ে রইল নির্জনতা, আদিমতা, স্থবির দেউল, আর এদেশের এক অজানা অবহেলিত ইতিহাস। বৃষ্টি ভেজা পথ ধরে আমরা ফিরে চললাম ধূলিধূসর বর্তমানের দিকে।

(চিত্রঋণ – শাশ্বতী সান্যাল)

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.