HeaderDesktopLD
HeaderMobile

পুজোয় ডাকছে পাহাড়-জঙ্গলের ঘেরাটোপে লুকিয়ে থাকা কাঁকড়াঝোড়ের সবুজ ঠিকানা

0 89

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

আশ্বিনের নীল আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, মফসসলের মাটিতে জেগে উঠেছে কাশ। শরৎ যেন এক নির্ভেজাল ছুটির ঋতু। প্রকৃতি নিজেই তার রূপ-রস-গন্ধ ঢেলে ইশারায় ডাক পাঠাচ্ছে বেরিয়ে পড়ার। আকাশে বাতাসে ভেসে উঠেছে আগমনীর সুর। শহরের ইট-কাঠ-পাথরের সাম্রাজ্যে, বড় বড় হাইরাইজের জঙ্গলের মধ্যে বসেও সেই ছুটির ডাক শুনে ফেলে কেউ কেউ। দেখে ফেলে দিগন্তপ্লাবী নীল নির্জন আকাশের রহস্য-রূপ। তখন কেজো পৃথিবীতে তাঁকে বেঁধে রাখাই মুশকিল!

সবুজ ভালবাসে না এমন বাঙালি সত্যিই দুর্লভ। আর সেই সবুজের সঙ্গে যদি মিশে থাকে অরণ্যের বুনো সোঁদা গন্ধ, শালমঞ্জরীর আর আকাশমণি ফুলের পাপড়ি ছড়ানো পথের মাদকতা, জঙ্গলপরীর গল্প – তাহলে কেমন হয় বলুন তো! ভাবছেন কাছেপিঠে আর জঙ্গল কোথায়! না, না, সুন্দরবনের কথা বলছি না মোটেও। চারপাশে জঙ্গল কমে এসেছে ঠিকই, তবুও পশ্চিম মেদিনীপুরের কাছে এখনও লুকিয়ে আছে একটুকরো বন্য সুন্দর। আমরা অনেকেই খবর জানি না তার৷ এবার পুজোয় একটু নির্জনতাকে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়ুন না ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র খোঁজে! কোজাগরি পূর্ণিমার আগে পরে যদি একান্তে জঙ্গল-জ্যোৎস্নার মাহাত্ম্য অনুভব করতে চান, বা বনদেবীদের সঙ্গে একটা সন্ধে চা-পানের প্ল্যান থাকে – তাহলে তো কথাই নেই। একটা ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে ছুটে যাওয়াই যায় কাঁকড়াঝোড়ের পথে। কলকাতা থেকে মাত্র ঘণ্টা ছয়েকের গাড়ি দূরত্বে মেদিনীপুরের সীমান্তে আপনার জন্য আজও অপেক্ষা করে আছে কিছু সবুজ রূপকথা।

ঝাড়খণ্ড আর বাংলার একেবারে সীমান্তে এই কাঁকড়াঝোড়। ‘কাঁকড়া’ শব্দটির স্থানীয় অর্থ পাহাড় আর ঝোড় শব্দটি ‘জঙ্গল’কে বোঝায়। নামের সঙ্গে প্রকৃতির এমন অপূর্ব মেলবন্ধন লক্ষ্য করার মতো। চারিদিকে পাহাড় আর জঙ্গলের ঘেরাটোপে লুকিয়ে থাকা এক স্বপ্নসুন্দর পর্যটন কেন্দ্র এই কাঁকড়াঝোড়।

বাঁশপাহাড়ি থেকে ছোট্ট ছোট্ট ছবির মতো সুন্দর গ্রাম চাকাডোবা, কাশমোর, কাশীডাঙা, ছুরিমারা, ময়ূরঝরনা হয়ে সবুজে মোড়া ছবির মতো সুন্দর পথ এগিয়ে গেছে কাঁকড়াঝোড়ের দিকে। অদূরেই উঁকি মারছে দলমা পাহাড়ের বুনো রেঞ্জ আর সবুজে সবুজ বনানী। পাহাড়ের শরীর জুড়ে যেমন গভীর জঙ্গল, তেমনই জঙ্গলে ঢাকা রূপসি কাঁকড়াঝোড়। তাকে ঘিরে আছে তিনটি জেলা ও একটি রাজ্যের সীমানা, মানে একদিকে মেদিনীপুর, পুরুলিয়া আর বাঁকুড়ার সীমা, আর অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডের দলমা।

কুসুম, শাল, পিয়াশাল, সেগুন, মহুয়া, আকাশমণিতে ছাওয়া ভৈরব পাহাড়ের গা ঘেঁষে ৯০০০ হেক্টরের গহন বনে চরে বেড়ায় ভালুক, বুনো শুয়োর, হায়না, শম্বর হরিণের দল। রাতের বেলা এরাই কেন্দু ও মহুয়ার লোভে নেমে আসে কাঁকড়াঝোড়ের সবুজ উপত্যকায়। কখনও সখনও হাতির পালও দলমা থেকে নেমে এসে পথ অবরোধ করে দাঁড়ায়। তখন সে এক দেখার মতো দৃশ্য! সাধারণত হাতিরা পাহাড় থেকে নেমে আসে পার্বত্য নদীতে জল খাওয়ার জন্য। জলপানের আগে-পরে ইতস্তত সামান্য ঘোরাফেরা করে আবার ফিরেও যায় দলমায়। ভাগ্য ভালো থাকলে জঙ্গলের পথে আপনার আচমকা মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়ে যেতেই পারে দলমার দামালদের সঙ্গে।

কাঁকড়াঝোড়ে আজকাল কাজু, কফি ও কমলালেবুর চাষ করা হচ্ছে। বেড়ানোর আদর্শ সময় শীতকাল। রাতের দিকে বেশ ঠাণ্ডা পড়লেও ছায়াঢাকা পথে শুনশান শীতের দুপুরগুলো বড় মনোরম। শীতকালে সময় না পেলেও ক্ষতি নেই। প্রখর গ্রীষ্ম এড়িয়ে বছরের যে কোনও সময় আসা যায় এ পথে। দু-তিন দিনের ছোট্ট ট্যুরে যদি পেয়ে যান একটি চাঁদনি রাত, তাহলে তো কথাই নেই। জঙ্গলের জ্যোৎস্নামাখা কুহক পরিবেশে দাঁড়িয়ে বুকের মধ্যে সারেঙ্গির ছড় টানার শব্দ পাবেন। টের পাবেন অল্প দূরেই বনদেবীদের নিঃশব্দ গতিবিধি৷

ভৈরব পাহাড়ের গা ঘেঁষে কাঁকড়াঝোড়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী খরা। নদীর পাড় ধরে হাঁটলে আপনার চোখে পড়বেই ছড়ানো ছেটানো ছোটো-বড় প্রায় ২৮টি গ্রাম। এই আরণ্যক গ্রামগুলিতে কম-বেশি শতাধিক পরিবারে হাজারেরও বেশি মুণ্ডা, সাঁওতাল ও অন্যান্য ভূমিজ উপজাতির বাস। সংসার চলাতে সামান্য চাষবাসের কাজ করলেও, জীবিকার জন্য এদের অধিকাংশকেই নির্ভর করতে হয় জঙ্গলের কেন্দুপাতার উপর। এই কেন্দুপাতা মূলত বিড়ি তৈরির কাজে লাগে। নানা মূল্যবান ঘাস ও গুল্মের আকর এই অরণ্য। জঙ্গলের বনৌষধি লতাগুল্মের মধ্যে রয়েছে অনন্তমূল, শতমূল, কালমেঘের মতো গাছগাছরা। এদিকে ওদিকে প্রায়ই চোখে পড়ে সাবাই ঘাসের বন। এই ঘাস থেকে এক বিশেষ ধরনের দড়ি তৈরি করেন আদিবাসী মহিলারা, সে দড়ি বিকোয় কাঁকড়াঝোড়ের সপ্তাহের হাটে। গ্রামের পথে হাঁটতে বেরোলে চোখে তো পড়বেই, চাইলে এমনকি হাতেকলমে শিখেও নিতে পারবেন এই ঘাস পাকিয়ে দড়ি তৈরির আশ্চর্য পদ্ধতি।

মরামারীর ভয়, দৈনন্দিনতার ক্লান্তি, ধুলো-ধোঁয়া, ভিড় আর মেকি শহুরে স্মার্টনেস থেকে কিছুদিনের জন্য ছুটি নিয়ে প্রকৃতির বুকে পালাতে চাইলে, মুখের মাস্ক খুলে রুগ্ন ফুসফুসে কিছুটা নির্ভেজাল অক্সিজেন টেনে নিতে চাইলে আপনাকে একবার অন্তত আসতেই হবে কাঁকড়াঝোড়ে। এই অরণ্যভূমির পশ্চিমে সীমানা টেনেছে ঘর্ঘরা নালা তথা ভৈরবী নদী। এপারে বাংলা ওপারে ঝাড়খণ্ড। ভৈরবীর হাঁটুজল ভেঙে আরণ্যক পথে বোল্ডারের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে মাকুলি নদী, গিয়ে মিশেছে সেই সুদূর সুবর্ণরেখায়। ইচ্ছে হলে চড়াই পথে একবেলা সামান্য কষ্ট করে দেখে নিতে পারেন অনবদ্য মাকুলি ঝরনাটিও।

ঝাড়গ্রাম থেকে কাঁকড়াঝোড়ের দূরত্ব ৭৯ কিলোমিটার আর বেলপাহাড়ি থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার। বেলপাহাড়ি থেকে একটু এগিয়ে বাঁ দিকে ওদলচুয়ার রাস্তা হয়ে সোজা কাঁকড়াঝোড় যাওয়া যায়। এখন এ পথে ওদলচুয়া হয়ে বাস চলাচলও শুরু হয়েছে। এছাড়া মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম থেকেও কাঁকড়াঝোড়ের বাস যোগাযোগ রয়েছে। আপনি চাইলে দুটোরাত কাঁকড়াঝোড়ে কাটিয়ে, সেখান থেকেই অনায়াসে ঘুরে আসতে পারেন বিভূতিভূষণের স্মৃতিধন্য ঘাটশিলায়। জঙ্গলে কিছুটা পথ হেঁটে কাশীদা, সেখান থেকে বাসে করে ঘাটশিলা পৌঁছে যাওয়া যায় খুবই সহজ।

ট্রেকিংয়ের শখ আছে যাদের, তাদেরও নিরাশ হতে হবে না। কাঁকড়াঝোড়কে কেন্দ্র করে এখন ছোট ছোট বেশ কয়েকটি রুটে অনায়াসে ট্রেক করা যায়। কয়েক বছর আগেও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীরা ভুলাবেদায় নেমে ১০ কিলোমিটার মতো পথ ট্রেক করে জঙ্গলের পথ ধরে পৌঁছতেন কাঁকড়াঝোড়ে। এখনও সে রোমাঞ্চ ইচ্ছে করলেই নেওয়া যায়।

থাকার জন্য রয়েছে বনবিভাগের একটি সাজানো-গোছানো বনবাংলো, পশ্চিমবঙ্গ বন উন্নয়ন নিগমের প্রকৃতি ভ্রমণ কেন্দ্র। যদিও ভ্রমণের আগে বুকিং সম্বন্ধীয় যাবতীয় তথ্য কোলকাতা থেকে নিয়ে যাওয়াই ভালো। আর আছে আদি অকৃত্রিম মাটির দোতলা বাড়ি রোম্যান্টিক মাহাতো লজ। এখানে থাকতে হলে টর্চ, জল পরিশোধক, মশা তাড়াবার ধূপ বা ক্রিম সঙ্গে থাকা অত্যন্ত জরুরি। কাঁকড়াঝোড় থেকে অল্প দূরেই কেটকি ঝর্ণা একবেলার ট্যুর হিসাবে হইচই করে ঘুরে আসা যায় সে পথেও।

কাঁকড়াঝোড় থেকে গাড়ির পথে কদমডিহা, বুরিঝোড়, শুষনিজিবি হয়ে সিঙ্গাডোবা গ্রাম। এখান থেকে মোরাম পথে ২ কিলোমিটার গেলেই এক অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে কেটকি ঝরনা। পাহাড়ি ঝোরার জল আটকে তৈরি হয়েছে এক বিস্তীর্ণ জলাশয়। নির্জনতাকে সঙ্গী করে সিঙ্গাডোবা ও বুরিঝোড় গ্রামের সীমান্ত বাঁধে বন্দি চেরারাং পাহাড়ের কেটকি ঝরনা। এই চেরারাং পাহাড় পেরোলেই ঝাড়খণ্ড রাজ্য। এখানেই বর্ষার নতুন মেঘের মতো পালে পালে ঘুরে বেড়ায় বুনো হাতির দল। মনের আনন্দে উড়ে বেড়ায় টিয়া, নীলকণ্ঠ-সহ ঝাঁক ঝাঁক পাখি। আশপাশের গ্রামগুলোতে এখনও খাবারের খোঁজে হানা দেয় বুনো হায়নার পাল।

ঝরনার কিছু আগে পর্যন্ত গাড়ি যায়। এরপর কিছুটা পথ পায়ে হেঁটে কেটকি ঝরনার কাছে পৌঁছনো যায়। হাঁটতে হাঁটতেই অনুভব করবেন পায়ের উপর বাবুই ঘাসের অভ্যর্থনা। বেলপাহাড়ি থেকে ওদলচুয়া ১১ কিলোমিটার। এই পথে গজডুংরি, চুটিয়াডুংরি, ঠাকুরান পাহাড়ে ঘেরা রাস্তায় এলে পথের সৌন্দর্য মন কেড়ে নেবে আপনার! মাটির পৃথিবী নয়, মনে হবে একটুকরো অমরাবতীর পথ ধরে চলেছেন। ওদলচুয়া থেকে ৩ কিলোমিটার পথ গিয়ে সিঙ্গাডোবা গ্রাম, সেখান থেকে ২ কিলোমিটার গেলেই কেটকি ঝরনা। অ্যাডভেঞ্চার করতে যারা ভালবাসেন তারা কেটকি ঝরনা থেকে ৭ কিলোমিটার জঙ্গলের পথ ধরে কাঁকড়াঝোড় অবধি ট্রেক করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই একজন দক্ষ গাইডের দরকার হবে। সিঙ্গাডোবা অবধি ট্রেকার পাওয়া যায়, বাকি ২ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হবে। তবে রিজার্ভ গাড়িতে গেলে ঝরনা পর্যন্ত সরাসরি যাওয়া যাবে।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.