পুজোর ছুটিতে নির্জন নদী, সমুদ্রের দেশে ভেসে আসুন ইতিহাসের নৌকোয় চড়ে

0

রত্না ভট্টাচার্য্য
শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

পুজো এসে গেল। যদিও এবছর করোনা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে অন্যান্য বছরের মতো সারাবেলা পথে পথে ঘুরে ঠাকুর দেখার প্ল্যান মুলতুবি রাখছেন অনেকেই। তাহলে কী করবেন এই চার দিন? ভিড়ে, গরমে, শহরের যানজটে নাস্তানাবুদ হবেন! না কি, ঘরবন্দি হয়ে মজে থাকবেন ভার্চুয়াল আড্ডাতেই! তার চেয়ে বলি কী, দুটো দিন হাতে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন না, অন্তহীন ঝাউবন, অগাধ সমুদ্র আর অতীত ইতিহাসের খোঁজে।

শহর থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলেই আপনার পথ চেয়ে আছে সোনালি বালির ভার্জিন বীচ আর নীলচে জলের রূপকথা। দীঘা পুরী তো বহুবার হল, এবার চলুন ঘুরে আসা যাক প্রায় নাম-না-জানা এক সমুদ্রসৈকত থেকে। কাঁথির কাছেই, একখণ্ড নীরবতা সাজিয়ে আপনার অপেক্ষায় জেগে আছে বাঁকিপুট- দরিয়াপুর। জুনপুট ঘুরেও আসতে পারেন এ পথে। শহরের বাহুল্য থেকে পালিয়ে পুজোর দুটো দিন প্রকৃতির বুকে মুখ লুকোনোর আদর্শ ঠিকানা এই বাঁকিপুট।

জুনপুট থেকে বাঁকিপুটের দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার। এপথে যানবাহন তেমন কিছুই মেলে না। আসা-যাওয়ার জন্য নিজস্ব গাড়ি, সাইকেল বা মোটর-সাইকেলই একমাত্র ভরসা। আর যদি কিছুই না জোটে, তাহলে নিজের পদযুগলের ওপর ভরসা করেই পাড়ি দিতে হবে। ভাগ্য ভালো থাকলে মিলে যেতে পারে একটি বা দুটি রিকশা। কাঁথি রেলস্টেশন থেকে ভাড়া করা গাড়িতে অবশ্য খুব সহজেই বাঁকিপুট যাওয়া যায়।

  

হরিপুর সাগর সৈকতের একেবারে উল্টো দিকে, মানে বিপরীত পাশে এই বাঁকিপুট বা গোপালপুর সৈকত। ওড়িশার গোপালপুর অন সি-র যতটা প্রচার, ঠিক ততটাই লাজুক, অন্তরালবাসী বাংলার এই গোপালপুর। অথচ বাঁকিপুটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়নাভিরাম। লাল মোরাম বিছানো পথের দু’পাশে সারিবদ্ধ ঝাউ, ইউক্যালিপটাস ঝুঁকে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভ্যর্থনায় আপ্লুত হয়ে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া সমুদ্রের দিকে। সমুদ্র এখানে একটু বাঁক নেওয়ায় ক্ষয়ের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবছরই বর্ষাকালে এই এলাকার সমুদ্রবাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়।

এই সমুদ্রবাঁধের উপরেই গড়ে উঠেছে একটি পর্যটনাবাস, নাম ঝিনুক লজ। এই সবেধন নীলমণি ঝিনুক লজই বাঁকিপুরে থাকার একমাত্র জায়গা, রাত্রিবাসের একমাত্র ঠিকানা। এখানে এলেই বুঝতে পারবেন লজের এই ‘ঝিনুক’ নামটি কতখানি সার্থক! ভেবে দেখলে, এই কুমারী সমুদ্রতটে বালি আর ঝিনুক ছাড়া আর কিছু থাকার কথাও নয়।

যারা ভীষণভাবে নির্জনতা পছন্দ করেন, লোকজন ভিড়ভাট্টা থেকে একটু দূরে সরে থাকতে চান পুজোর দিনগুলোতে, তাদের জন্য ঝিনুক লজ একেবারে আদর্শ জায়গা। পর্যটক এখানে নামমাত্র আসে। হয়তো গিয়ে দেখলেন, আপনি আর আপনার ভ্রমণসঙ্গীটি ছাড়া কাছে দূরে আর কেউ কোত্থাও নেই। চোখের সামনে শুধু ঢেউ ভাঙছে জল আর জল। এত কাছে সমুদ্র, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে সফেন বুদবুদ। ঝাউবনের সবুজে বাতাসের লুকোচুরি খেলা, সমুদ্রের জলে মাখামাখি সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, সারাদিন পাখির কলকাকলি আর অপার নির্জনতা – এই নিয়েই পথ চেয়ে আছে বাঁকিপুট বা গোপালপুর।

দুদিনের হঠাৎ ভ্রমণে একটা গোটা দিন রাখুন না কাছের মানুষটিকে নিয়ে নির্জন সৈকতে পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য। দ্বিতীয় দিনটিতে ঘুরে আসা যায় খুব কাছেই দরিয়াপুর থেকে। দরিয়াপুর নামটা শুনলেই মনে হয় না দরিয়ায় নাও ভাসানোর কথা! নাও না ভাসালেও দরিয়াপুর কিন্তু বাংলা সাহিত্যের দরিয়ায় এক অবিস্মরণীয় জায়গা করে নিয়েছে। এই সেই বিখ্যাত দরিয়াপুর গ্রাম– যার পটভূমিতে দাঁড়িয়েই লেখা হয়েছিল কপালকুণ্ডলা উপন্যাস। ১৮৬৬ সালে প্রকাশ পায় কপালকুণ্ডলা। তারও বেশ আগে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র যখন এখানে এসেছিলেন তখন এই অঞ্চল ছিল গভীর জঙ্গলাকীর্ণ। দৌলতপুরে সেচ বিভাগের একটি বাংলো ছাড়া আশেপাশে রাত্রিবাস করার কিছুই ছিল না। সেই দৌলতপুর বাংলোটির বর্তমানে জরাজীর্ণ দশা।

দরিয়াপুরে দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে কপালকুণ্ডলা কালীর দু’দুটি মন্দির। অপেক্ষাকৃত নতুন মন্দিরটি প্রায় রাস্তার ধারে অবস্থিত। খোলা প্রাঙ্গণের এক ধারে বঙ্কিম মঞ্চ আর অন্যদিকে গ্রন্থাগার। এখানে একটি কক্ষের মধ্যে বঙ্কিমের আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত রয়েছে। এই মূর্তির কাছেই প্রতিবছর বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুদিন অর্থাৎ ২৬শে চৈত্র ‘বঙ্কিমমেলা’ অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে।

একটু এগোলেই একটা উঁচুমতো ফাঁকা জায়গায় আপনার চোখে পড়বে সদাশিবের বড় মন্দির। ভাঙা একটি মূর্তি দাঁড় করানো রয়েছে বাইরের চাতালে। মন্দিরটি কিন্তু বেশ প্রাচীন। সম্প্রতি বছরখানেক আগে এর সংস্কার করায় ভগ্নদশা অনেকটা কেটেছে। মন্দিরের সামনেই রয়েছে বিশাল ঝুরির এক সুপ্রাচীন বটবৃক্ষ। এই মন্দিরটিকে পেছনে ফেলে গ্রামের রাস্তা ধরে আরও খানিকটা এগোলে আপনার চোখে পড়বে আর একটি মন্দির। বছর কয়েক আগেও ভাঙাচোরা, আগাছা আর জঙ্গলে পরিপূর্ণ এই মন্দিরের চেহারা দেখে ভয় পেতেন দর্শনার্থীরা। বিকেলের পর মন্দির দর্শনের কথা কল্পনাও করা যেত না। কিন্তু বর্তমানে আমূল সংস্কার হওয়ায় মন্দিরের ভোল একেবারে পাল্টে গেছে। বোঝার উপায়ই নেই কয়েক বছর আগেও মন্দিরটির চেহারা কেমন ছিল। তবে এই মন্দিরটিই বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলায় উল্লিখিত সেই কাপালিক কালীর মন্দির কী না, সে তথ্য আজও সন্দেহের কুয়াশায় ঢাকা। লিখিত কোনও প্রমাণ না থাকায় জনশ্রুতিকে বিশ্বাস করা ছাড়া কোনও উপায় নেই পর্যটকদের।

এই মন্দির ছাড়িয়ে আরও বেশ খানিকটা এগোলে আপনার নজরে পড়বেই পথের বাঁ-পাশ আলো করে দাঁড়িয়ে থাকা দরিয়াপুর দীপঘর বা লাইট-হাউস। লাইট-হাউসটি এক কথায় এই দরিয়াপুরের গর্ব। প্রাচীর ঘেরা এলাকার মধ্যে অফিস, বাগান, কর্মীদের আবাসন আর তার মাঝখানে উঠে গেছে সাদা-কালো বলয়ের উত্তুঙ্গ দীপঘর। দীপঘরের উচ্চতা ৭৫ ফুট,মানে প্রায় সাততলা বাড়ির সমান। ভেতরে ঘোরানো সিঁড়ি রয়েছে। সেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে দেখা যেতে পারে দিগন্ত পারের অপূর্ব ছবি। সামনেই গঙ্গার বিপুল জলরাশি। একূল ওকূল দেখা যায় না। নদী এখানে প্রায় ২০ কিলোমিটার মতো চওড়া। বামদিকে বয়ে চলেছে রসুলপুর নদীর শীর্ণ ধারা। অপেক্ষা করলে এই লাইটহাউজের শীর্ষ থেকে কখনও কখনও কলকাতা বন্দর অভিমুখী জাহাজের দেখা মিললেও মিলতে পারে।

দীপঘরের যন্ত্রপাতি সম্পর্কে কিছু পরিচিতি দেওয়া আছে। উৎসাহীরা খোঁজখবর করে জেনে নিতেই পারেন আরও কিছু তথ্য। মোটামুটি যতটুকু জানা যায়, একসময় এই লাইট হাউসের যন্ত্রপাতি ছিল দ্বারকাতে এবং তখন এটি জ্বালানো হত তেলের সাহায্যে। পরে ১৯৬৪ সালে ওইসব যন্ত্রপাতি নিয়ে আসা হয় কলকাতা লাইটহাউসে এবং সংস্কার করে ১৯৬৮ সালে দরিয়াপুরে স্থানান্তরিত করা হয়। তখন থেকে এটি তেলের পরিবর্তে পেট্রোলিয়ম ভেপার বার্নারে জ্বালানো শুরু হয়। উনিশ মাইল দূরের সমুদ্র থেকে আজও জাহাজের নাবিকেরা এর আলো দেখতে পান। তাদের বিপদে-আপদে প্রধান ভরসাই এই দরিয়াপুর আলোকস্তম্ভ। এখানে এলে একবার ঘুরে দেখে যেতেই পারেন বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই দীপঘরে। লাইটহাউজের উপর থেকে নীচের প্রকৃতি মনে হয় যেন ক্যানভাসে আঁকা ল্যান্ডস্কেপ। সে সৌন্দর্যও আপনার আজীবনের সঞ্চয় হয়ে থাকবে।

লাইট হাউস ঘুরে দেখার সময় কিন্তু বিকেল ৩টে থেকে বিকেল ৫টা, মাত্র ২ঘণ্টা। প্রবেশমূল্য বয়স্কদের জন্য ১০ টাকা আর শিশুদের মাত্র ৩ টাকা, স্টিল ক্যামেরা ২০ টাকা আর ভিডিওর জন্য ২৫ টাকা করে লাগে।

এখান থেকেই পায়ে পায়ে দেখে নেওয়া যায় দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল ফিশিং হারবার। কাঁথি শহর থেকে দরিয়াপুরের দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার। অটো, জিপ বা ভাড়া করা গাড়ি নিয়ে স্বচ্ছন্দে একবেলা ঘুরে আসা যায় দরিয়াপুর থেকে। আর একটু সাশ্রয় করতে চাইলে রুটের ট্রেকারে কাঁথি থেকেও আসা যায় এই পথে।

দরিয়াপুর থেকে নদী পেরিয়ে ওপারে গেলেই হিজলি। হিজলি শব্দটার মধ্যেই একটা মাদকতা আছে, তাই না! ইতিহাস, ভূগোল আর অপার্থিব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে ‘হিজলি’তে। হিজলিকে জানতে গেলে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতেই হবে ইতিহাসের পথে। তা নাহলে এই ভ্রমণ কেবল নীরস পরিক্রমা হয়ে দাঁড়াবে।

রসুলপুর নদী গঙ্গার শেষ উপনদী। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ‘কপালকুণ্ডলা’-য় উল্লিখিত এই সেই বিখ্যাত রসুলপুর নদী। উপনদী যেখানে গঙ্গায় মিশেছে সেই সংযোগস্থলেরই উত্তর তীরে হিজলি আর দক্ষিণ তীরে দরিয়াপুর।

চতুর্দশ শতাব্দী ছিল তাম্রলিপ্ত বন্দরের অন্তিমকাল। তারপর অনেক জল বয়ে গেছে নদী দিয়ে। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকে ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে ওড়িশার পিপলি বন্দর থেকে হিজলিতে এসে হাজির হন একদল পর্তুগিজ বণিক। হিজলি অঞ্চল তখন ঘন জঙ্গলে ঢাকা, বসবাসের কোনও সুযোগ-সুবিধেই নেই। বলতে গেলে, পর্তুগিজদের হাতেই হিজলির উত্থান। ১৫৮৬ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তাম্রলিপ্ত বন্দরের বিকল্প হিসাবে হিজলি বন্দরের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া এবং ইউরোপে। চাল, কার্পাস আর পাটের কাপড় যা রেশমি বস্ত্রের মতো, তার প্রধান বেচাকেনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই বন্দর। নাগাপট্টম, সুমাত্রা, মালাক্কার মতো দূর দূর অঞ্চল থেকে বাণিজ্য-জাহাজ আসত এই বন্দরে।প্রচুর পরিমাণে চাল, কার্পাস ও রেশমবস্ত্র ছাড়াও মাখন, লঙ্কা, চিনি ও অন্যান্য জিনিসপত্রও নিয়ে যেত তারা। পর্তুগিজ ছাড়াও ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজ বণিকদের কাছেও ক্রমশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এই বন্দর। আজ ভাবতে অবাক লাগে, কত বছর আগে, প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যকেন্দ্র ও শ্রেষ্ঠ বন্দরের খ্যাতি অর্জন করেছিল এই বাংলার বুকে হিজলি বন্দর।

১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে হিজলির যুদ্ধ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। মাত্র দু’শো সৈন্য নিয়ে জোব চার্নক সেদিন চাতুরি করে মোগল সেনাধ্যক্ষ আবদুস সামাদের ১২ হাজার সৈন্যের বিপুল বাহিনীকে পরাজিত করেন। সেই লজ্জাজনক হারের পথ ধরেই ভারতের মাটিতে, হিজলিতে ইংরেজ আধিপত্যের গোড়াপত্তন হল ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ই জুন। হিজলি তখন বিশাল দুর্গ সমন্বিত রাজধানী শহর। আপাতত সেই অতীত গৌরবের সাক্ষী বলতে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। শুধু একা কুম্ভের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অতীত সৌভাগ্যের নিদর্শন মসনদ-ই-আলা।

এই মসজিদটি মুসলিম স্থাপত্যরীতির এক অতি প্রাচীন নিদর্শন। ঐতিহাসিকদের মতে, এই মসজিদের নির্মাণ শুরু হয় শাহজাহানের শাসনকালে আর শেষ হয় ১৬৪৯ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু এই মসজিদ নির্মাণ করল কে?

সে ইতিহাস জানতে গেলে আবার পিছিয়ে যেতে হবে সেই সুদূর অতীতে। এই অঞ্চলে হিজলি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মোগল সুবেদারের অধীনস্থ ক্ষমতাশালী জমিদার মনসুর ভুঁইঞার ছোটছেলে রহমত ভুঁইঞা। রহমত তাঁর বড়ভাই জামালের ষড়যন্ত্রের হাত থেকে বাঁচতে এই হিজলিতে পালিয়ে আসেন এবং হিন্দু কর্মচারীদের নিয়ে রাজ্যপাট চালাতে থাকেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র দাউদ খাঁ খুব অল্প দিন রাজত্ব করে মারা যান। দাউদ-পুত্র তাজ খাঁ মসনদে বসে খুব অল্পদিনেই তাঁর নিজের প্রতিভার গুণে হিজলি রাজ্যকে সুশাসিত করেন। হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের প্রজাদের কাছেই প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করেন তিনি। এই তাজ খাঁ’ই উপাধি নেন মসনদ-ই-আলা। এই শব্দবন্ধের অর্থ– যাঁর আসন সবার উপরে।

রাজকর্মচারীদের ষড়যন্ত্রে তাজ খাঁ’য়ের প্রিয় ভাই সিকন্দরের মৃত্যু ঘটলে তাঁর মনে বৈরাগ্য জন্মায় এবং বর্তমান পটাশপুরের অমর্ষি নামক জায়গায় ফকির হজরত মখদুম-শেখ-উল-মশারেখ-শাহ-আবদুল-হক উদ্দিন চিশতির কাছে সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষা নেন। বাকি জীবনটা ঈশ্বর চিন্তাতেই কাটিয়ে দেন একদা দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই শাসক। ঈশ্বর ভজনার গুণে তিনি প্রজাদের কাছে হয়ে ওঠেন ঈশ্বরের অবতার রূপ। তাঁর সাধনক্ষেত্র হিজলিতে গড়ে তোলা হয় এই বিরাট মসজিদ, মসনদ-ই-আলা।

মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। পূর্ব দিকে তিনটে দরজা। তিনটি সুগোল প্রকাণ্ড গম্বুজ ও মিনার দ্বারা ছাদটি নির্মিত। অতীতে এই সুউচ্চ মিনারগুলি সাগর থেকে মোহনায় প্রবেশকালে বা বঙ্গোপসাগরে যাত্রাকালে বণিক, নাবিকদের পথ দেখানোয় সাহায্য করত।

মসজিদের মাঝের দরজার খিলানের একটু উপরে দেওয়ালের গায়ে আরবি অক্ষরের প্রস্তরলিপি রয়েছে। আর মসজিদের সামনে রয়েছে তাজ খাঁয়ের সমাধিমঞ্চ বা মাজার। লোকে বলে বাবাসাহেবের মাজার। চলতি কথায় মসনদ-ই-আলার স্থানীয় নাম ‘বাবাসাহেবের কোর্টগড়া’।

মাজারের সামনে রয়েছে একটা বেশ বড় কুয়ো। কথিত আছে, তাজ খাঁ সুদূর মক্কা থেকে পবিত্র জল এনে এর মধ্যে রেখেছিলেন। মসজিদের পাশে একটি প্রাচীন গুলঞ্চ গাছের পাশে রয়েছে তাজ খাঁয়ের ছোটভাই সিকন্দরের লোহার লাঠি। এটিকে ‘আশাবাড়ি’ বলে ডাকা হয়। জনশ্রুতি বলে, কোনও কামনা নিয়ে এক বারের চেষ্টায় এই আশাবাড়িকে কেউ যদি মাটি থেকে ওঠাতে পারেন, তাহলে তাঁর মনস্কামনা পূর্ণ হবেই। বছর দশেক হল মসজিদটি সংস্কার হয়ে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

খেজুরি থানার অন্তর্গত হিজলিতে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই মসনদ-ই-আলা সমান শ্রদ্ধার। এখানে অঞ্চলের লোকেরা মানত করে, ইচ্ছাপূরণ হলে পুজো দেয়, শিরনি চড়ায়। শিরনি তৈরি হয় চালের গুঁড়ো, ময়দা এবং চিনি দিয়ে।

প্রতিবছর চৈত্র মাসের প্রথম শনিবার সারারাত ধরে মেলা বসে সন্ধে থেকে। আশেপাশের জেলাগুলো থেকে হাজার হাজার মুসলমান জলপথে, যানবাহনে বা পায়ে হেঁটে আসেন এখানে। কেবল মুসলমানেরাই নন, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লক্ষাধিক মানুষের ঢল নামে এই মেলায়। এই মুহূর্তে পশ্চিমবাংলায় এরকম সর্বধর্ম সমন্বয়ের, সম্প্রীতির মেলা খুব কমই আছে।

ঘন ঝাউয়ের জঙ্গল, রসুলপুরের সুদূরপ্রসারী মোহানা, আর পিছনের উঁচুনীচু বালিয়াড়ি – সব মিলিয়ে এই মসনদ-ই-আলা আগামীর সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো বাঁকিপুটের পাশাপাশি বাংলার পর্যটন মানচিত্রে আলাদা জায়গা করে নেবে হিজলিও।

বাঁকিপুটে রাত্রিবাসের ঠিকানা
ঝিনুক লজ, বাঁকিপুট, চলভাষ – ৯৮৩১১৬৭৫৩৭।
You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.