HeaderDesktopLD
HeaderMobile

পুজোর ছুটিতে পৌঁছে যান সুবর্ণরেখার তীরে অরণ্য, মন্দির, লোককথার স্বর্গরাজ্য নয়াগ্রামে

0 160

পুজোর মধ্যে দুদিনের জন্য বেরিয়ে পড়তে চান অজানার পথে! কিন্তু কোথায় যাবেন ঠিক করে উঠতে পারছেন না, তাই তো? কোভিড পরিস্থিতিতে টানা সাত মাস ঘরবন্দি থেকে হাঁপিয়ে উঠেছে আমাদের সুদূর পিয়াসী মন। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে বেশি দূরে ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ আর সাহস কোনওটাই নেই। অথচ মাত্র তিন চার ঘণ্টার গাড়ি দূরত্বে এই বাংলার বুকেই লুকিয়ে আছে কত শত অজানা সৌন্দর্যের খনি, রূপে রসে গল্পকথায় যা মুহূর্তে জয় করে নিতে পারে ভ্রমণপিপাসু পথিকের মন।

পাঁচসাত না ভেবে বরং বেড়িয়ে পড়ুন না, এমনই এক সোনার কাঠির খোঁজে, যার ছোঁয়ায় জেগে উঠবে রোজকার হাঁপিয়ে ওঠা জীবন, ফুসফুসে ভরে নেওয়া যাবে তাজা হাওয়া, মন মেতে উঠবে আনন্দে। কলকাতা থেকে মাত্র ১৮৪ কিলোমিটার দূরত্ব মেদিনীপুরের নয়াগ্রাম তেমনই এক সোনার খনি। সুবর্ণরেখার তীরে অরণ্য, দেউল আর লোককথার স্বর্গরাজ্য। দুটো দিন শহুরে জীবন থেকে ছুটি নিয়ে দিকশূন্যপুরে পালিয়ে যাওয়ার আদর্শ ঠিকানা।

পশ্চিম মেদিনীপুরের নয়াগ্রাম নামে নয়া হলেও, বয়সের হিসাবে বেশ প্রাচীন জনপদ। ওড়িশা রাজ্যের গা-ছোঁয়া সীমান্ত এলাকায় শাল সেগুনের অরণ্যে ঘেরা নয়াগ্রাম আজও সুন্দরী আদিবাসী মেয়েটির মত অনাবিষ্কৃত, রহস্যময়। এখনও দিনের বেলা এই পথে রাস্তা পারাপার করে বুনো হাতির দল। প্রচণ্ড গরমে এ পথে এলে আচমকা গ্রামের পুকুরে কোনও কোনও হাতিকে গা-ডুবিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠবেন না। স্নান শেষ হলে কাদামাখা শরীরে পথের মানুষজনকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে, সে আপন খেয়ালে দুলকি চালে জঙ্গলের দিকে চলে যাবে। পর্যটক আকর্ষণের নানা উপাদান থাকা সত্ত্বেও এ রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে নয়াগ্রাম আজও অবহেলিত। সুস্থ পর্যটনের কোনও পরিকাঠামোই গড়ে ওঠেনি এখানে। খুব সাধারণ মানের কিছু হোটেল ও হাতে গোনা দুএকটি ভালো মানের বনবাংলো আজও পর্যটকদের তৃষ্ণা মেটায়।

নয়াগ্রামের খড়িকামাথানি ব্যস্ত এলাকা। এখান থেকে কাছেই, পাঁচ কিলোমিটার দূরে কালুয়াষাঁড়ের থান। চারপাশে ঘন জঙ্গল, সবুজে ঘেরা গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে লোধা সম্প্রদায়ের বাস। এদের উপাস্য দেবতা কালুয়া ষাঁড়। এখনও জঙ্গলের মাটিতে কান পাতলে শুনতে পাবেন ষাঁড়বাবাকে মহিমাকে ঘিরে গুঞ্জরিত হওয়া কত শত লোককথা। জনশ্রুতি বলে, একদা এই গভীর, প্রায়ান্ধকার শাল জঙ্গল থেকে মাঝেমধ্যে লোকালয়ে বেরিয়ে আসত একটা মিশমিশে কালো, প্রবল শক্তিধর ষাঁড়। সবাই দেখতে পেত না তাকে। মুহূর্তখানেক দেখা দিয়ে জঙ্গলের অন্ধকারেই আবার মিশে যেত সে। হিংস্র বাঘের মুখে পড়ে জঙ্গলের অসহায় মানুষ স্মরণ করত এই ষাঁড়বাবাকে । আর্তের ডাক শুনে অন্ধকার অরণ্য থেকে সত্যি সত্যিই না কি বেরিয়ে আসত সেই অতিলৌকিক প্রকাণ্ড ষাঁড়! শুধু তাই নয়, বাঘের সঙ্গে লড়াই করে এই ষাঁড়বাবাই প্রাণ বাঁচাত ভয়ার্ত গ্রামবাসীদের। আজও নয়াগ্রাম এলাকার লোকেরা ঘরের বাইরে গেলে কালুয়া ষাঁড়কে স্মরণ করে যেতে ভোলেন না।

কালুয়াষাঁড়ের থানে কোনও মন্দির বা দেবতার মূর্তি নেই। গভীর জঙ্গলের মধ্যে এই থানটির চার দিকে আপনার চোখে পড়বে পোড়ামাটির ছোট বড় ঘোড়া আর হাতি। এগুলো দিয়েই ষাঁড়বাবার পুজো দেওয়ার রীতি এখানে। প্রতি শনি আর মঙ্গলবার পুজোর সময় ছাগল,মুরগি বলিও দেওয়া হয়। পৌষ সংক্রান্তির ঠিক আগের দিন এখানে বসে বিরাট এক মেলা। কালুয়া ষাঁড়কে দুম অর্থাৎ মদ দিয়ে পুজো দেওয়ার চলও আছে স্থানীয় আদিবাসীদের মধ্যে। গা ছমছমে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এই থানে পৌঁছনোই একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। দিনের আলো থাকতে থাকতেই এ পথে আসবেন। তবে বাজি রেখে বলতে পারি, অরণ্যের আদিম রূপ খালি হাতে ফেরাবে না আপনাকে।

নয়াগ্রাম বাজারের মধ্যে আছে নবাবের কাছারি বাড়ি।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে একসময় এই নয়াগ্রামের প্রেমে পড়েছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাব। তাই এই অঞ্চলটুকু কোনওভাবেই হাতছাড়া করেননি তিনি। কয়েকশো বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে নবাবের সেই কাছারিবাড়ি। এখান থেকে কিছুটা এগোলেই ভসরা ঘাট, সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে তন্বী সুবর্ণরেখা নদী। বেড়াতে এলে একটি বিকেল অন্তত কাটাবেন এই সুবর্ণরেখার তীরে। দিনের শেষ সূর্যাস্তের ছবি আপনাকে ইশারায় ডেকে নিয়ে যাবেই এক অচিনপুরের পথে।

বাসে বা গাড়িতে নয়াগ্রাম থেকে পলাশিয়া মাত্র ১২ কিলোমিটার। গ্রামের পথে তিন কিলোমিটার পেরোলেই রয়েছে সহস্রলিঙ্গের মন্দির। দেবাদিদেব মহাদেবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে অনেক জনশ্রুতি। কিংবদন্তী বাদ দিলেও মন্দিরটির বাস্তব আকর্ষণও কম নয়। এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গটি ভারি অদ্ভুত আকারের। এমন শিবলিঙ্গ ভূভারতে আর দ্বিতীয় আছে কী না, সন্দেহ। বৃহৎ লিঙ্গটির গায়ে দশটি ধাপ রয়েছে। প্রতিটি ধাপে আবার ১০০টি করে ছোট লিঙ্গ। এভাবে দশ ধাপে একহাজার লিঙ্গ আছে। দেবতার নাম তাই সহস্রলিঙ্গ। এই শিবের অধিষ্ঠান পঞ্চরথ শিখর দেউলের মধ্যে। এটি এই নয়াগ্রাম অঞ্চলের এক উল্লেখযোগ্য পুরাকীর্তি। দেবদ্বিজে আগ্রহ না থাকলেও কেবল পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবেও দেখে নেওয়া যায় এই মন্দির। ওড়িশার প্রায় সীমারেখায় গ্রামটি। তাই মন্দিরে ওড়িশি স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট।মাকড়া পাথরে নির্মিত মন্দিরটির মাথার কাছে আমলকী, কলস ও ত্রিশূল রয়েছে। মন্দিরের সামনেই নন্দীর মন্দির ও দক্ষিণে ঠাকুরের একটা কূপ আছে। এই মন্দিরের কোনও প্রতিষ্ঠালিপি পাওয়া যায়নি। তবে গঠন বৈশিষ্ট্য দেখে খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে এই মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল বলে অনুমান করেন গবেষকেরা।

নয়াগ্রামে বেড়াতে এলে আপনাকে একবার অন্তত যেতেই হবে রামেশ্বরনাথের মন্দিরে। নয়াগ্রাম থেকে গোপীবল্লভপুর যাওয়ার পথে পড়ে চাঁদাবিলা বাস স্টপ। এখান থেকে জঙ্গলের পথে বেশ কয়েকটা গ্রাম পেরিয়ে আট কিলোমিটার দূরে সুবর্ণরেখার ধারে অবস্থিত এই রামেশ্বর মন্দির। সপ্তরথ শিখর এই দেউলটি মাকাড়া পাথরে নির্মিত। মন্দিরের সারাশরীরে ওড়িশি শৈলির স্পষ্ট প্রভাব। অনেকখানি এলাকা জুড়ে এই মন্দির। মূল স্থাপত্যকে ঘিরে রয়েছে ঝামাপাথরে বাঁধানো বিশাল চত্বর। চারিদিকে ফাঁকা। যতদূর চোখ যায় ধূ ধূ করছে আশপাশ। তার মধ্যেই অনেকটা এলাকা জুড়ে গর্ভমন্দির, ভোগমণ্ডপ, আর নাটমন্দির নিয়ে তিরিশ ফুট উচ্চতার রামেশ্বর দেউল দাঁড়িয়ে আছে একাকী।

এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটা গল্প প্রচলিত আছে লোকমুখে। ত্রেতাযুগে বনবাসের সময় শ্রীরামচন্দ্র, স্ত্রী সীতাদেবি আর ভাই লক্ষ্মণকে নিয়ে না কি এসেছিলেন এই পথে! এর মধ্যে শিবরাত্রির তিথি এসে পড়লে, সীতাদেবী সুবর্ণরেখার তীরে বালি দিয়ে বারোটি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে পুজো নিবেদন করেন। পূজার্চনার পর সেই দ্বাদশ শিবলিঙ্গ নদীর জলে ভাসাতে গেলে শোনা যায় দৈববাণী। দেবতার ইচ্ছে অনুসারে শ্রীরামচন্দ্র বিশ্বকর্মাকে দিয়ে নদীর তীরেই একটি মন্দির তৈরি করেন এবং ওই বারোটি শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন। স্বয়ং রামচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত মন্দির, তাই নাম হয় রামেশ্বর দেউল।

বাস্তবে কোন সময়ে, কে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তা জানা যায়নি আজও। তবে মন্দিরটা যে বেশ প্রাচীন, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। মন্দিরের নির্মাণ চাতুর্য এমনই বিস্ময়কর, যে গর্ভ মন্দিরে কোনও জানলা না থাকা সত্ত্বেও তিনটে অঙ্গনের দরজা সমান্তরাল থাকায়, সূর্যোদয় হলেই সোজা সূর্যকিরণ ঢুকে আসে গর্ভগৃহে আর আলোকিত করে তোলে শিবলিঙ্গকে। শিবরাত্রির সময়ে এই মন্দির চত্বরে বিরাট মেলা বসে। তবে এই জায়গার মনোরম পরিবেশের আস্বাদ নিতে চাইলে শিবরাত্রির ভিড় এড়িয়ে আসুন। রাত্রিবাসের বন্দোবস্ত নেই বললেই চলে। তাই মন্দির চত্বর সূর্যাস্তের আগে দিনে দিনে ঘুরে নেওয়া ভালো।

রামেশ্বর মন্দির থেকে তিন কিলোমিটার দূরে দক্ষিণে সুবর্ণরেখা নদীর ধারে গভীর জঙ্গলের মধ্যে রয়েছে অপরূপ সুন্দর এক জায়গা, তপোবন। এমনিতেই অসামান্য রূপসি এই অরণ্য প্রকৃতি। জঙ্গলের বুক চিরে তিরতির করে বয়ে গিয়েছে সরু এক খাল। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এখানেই নাকি মহর্ষি বাল্মীকির তপোবন ছিল! এখানেই না কি যমজ সন্তান লব আর কুশের জন্ম দিয়েছিলেন সীতাদেবী! এখানে এলে আপনার প্রথমেই চোখে পড়বে বেশ কিছু উইয়ের ঢিপি বা বল্মীকস্তুপ। বাল্মীকির সমাধির পাশে সীতার আঁতুড়ঘরও রক্ষিত আছে। পাশাপাশি রয়েছে বেশ কয়েকটি মাটির কুটির। কয়েক জন সন্ন্যাসীও থাকেন এই চত্বরে। তাঁদের সঙ্গে বলে কিছুক্ষণ গল্প করতেই পারেন। দেখবেন, এক একটা কুটির দেখিয়ে এক এক রকম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তাঁরা।

বিশ্বাস অবিশ্বাসের উর্ধ্বে এই অদ্ভুত সারল্য ঘিরে আছে এই আরণ্যক আশ্রমটিকে, যা আপনার শহুরে মনকে স্পর্শ করবেই। একটা অখণ্ড ধুনি জ্বলছে এই আশ্রমে। তাতে কাঠ জুগিয়ে দেওয়ার রীতি চলে আসছে আজও। তপোবনের আশপাশের গ্রামগুলোয় আদিবাসীদের লোধাদের বাস। যারা এডভেঞ্চার ভালোবাসেন, গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে তপোবনে পৌঁছোনোর অভিজ্ঞতা, রোমাঞ্চ দেবেই তাদের। তপোবনে বাল্মীকির আশ্রম পর্যন্ত অবশ্য গাড়িতেও যাওয়া যায়। তবে নিজস্ব যান বা ভাড়া গাড়িতে করে আসা ছাড়া উপায় নেই। পথে কোনও নিয়মিত কোনও যানবাহন চলাচল করে না। গাড়ির ব্যবস্থা না থাকলে হাঁটা ছাড়া গতি নেই।

প্রকৃতি, নদী আর ইতিহাসের ত্রিবেণী সঙ্গম ঘটেছে এই নয়াগ্রামে। সব মিলিয়ে, দুটি দিন হাতে নিয়ে এই নয়াগ্রাম থানা এলাকায় ঘুরে বেড়াতে মন্দ লাগবে না আপনার। কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রাম হয়ে বাসে খুব সহজেই নয়াগ্রাম আসা যায়। আবার খড়্গপুর থেকে কোশিয়ারি হয়ে ভসরাঘাট পেরিয়েও আসা যায় এ পথে। নিজস্ব গাড়ি থাকলে তো কথাই নেই। কলকাতা থেকে উইকএন্ডে খড়্গপুর থেকে কোশিয়ারি হয়ে সুবর্ণরেখা পেরিয়ে নয়াগ্রাম আসা সব চেয়ে সুবিধের।

ভসরাঘাটে থাকার জন্য নয়াগ্রাম বনবাংলো রয়েছে। তার বুকিং-এর ঠিকানা-– আঞ্চলিক বনাধিকারিক, ঝাড়গ্রাম। দূরভাষ-– ০৩২২১-২৫৫০১০। আর আছে নয়াগ্রাম পঞ্চায়েত সমিতির লজ, আরণ্যক। বুকিং পঞ্চায়েত সমিতি অফিস, নয়াগ্রাম – দূরভাষ – ০৩২২৩-২৫৭২০৬। এবং নয়াগ্রামের খড়িকামাথানিতে রয়েছে অভিষেক হোটেল। চলভাষ – ৯৯৩২৮২৫৯৮০।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.