HeaderDesktopLD
HeaderMobile

গণেশ-কার্তিকের উল্টো অবস্থান! সাদিপুরের সভাকর বাড়ির দুর্গোৎসব যেন লোককথার আখর

0 155

রীতির বিপরীতে গণেশ ও কার্তিককে অধিষ্ঠিত রেখেই তিনশো বছর ধরে দুর্গা আরাধনা হয়ে আসছে সাদিপুরের সভাকর বাড়িতে। সভাকর বাড়ির এই পুজো ঘিরেই দুর্গোৎসবের ক’টা দিন আনন্দে মাতোয়ারা থাকেন সাদিপুর গ্রামের বাসিন্দারা।

দামোদর লাগোয়া জামালপুরের বেরুগ্রাম পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত গ্রাম সাদিপুর। সনাতন ঐতিহ্য মেনে এই গ্রামের সভাকর বাড়ির সাবেকি মন্দিরে হয় দেবীর আরাধনা। সভাকর পরিবারের বর্তমান বংশধর দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় জানান, বর্গিদের অত্যাচারে নিজ ভূমি ছেড়ে তাঁর পূর্বপুরুষরা পালিয়ে চলে এসেছিলেন এই সাদিপুর গ্রামে। এখানেই বসবাস শুরু করেন তাঁরা।

তাঁদের বংশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন কালী। দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পেয়ে তাঁদের বংশের পূর্বপুরুষ উমাচরণ চট্টোপাধ্যায় কালী বেদিতেই দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন।

হতদরিদ্র সাধক ব্রাহ্মণ উমাচরণ চট্টোপাধ্যায় বনের ফুল, চালতার আচার আর থোড়ের নৈবেদ্য দিয়ে দেবী আরাধনা করতেন। সেই রীতি মেনে আজও একই ধারায় তাঁর বর্তমান বংশধররা দুর্গা আরাধনা করে আসছেন।

কথিত আছে বহুবছর আগে বন্যার সময়ে দামোদরে পাটাতন সহ দুর্গা প্রতিমার একটি কাঠামো ভেসে আসে। স্থানীয় নাগড়া গ্রামের বর্গক্ষত্রিয় ধারা পরিবারের কয়েকজন সদস্য দামোদর থেকে সেই কাঠামোটি তুলে আনেন। তাঁরা সেই প্রতিমা কাঠামোটি দেবীপুরে বিক্রি করতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মা দুর্গার স্বপ্নাদেশ মেনে তাঁরা ওই কাঠামো আর দেবীপুরে বিক্রি করতে না গিয়ে দেবীর নির্দেশ মেনে পাটাতন সহ ওই কাঠামোটি হতদরিদ্র সভাকর পরিবারের বিধবা বধূ রতনমণি দেবীকে দিয়ে দেন। সেই পাটাতন ও কাঠামোতেই আজও দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে সভাকর বাড়িতে পুজো হয়ে আসছে। এখনও প্রতিবছর দুর্গাপুজোর সময়ে নাগড়ার বর্গক্ষত্রীয় ওই ধারা পরিবারে প্রসাদ পাঠান সভাকর পরিবারের সদস্যরা।

এমনটাও কথিত যে উমাচরণবাবুর সময়কালে একদল ডাকাত এক রাতের মধ্যে কাঁচা মাটির দেওয়াল ও খড়ের চালার মন্দির তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেখানেই অধিষ্ঠিত হন দেবী। সেই সময়কার মাটির দেওয়াল ও খড়ের চালার মন্দিরটি এখন আর নেই। সভাকর বংশের সদস্যরা পরবর্তীকালে ওই একই জায়গায় একটি সুন্দর পাকা দালান মন্দির তৈরি করেন।

পুজোর সূচনার ইতিহাস যেমন বৈচিত্রে ভরা তেমনি বৈচিত্র রয়েছে সভাকর বাড়ির দুর্গা প্রতিমায়। সাবেকি আমলের একচালার কাঠামোয় দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করা হয়। তবে এই সভাকর বাড়িতে দুর্গা প্রতিমায় সাধারণ রীতির ঠিক বিপরীত অবস্থান দেখা যায় গণেশ ও কার্তিকের।

এই বাড়ির প্রতিমায় গণেশ দেবী দুর্গার ডানদিকে না থেকে বাম দিকে অবস্থান করেন। আর কার্তিক বামদিকের পরিবর্তে ডানদিকে অবস্থান করেন। তবে কলা বউকে দুর্গা প্রতিমার ডানদিকে অর্থাৎ কার্তিকের পাশে রেখেই পুজো হয়।

লক্ষী ও সরস্বতীর অবস্থানে অবশ্য কোনও পরিবর্তন নেই। এই বাড়ির প্রতিমায় দুর্গার বাহন সিংহ সাদা বর্ণের। তার মুখটি আবার ঘোড়ার মুখের মতো। রায়নার মহেশ পালের পরিবার পুরুষানুক্রমে সভাকর বাড়ির এমন ব্যতিক্রমী মূর্তি তৈরি করে আসছেন।

গণেশ ও কার্তিকের স্থান বদল প্রসঙ্গে দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘শুনেছি আমাদের এক পূর্বপুরুষ আকণ্ঠ কারণ সুধা পান করে পুজোয় বসেছিলেন। পুরোহিত মশাই তাঁকে দক্ষিণে গনেশায় নমঃ ও বামে কার্তিকেয় নমঃ বলে পুজো করতে বললেও তিনি ঠিক তার উল্টোটাই বলে চলেন। পুরোহিত তাঁর প্রতিবাদ করলে তিনি পুরোহিতকে চোখ মেলে প্রতিমার দিকে তাকাতে বলেন। তখন পুরোহিত-সহ পরিবারের অন্য সবাই প্রতিমার দিকে তাকিয়ে দেখেন সত্যি দেবী দুর্গার বামে গণেশ ও ডানদিকে কার্তিক রয়েছে।’’ সেই থেকে বামে গণেশ ও ডানদিকে কার্তিককে অধিষ্ঠিত রেখেই সভাকর বাড়িতে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে।

সভাকর বাড়ির গৃহকর্ত্রী মানসী চট্টোপাধায় জানান, প্রতিপদের দিন থেকেই চণ্ডীপাঠ, আরতি ও ভোগ বিতরণের মধ্য দিয়ে তাঁদের বাড়ির পুজোর বোধন শুরু হয়ে যায়। তন্ত্রমতে দেবী আরাধনা করেন তাঁরা। স্থানীয় পূজারী মাণিক মুখোপাধ্যায় জানান, পূর্বে বর্ধমানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দিরে কামান দাগার শব্দ শুনতে পাওয়ার পর সভাকর বাড়িতে মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোর বলিদান শুরু হত। সেই সব এখন ইতিহাস। বর্তমানে পঞ্জিকার সাময় সারণী ধরে বলিধান হয়। দশমীর দিন দধিকর্মা বিতরণ ও সিঁদুর খেলা পর্ব মিটে যাওয়ার পর রাতে শোভাযাত্রা সহকারে দুর্গা প্রতিমা দামোদরে নিয়ে গিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.