HeaderDesktopLD
HeaderMobile

আমডাঙার করুণাময়ী কালী মা, যাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রানা মান সিংহ

0 50

দিল্লির মসনদে বসার পর সম্রাট আকবর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীরকে পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবিজয়ের  উদ্দেশ্যে। বাংলার মাটিতে মুঘল বাহিনীর সামনে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বারো ভুঁইয়ার অন্যতম প্রতাপশালী জমিদার ও যশোরের মহারাজা প্রতাপাদিত্য। মা যশোরেশ্বরী কালীর আশীর্বাদ নিয়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা প্রতাপাদিত্যের সেনার হাতে পরাজিত হয়েছিল মুঘলবাহিনী। দিল্লি ফিরে গিয়েছিলেন হতোদ্যম জাহাঙ্গীর। সম্রাট আকবরকে জাহাঙ্গীর বলেছিলেন, মা যশোরেশ্বরী কালীর আশীর্বাদেই মহারাজা প্রতাপাদিত্যের এত প্রতাপ। তাই প্রতাপাদিত্যকে হারিয়ে বাংলা জয় করা দুষ্কর হয়ে উঠেছে।

বাংলায় এসেছিলেন মুঘল সেনাপতি রানা মানসিংহ

মহারাজা প্রতাপাদিত্যকে শায়েস্তা করতে সম্রাট আকবর তখন বাংলায় পাঠিয়েছিলেন তাঁর সেনাপতি রানা মানসিংহকে। কিন্তু অম্বররাজ মানসিংহও বেশ কয়েকটি যুদ্ধে হেরে গিয়েছিলেন মহারাজা প্রতাপদিত্যের কাছে। অবিশ্বাস্যভাবে যুদ্ধে হারার পর মানসিংহ বুঝলেন, ঠিকই বলেছিলেন জাহাঙ্গীর। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের সকল শক্তির কেন্দ্র হলেন যশোরের যশোরেশ্বরী কালী মা।

মহারাজা প্রতাপাদিত্যের শক্তিকে খর্ব করার জন্য যশোরেশ্বরী কালী মায়ের এক পুরোহিতকে অর্থ দিয়ে বশ করেছিলেন মানসিংহ। তারপর সেই পুরোহিতের সাহায্যে যশোরের  থেকে মা যশোরেশ্বরীর বিগ্রহটি চুরি করে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আরাধ্যা দেবী মা যশোরেশ্বরী কালীর বিগ্রহটি চুরি যাওয়ায় শোকে মহারাজা প্রতাপাদিত্য সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিলেন। মূর্তি চুরির পুরো দায় চাপিয়ে দিয়েছিলেন মন্দিরের প্রধান সেবায়েত রামানন্দগিরির ওপর।

যশোরেশ্বরী কালীর প্রধান সেবায়েত রামানন্দগিরিকে অপমান করে মন্দির থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। অথচ নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ও কালীমায়ের পরম ভক্ত রামানন্দগিরি ছিলেন নিরপরাধ। অপমানিত রামানন্দগিরি সত্যি সত্যিই উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন।  কিছুদিন পর রানা মানসিংহ হীনবল প্রতাপাদিত্যকে হেলায় হারিয়ে দখল করেছিলেন বাংলা। যশোরের মন্দির থেকে চুরি করা মা যশোরেশ্বরী কালীর বিগ্রহটি রাজস্থানের অম্বর দুর্গে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজও সেই দুর্গেই বিরাজ করছেন মা যশোরেশ্বরী কালী।

মানসিংহের স্বপ্নে দেখা দিয়েছিলেন ক্রুদ্ধ কালিকা

কিন্তু বঙ্গবিজয়ের কিছুদিনের মধ্যেই অম্বররাজ মানসিংহ স্বপ্নে দেখেছিলেন মা যশোরেশ্বরী কালীকে। রুষ্ট কণ্ঠে মা কালী মানসিংহকে বলেছিলেন, মানসিংহের জন্যই তাঁর পরমভক্ত রামানন্দগিরি বিনা দোষে উন্মাদ হয়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মানসিংহ যেন নিজে গিয়ে রামানন্দগিরিকে জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেন এবং উদ্ধার করার পর সূক্ষ্মাবতী নদীর তীরে মা কালীর নতুন একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের মায়ের সেবার পূর্ণ দায়িত্ব যেন রামানন্দগিরিকে দেওয়া হয়। এর অন্যথা হলে সমূহ বিপদে পড়তে হবে রানা মানসিংহকে।

মা যশোরেশ্বরী কালীর সেই ভীষণা রূপ দর্শন করার পর মানসিংহ দেরি না করে চলে এসেছিলেন বাংলায়। যমুনার শাখা সূক্ষ্মাবতী নদীর তীরে থাকা জঙ্গল থেকে উদ্ধার করেছিলেন রামানন্দগিরিকে। মায়ের আদেশ মেনে সূক্ষ্মাবতী নদীর তীরের জঙ্গলের মধ্যেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মা করুণাময়ী কালীর বিগ্রহ। রানা মানসিংহ প্রতিষ্ঠিত সেই মন্দিরের নামই আজ ‘আমডাঙা করুণাময়ী মঠ’। মা যশোরেশ্বরী কালীর প্রধান সেবায়েত রামানন্দগিরির নাম অনুযায়ী জায়গাটির নাম হয়েছিল ‘রামডাঙা’। সেই রামডাঙাই পরিণত হয়েছে আজকের ‘আমডাঙা’য়। সূক্ষ্মাবতী নদীর বর্তমান নাম হল সুঁটির খাল।

মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের স্মৃতিও

ঐতিহাসিক করুণাময়ী কালীমন্দিরটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের স্মৃতিও। মীরজাফরকে সরিয়ে মীরকাশিম নবাবের  আসনে বসার পর, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে বন্দি করে ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে মুঙ্গেরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মুঙ্গেরেই গোপনে মহারাজকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন। সে খবর পেয়ে, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার জন্য আমডাঙা করুণাময়ী মঠের তৎকালীন মোহন্ত নারায়ণগিরি পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে মা করুণাময়ী কালীর আরাধনা শুরু করেছিলেন।

মায়ের অপার লীলায় আশ্চর্যজনকভাবেই মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র। মায়ের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতায় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র পরবর্তীকালে আমডাঙা করুণাময়ী মঠের সংস্কার করেন ও মঠকে নিষ্কর ৩৬৫ বিঘা জমি দান করেন। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রেরই ইচ্ছাতেই আমডাঙার করুণাময়ী মঠটি দ্বিতল হয়েছিল।

আজও আমডাঙায় বিরাজ করেন শ্রী শ্রী করুণাময়ী মাতা ঠাকুরানি

মঠের দোতলায় মহাদেবের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন কষ্টিপাথর নির্মিত দুই ফুট উচ্চতার করুণাময়ী কালী মা। ত্রিনয়নী দেবীর তিনটি চোখ, জিভ, নাকের নথ, মাথার সুদৃশ্য মুকুট ও কানের কান-পাশা সোনা দিয়ে তৈরি। দেবীর গলায় শোভা পায় মুণ্ডমালা। মন্দিরের গর্ভগৃহের সূক্ষ্ম কারুকার্য শোভিত দরজাটি সাড়ে চারশো বছরের পুরোনো এবং চন্দনকাঠ দিয়ে তৈরি।

মন্দিরের একতলায় ১০৮টি শালগ্রাম শিলার উপর প্রতিষ্ঠিত আছে রত্নবেদি। শ্রীক্ষেত্র ও আমডাঙার এই মঠ ছাড়া এই রত্নবেদি ভূভারতের আর কোথাও দেখতে পাওয়া যাবে না। এই রত্নবেদির টানেই আমডাঙার মঠে এসেছিলেন সাধক রামপ্রসাদ ও শ্রীরামকৃষ্ণ। ইতিহাস প্রসিদ্ধ এই মন্দিরটি আজ সারা ভারতে পরিচিত। দেশ বিদেশ থেকে বহু ভক্ত শ্রীশ্রী করুণাময়ী মাতা ঠাকুরানির দর্শন করতে আসেন। ২৫শে ও ২৬শে ডিসেম্বর বাৎসরিক উৎসব উপলক্ষ্যে বিশাল মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দীপান্বিতা কালী পূজার দিন মঠ প্রাঙ্গণে তিল ধারণের জায়গা হয় না। দূরদূরান্ত থেকে ভক্তেরা সেদিন ছুটে আসেন শ্রী শ্রী করুণাময়ী মাতা ঠাকুরানির দরবারে। কারণ তাঁরা জানেন অপার করুণা দিয়ে ভক্তগণের সর্বদুঃখ নাশ করেন আমডাঙার শ্রীশ্রী করুণাময়ী কালী মা।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.