HeaderDesktopLD
HeaderMobile

নারায়ণপুরে জমিদারবাড়ির ৩০০ বছরের পুজো বাঁচিয়ে রেখেছেন এলাকাবাসীরাই

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো: নারায়ণপুরের (narayanpur) মণ্ডলবাড়ির পুরোনো দালানগুলো একা পড়ে আছে। ৩০০ বছর আগের এলাহি ছবিটা এখনকার জীর্ণ প্রাসাদ দেখে বোঝার উপায় নেই। কী ছিল সেইসব দিন! পুজোর এলেই সানাই বেজে উঠত নহবত খানায়। বেলজিয়াম গ্লাসের বিশাল বিশাল সেজের ঝাড়বাতিতে সেজে উঠত দুর্গা মন্দির সহ গোটা জমিদারবাড়ি। বসত পুতুল নাচের আসর, রাতভর চলত যাত্রাপালা। দূরদূরান্তের মানুষ এসে যোগ দিতেন হদল নারায়ণপুরের (narayanpur) মণ্ডলবাড়ির পুজোয়।

প্রাচীন কামানে তোপ দেগে দুর্গাপুজোর প্রতিটি নির্ঘণ্ট ঘোষণা করা হত। উৎসবের আমেজে মেতে উঠত গোটা এলাকা। আজ আর সেই জমিদারি নেই, তবু বিশাল দেবোত্তর এস্টেটের আয়ে বছর বছর দুর্গাপুজোর আয়োজনে ত্রুটি রাখেন না মণ্ডল বাড়ির বর্তমান প্রজন্ম ।

আজও পুজো এলেই মণ্ডল জমিদারবাড়ির নহবত খানা থেকে ভেসে আসে সানাইয়ের সুর। ভাঁড়ার থেকে পুরনো দিনের সেই ঝাড়লন্ঠন বের করে ধুলো ঝেড়ে টাঙানো হয় দালানে। দেশবিদেশে ছড়িয়ে থাকা পরিবারের সদস্যরা আজও সময় করে ছুটে আসেন ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখার লোভে।

কীভাবে শুরু হয়েছিল জমিদারবাড়ির পুজো? মণ্ডলদের সমৃদ্ধির ইতিহাসের গায়েই লেগে আছে সেই গল্প।

আজ থেকে ৩ শতক আগে বর্ধমানের নীলপুর গ্রাম থেকে ভাগ্যের খোঁজে বেরিয়ে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজাদের সান্নিধ্য লাভ করেন মণ্ডল পরিবারের আদি পুরুষ মুচিরাম ঘোষ। মল্ল রাজাদের দাক্ষিন্যেই দামোদরের উপনদী বোদাই এর তীরে বিশাল এলাকার জমিদারী লাভ করেছিলেন তিনি । পরবর্তীকালে একাধিক নীলকুঠি পরিচালনা করে বিশাল সম্পত্তির মালিক হন ওই জমিদাররা। এর পরই বাঁকুড়ার হদল ও নারায়ানপুর গ্রামের মাঝে বিশাল জমিদারবাড়ি তৈরি করে শুরু হয় দুর্গাপুজো। ৩০০ বছর পেরিয়ে আজও সেই পুজো ঘিরে এলাকার মানুষের উন্মাদনায় এতটুকুও ভাঁটা পড়েনি।

৩০০ বছর আগে নীলপুর গ্রাম থেকে বেরিয়ে বাঁকুড়ার রামপুর গ্রামের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ শুভঙ্করের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় মুচিরাম ঘোষের। বিখ্যাত গণিতজ্ঞ হওয়ায় বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজ দরবারে শুভঙ্করের আলাদা খাতির ছিল। এই শুভঙ্করের সূত্রেই মল্ল রাজাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট বার্ষিক খাজনার বিনিময়ে দামোদরের উপনদী বোদাই এর কাছে উর্বর বিশাল এলাকার জমিদারী সত্ব লাভ করেন মুচিরাম ঘোষ। বেশ কয়েকটি তালুক নিয়ে বিশাল মণ্ডল জমিদার হওয়ায় মল্ল রাজারা তাঁদের মণ্ডল উপাধি দেয় ।

জমিদাররা নেই, তবে বাহিনের জমিদারবাড়ির পুজোই আজ সার্বজনীন দুর্গোৎসব

জমিদারী পত্তনের সাথে সাথেই হদল ও নারায়ন পুর গ্রামের মাঝে গড়ে ওঠা বিশাল জমিদারবাড়ির মন্দিরে শুরু হয় দুর্গাপুজো। পরবর্তীকালে ওই উর্বর এলাকায় ব্রিটিশরা নীল চাষ শুরু করলে ব্রিটিশ শক্তির সাথেও বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এই মণ্ডল জমিদারদের। আরও পরে ব্রিটিশদের কাছ থেকে ওই এলাকার মোট ৭ টি নীলকুঠী ইজারা নিয়ে নেন মণ্ডলরা। কথিত আছে সেসময় বোদাই নদীতে নীল বোঝাই করা বজরা ভাসিয়ে দূরদূরান্তে তা রপ্তানি করতেন মণ্ডলরা। নীল বিক্রি করে প্রচুর ধন সম্পদ বোঝাই বজরা নিয়ে ফিরে আসতেন গ্রামে। কিন্তু একবার ফেরার সময় জল দস্যুদের কবলে পড়েছিলেন মণ্ডল বাড়ির কোন এক পূর্বপুরুষ। কোনমতে বেঁচে ফিরলেও বজরায় থাকা যাবতীয় সম্পত্তি দুর্গার নামে দেবত্তর করে দেওয়ার মানত করেন তিনি।

সেই সমস্ত ধনসম্পদ দিয়ে বিশাল দুর্গাদালান, রাসমঞ্চ, রথমন্দির, নাটমন্দির, নহবত খানা তৈরি করেন মণ্ডলরা। একদিকে নীলকুঠির বিপুল আয় অন্যদিকে বিশাল জমিদারির খাজনায় ফুলে ফেঁপে ওঠে রাজকোষ। তার প্রতিফলন দেখা গেছিল জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজোতেও। কালের নিয়মে সেই জাঁকজমক পেছনে ফেলে এসেছে মণ্ডল পরিবার। তবে আগমনীর সুর বাতাসে ভাসতেই এবছরও মা দুর্গার আরাধনার জন্য তৈরি হচ্ছেন এলাকাবাসী। জমিদারবাড়ির পুজোই
যে এখনও এলাকার সার্বজনীন!

অষ্টমীতেই সিঁদুর খেলা হাওড়ার পালবাড়ির পুজোয়

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.