HeaderDesktopLD
HeaderMobile

তমলুকে বিরাজ করছেন সমগ্র মেদিনীপুরের মা, দেবী বর্গভীমা

0 45

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সদর শহর তমলুক। এই তমলুকেই বিরাজ করছেন সমগ্র মেদিনীপুরের মা, দেবী বর্গভীমা। একান্নটি শক্তিপীঠের অন্যতম এই পীঠে সতীর বাম গোড়ালি পড়েছিল। দেবী এখানে ভীমরূপা ‘কপালিনী’ ও তাঁর ভৈরব হলেন সর্বানন্দ। জনশ্রুতি বলে, প্রাচীনকালের তাম্রলিপ্ত জনপদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ছিলেন মা বর্গভীমা। মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে দুটি কিংবদন্তি আজও লোকের মুখে মুখে ঘোরে।

রাজা তাম্রধ্বজের উপাখ্যান

মহাভারতের সময় এই অঞ্চলে ছিল ময়ূরবংশীয় রাজা তাম্রধ্বজের রাজত্ব। রাজার প্রাসাদে রোজ জ্যান্ত শোল মাছ দিয়ে যেতেন এক জেলেনি। রাজার নির্দেশ ছিল রোজ জ্যান্ত শোল মাছই দিয়ে যেতে হবে। একদিন রাজপ্রাসাদে যাওয়ার সময় জেলেনি দেখেছিলেন তাঁর ঝুড়ির সবকটি মাছ মরে গিয়েছে। পাশেই ছিল একটি জলাশয়। সেই জলাশয়ের জল মাছগুলির গায়ে ছিটিয়ে দিতেই মৃত মাছগুলি আবার বেঁচে উঠেছিল। এই অলৌকিক ঘটনাটির কথা পৌঁছে গিয়েছিল রাজা তাম্রধ্বজের কানে।

রাজা সেই জলাশয়ের কাছে গিয়ে জলাশয়টির পাশে একটি বিগ্রহ দেখতে পেয়েছিলেন। খোলা আকাশের নীচে থাকা বিগ্রহটি একটি বেদীর ওপর বসানো ছিল। রাজা বুঝতে পেরেছিলেন জাগ্রতা এই দেবীর আশীর্বাদেই জেলেনির ঝুড়ির মৃত মাছগুলি পুনরায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে। জলাশয়ের জলের তাই দৈবগুণ আছে। তখন রাজা তাম্রধ্বজ, সেই পবিত্র জলাশয়ের ধারেই দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই মন্দিরটিই আজ পরিচিত মা বর্গভীমার মন্দির নামে। আজও বর্গভীমা মন্দিরে কালীপুজোর ভোগ হয় শোল মাছ দিয়ে।

ধনপতি সওদাগরের উপাখ্যান

সিংহলে বাণিজ্য করতে যাওয়ার জন্য তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে বাণিজ্যতরী ভাসাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ধনপতি সওদাগর। জলে ভাসার আগে তাম্রলিপ্ত শহরের পথে পথে ঘুরছিলেন তিনি। হঠাৎ তাঁর নজরে পড়েছিল এক ব্যক্তির হাতে থাকা সোনার কলশির দিকে। ধনপতি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তাম্রলিপ্তের মানুষ এত ধনী যে সোনার কলশি ব্যবহার করেন! ব্যক্তিটির কাছে ধনপতি সওদাগর জানতে চেয়েছিলেন ‘কলশি রহস্য’। ব্যক্তিটি ধনপতি সওদাগরকে চিনতেন না। তিনি ধনপতি সওদাগরকে নিয়ে গিয়েছিলেন একটি কুণ্ডের কাছে। সওদাগরকে বলেছিলেন, কুণ্ডে পিতলের জিনিস ডোবালে তা সোনায় পরিণত হয়। ব্যবসায়ী ধনপতি বাণিজ্যতরীতে থাকা সমস্ত পিতলের বাসনপত্র ও অন্যান্য জিনিস নামিয়ে এনে কুণ্ডের জলে ডোবাতেই সেগুলি সোনায় পরিণত হয়েছিল। সেই সোনা সিংহলে বিক্রি করে আরও ধনী হয়ে উঠেছিলেন ধনপতি সওদাগর। সিংহল থেকে বাণিজ্য সেরে ফেরার পথে আবার তাম্রলিপ্ত শহরে এসেছিলেন ধনপতি সওদাগর। তিনি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী সেই কুণ্ডের ধারে মা বর্গভীমার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

মায়ের মন্দির সুপ্রাচীন

যিনিই প্রতিষ্ঠা করুন, যেভাবেই মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হোক, মা বর্গভীমা কিন্তু হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে তমলুকের মাতৃমন্দিরে বিরাজ করছেন।

প্রাচীন শাস্ত্রে লেখা আছে,”কপালিনী ভীমারূপা বামগুলফো বিভীষিকে”। প্রাচীনকালে তাম্রলিপ্ত বন্দরকে বলা হত বিভীষক বা বিভাষ। ব্রহ্মপুরাণে শ্রী বিষ্ণু বলছেন ভারতের দক্ষিণে তমোলিপ্ত (তাম্রলিপ্ত) নামে গূঢ়তীর্থ বিরাজ করছে। সেই মহাতীর্থে অবগাহন করলে মানুষ বৈকুণ্ঠে গমন করে।

“আস্তি ভারতবর্ষস্য দক্ষিণস্যাং মহাপুরী,

তমোলিপ্তং সমাখ্যাতং গূঢ়ঃ তীর্থ বরং বসেত্।

তত্র স্নাত্বা চিরাদেব সম্যগেষ্যসি মত্পুরীং

জগাম তীর্থরাজস্য দর্শনার্থং মহাশয়।।”

এছাড়া চারশো বছর আগে কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চণ্ডীমঙ্গল (অভয়ামঙ্গল) কাব্যে মা বর্গভীমা সম্পর্কে লিখে গিয়েছিলেন, “গোকুলে গোমতী নামা তাম্রলিপ্তে বর্গভীমা উত্তরে বিদিত বিশ্বকায়া।”

মা বর্গভীমার পরিচয় নিয়ে অনেকে আজও দ্বিধান্বিত

কেউ মা বর্গভীমাকে কালী বলে থাকেন। কেউ বলে থাকেন মা হলেন দশমহাবিদ্যার দ্বিতীয় রূপ তারা বা উগ্রতারা। কেউ বলেন মা হলেন চণ্ডীতন্ত্রে বর্ণিত ভীমাদেবী। অনেক ইতিহাসবিদ বলে থাকেন দেবী আসলে বৌদ্ধদেবী ‘বজ্রভীমা’ এবং স্থানটিতে আগে বৌদ্ধ মঠ ছিল। পরে বৌদ্ধ মঠটিকে বল্লাল সেনের আমলে হিন্দুমন্দিরের রূপ দেওয়া হয়। যিনি যাই বলুন মা বর্গভীমাকে হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে মা দুর্গা, মা কালী, কখনও বা মা জগদ্ধাত্রী রূপে পূজা করে আসছেন সনাতনধর্মী ভক্তের দল। তবে মন্দিরের বিগ্রহটি যেহেতু দেবী কালিকার, তাই মা বর্গভীমাকে বাংলার মানুষ মা কালীই ভাবেন। পণ্ডিতেরা বলেন দেবী তাঁর ভক্তদের ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ বা চতুর্বর্গ দান করেন বলেই দেবীর নাম বর্গভীমা।

তমলুকের মাণিকতলা মোড় থেকে অনতিদূরে মায়ের মন্দির। বেশ কটি সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছাতে হয় মা বর্গভীমার মন্দিরে। নাটমন্দির, যজ্ঞ মন্দির, জগমোহন ও মূল মন্দির নিয়ে গঠিত মন্দির কমপ্লেক্স। বৌদ্ধ স্থাপত্যে তৈরি ষাট ফুট উচ্চতার মূলমন্দিরটির বাইরের দেওয়ালে সাতাশটি পোড়ামাটির মূর্তি বর্তমান। মূলমন্দিরের গর্ভগৃহে বিরাজ করেন কষ্টিপাথরে নির্মিত মা বর্গভীমা। মা কালিকা এখানে ঘন কৃষ্ণবর্ণা, মুক্তকেশী ও করালবদনা। চতুর্ভুজা দেবী তাঁর ডান হাত দুটিতে ধারণ করে আছেন খড়্গ ও ত্রিশূল এবং বাম হাত দুটিতে খর্পর ও নরমুণ্ড। দেবীর মাথায় সোনার মুকুট। সর্বাঙ্গে শোভা পায় নানান অলঙ্কার।

দীপান্বিতা কালীপুজোর দিন মায়ের মন্দিরে জনসমুদ্র দেখা যায়। বছরের অন্যান্য দিন সন্ধ্যাবেলাতেই বন্ধ হয়ে যায় মায়ের মন্দিরের দরজা, কিন্তু কালীপুজোয় সারা রাত মন্দির খোলা থাকে। তমলুক রাজবাড়ি থেকে প্রতি বছর কালীপুজোর নৈবেদ্য আসে। কালীপূজার দিন খুব ভোরে দেবীকে স্নান করানো হয়। তারপর শুরু হয় নিত্যপুজো। ছোলা, শরবত, ফল ও মুড়কি বা শীতলভোগ দেওয়ার পর মাকে বেনারসি শাড়ি পরিয়ে রাজবেশে সাজিয়ে দেওয়া হয়। দুপুরে মাকে দেওয়া হয় বিশেষ ভোগ। সেই ভোগে থাকে সাদা ভাত, খিচুড়ি, পাঁচ রকম ভাজা, তিন রকম তরকারি, পোলাও, শোল, ইলিশ, চিংড়ি ও পায়েস। সন্ধারতির পর মাকে দেওয়া হয় পাঁচ রকম ফল, পাঁচ রকম মিষ্টি, লুচি, আলুভাজা ও ক্ষীর। গভীর রাতে শোলমাছ ও পাঁঠার মাংস দিয়ে তন্ত্রমতে হয় মা বর্গভীমার নিশি পুজো।’‌

মা বর্গভীমার মন্দির হল সেই মন্দির, যে মন্দির ভাঙতে পারেননি স্বয়ং কালাপাহাড়।

আফগানিস্তান থেকে বাংলায় আসা সুলতান তাজ কররানী প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের এক দুর্ধর্ষ সেনাপতি ছিলেন কালাপাহাড়। আসল নাম ছিল কালাচাঁদ রায় (মতান্তরে রাজীবলোচন রায়)। তিনি ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের নিয়ামতপুরের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। কালাচাঁদ রায় নবাব সুলেমান খান কররানীর মেয়ে দুলারি বিবির প্রেমে পড়েছিলেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে দুলারি বিবিকে বিবাহ করেছিলেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর কালাচাঁদ রায়ের নাম হয় ‘মহম্মদ ফরমুলি’। মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান কন্যাকে বিবাহ করার জন্য বর্ণবাদী হিন্দুরা কালাচাঁদ রায়কে সমাজচ্যুত করেছিল। মায়ের অনুরোধে কালাচাঁদ রায় কিছুদিন প্রায়শ্চিত্ত করে হিন্দুধর্মে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাংলার হিন্দু ধর্মগুরুরা তাঁকে হিন্দু ধর্মে ফিরতে দেননি।

এরপর কালাচাঁদ রায় গিয়েছিলেন পুরী। পুরীর জগন্নাথ দেবের মন্দিরে গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করবেন বলে। কিন্তু পুরীর মন্দিরের পাণ্ডারা কালাচাঁদ রায় ও তাঁর স্ত্রীকে বিধর্মী বলে মন্দিরে প্রবেশ করতে দেননি। এবং জানিয়ে দিয়েছিলেন কালাচাঁদ রায় কখনও আর প্রায়শ্চিত্ত করতে পারবেন না। মর্মাহত কালাচাঁদ রায়ের ভেতরে জ্বলতে শুরু করে প্রতিশোধের আগুন। ১৫৬৮ সালে তিনি পুরীর জগন্নাথ মন্দির আক্রমণ করেছিলেন। তবে ধ্বংস করতে না পারলেও প্রভূত ক্ষতি ও সম্পদ লুঠ করে নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মাদ কালাচাঁদ রায় ভাঙতে শুরু করেছিলেন একটার পর একটা হিন্দু মন্দির। আক্রমণ করেছিলেন মা কামাখ্যার মন্দিরও। কালাচাঁদ রায়ের নাম হয়ে গিয়েছিল কালাপাহাড়।

কালাপাহাড়ের আক্রমণে বাংলার বেশিরভাগ মন্দির ধ্বংস হয়েছিল। উড়িষ্যাকে চূর্ণ করে একের পর এক মন্দির ও দেবদেউল ধ্বংস করতে করতে কালাপাহাড় ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রবেশ করেছিলেন তাম্রলিপ্ত বা তমলুকে। উদ্দেশ্য ছিল ভারতবিখ্যাত মা বর্গভীমার মন্দির ধ্বংস করা। শিশুকাল থেকেই জাগ্রতা এই দেবীর কথা অনেকের মুখে শুনেছিলেন তিনি। তাই দেবীকে নিজের চোখে দেখার সাধ হয়েছিল কালাপাহাড়ের। রূপনারায়ণের তীরে ফেলা সেনা ছাউনি থেকে একাই গিয়েছিলেন মা বর্গভীমার মন্দিরে। মা বর্গভীমার সম্মোহিনী শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছিলেন হিন্দুবিদ্বেষী কালাপাহাড়। মায়ের ভূবনমোহিনী রূপে সম্মোহিত কালাপাহাড় মন্দির ধ্বংস করার কথা ভুলে মায়ের পদতলে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। কালাপাহাড়ের ধ্বংসলীলা থামিয়ে দিয়েছিলেন মা বর্গভীমা।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.