HeaderDesktopLD
HeaderMobile

ক্যানিংয়ের ভটচায বাড়ির পুজোর শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যে কালোই জগতের আলো

0 40

সময়টা হিসেব করতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় দুশো বছর। কথিত, এক মহা সপ্তমীর পুজো চলার সময় পাশের একটি মনসা মন্দিরের জলন্ত প্রদীপের শিখা থেকে সলতে নিয়ে দুর্গা মন্ডপে ফেলেছিল একটি কাক। আর মুহূর্তের মধ্যেই সেই বিধ্বংসী অগ্নিশিখার লেলিহান আগুন গ্রাস করে নেয় সমগ্র পুজোমণ্ডপকে। আগুনের লেলিহান শিখা থেকে রক্ষা পায়নি দেবী দুর্গার মুর্তিও।

এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন সমগ্র ভট্টাচার্য্য পরিবারের সদস্যরা। এলাকার মানুষজন রব তুলেছিলেন, তাঁদের ওপর দেবী দুর্গা রুষ্ট হয়েছেন। আর পুজো চাইছেন না। তাই আগুনে মায়ের মূর্তি পুড়ে কালো হয়েছে।

তখন ধ্যানে বসেন ভট্টাচার্য পরিবারের এক সদস্য। আদেশ পান, সব আচার মেনেই পুজো হবে। তবে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গিয়ে দেবীর মুখ যেমন কালো আর শরীর বাদামী রং হয়েছে ঠিক তেমন ভাবে দুর্গামূর্তি গড়ে পুজো করতে হবে। আর তা না হলে ভট্টাচার্য্য বংশের ক্ষতি হবে। সেই থেকেই ক্যানিংয়ের দিঘির পাড়ের ভট্টাচার্য বাড়ির প্রতিমার মুখ কালো আর শরীর বাদামী রঙের।

এই পুরো গল্পটাই শোনালেন পরিবারের সদস্য পীযুষ কান্তি ভট্টাচার্য্য। জানালেন, তখন পুজো হত বাংলাদেশে। ভট্টাচার্য্য পরিবার এক সময় বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের পাইনখাড়া গ্রামে বসবাস করতেন। বংশের কালীপ্রসন্ন, কাশীকান্ত, রামকান্ত, রামরাজা ভট্টাচার্যরা মিলিত ভাবে পুজো শুরু করেন। আজ থেকে প্রায় ৪৩৫ বছর আগে অর্থাৎ ১৫৮৫ সালে। দেশভাগের পর ক্যানিং শহরে চলে আসেন ভট্টাচার্য্য পরিবার। ক্যানিংয়ে চলে আসলেও পুজোর সময় ক্যানিং থেকে সপরিবারে বাংলাদেশের বিক্রমপুরের পাইনখাড়া গ্রামে গিয়ে পুজো করে আসতেন ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যরা। পরে পুজো শুরু হয় ক্যানিংয়ে। পারিবারিক রীতি থেকে একটুও বিচ্যুত না হয়ে  ৭৩ বছর আগে এখানে দুর্গাপুজো শুরু করেন ভট্টাচার্য্য পরিবারের সদস্য ইন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য।

ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোতে মহিষ বলির প্রচলন ছিল। তাতে কেউ মায়ের প্রসাদ খেতেন না বলে ফলে পরবর্তী কালে পাঁঠা বলি দেওয়া শুরু হয়। একবার সেই বলি দেওয়ার সময় দুমড়ে মুচড়ে যায় খড়্গ। সেই থেকেই বলি দেওয়ার প্রথা এক রকম বন্ধ। এখন সপ্তমী-অষ্টমীর সন্ধি পুজোয় চালকুমড়ো বলি এবং নবমীতে চালকুমড়ো, শশা ও শত্রু বলি দেওয়ার প্রচলন। আতপ চাল দিয়ে মানুষের মূর্তি গড়ে মানকচু পাতার উপরে বলি দেওয়া কেই বলে শত্রু বলি।

৪৩৫ বছর ধরে একই পরিবার বংশ পরস্পরায় ভট্টাচার্য পরিবারের প্রতিমা গড়ে চলেছেন। বাংলাদেশে যাঁরা মূর্তি গড়তেন, সেই পাল বংশের বংশধররাই বাংলাদেশ থেকে এসে সুন্দরবনের বাসন্তী থানা এলাকার পশ্চিম বাসন্তী গ্রামে বসবাস করছেন। পাল বংশের বর্তমান প্রজন্ম গৌতম পাল এখন ভট্টাচার্য বাড়ির মূর্তি গড়েন।

পারিবারিক প্রথা মেনে বিসর্জনের পর প্রতিমার মূর্তি জলের তলায় তিনদিন পুঁতে রাখা হয়। যাতে করে প্রতিমা গভীর জল থেকে উপর ভেসে না উঠতে পারে। লক্ষ্মীপুজোর পরের দিন জল থেকে তোলা হয় কাঠামো। জন্মাষ্টমীর পুণ্যতিথি থেকেই শুরু হয় প্রতিমা গড়ার কাজ। সে কাজ শেষ হয় মহালয়ার দিন।

প্রতিবছর অষ্টমীর দিন সমস্ত দর্শনার্থীদের পুজোর প্রসাদ বিতরণ করা হয়। তবে এ বছর করোনার তাণ্ডবে সেটা আর হবে না। পরিবারের নিরাপত্তায় এবার আর বহিরাগত দর্শনার্থীদের বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এটাও ব্যতিক্রম বলেই জানাচ্ছেন ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যরা।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.