HeaderDesktopLD
HeaderMobile

গা ছমছমে জঙ্গলে, রহস্যময় এক গড়ে বাংলার প্রথম দুর্গাপুজো করেছিলেন কাপালিকরা

0

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলায় প্রথম দুর্গাপুজো (durgapuja) শুরু হয়েছিল এক জঙ্গলের ভেতর। গা ছমছমে পরিবেশে কামানের তোপ দেগে শক্তিরুপীনি দেবী দুর্গার পুজো করতেন কাপালিকরা। সে প্রায় হাজার বছর আগের কথা। প্রথম দুর্গাপুজোর সেই ইতিহাস আজও রহস্যে ঘেরা।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বক্তিয়ার খিলজির হাত থেকে রক্ষা পেতে বাংলার রাজা লক্ষণ সেন লুকিয়ে পড়েছিলেন কাঁকসার গড় জঙ্গলে। সেই জঙ্গল এতই ঘন যে কেউ লুকিয়ে পড়লে তাকে সহজে খুঁজে পাওয়া সম্ভব ছিল না। আর সেখানেই ছিল কাপালিকদের বাস। তাঁরা পাথরে খোদাই করা শক্তির দেবীর উপাসনা করতেন। দুর্গার আদিতম রূপ সেটিই। পুজোর সময় তাঁরা নরবলি দিতেন। শোনা যায়, যে বছর লক্ষণ সেন গড় জঙ্গলে আত্মগোপন করেন সেই বছরই কাপালিকরা সিদ্ধিলাভের জন্য ১০৮টি নরবলি দেবেন বলে স্থির করেন। কিন্তু এদিকে লক্ষণ সেন নরবলিতে বাধা দিতে পারেন ভেবে কাপালিকরা শেষে লক্ষণ সেনেরই শরণাপন্ন হন। বলেন, শক্তির দেবী অত্যন্ত জাগ্রত। এই পুজোয় যোগদান করে দেবীকে প্রসন্ন করলেই রাজা লক্ষণ সেন পুনরায় শক্তি ফিরে পাবেন। সেই প্রস্তাবে রাজা রাজি হলেও মাঝখানে এসে ব্যাঘাত ঘটান সভাকবি কবি জয়দেব।

সামদাসবাড়ে সমুদ্রপাড়ের রোদে আতস কাচের আগুনে দেবীর আরাধনা

তিনি বলেন দেবী কতটা জাগ্রত তার প্রমান চাই। তবেই বলি হবে নচেৎ বন্ধ। কিন্তু কাপালিকরা তা দেখাতে না পারায় কবি জয়দেব কৌশলে নিজেই একই দেহে দেবী দুর্গা এবং শ্রীকৃষ্ণের রূপ ধারণ করে দেখা দেন, বলি দিতে নিষেধ করেন। সেই রূপ দেখে দেবীর নাম হয় শ্যামরূপা। লক্ষণ সেনের হাত ধরেই পুজো পান সেই দেবী। তাঁরই মূর্তি পরবর্তীকালে অধিষ্ঠিত হয় গড় জঙ্গলে।

শোনা যায়, লক্ষণ সেন মারা যাবার আগে গড় জঙ্গলের পুজোর দায়িত্ব দিয়ে যান ইছাই ঘোষকে। ইছাই ঘোষ মারা গেলে তার পালিত কন্যা দেবীমূর্তি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বরাকরের কাছে সেটি নদীতে পড়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সেটি পাওয়া যায় নি। অগত্যা তিনি কাশিপুরেই ফিরে যান। শোনা যায়, পরে স্বপ্নাদেশ পান দেবী ওখানেই আছেন। সেখানেই দেবীকে প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ আসে। সেই মতো কল্যানেশ্বরীতেই দুর্গা মন্দির গড়ে দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

তাই আজও শ্যামরুপার পুজো শুরু হবার পর কল্যানেশ্বরীতে পুজো শুরু হয়। নরবলি না হলেও আজও এখানে ছাগ বলি প্রথা চলে আসছে। এছাড়া সারা বছরই নিত্যসেবা হয় এখানে। বিশেষ করে পুজোর কটা দিন এখানে নরনারায়ন সেবার আয়োজন থাকে। ঘন জঙ্গলের ভেতরে যাতে মানুষের যাতায়াতে কোনো সমস্যা না হয় তার জন্য গোটা জঙ্গল নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে দেয় কাঁকসা থানার পুলিশ।

নারায়ণপুরে জমিদারবাড়ির ৩০০ বছরের পুজো বাঁচিয়ে রেখেছেন এলাকাবাসীরাই

এখানকার পুজোর আরও এক আকর্ষণ হল অষ্টমীর দিন কামান দাগার আওয়াজ শোনা যায়। তারপরেই শুরু হয় বলি প্রথা। শুধু গড় জঙ্গলে নয়, তোপধ্বনি শুনেই বলি শুরু হয় আশেপাশের সমস্ত গ্রামে। সেই ঐতিহ্যময় কামান দাগার আওয়াজ শুনতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ভিড় করেন এখানে।

গাছের গায়ে ইটের টুকরো বেঁধে বর প্রার্থনা করেন ভক্তরা। আর মনস্কামনা পূর্ন হলে দেবীকে ফল মিষ্টি দিয়ে পুজো দেন তাঁরা। তবে ভক্তদের আক্ষেপ, যেভাবে শব্দদূষণ হয় তাতে আর কোনটা বাজির আওয়াজ আর কোনটা কামানের তা বুজে ওঠা সম্ভব হয় না। তবে জঙ্গলের ভেতরেই কোথাও কামান দাগা হয় যা আজও অনেক চেষ্টা করেও খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। জঙ্গলের দেবীর একাধিক রহস্য যেন আজও অটুট।

শহরের পুজো ছেড়ে ঘন এমন গা ছমছমে পরিবেশে বাংলার প্রথম দুর্গাপুজো দেখার রোমাঞ্চই তাই আলাদা। সেই অন্যরকম অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করতে বছর বছর উৎসাহী মানুষ ভিড় করেন গড় জঙ্গলে। বলির আগে কান পেতে তোপধ্বনি শুনতে রোম খাড়া হয়ে যায় তাঁদের। বাংলার প্রথম দুর্গাপুজোর ইতিহাস এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকে।

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.