HeaderDesktopLD
HeaderMobile

‘অর্পণনামা দলিল’ মেনেই পুজোর আয়োজন বননবগ্রামের কাছারি বাড়িতে, তবে বন্ধ ভোগ বিলি 

0 855

১৩১ বছরের পরম্পরায় ছেদ পড়ল এবার। আউশগ্রামের বননবগ্রামের কাছারি বাড়িতে এই বছর দুর্গাপুজোয় বন্ধ পাত পেরে ভূরিভোজ। পুজোর কয়েকদিন এই বনেদিবাড়ির চত্বর গ্রামবাসীদের ভিড়ে গমগম করে। কিন্তু এই বছর মানতে হচ্ছে সামাজিক দূরত্বের বিধি। তাই গণভোজের আয়োজনে কাটছাঁট।

সারাবছর চট্টোপাধ্যায় পরিবারের কেউ গ্রামে থাকেন না। বননবগ্রামের অট্টালিকাসম ’নতুন কাছারিবাড়ি’ ফাঁকাই পড়ে থাকে। শুধু দুর্গোৎসবের কয়েকদিন আলোর রোশনাইয়ে ঝলমল করে ওঠে বাড়ির চারপাশ। ১৩১ বছর আগে এই পুজো শুরু করেছিলেন এলাকার তৎকালীন জমিদার সারদাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। শেষ বয়সে তিনি সংসার ত্যাগ করে কাশীবাসী হয়েছিলেন। গৃহত্যাগের আগে কুলদেবীর সেবার জন্য একটি ‘অর্পণনামা দলিল’ করে যান। সেই অর্পণনামা দলিল মেনেই আজও পুজো হয়ে আসছে বননবগ্রামের নতুন কাছারিবাড়িতে। আচার আচরণে কোনও ছেদ প়ড়েনি।

বননবগ্রাম মৌজা সহ আশপাশের মৌজা মিলে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের অগাধ ভূসম্পত্তি ছিল। বহুকাল আগে চট্টোপাধ্যায় পরিবারে একটিই প্রতিমার পুজো হত। প্রায় ১৩১ বছর আগে যৌথ পরিবার ভেঙে দুটি পরিবারের সৃষ্টি হয়। সেই থেকেই বননবগ্রামের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের দুটি পুজো পরিচিত হয়েছে ‘পুরোনো কাছারি’ আর ‘নতুন কাছারি’র পুজো নামে। পুরানো কাছারিবাড়ির পুজোয় জৌলুস আর ততটা না থাকলেও আজও অটুট নতুন কাছারি বাড়ির পরম্পরা।

নতুন কাছারির পুজো শুরুর পিছনে রয়েছে এক কাহিনী। যৌথ পরিবারে থাকাকালীন সারদাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী নাকি একবছর পুজোর সময় দেবীমন্দিরে অসম্মানিত হয়েছিলেন বাড়ির অন্যান্য বধূদের কাছে। তখন তিনি পুজোর অঞ্জলি না দিয়ে মন্দির ছেড়ে বেড়িয়ে আসেন। অভিমান করে স্বামীর কাছে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন পৃথক পুজো না করলে জীবনে তিনি দেবীর মুখ দেখবেন না। স্ত্রীর আবদারে পরের বছর থেকেই পৃথক প্রতিমার পুজো শুরু করেন সারদাপ্রসাদ। সারদাপ্রসাদের ছিল ছয় পুত্র। তাঁদের মধ্যে একজন নলিনীরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বৃটিশ আমলে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। তাঁর আমলেই তৈরি হয়েছিল নতুন কাছারি বাড়ির অট্টালিকাসম বর্তমান বাড়িটি। তার সঙ্গে কুলদেবীর মন্দিরও।

পরিবারের সদস্য প্রশান্ত চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তাদের পূর্বপুরুষ  সারদাপ্রসাদ শেষ জীবনে গৃহত্যাগ করার আগে গুসকরা সাব রেজেস্ট্রি অফিসে ১৯০৮ সালে একটি অর্পণনামা দলিল তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন। পাশাপাশি দেব সেবার জন্য প্রচুর জমি রেখে যান। পুজোর যাবতীয় পদ্ধতি প্রকরণ উল্লেখ করা রয়েছে সেই অর্পণনামা দলিলে। এই দলিল অনুযায়ী পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন ‘সেবাইত’কে। তিনিই কমিটির প্রধান হয়ে পুজো পরিচালনা করেন। তাকেই দায়িত্ব নিতে হয় সারাবছরের নিত্যসেবারও। এই সেবাইত নির্বাচনে ভোটাধিকার দেওয়া হয়নি পরিবারের মেয়ে ও বধূদের।

একচালায় তৈরি মাটির প্রতিমা পূজিতা হন নতুন কাছারিবাড়িতে। শাক্তমতে পুজো হয়। আগে অষ্টমীর সন্ধিক্ষণে মোষবলি দেওয়া হত। এখন শুধু ছাগ বলি হয়। কাছারিবাড়ির পুজোয় দেবীর ভোগে দিতে হয় ৯ রকমের ভাজা। সপ্তমীর দিন থেকেই মাছ ও মাংসের ভোগ দিতে হয় দেবীকে। নবমীর দিন ১৮ সের চালের পোলাও ভোগ লাগে। শুক্তো, শাক, মুগডালের সঙ্গে কচুর তরকারি ভোগে দেওয়া হয়। অষ্টমীর দিন চ্যাং ও ল্যাটা মাছ পুড়িয়ে ৬৫ টি আলাদা আলাদা পাত্রে দেবীমূর্তির পিছনে বিশেষ ভোগ দেওয়ার প্রথা প্রথম থেকেই চলে আসছে কাছারিবাড়িতে। এদিন সকালেও দেবীকে গোবিন্দভোগ চালের অন্ন মাটির মালসায় ভোগ দিতে হয়। দুপুরে দেওয়া হয় আলাদা ভোগ। রাতে লুচি ও মিষ্টির সঙ্গে ছ’সের দুধ ফুটিয়ে সেই ক্ষীরের ভোগ উৎসর্গ করা হয় দেবীকে।

পরিবারের সকলেই কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন। তাঁরা বর্তমানে কলকাতা বা অন্যান্য শহরে বসতবাড়িও করেছেন। কিন্তু দুর্গাপুজোর আগে সবাই চলে আসেন বননবগ্রামে নতুন কাছারি বাড়িতে। একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া হয়। পরিবারের সদস্য ও কাজের লোকজন মিলে রোজ প্রায় ২৫০ জনের পাত পড়ে। অষ্টমী ও নবমীর দিন নিমন্ত্রিত থাকেন বননবগ্রাম সহ আশপাশের গ্রামের পরিচিতরা। তবে এবছর থাকছে না ভোজের আয়োজন।

প্রশান্তবাবু বলেন, ‘‘করোনা পরিস্থিতির জন্য শুধুমাত্র পরিবারের সদস্যরা ও কাজের লোকজন বাড়িতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু গ্রামের ও আশপাশের গ্রামের মানুষদের নিয়ে ভোজ এবছর বন্ধ রাখতে হয়েছে। তাতে আমাদের মনে কষ্ট হলেও কিছু করার নেই। তবে দেবীর প্রসাদ বিতরণ করা হবে। যাতে সব পরিবার একটু করে মহাপ্রসাদ গ্রহণ করতে পারে। এটাও অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনেই করা হবে।”

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.