HeaderDesktopLD
HeaderMobile

সুতোয় বুনছেন জীবনের স্বপ্ন, স্বনির্ভর পথে মেয়েদের লড়তে শেখাচ্ছেন ফুলিয়ার দুর্গা আফরুন্নিসা

0 118

সুয্যি পাটে গেলে চিন্তার মেঘ ঘনাত বলিরেখা মাখা মুখে। দিনভর ছুটে চলা। বিরামহীন সংগ্রাম। পায়ের শুকতলা যেন খসে পড়ে। এদিকে দু’হাতের আঙুলে জাদু মাখিয়ে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। সূঁচে সুতো পরিয়ে টান দিলেই রূপকথা তৈরি হয়। কিন্তু তা বুঝবে কে? অভাবীর স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই, এ কথা বলেন মহাজনরাই। শুনে শুনে কানও ভারী হয়েছে। তাই আর দোরে দোরে ঘোরা নয়। পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে হবে নিজেকেই। দু’হাতে যে জাদু আছে, জীবনের ক্যানভাসে তাই হবে শক্তি। তৈরি হবে পথ। স্পষ্ট হবে লক্ষ্য পূরণের নিশান। প্রতিভা আর অধ্যবসায় তৈরি করবে স্বপ্নের বেদি। সে বেদিতেই আজ প্রতিষ্ঠিত ফুলিয়ার দুর্গা। বস্ত্রশিল্পী আফরুন্নিসা বেগম।

ফুলিয়ার তাঁতশিল্প, বস্ত্রশিল্পের নাম আছে। কিন্তু শিল্পীদের নাম অজানা। অস্থি-মজ্জার পরিশ্রম মহাজনের আলমারিতে বন্দি থাকে। নাম হয় সংগঠন, সংস্থার। শিল্পীর নয়। এ কথা বিলক্ষণ জানতেন আফরুন্নিসা। অভাবের ঘরে লক্ষ্মীর ধন আনার স্বপ্ন দেখেননি তিনি। তাঁর লড়াই তাই ছিল শিল্পীর মর্যাদা কিছু স্বার্থপর মানুষের কুঠুরি থেকে ছিনিয়ে বের করে আনা। স্বনির্ভর হওয়ার যে পথ দেখিয়েছেন আফরুন্নিসা, সেখানে কোথাও একটা নীরব প্রতিবাদ আছে। শিল্পকে বাঁচানোর, শিল্পীকে সম্মান দেওয়ার। সেই কাজে সফল আফরুন্নিসা বেগম। আজ তাঁর নিজের সংগঠন রয়েছে ‘ফুলিয়া তন্তুবায় সমবায় মহিলা সমিতি লিমিটেড’। সরকারি সাহায্যে নিজের শো-রুম তৈরি করেছেন। সাড়ে ছ’ শো মহিলার সংসার চালানোর দায়িত্ব নিয়েছেন একা হাতে।

“যখন কাজ খুঁজতে গিয়েছিলাম ঠাঁই দেননি মহাজনরা। সকলেই বের করে দিয়েছিলেন। পথে পথে ঘুরে নিজে কিছু থান কিনে সুতোর কাজ শুরু করি। তবে তাতে লাভ বিশেষ হত না,” বলেছেন আফরুন্নিসা। কাজ শেখার জন্যও গাঁটের কড়ি খসাতে হয়। মহাজনের হুকুম মানতে হয়। তাই সে পথেও সুবিধা হয়নি। শেষে ফুলিয়া থেকে সোজা চলে আসেন কলকাতায়। ইচ্ছা যদি ছোটখাটো কিছু একটা খোলা যায়। যা নিজের হবে। কারও জিম্মায় স্বপ্ন বন্ধক দিতে হবে না।

সুতোর উপর সুতো বুনে যখন টান দেন আফরুন্নিসা, মনে হয় সাদা ক্যানভাসে রঙের ছোঁয়া লাগল। একটার পর একটা টান। রঙের উপর রঙের প্রলেপ পড়ে একটা আস্ত গল্প তৈরি হয়। এই গল্প জীবনের। পরিশ্রমের। মেধার। শিল্পীর রক্তমাংস নিংড়ানো আবেগ আছে সেই গল্পে। প্রেম আছে, দুঃখ আছে, লড়াইয়ের প্রতিটা মুহূর্তের কথা বলা আছে নিখুঁতভাবে। সুতোর টানে স্বপ্ন বুনতে বুনতেই একদিন কলকাতার এক সংস্থার চোখে পড়ে যান আফরুন্নিসা। শিল্পীর প্রতিভা দেখে মুগ্ধ সেই সংস্থাই রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করে দেয় আফরুন্নিসাকে। তৈরি হয় চলার পথ। নিজের সংগঠন তৈরি করেন।

৫৫ জনকে নিয়ে কাজ শুরু করেন আফরুন্নিসা। তখন বাইরে থেকে রসদ জোগাড় করে এনে সুতোর কাজ করতে হত। লাভের খাতায় বিশেষ কিছু জমা হত না। তবে হাল ছাড়েননি আফরুন্নিসা। লক্ষ্যের পথে প্রথম সিঁড়িটা পেরিয়েই গিয়েছিলেন। পরবর্তী ধাপে তাই আরও বড় কিছু করার ইচ্ছা চেপে বসেছিল মনে। সে সুযোগও এসে যায় একদিন, আচমকাই।

“খাদি বোর্ড বলেছিল যদি আমি কিছুটা জমি দিতে পারি তাহলে তারা ঘর করে দেবে। সেখানে নিজের শো-রুম খুলতে পারব। আমি অনেক চেষ্টা করে কিছুটা জমি কিনে খাদি বোর্ডকে দিয়ে দিই। ওরাই দোকানঘরের ব্যবস্থা করে দেয়,” মুখে তৃপ্তির হাসি আফরুন্নিসার। মনের মতো করে সাজিয়ে তোলেন নিজের শো-রুম। নাম হয় ‘কাঁথাকলি কারুতীর্থ’ । আফরুন্নিসার পাশে দাঁড়ায় পশ্চিমবঙ্গ গ্রামীণ শিল্প পর্ষদ।

গ্রামের মেয়েদের সুতোর কাজ শেখাতে শুরু করেন আফরুন্নিসা। তাঁর কাঁথাকলিতে স্বপ্নপূরণের সুযোগ পা গ্রামের অভাবী মেয়েরা। কাপড়ের উপর সুতোর কাজে বোনা হয় নানা গল্প-কাহিনী। কখনও রাধা-কৃষ্ণ, কখনও শকুন্তলা। আবার কখনও আধুনিক সময়ের নানা ঘটনা পরম্পরা। এখনকার মেয়েদের মনের মতো করে তৈরি পোশাক বোনেন আফরুন্নিসা। তাতে বাংলার হারিয়ে যাওয়া লোকগাথাকে মিলিয়ে দেন। আফরুন্নিসার হাতের কাজ এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্য ও দেশের নানা প্রান্তে। শিল্পীর হাতে বোনা কাজের কদরও বেশি।

আফরুন্নিসার লড়াইয়ের গল্প এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু হয়নি। কারণ ফুলিয়ার এই দুর্গা শুধু নিজের স্বপ্নের জন্য বাঁচেননা। তাঁর লড়াইটা অনেক বড়। এক গ্রাম্য মহিলার ভাবনার ডালপালা ছড়িয়েছে দিগন্ত জুড়ে। সেখানে স্বপ্ন একটা নয়, হাজারটা। আফরুন্নিসা নিজেই বলেছেন, এখন তিনি শুধু শিল্পী নন। একজন অভিভাবক। মায়ের মতো আগলে রাখেন তাঁর মেয়েদের। গ্রামের যে মহিলারা আফরুন্নিসার হয়ে কাজ করেন তাঁরা শুধু কর্মচারী নন, তাঁর সন্তানও। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সমস্যায় পাশে দাঁড়ান আফরুন্নিসা। “কারও বিয়ে লাগল, সংসারে অশান্তি হল, আমি ছুটে যাই। ওরা আমাকে দেবতার মত মানে। সব কথা শোনে। আমি না দাঁড়ালে কে দেখবে ওদের,” শিল্পী নন, যেন একজন মা কথা বলছেন।

শুনে নিন আফরুন্নিসার কথাগুলো।

আফরুন্নিসার লড়াই এখন নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে। গ্রামের ঘরে ঘরে মহিলাদের স্বনির্ভর করার গুরুদায়িত্ব তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে। মেয়েদের উপর অত্যাচার হচ্ছে শুনলেই ছুটে যান। বয়সের বাধা মানেন না। তীব্র প্রতিবাদ করেন। গ্রামের পঞ্চায়েতের কাছে নালিশ করেন। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন। কেউ অসুস্থ হলেও আফরুন্নিসার ডাক পড়ে। নিজের খরচে গাড়ি ভাড়া করে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও তাঁর। কার সংসারে হাঁড়ি চড়ছে না, সেদিকেও শিল্পীর সতর্ক নজর। এর মধ্যেই প্রায় ২০০ জনের ঘরে চাল-ডাল পৌঁছে দিয়েছেন। খিদের যন্ত্রণা কতটা সেটা নিজের জীবনেই তো উপলদ্ধি করেছেন আফরুন্নিসা।

“একটা অনাথ আশ্রম খুলতে চাই। কর্মসাথী প্রকল্পে মেয়েদের জন্য ঋণের আবেদন করেছি। ২০ জনের জন্য আবেদন গৃহীত হয়েছে। আরও ২৮ জনের জন্য প্রস্তাব দিয়েছি,” বলেছেন আফরুন্নিসা। তাঁর এখন অনেক কাজ। তাঁর মেয়েদের সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। সে দায়িত্বও নিয়েছেন। সারাদিন মেয়েরা কাজ করে, তাঁদের সন্তানরা যাতে পড়াশোনা করতে পারে সে চেষ্টা করছেন। গ্রামের আরও মেয়েদের ডাক দিয়েছেন। সকলকে স্বনির্ভর করে তুলবেন আফরুন্নিসা।

দশ হাতে অশুভকে বিনাশ করেন দেবী দুর্গা। ফুলিয়ার এই দুর্গা দু’হাতেই জীবনের যন্ত্রণা মুছছেন। প্রাণের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন হেরে যাওয়া মনে। থেমে গেছে জীবনের যে অধ্যায়, তাকে জাগিয়ে তোলার শপথ নিয়েছেন আফরুন্নিসা। সুপ্ত থাকা বীজ থেকেই নতুনকে আবাহন করছেন। বাঁচতে শেখাচ্ছেন শত শত নারীকে। তাই তিনিই শক্তি, তিনিই দুর্গা।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.