HeaderDesktopLD
HeaderMobile

পুরুলিয়ার প্রথম মহিলা ছৌ-শিল্পী মৌসুমী, বৈষম্য ভেঙে শক্তির ছন্দে মাতাচ্ছে বিশ্ব

1 137

পুরুলিয়ার আদি ঠিকানা মানভূম। লোকে বলে গানভূম। লাল, রুক্ষ, পাথুরে মাটির দেশে শত অভাব-দারিদ্রেও নাচ ও গানের ফল্গুধারা বয়ে যাচ্ছে সে কবে থেকেই। লাল মাটির এই দেশে রুক্ষ প্রান্তরে ‘মহিষাসুর বধ’ পালা বসেছে। বৃত্তাকারে বসে দর্শকদের চোখে সীমাহীন কৌতুহল।

দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্র। মুখোমুখি লম্ফঝম্ফ করছে মহিষাসুর। রণবাদ্য বেজেছে। নৃত্যের ভঙ্গিতে যুদ্ধের আবাহান। এঁরা ছৌ শিল্পী। শরীর দুমড়ে মুচড়ে ঘুরে ফিরে পালা যখন শেষ পর্যায়ে, তুমুল হাততালির মাঝে মুখোশ খুলে ফেলেন দুর্গা। এ কি? পুরুষ তো নয়, এ যে নারী। ছৌ নাচে পুরুষরাই কুশীলব। আদিকাল থেকে এমনটাই চলছে। শরীরের ভঙ্গিতে, নাচের কৌশলে কই নারী বলে তো মনে হয়নি! এত পরিশ্রম, এত উচ্ছ্বল ভঙ্গি এক নারীর! তাও আবার এক কিশোরী!

‘আমি শক্তি, আমি দুর্গা’, মেয়েটির চোখেমুখে আত্মবিশ্বাসের আলো। শরীর থেকে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে তেজ। জরি-চুমকির পোশাক ভেদ করেও সে তেজের আলো পৌঁছে গেছে গ্রামে গ্রামে। এই তেজ সাহসের। আত্মবিশ্বাসের। পরিশ্রম ও নিষ্ঠার। দুর্গার নাম মৌসুমী চৌধুরী। পুরুলিয়া জেলার প্রথম মহিলা ছৌ শিল্পী। পুরুষদের একচেটিয়া অধিকারে ভাগ বসিয়েছেন মৌসুমী। ছৌ নাচের মুখোশের আড়ালে লিঙ্গের বৈষম্য ঘুচেছে। মৌসুমী বুঝিয়ে দিয়েছেন, নৃত্যশৈলী হোক বা পরিশ্রম, নারী-পুরুষের ভেদ চলে না। ইচ্ছাশক্তিই বড়। লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, নিজের উপর বিশ্বাস যদি অটুট থাকে, তাহলে জয় হবেই।

“সমালোচনা করেছিল সবাই। বলেছিল মেয়ে কীভাবে ছৌ নাচবে। ঘরে বসে সংসার সামলাক। কিন্তু ছৌ আমাকে টানত। নাচের ভঙ্গিতে প্রাণ খুঁজে পেতাম,” বলেছেন মৌসুমী। পুরুলিয়ার গ্রামে বাড়ি। রোগা-পাতলা চেহারা। কিন্তু দু’চোখ বড় উজ্জ্বল। যে কোনও প্রতিকূলতাকে জয় করার দুর্বার ইচ্ছা সেখানে নিহীত। সেই চোখের সামনে সমালোচকদের মন্তব্য একদিন থেমে গিয়েছিল। পায়ে ঝুমুর বেঁধে লম্বা লাফ দিয়ে পেশাদার পুরুষ ছৌ শিল্পীর মতো যখন শরীরে মোচড় দিতেন মৌসুমী, অবাক হয়ে যেতেন গ্রামের লোকজনও। তখন আর সমালোচনা নয়, সম্ভ্রম ফুটে উঠত তাদের দৃষ্টিতে। গর্বে চোখ ভিজে আসত বাবা জগন্নাথ চৌধুরীর। বাবাকে দেখেই লক্ষ্য পূরণের পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতেন মৌসুমী।

পুরুলিয়ার মৌসুমী এখন পেশাদার ছৌ শিল্পী। দেশে-বিদেশে পালা করেন। নিজের ছৌ নাচের দল গড়েছেন। তাঁর কর্মশালা রয়েছে যেখানে গ্রামের মেয়েরা ছৌ নাচের কলা-কৌশল শিখতে আসে। মৌসুমী বলেছেন, তাঁর গুরু হলেন বাবা জগন্নাথ চৌধুরী। তিনিও পেশাদার ছৌ শিল্পী। মেয়েকে নিজের হাতে তৈরি করেছেন। প্রথমটায় ভেবেছিলেন মেয়ে পারবে না। কারণ ছৌ নাচে যে পরিশ্রম দরকার হয় তা মেয়েরা করার কথা ভাবতেই পারে না। একে গ্রামগঞ্জ এলাকা। মহিলারা পর্দার আড়ালে না থাকলেও, সামাজিক নানা বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে।

মৌসুমীর গ্রামও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই মেয়েকে এ পথে আসতে মানাই করেছিলেন জগন্নাথবাবু। কিন্তু মেয়ে নাছোড়। বাবাকে ছৌ নাচতে দেখে নিজে থেকেই অভ্যাস করে। সেই শিশুবেলা থেকেই। বয়স বাড়লে ছৌয়ের প্রতি আকর্ষণ আরও বাড়ে। কাজেই বাবাও আর না করতে পারেননি। জগন্নাথবাবু বলেছেন, “মেয়েকে যখন শেখাতে শুরু করি, তখন নানা কথা কানে আসে। নানা জনে নানা কথা বলেছিলেন। চক্ষুলজ্জার ভয়ও দেখিয়েছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়িনি। মেয়ের জেদের কাছে হার মেনেছিলাম আমিও।” জগন্নাথবাবুর হাত ধরেই প্রথমে প্রতিকূলতাকে জয় করার পাঠ নেন মৌসুমী। বাবার শিক্ষায় এবং স্নেহে ছৌ নাচের প্রতিটি কৌশল তাঁর আয়ত্তে এসে যায় অল্পদিনেই।

ছৌ পুরুলিয়ার শ্রেষ্ঠ নাচ। বিহার ও ওড়িশার অনেক জায়গায় এবং পশ্চিম মেদিনীপুরেও ছৌ নাচ দেখা যায়। এর নান্দনিক বৈশিষ্ট্য হল মুখোশ আঁটা শিল্পীদের ঘোরা, লাফানো, রণবাদ্যের তালে তালে নৃত্যের নানা ভঙ্গি। উচ্চারণগত এবং ব্যবহারগত দিক থেকে ছো>ছউ>ছৌ।  কেউ বলেন ‘ছৌ’কথাটা এসেছে ছাউনি থেকে, অর্থাৎ সেনা ছাউনি। ওড়িয়া ও কুর্মালি ভাষায় বলে ছুয়া বা ছেলে থেকে ছৌ নাচের নামকরণ হয়েছে। তাই ছৌ হল মূলত পুরুষদের নাচ। যদিও এখন সে ধারণা ভেঙে দিয়েছেন মৌসুমী। গতানুগতিক ধারার বিপরীতে চলে নিজের ঘরানা তৈরি করেছেন তিনি।

ছৌ নাচের চারটি ধারা রয়েছে। পুরুলিয়ার ছৌ, ওড়িশার ময়ুরভঞ্জের ছৌ, ঝাড়খণ্ডের সরাইকেল্লার ছৌ এবং ঝাড়গ্রামের চিল্কিগড়ের ছৌ। এদের প্রতিটির বৈশিষ্ট্য আলাদা। মুখোশের ধরন আলাদা। নাচের কৌশলেও পার্থক্য রয়েছে। ছৌ-কে বলা হয় যুদ্ধনৃত্য। শিব-দুর্গা পালা, মহিষাসুর বধ, রামায়ণ, মহাভারত বা পুরাণের নানা দেবদেবীর কাহিনী নিয়ে পালা সাজানো হয়। চরিত্র অনুযায়ী মুখোশ ও সাজসজ্জা করেন শিল্পীরা। ছৌ-এর মুখোশ ও পোশাকের সাজে এমনিতেই ওজন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তারপর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে পালা করতে হয়। ৪৫ মিনিটের পালা মানেই অক্লান্ত পরিশ্রম। আর যদি রাত জেগে পালা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। তাই সাধারণত পুরুষরাই ছৌ নাচের অভ্যাস করেন।

“আগে সবাই ভাবত মেয়েরা পারবে না। এখন আমাকে দেখে মনের জোর পেয়েছে। পুরুলিয়াতেই দশ থেকে বারোটা মহিলা ছৌ নাচের দল আছে,” বলেছেন মৌসুমী। তাঁর বোন শ্যামলীও ছৌ নাচের অভ্যাস করছে। বাবার সাহচর্যেই নিজের ছৌ-নাচের দল তৈরি করেছেন, নাম ‘মিতালি ছৌ মান্ডি।’ বিদেশেও পালা করতে গিয়েছেন তিনি। নরওয়েতে যখন মঞ্চে উঠে নাচের নানা কৌশল দেখিয়েছিলেন তখন অবাক হয়ে গিয়েছিলেন দর্শকরা। এমন বিচিত্র সাজে এমন জটিল নাচের ভঙ্গি দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন সকলে। মুগ্ধতাও ফুটে উঠেছিল তাঁদের চোখেমুখে। মৌসুমী বলেছেন, এত মানুষের প্রশংসাই তাঁর চলার পথ তৈরি করে দিয়েছে। সাহস জুগিয়েছে প্রতিটি পদক্ষেপে।

দেখুন মৌসুমীর কাহিনি।

জীবনের গতি থেমে থাকে না। ধরাবাঁধা পথেও চলে না। গানের সুরে, বাজনার তালে জীবনের যে উচ্ছ্বাস ধরা পড়ে তাকেই সাদরে আলিঙ্গন করেছেন মৌসুমী। এই নৃত্যকলায় শুধু মুখোশের আড়াল আছে, বাকি সবই উন্মুক্ত। রণবাদ্যে অশুভের বিনাশ এবং শৃঙ্গাররসে প্রেমের ভাবনা ফুটে ওঠে। জীবনের ভালমন্দ ধরা দেয় এই নাচগানে। জীবন যেন তার সব রাখঢাক ঝেড়ে ফেলে ধরা দেয় এক সহজ সারল্যে।

এই সরলতাই মৌসুমীর শক্তি। ভাগ্যের দোহাই দিয়ে প্রত্যাশা পূরণের আশায় বসে নেই। নিজের পথ তৈরি করেছেন নিজের শক্তিতেই। আর এই শক্তিই শত শত নারীর অলঙ্কার। এই শক্তি দুর্গার প্রতীক। মৌসুমীর মতো মেয়েরাই সে দুর্গা যারা বাঁধন ভেঙে নিজের ভাগ্য জয় করেছেন। আগামীদিনেও করবেন।

You might also like
1 Comment
  1. […] পরিশ্রম ও নিষ্ঠার। দুর্গার নাম মৌসুমী চৌধুরী। পুরুলিয়া জেলার প্রথম মহিলা ছৌ […]

Leave A Reply

Your email address will not be published.