HeaderDesktopLD
HeaderMobile

রঙে-রূপে ভরিয়ে তুলছেন মা দুগ্গাকে, ‘পুরুষশাসিত’ কুমোরটুলিতে শক্তির প্রতীক চায়না পাল

0 83

হাতে বাকি মাত্র দু’দিন। তার পরেই দেবী দুর্গার বোধন। করোনা আবহে অবশ্য চারপাশে নিয়মের কড়াকড়ি রয়েছে। তবে তাতে কী, নিয়ম-বিধি মেনেই এবার বাঙালি মাতবে মায়ের আরাধনায়। শহর ও শহরতলির প্রায় সব মণ্ডপে ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছে দেবী মূর্তি। মৃৎশিল্পীদের নিখুঁত কারিগরি এবার অনেকেই চাক্ষুষ করবেন ভার্চুয়ালি অর্থাৎ ডিজিটাল মাধ্যমে। আর নিউ নরম্যালে নতুন উপায়ে দেবী দর্শনের মধ্যেই তাঁরা ঝলক পাবেন চায়না পালের তৈরি মা দুর্গার।

কলকাতার কুমোরটুলি হোক বা যে কোনও জায়গায় ঠাকুর বানানোর কারিগর, পুরুষদের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে এই জগতে। সেখানেই নিয়মের বেড়াজাল ভেঙেছেন চায়না। কুমোরটুলির স্টুডিওতে বসে দিব্যি পাল্লা দেন বাকি ‘পুরুষ’ মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে। মূর্তি গড়া থেকে সংসারের হাল ধরা, আক্ষরিক অর্থেই চায়না দশভুজা। পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন এই পেশা। বাবা ছিলেন মৃৎশিল্পী। তবে কোনও দিন চাননি মেয়ে এই পেশায় আসুক। একে তো ঠাকুর গড়ার কাজ অনেক ঝক্কির, তার মধ্যে রয়েছে অনেকের বাঁকা নজর। সব মিলিয়ে ছোট্ট থেকেই একরত্তি মেয়েকে নিয়ে বড় চিন্তা ছিল তাঁর।

তবে এসবের অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন চায়না। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরেই প্রথম স্টুডিওতে আসা। অল্প সময়েই বুঝে গিয়েছিলেন এই তাঁর স্বপ্নের ঘর। নিজের শিল্পসত্ত্বার জাদুতে এখানে বিপ্লব করতে পারবেন তিনি। কিশোরী বয়সেই মাটি-রং-তুলির সঙ্গে সখ্য জন্মায় চায়নার। বাবা বিশেষ পছন্দ করতেন না বলে সকলের নজর এড়িয়ে, বাবার আড়ালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গিয়ে বসে থাকতেন স্টুডিওতে। দু’চোখ ভরে দেখতেন মা দুর্গার মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী হয়ে ওঠা। মনে মনে তখন থেকেই চায়না ঠিক করেছিলেন যাই হয়ে যাক ঠাকুর গড়া শিখতেই হবে। কেউ না শেখাক, বাকিদের দেখে দেখেই শিখবেন। কিন্তু শিখতেই হবে।

এর পরেই চায়নার জীবনে আসে বড় বিপর্যয়। একবার দুর্গা পুজোর মাত্র ২০ দিন আগে মারা যান চায়নার বাবা। আচমকা এ হেন ঘটনায় খানিক বেসামাল হয়ে গিয়েছিলেন বটে। তবে হাল ধরতে বেশি সময় নেননি চায়না। বাবার মৃত্যুর পরই সেই অর্থে ঠাকুর গড়ার কাজ শুরু হয় তাঁর। একে একে শিখেছেন সবকিছু।

চায়না বলেন, “মাটির মূর্তি বানানো মুখের কথা নয়। সব জিনিস সব মাটিতে হয় না। যেমন মায়ের মুখ তৈরি হয় বেলে আর এঁটেল মাটিতে। তার আবার ভাগ আছে। তার পর রয়েছে ছাঁচে ফেলে মায়ের মুখের আদল গড়া। মূর্তি রঙ থেকে দেবীর চোখ আঁকা, খড়ের কাঠামোয় মাটির প্রলেপ থেকে শুরু করে পরিপূর্ণ মা দুর্গাকে তৈরি করা চাট্টিখানি কথা নয়। আস্তে আস্তে সব শিখে নিয়েছি।”

দেখুন, কী বলছেন চায়না পাল।

বাবাকে হারিয়েছেন অকালে। সাংসারিক ঝড়ঝাপ্টা সামলে কাজের জগতেও শুনতে হয়েছে কটাক্ষ। কষ্ট হয়েছে। তবে একদিনের জন্যও ভেঙে পড়েননি চায়না। বিশ্বাস রেখেছিলেন নিজের উপর। জানতেন তাঁর শিল্পীসত্ত্বা আর গুণ তাঁকে ধোঁকা দেবে না। নিষ্ঠা আর অদম্য পরিশ্রমের ফসলও হাতেনাতে পেয়েছেন তিনি।

আজ তিলোত্তমার অন্যতম বিখ্যাত মৃৎশিল্পী তিনি। কেউ আর মেয়ে বলে খোঁটা দেয় না। বরং তাঁর গুণের কদর করে। জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক, সব স্তরেই বিখ্যাত চায়না। নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে বিদেশের মাটিতেও। পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। চিনের মিউজিয়ামে শোভা পেয়েছেন তাঁর স্পেশ্যাল স্টাইল ‘একচালার ঠাকুর’। থিমের রমরমাতেও বাবার চিরন্তন স্টাইলকেই ধরে রেখেছেন চায়না। একচালাতেই সপরিবারে উমাকে রাখেন তিনি। নিখুঁত তুলির টানে যেন প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় মাটির মূর্তিতে।

একা হাতে ঘরবার সামলে আজ চায়না পাল-ই সমাজের শক্তির প্রতীক।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.