HeaderDesktopLD
HeaderMobile

ঝলমলে জীবন থেমে যায় নার্ভের অসুখে, ফিনিক্স পাখি অনূক্তা আজ স্বপ্ন দেখাচ্ছেন পিছিয়ে পড়াদের

1 551

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল অভিনেত্রী হওয়ার। মডেলিং, গ্ল্যামার দুনিয়া, র‍্যাম্প আকর্ষণ করতে তাঁকে। আর তাই দমদমের খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে হয়েও সেদিকে পা বাড়িয়েছিলেন অনূক্তা ঘোষাল। তার জন্য কম খেসারত দিতে হয়নি তাঁকে। শুনতে হয়েছে কথা। বাবা পর্যন্ত খারাপ ভেবেছেন। লড়তে হয়েছে শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গেও। কিন্তু লড়াই থামাননি অনূক্তা। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছেন সব কষ্ট। এগিয়ে গিয়েছেন সব বাধা ভেঙে। আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন অনেক সাধারণ মেয়েদের রোলমডেল। অনূক্তা প্রমাণ করেছেন, তিনিই শক্তি, তিনিই দুর্গা।

অনূক্তার কথায়, “যখন সদ্য কিশোরী তখন মডেল ও অভিনেত্রী হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজনরা কেউ মেনে নেননি। আমাকে বলা হয়েছিল আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তাই বড় স্বপ্ন দেখা আমার উচিত নয়। কিন্তু আমি থামিনি। ২০১২ সালের কলকাতার একটি নামকরা বিউটি কনটেস্টে লুকিয়ে নাম দিই। শুধুমাত্র অসুস্থ মা আমার পাশে ছিলেন। সেখানে আমি ফার্স্ট রানার আপ হওয়ায় কলকাতার বেশ কিছু খবরের কাগজ ও ম্যাগাজিনে আমার ছবি বের হয়। আর তারপরেই পাড়া প্রতিবেশীরা বলতে শুরু করে মেয়ে সুন্দরী বলে রাস্তায় নেমে ব্যবসা করছে।”

কারও কথায় কান দেননি অনূক্তা। একদিকে বাড়িতে অসুস্থ মায়ের সেবা, বাজার করা, রান্না করা থেকে শুরু করে মডেলিং, গ্রুপ থিয়েটার সব কিছু করতেন তিনি। কিন্তু এই লড়াইয়ে কাউকে পাশে পাননি অনূক্তা। এমনকি আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীদের কথা শুনে বাবাও কথা বলা বন্ধ করে দেন। কিন্তু তাও এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। তখনও জানতেন না সামনে কী ভয়ানক সময় অপেক্ষা করে রয়েছে তাঁর জন্য।

২০১৩ সালের শেষের দিকে গুরুতর নার্ভের রোগে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন অনূক্তা। হাঁটাচলা তো দূর, ঠিকভাবে কথা পর্যন্ত বলতে পারতেন না তিনি। অনূক্তার কথায়, “জীবনটা থমকে গিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে মনে হত, সবাই কীরকম হাঁটাচলা করছে, কথা বলছে। সবাই কত ভাগ্যবান। এই সময় ডাক্তাররা পর্যন্ত জানিয়ে দেন আমি আর সুস্থ জীবনে ফিরতে পারব না। আত্মীয়স্বজন থেকে পাড়া প্রতিবেশী সবাই আমাকে অপয়া, বাবা মায়ের বোঝা এইসব বলত। অনেক তো এও বলত মুখে রং মেখে উশৃঙ্খল জীবনযাপন করতাম বলেই ভগবান নাকি আমাকে শাস্তি দিয়েছেন।”

সবার সব কথা সহ্য করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করেন অনূক্তা। প্রায় দেড় বছর পরে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন তিনি। সেখান থেকেই তাঁর লড়াই আবার শুরু হয়। ফের মডেলিং করার চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু কেউ তাঁকে নিচ্ছিল না। সব জায়গায় বলা হচ্ছিল তাঁর শরীরে রোগের ছাপ পড়েছে। কুড়িটিরও বেশি অডিশনে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হন তিনি। শুধু তাই নয়, সব জায়গায় কটূক্তি শুনতে হত। সেই সময় তাঁর কাউন্সেলিং চলায় পাড়ায় সবাই ‘পাগল’ বলে ডাকাও শুরু করেছিল তাঁকে।

অনূক্তার কথায়, “কেউ আমাকে তাদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করত না। কেউ কথা বলত না। এক আত্মীয় তো ৪৮ বছর বয়সী একজনের সঙ্গে আমার বিয়ের সম্বন্ধও আনেন। তখন আমার বয়স ২২। এসে বলেছিলেন বাড়ির বোঝাকে বিদায় করতে। মায়ের চোখে জল দেখেছিলাম। সেদিনই ঠিক করি আর হারব না।”

নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন অনূক্তা। গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, এমবিএ করার পরে বিশ্বের অন্যতম সেরা একটি অডিট ফার্মে চাকরি পান তিনি। সেইসঙ্গে ফিরে পান নিজের আত্মবিশ্বাসও। আর তাই টেলিভিশনে অ্যাঙ্কারিং, লেখালেখি সব চলতে থাকে। অনেক অনুষ্ঠান থেকে ডাকও আসে। এমনকি রাজভবনে রাজ্যপালের সামনে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করার সুযোগ পান অনূক্তা।

এর পরে আবার তিনটি বিউটি কনটেস্টে নাম দিয়ে জয়ী হন অনূক্তা। আরও তিনটি কনটেস্টের ফাইনালে পৌঁছন। নামকরা সংবাদপত্র থেকে শুরু ম্যাগাজিনে নাম ও ছবি বেরতে থাকে তাঁর। বড় ব্র্যান্ডের ক্যালেন্ডারেও জায়গা হয় অনূক্তার। সমাজসেবার কাজেও ব্রতী হন তিনি।

শুনুন অনূক্তার কথা।

অনূক্তার কথায়, “আমরা এমন একটা প্রতিষ্ঠান করার চেষ্টা করছি যেখানে সমাজের সেইসব মানুষদের বিনামূল্যে কাউন্সেলিং করানো হবে যারা কোনও না কোনও কারণে নিজেদের উপর থেকে আত্মবিশ্বাস হারিয়েছেন। তাঁদের নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শেখাব আমরা।”

এখনও লড়াই শেষ হয়নি অনূক্তার। যে লড়াই তিনি নিজে করেছেন সেই লড়াইয়ের আগুন ছড়িয়ে দিতে চান আরও অনেকের মধ্যে। সেই কাজই করে চলেছেন এক মনে। আর তাই সমাজের অসংখ্য মেয়ের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন শক্তি, হয়ে উঠেছেন দুর্গা।

You might also like
1 Comment
  1. […] ঘরের মেয়ে হয়েও সেদিকে পা বাড়িয়েছিলেন অনূক্তা ঘোষাল। তার জন্য কম খেসারত দিতে হয়নি তাঁকে। […]

Leave A Reply

Your email address will not be published.