HeaderDesktopLD
HeaderMobile

দেশের দশের দশ দুর্গা, জানুন তাঁদের দুর্গতিনাশের কাহিনি

0 242

সভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই এ সমাজে, জীবনে নারীদের অবদান অসামান্য। প্রাণের আধার তাঁরা, তাঁরাই চালিকাশক্তি এ পৃথিবীর। তবু সেই আদিলগ্ন থেকেই সমাজের এক অদ্ভুত বৈষম্যে নারীদের সামনে একের পর এক হাজির হয়েছে বাধা, প্রতিকূলতা, সংকট। কখনও সম্মানের সঙ্গে আপস, কখনও সুযোগের অভাব। কখনও বা শুধু নারী হওয়ার কারণেই হিংসার শিকার তাঁরা। তবু যুগে যুগে যে বঞ্চনা-লাঞ্ছনার পথ পার করে যেভাবে বারবার পৃথিবীর নানাপ্রান্তে সাফল্যের আঁচড় কেটেছেন তাঁরা, তাতে একথা স্পষ্ট, নারীরা আদতে অপার অপার শক্তির আধার।

এই শারদোৎসবে আমরা যে মা দুর্গার আরাধনা করি, তা আসলে সেই অপার শক্তিরই আরাধনা। কিন্তু শুধু মা দুর্গা নন, আমাদের চারপাশে তথাকথিত যে সাধারণ নারীরা থাকেন, তাঁদের মধ্যেও অপরিসীম শক্তি লুকিয়ে থাকে। যে সব নারীদের কথা কখনও সামনে আসে না, বিশ্বের নানা প্রত্যন্তে একমনে লড়ে চলেছেন তাঁরা, পথ দেখাচ্ছেন,  তাঁরাও দশভুজা দু্র্গার চাইতে কোনও অংশে কম নন!

‘দ্য ওয়াল’ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার গ্রাম ও শহর থেকে এই রকম ১০ জন নারীকে স্বীকৃতি জানিয়েছে এই শারদোৎসবে। তাঁদের লড়াইকে, লড়াই পার করে সাবলম্বী হওয়াকে এবং আরও পাঁচ জনকে পথ দেখানোর প্রচেষ্টাকে কুর্নিশ জানিয়েছে দ্য ওয়াল। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আরও হাজার হাজার নারীকে তাঁদের শক্তির প্রকাশ ঘটানোর আহ্বান জানাচ্ছে তারা।

এ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে কোনও নারী তাঁর উচ্ছলতা নিয়ে, তার প্রাণশক্তিতে ভর করে গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়লে তাঁদের থামিয়ে দেওয়ার অলিখিত নিয়ম লেখা রয়েছে এই সমাজে। কিন্তু যাঁরা আজও নাছোড়বান্দা, তাঁদেরই দশ জন এবছর দ্য ওয়ালের ‘আমি শক্তি আমি দুর্গা’

আসুন, পরিচয় করে নিই তাঁদের সঙ্গে।

১. শহরের ব্যস্ত পথঘাট, নামীদামি কোচিং সেন্টারের বাইরে এ এক অন্য জীবন। পাত্রসায়র ব্লকের হামিরপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পারুলিয়া গ্রাম। এখানে রোজ সকালে খোলা আকাশের নীচে ভাঙা দাওয়ায় জড়ো হয় একরাশ কচিকাঁচা। বিয়ের পর থেকেই বছর ৫০ ধরে বাচ্চাদের পড়িয়ে আসছেন জ্যোৎস্না সেনগুপ্ত। জ্যোৎস্নার কাছে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ নিয়ে এই পিছিয়ে থাকা এলাকার অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী আজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত। তাঁরাই সত্তরোর্ধ্ব জ্যোৎস্না দিদিমণির অহঙ্কার।

দেখুন জ্যোৎস্নার কাহিনি।

২. ৬ বছর আগে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ডাক্তারি পাশ করেন আকাঙ্ক্ষা ভাস্কর। সেই বছরই ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা দিয়েছিলেন তিনি। পড়াশোনায় বরাবরের মেধাবী আকাঙ্ক্ষা এমবিবিএস ডিগ্রির পাশাপাশি একবছরের মধ্যেই হাসিল করেন আইএএস ডিগ্রিও। ২০১৫ সালের আইএএস ব্যাচের ক্যাডার হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেই পথচলা শুরু। তার পর কাজের জায়গায় যত এগিয়েছেন জনপ্রিয়তার সঙ্গে সম্মান বেড়েছে আকাঙ্ক্ষার। ক্রমশ পুরুলিয়াবাসীর ঘরের একজন হয়ে উঠেছেন তিনি।

দেখুন আকাঙ্ক্ষার কাহিনি।

৩. কলকাতার কুমোরটুলি হোক বা যে কোনও জায়গায় ঠাকুর বানানোর কারিগর, পুরুষদের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে এই জগতে। সেখানেই নিয়মের বেড়াজাল ভেঙেছেন চায়না পাল। কুমোরটুলির স্টুডিওতে বসে দিব্যি পাল্লা দেন বাকি ‘পুরুষ’ মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে। মূর্তি গড়া থেকে সংসারের হাল ধরা, আক্ষরিক অর্থেই চায়না দশভুজা। পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন এই পেশা। তিনি আজ নিজেও যেমন ঠাকুর গড়েন সমাজের ছক ভেঙে, আর পাঁচটা মেয়েকে সেই শিক্ষাও দেন।

দেখুন চায়নার কাহিনি।

৪. মেয়েটির চোখেমুখে আত্মবিশ্বাসের আলো। শরীর থেকে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে তেজ। জরি-চুমকির পোশাক ভেদ করেও সে তেজের আলো পৌঁছে গেছে গ্রামে গ্রামে। এই তেজ সাহসের। আত্মবিশ্বাসের। পরিশ্রম ও নিষ্ঠার। দুর্গার নাম মৌসুমী চৌধুরী। পুরুলিয়া জেলার প্রথম মহিলা ছৌ শিল্পী। পুরুষদের একচেটিয়া অধিকারে ভাগ বসিয়েছেন মৌসুমী। ছৌ নাচের মুখোশের আড়ালে লিঙ্গের বৈষম্য ঘুচেছে। মৌসুমী বুঝিয়ে দিয়েছেন, নৃত্যশৈলী হোক বা পরিশ্রম, নারী-পুরুষের ভেদ চলে না। ইচ্ছাশক্তিই বড়। লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, নিজের উপর বিশ্বাস যদি অটুট থাকে, তাহলে জয় হবেই।

দেখুন মৌসুমীর কাহিনি।

৫. এক মুহূর্তে সাজানো গোছানো জীবনটা ওলোটপালোট হয়ে গিয়েছিল অমৃতা পাণ্ডার। কোভিডের কোপে যে এভাবে তাঁদের পরিবারকে পড়তে হবে তা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেননি তিনি। তাই ঝড়টা জীবনে আসার পরে প্রথমে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক গ্রাস করেছিল গোটা পরিবারকে। কিন্তু লড়াই ছাড়েননি অমৃতা। আতঙ্ক কাটিয়ে উঠে হয়েছেন কোভিড যোদ্ধা। অন্য আক্রান্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি, দান করেছেন প্লাজমা। আর এভাবেই অমৃতা হয়ে উঠেছেন আজকের শক্তি, আজকের দুর্গা।

দেখুন অমৃতার কাহিনি।

৬. বর্ধমানের আউশগ্রামের জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত এলাকা যাদবগঞ্জের ঝাড়গড়িয়া। আদিবাসী অধ্যুষিত এই গ্রামে সময় যেন থমকে। বাইরের এগিয়ে যাওয়া পৃথিবী এখানে মুখ লুকোয়। এখানে বেঁচে থাকাটাই একটা মস্ত লড়াই। প্রতিদিনের রসদ জোগাড়ে কেটে যায় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত। সেখানে পড়াশোনা শেখার সময় কোথায়? সেই চিন্তা করার অবকাশই যে হয় না কারও। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের সরিয়ে রাখে শিক্ষার আঙিনা থেকে অনেক দূরে। তাই পাঠশালা খুলেছেন ফুলমণি কিস্কু

দেখুন ফুলমণির কাহিনি।

৭. ফুলিয়ার তাঁতশিল্প, বস্ত্রশিল্পের নাম আছে। কিন্তু শিল্পীদের নাম অজানা। অস্থি-মজ্জার পরিশ্রম মহাজনের আলমারিতে বন্দি থাকে। নাম হয় সংগঠন, সংস্থার। শিল্পীর নয়। এ কথা বিলক্ষণ জানতেন আফরুন্নিসা বেগম। অভাবের ঘরে লক্ষ্মীর ধন আনার স্বপ্ন দেখেননি তিনি। তাঁর লড়াই তাই ছিল শিল্পীর মর্যাদা কিছু স্বার্থপর মানুষের কুঠুরি থেকে ছিনিয়ে বের করে আনা। স্বনির্ভর হওয়ার যে পথ দেখিয়েছেন আফরুন্নিসা, সেখানে কোথাও একটা নীরব প্রতিবাদ আছে। শিল্পকে বাঁচানোর, শিল্পীকে সম্মান দেওয়ার। সেই কাজে সফল আফরুন্নিসা বেগম। আজ তাঁর নিজের সংগঠন রয়েছে ‘ফুলিয়া তন্তুবায় সমবায় মহিলা সমিতি লিমিটেড’। সরকারি সাহায্যে নিজের শো-রুম তৈরি করেছেন। সাড়ে ছ’ শো মহিলার সংসার চালানোর দায়িত্ব নিয়েছেন একা হাতে।

দেখুন আফরুন্নিসার কাহিনি।

৮. ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল অভিনেত্রী হওয়ার। মডেলিং, গ্ল্যামার দুনিয়া, র‍্যাম্প আকর্ষণ করতে তাঁকে। আর তাই দমদমের খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে হয়েও সেদিকে পা বাড়িয়েছিলেন অনূক্তা ঘোষাল। তার জন্য কম খেসারত দিতে হয়নি তাঁকে। শুনতে হয়েছে কথা। বাবা পর্যন্ত খারাপ ভেবেছেন। লড়তে হয়েছে শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গেও। কিন্তু লড়াই থামাননি অনূক্তা। নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছেন সব কষ্ট। এগিয়ে গিয়েছেন সব বাধা ভেঙে। আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন অনেক সাধারণ মেয়েদের রোলমডেল। অনূক্তা প্রমাণ করেছেন, তিনিই শক্তি, তিনিই দুর্গা।

দেখুন অনূক্তার কাহিনি।

৯. ভোর থেকে সন্ধে পর্যন্ত কঠোর অনুশীলনের শৃঙ্খলে বাধা জীবন তখন। নিজের চারপাশে যা কিছুই ঘটে যাক, লক্ষ্য থেকে চ্যুত হওয়ার ন্যুনতম কোনও অবকাশ ছিল না। সেই লড়াই তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে অনেক কিছু। আন্তর্জাতিক আঙিনায় দেশের হয়ে লড়াই করে কখনও তিনি জয় করেছেন সোনা, কখনও রুপো। পেয়েছেন খ্যাতি, সম্মান। আর এখন নিজে খেলা ছাড়ার পরেও মাঠের সঙ্গে সম্পর্কে ছেদ পড়েনি কোনও। বরং প্রতিদিন যেন আরও মজবুত হচ্ছে সেই বন্ধন। আগামী প্রজন্মকে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ যে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় রানাঘাটের মেয়ে সোমা বিশ্বাসকে।

দেখুন সোমার কাহিনি।

১০. আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো পড়াশোনা করে চাকরি করার স্বপ্ন দেখতেন জয়তী নাথ। কম্পিটার নিয়ে পড়াশোনা করে চাকরিও শুরু করেছিলেন। তবে সুখ বেশিদিন সয়নি। ২০০৪ সালে আচমকাই সেরিব্রাল অ্যাটাক হয় জয়তীর বাবার। সংসারের সব সামলে চাকরিটা আর করা হয়নি তাঁর। সেই থেকেই শুরু জীবন সংগ্রাম। একাধিক ব্যবসা পেরিয়ে, ঘা খেয়ে, সেখেন সফ্ট টয়েজ বানানো।  আজ জয়তীর তৈরি সফট টয়, টেডি বিয়ার পৌঁছে যায় ১০ থেকে ১২টা দোকানে। বড় বাজারেও সফট টয় পাঠান জয়তী। পাইকারি হিসেবে সরবরাহ করেন টেডি বিয়ার ও আরও অনেক কিছু। তাঁর কাছে কাজ শেখে আরও বেশ কিছু মেয়ে।

দেখুন জয়তীর কাহিনি।

 

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.